চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৩৭ ॥ সুশীল সাহা


স্বাতী নক্ষত্রের পতন


শরীর একটু একটু করে ভেঙ্গে পড়ছিল। অসুস্থ শরীর নিয়েও অবিরত কাজ করে যাচ্ছিলেন। মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি মানেই এক অনাবিল প্রাণ। একটির পর একটি চরিত্রে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। তাঁর সমস্ত মেধা ও মনন জুড়ে ছিল নাটক আর নাটক। অবশেষে সত্তর ছুঁতে না ছুঁতেই তাঁকে চলে যেত হল। কিডনির সমস্যা নিয়ে মাসখানেক নার্সিং হোমে জীবন মৃত্যুর লড়াই শেষ করে অবশেষে বাংলা নাট্যজগতকে নিঃস্ব করে দিয়ে চলে গেলেন স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত । ইলাহাবাদের শিক্ষিত সম্পন্ন ঘরের মেয়ে থিয়েটারের আকর্ষণে কলকাতায় এসে সেই কবে ১৯৭৮ সালে যোগ দিয়েছিলেন নান্দীকারে। ততদিনে কেয়া চক্রবর্তী আর অজিতেশ বন্দ্যপাধ্যায় চলে গেছেন। রিক্ত নিঃস্ব রুদ্রপ্রসাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন স্বাতীলেখা। শুরু হল নান্দীকারের নতুনভাবে যাত্রা। বহু গুণে গুণান্বিতা স্বাতীলেখা ইলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন, কেবল তা নয়, ছিলেন সংগীতে পারদর্শী। বহুদিনের অনুধ্যানে আয়ত্ত করেছিলেন বেহালা আর পিয়ানো বাদনে দক্ষতা। ইলাহাবাদেই তাঁর নাট্যাভিনয়ের হাতে খড়ি। কলকাতায় এসে তা পূর্ণতা পেয়েছিল। অচিরেই নান্দীকার দলের অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন তিনি। একটা পর একটা নাটকের প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন। অভিনয়ের দক্ষতায় অর্জন করে নিয়েছিলেন সংগীত নাটক আকাদেমির পুরষ্কার। তাঁর সুযোগ্য সহযোগিতায় দলে নতুনভাবে সঞ্চারিত হল প্রাণ। শুরু হল নান্দীকারের অন্য এক অভিযাত্রা। দ্রুতই শুধু বাংলায় নয় সারা ভারতে তথা বাংলাদেশে তাঁদের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে অভিনয় করে সুখ্যাতি পেলেও সিনেমা জগতের প্রতি তাঁর তেমন আকর্ষণ ছিল না। অনেকদিন পরে ‘বেলাশেষে’ ছবিতে অভিনয় করে আপন দক্ষতা নতুন করে প্রমাণ করেছিলেন। তবু সিনেমা নয়, থিয়েটারই ছিল প্রধান উদ্দিষ্ট। তাই নান্দীকারের কাজে নিজেকে সম্পুর্ণ ঢেলে দিয়েছিলেন। বাংলা থিয়েটারে নতুন করে প্রাণের জোয়ার এসেছিল তাঁর আর রুদ্রপ্রাসাদের যুগল সম্মিলনে। সঙ্গে যোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল তাঁদের কন্যা সোহিনী। তাঁদের সুযোগ্য নেতৃত্বে সেই আশির দশক থেকে নান্দীকারের বাৎসরিক ‘জাতীয় নাট্যোৎসব’ বাংলায় নিয়ে এসেছে এক নবীনানন্দের বার্তা।

অনেকের মনে হতে পারে নান্দীকারের ইতিহাস শুরু হয়েছে ওই ১৯৭৮ সাল থেকেই। কিন্তু সত্যি সত্যি তা নয়। ১৯৬০ সালে যে দলটার জন্ম অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে, স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে দীর্ঘ সতের বছরের সেই ইতিহাসটা ভুলে গেলে যে সত্যের অপলাপ করা হবে! পাশাপাশি কেয়া চক্রবর্তীর মতো এক অসামান্য অভিনেত্রীর কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে। শুধুমাত্র নাটকের জন্যে কলেজের স্থায়ী চাকরি যিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন অনেক ভেবেচিন্তে, দলের জন্যে বিক্রি করেছিলেন নিজের সমস্ত গয়না, তাঁর অবদানকে ভুলে যাওয়া হবে এক ধরনের দ্বিচারিতা। অতীতের প্রতি শ্রদ্ধামিশ্রিত দায়িত্ববোধ থেকেই তাই এখন কিছু বলার চেষ্টা করব। কেননা ইতিহাসকে ভুলে যাওয়া বা অস্বীকার করা এক ধরনের আত্মহনন ছাড়া আরকি!

ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের কৃতি ছাত্রী কেয়া স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়তেন। ওই কলেজেরই ছাত্র রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তকে বিয়ে করেছিলেন ভালবেসে। স্বামীর হাত ধরেই একদিন অজিতেশের কাছে এসেছিলেন। নান্দীকারের হয়ে প্রথম অভিনয় ‘চার অধ্যায়’ নাটকে (১৯৬১)। তারপর কিছুদিনের বিরাম। ইতোমধ্যে ওই কলেজেই অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন কেয়া (১৯৬৪)। কিন্তু তাঁর রক্তে ছিল অভিনয়। তাই ’৬৬ সালে নতুনভাবে যুক্ত হয়ে যান নান্দীকারের সঙ্গে। গুরু অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তাঁর নবজন্ম হয়। থিয়েটারে নিবেদিত হয়ে যান প্রবলভাবে। তাঁর অভিনয়ে সমৃদ্ধ হয়ে নান্দীকারের নাটকগুলো সেই সময়ে প্রবলভাবে দর্শকনন্দিত হয়। তিনি নিজে দলকে এতটাই ভালবেসে ফেলেন যে ১৯৭৪ সালে কলেজের চাকরিটিও ছেড়ে দেন। দলের সার্বক্ষণিক কর্মী হয়ে তাঁর সেই সময়কার অবদানকে মনে রাখতে হবে। দলের জন্যে নিজের সমস্ত গয়না যে নারী বিক্রি করে দিতে পারেন তাঁকে ভুলে গেলে চলবে কেন? বস্তুত থিয়েটারের আঙ্গিনায় এই ‘স্যাক্রিফাইস’ খুব কম দেখা যায়। কিন্তু এই থিয়েটারই তাঁকে একসময় বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখায়। মায়ের চিকিৎসার খরচ যোগাবার জন্যে তিনি দল থেকে তিন মাসের ছুটি চেয়েছিলেন কাশী বিশ্বনাথ মঞ্চের এক নাটকে অভিনয় করবেন বলে। ওই মঞ্চে তখন যে নাটক মঞ্চায়িত হচ্ছিল তার প্রধান অভিনেত্রী মাধবী চক্রবর্তী বিশেষ কারণবশত তিন মাসের ছুটিতে যান। তাঁর পরিবর্তে অভিনেত্রী হিসেবে কেয়ার কাছে প্রস্তাব আসে। পরম দুঃখের বিষয় দলের তখনকার নান্দীকারের পরিচালন সমিতি তাঁর সেই আবেদন মঞ্জুর করেনি। ভগ্ন ক্লান্ত হতোদ্যম কেয়া এজন্যে অবশ্য দল ছাড়েননি। অজিতেশের স্নেহধন্য হলেও এই অতি দুঃখজনক ঘটনায় তাঁর কিছু করার ছিল না। অপরদিকে রুদ্রপ্রসাদের তখনকার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন জাগে। বিবাহিত জীবনে স্বামী স্ত্রীর পাশে দাঁড়াবেন এটাই তো বিধিসম্মত। কিন্তু তিনি সেটা করলে কি কেয়াকে তখন অর্থের জন্যে অতি নিম্নমানের সিনেমাতেও অভিনয় করতে হয়! আর সিনেমাতে অভিনয় করতে গিয়েই এক দুর্ঘটনায় এই অসামান্য অভিনেত্রী প্রাণ হারান, এ তো সবার জানা। সাঁতার না জানা কেয়া অভিনয়ের জন্যে নৌকো থেকে জলে ঝাঁপ দেন এবং অচিরেই তলিয়ে যান। প্রশ্ন উঠেছিল, কেন ওই দৃশ্যের জন্যে ডামি ব্যবহার করা হয়নি! কেন জলের নীচে জাল পাতা ছিল না! কেয়া কি সত্যিই জলে ঝাপ দিয়েছিল নাকি তাঁকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল! এইসব প্রশ্ন ওঠেও সেই সময়ে। কিন্তু কোন উত্তর মেলেনি। সেই অর্থে এই দুর্ঘটনার কোনও তদন্তও হয়নি। ১৯৭৭ সালে কেয়ার এই মৃত্যু এবং ওই বছরেই অজিতেশের নান্দীকার ছেড়ে চলে যাওয়া, বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এক অতি দুঃখের ইতিহাস। যদিও এ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য হয়নি তখন। আজই বা কার মাথাব্যথা আছে ওইসব নিয়ে! তাতে অবশ্য নান্দীকারের জয়যাত্রা বিঘ্নিত হয়নি। রুদ্রপ্রসাদের নেতৃত্বে স্বাতীলেখা, গৌতম, দেবশঙ্কর আর সোহিনীর অদম্য মেলবন্ধনে নান্দীকার এগিয়ে চলে সামনের দিকে।

কিন্তু প্রশ্ন জাগে, কী এমন দুর্ঘটনা ঘটেছিল যার জন্যে অজিতেশকে তাঁর নিজের হাতে গড়া দল ছেড়ে চলে হয়! ১৯৬০ থেকে ’৭৭ কম সময় নয়। কত ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে অজিতেশকে দল চালাতে হয়েছিল! সেই সময় কেয়ার যোগ্য সঙ্গত কেন জানিনা রবীন্দ্রনাথ আর কাদম্বরী দেবীর সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়। কেয়া যেভাবে অতি দুঃসময়ে দলের জন্যে প্রায় সর্বস্ব দিয়ে দিয়েছিলেন, যার তুলনা বাংলা নাটকে খুব কম মেলে। অজিতেশ নতুন দল দল গড়েছিলেন, নান্দীমুখ। সেই দলের অসাধারণ প্রযোজনা ‘পাপপুন্য’র কথা বাংলা নাটকের সুদীর্ঘ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই নাটক নান্দীকারের হয়েই তিনি পরিচালনা করবেন, এমনটাই তো কথা ছিল। কিন্তু হল না। দলে একসময় তিনি কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলেন বলে জানা যায়। এমনকি ভোটাভুটিতে তাঁকে নেতৃত্বের পদ থেকে হারিয়েও দেয়া হয়। রাগে দুঃখে অভিমানে তিনি তাঁর দল ছেড়ে চলে যান। বাকিটা ইতিহাস, বলাবাহুল্য দুঃখের ইতিহাস। কেয়ার অকালমৃত্যু এবং মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে অজিতেশেরও হঠাৎ করে চলে যাওয়া বাংলা থিয়েটারের এক অপূরণীয় ক্ষতি।

স্বাতীলেখা সেনগুপ্তর মৃত্যুর পরে এইসব প্রসঙ্গের অবতারণা খানিকটা অবান্তর বলে অনেকে মনে করতে পারেন। কিন্তু থিয়েটারের ধারবাহিক ইতিহাসকে মান্যতা দিতে গিয়েই নানা প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর পেতে ইচ্ছে করে আমাদের। দলের প্রতিষ্ঠাতাকে ভুলে যাওয়ার কি কোনও সর্বমান্য যুক্তি আছে। আজ যখন সোস্যাল মিডিয়া জুড়ে আন্তিগোনে নাটকের ক্লিপিং দেখিয়ে স্বাতীলেখার জয়ধ্বনি দেওয়া হচ্ছে, তখন অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই এসে যায় ওই নাটকে কেয়ার অবিস্মরণীয় অভিনয়ের কথা। নান্দীকারেই যখন ‘ভালমানুষ’ নাটকের রিমেক হয় ‘শঙ্খপুরের সুকন্যা’ নামে তখনও স্বাতীলেখার অভিনয়ের সঙ্গে কেয়ার তুলনা এসেই যায়। শত চেষ্টাতেও কি মুছে দেওয়া যাবে কেয়ার সেই অসাধারণ অভিনয়ের অবদান?
মাত্র সত্তর বছর বয়সে স্বাতীলেখা সেনগুপ্তর মৃত্যু বাংলা নাটকের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আজ আমরা অত্যন্ত শোকাহত তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে। বাংলা থিয়েটারে তাঁর অবদানকে সম্মান জানাতে গিয়ে কথার পিঠে কথার মতো এসেই গেল কিছু অম্ল-মধুর-তিক্ত-কষা স্বাদের প্রসঙ্গ।
অতীতকে তো আর ইচ্ছে করলেই মুছে ফেলা যায় না!