চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৩৮ ॥ সুশীল সাহা


অবমানব না অন্য মানুষ, নাকি সৃজনবিমুখ এক অক্ষম মানবক!


চলতে ফিরতে কতরকম মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়! কেউ কারো মতো নয়। প্রত্যেকে প্রত্যেকের থেকে আলাদা। চেহারায় চালচলনে কথাবার্তায় আচরণে। আর প্রত্যেকের মনোজাগতিক গঠন তো সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন। সেই কারণে এক মানুষ অন্য থেকে আলাদা। তবু চেনা ছকের বাইরে কিছু মানুষদের আমরা দেখি যারা একেবারেই ভিন্ন গোত্রের। এদের ‘হিজড়ে’ বলে অবজ্ঞা করার প্রথা আমাদের তথাকথিত মনুষ্য সমাজে বহুদিন ধরে চলে আসছে। প্রকৃত অর্থে ওরা সংখায় লঘু বলে এতদিন মুখ বুজে সহ্য করে এসেছে।
কিন্তু দিন বদলেছে। এতদিনে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা আইনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। মাথা উঁচু করে বাঁচবার দিশা তাঁরা অর্জন করেছেন বহু ত্যাগ তিতিক্ষা আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। কিন্তু লড়াই তো একদিনে শেষ হবার নয়। অধিকারের প্রয়োগ সেইভাবে না হলে তা তো বইয়ের পাতার অক্ষরসমূহের মধ্যেই বন্দি হয়ে থাকে! এখনও যে তাঁদের অনেকটা পথচলা বাকি!

ছেলেবেলায় বাড়িতে নবজাত সন্তানের আবির্ভাবলগ্নে এঁদের দেখেছি। দল বেঁধে এসে নাচগান করে গেছে। সেই নাচ বা গানে না আছে কোনও মাধুর্য, না আছে কোন নান্দনিক বোধ। তবু তাঁরা আসত। হৈ হৈ করে কিছুটা সময় কাটিয়ে যেত। বিনিময়ে দিতে হত কিছু চাল ডাল অর্থ ইত্যাদি। সময় বদলে গেছে। ওঁদের দাবিও বেড়েছে। কী আর করা! কোনওরকমে ওঁদের হাত থেকে রেহাই পেতে গৃহকর্তারা তৎপর হয়েছেন। ওদের বিদেয় করে বাড়িতে ফিরে এসেছে শান্তির বাতাবরণ। কিন্তু এতেই তো শেষ হচ্ছে না। পথচলতি দেখা যাচ্ছে ওঁদের। গাড়ির কাছে এসে কিছু চাইছে। ট্রেনে বাসে যাত্রীদের কাছে হাত পাতছে। বাজারে ঢুকে যাকে বলে ‘তোলা’ তুলছে।

বহুকাল আগে ‘দেশ’ পত্রিকায় বুদ্ধদেব বসুর ‘কিম্পুরুষ’ শিরোনামে একটি কবিতা পড়ে খুব আলোড়িত হই। কবিতাটির সঙ্গে আমার দেখা চারপাশের বেশ কিছু সাদৃশ্য দেখে অবাক হয়ে যাই। কবি তাঁর অসামান্য পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেছিলেন সমাজ –বাস্তবতার এক করুণ চিত্র। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেখা এই কবিতাটি পরবর্তীকালে কবির শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘স্বাগত বিদায়’(১৯৭১)-এ সংকলিত হয়েছিল। মনে রাখা দরকার বুদ্ধদেব বসু প্রয়াত হয়েছিলেন ১৯৭৪ সালে। তাঁর এই কবিতাটি এখনও আমার কাছে খুব প্রাসঙ্গিক মনে হয়। কৌতূহলী পাঠকদের জন্যে কিছুটা তা থেকে তুলে ধরছি।
“কেউ ডেকে পাঠায় না। তারা কিন্তু চলে আসে ঠিক
যখনই নূতন শিশু জন্ম নেয় গৃহস্থের ঘরে:
যেন কোনো স্বতস্ফূর্ত প্রেরণার অদম্য উত্তরে
নৃত্য করে অভ্যর্থনা, ঐকতানে গেয় মাঙ্গলিক।
গলায় ফুলের মালা, হাতে চুড়ি, কপালে সিন্দুর,
হেসে, গ’লে, ঢ’লে পড়ে, লোল দৃষ্টি পাঠিয়ে আকাশে
(যদিও ছোটোরা কেউ ভয় পায়, ক্ষিপ্ত হয়ে চ্যাঁচায়)
মেতে ওঠে – অনাহুত – বিপুল বদান্য উচ্ছ্বাসে।
অতি সাধু পরিশ্রম! তবু প্রীতি জোগাতে পারে না।
কর্কশ তাদের কণ্ঠ। অঙ্গভঙ্গি বড়ো বেমানান
কুশ্রী নয় – কুশ্রীতারও অতিক্রান্ত উৎকট। অচেনা।
গৃহস্বামী দুই-চার মুদ্রা দিয়ে শশব্যস্ত বিদায় জানান।
দুই-চার মুদ্রা– শুধু সেজন্যেই এদের উৎসাহ
এই সব দুর্ভাগারা, যারা নয় নারী বা পুরুষ-
তাই বলে হৃদয় কি নিশ্চেতন? শরীর বেঁহুশ?
উৎপীড়ণ করে না কি ধমনীর নির্বোধ প্রদাহ?
মনে হয়, তাই তারা, ছুটে আসে মুগ্ধ কৌতূহলে-
সন্তানের জন্মে যেন এত সুখী অন্য কেউ নয়,
বা শুধু তাদেরই কাছে জন্ম এক অমেয় বিস্ময়,
নিজেরা জননরিক্ত, প্রকৃতির পরিত্যক্ত ব’লে।
যা থেকে বঞ্চিত তারা, চায় তারই পরোক্ষ আস্বাদ
লব্ধ ফলে প্রমাণিত দেবতাকে জানিয়ে সম্মান,
অবরুদ্ধ রহস্যের অভিনয়ে দিয়ে আত্মদান-
যদি জোটে কল্পনায় এক কণা নিষিদ্ধ আহ্লাদ:

গোটা কবিতার এটা বৃহদাংশ। ইচ্ছে করেই উদ্ধৃত করলাম। এমন অসামান্য একটি কবিতার স্বাদ থেকে পাঠকদের বঞ্চিত করতে চাইনি। বাহান্ন বছর আগে লেখা চিত্রের সঙ্গে আজকের কতটা মিল আছে, সেটা পাঠক নিজেই বিচার করবেন। আসলে যাকে বলি ‘সমাজ প্রগতি’ সে তো হয় অতি ধীরে। ঘড়ির কাঁটার মতো তার চলনটা ঠিক চোখে পড়ে না। কিন্তু তাই বলে কিছুই তো আর থেমে থাকে না!
সময়ের আবর্তনে এই তথাকথিত ‘অবমানব’ সমাজের মানুষেরা অন্য বেশে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। অনেক পরিবারে এমন সন্তানেরা তাদের নিজেদের মতো করে বড়ো হচ্ছে। ছিল অনন্য, হয়ে গেল অনন্যা। রাম হয়েছে রমা। চলাফেরায় মেয়েলি অঙ্গভঙ্গি। সাজপোশাক অন্যরকম। উৎকট মেক আপে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। সে ছেলে হয়েও মেয়ে। কেউ হয়ত কলেজে পড়ে, কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাদের জোটে অচেনা পথিকের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ঠাট্টা হরহামেশাই । তবু তারা অকুতোভয়। নিজেরাই গড়ে নিয়েছে নিজেদের একটা সমাজ, যতই তা ছোট হয় না কেন! সোমনাথ থেকে মানবী হয়ে ওঠার ইতিকথা এখনকার প্রায় সবাইই জানেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী অর্জন করে নিজের যোগ্যতায় ঝাড়্গ্রাম কলেজে অনেক অপমান সহ্য করে তাঁর শিক্ষকতা করা এবং তারপর কৃষ্ণনগর উইমেন্স কলেজের অধ্যক্ষ হওয়া এখন ইতিহাস। সর্বমান্য চলচ্চিত্রকার ঋতুপর্ণ ঘোষ সম্পর্কে নতুন করে আর কিইবা লিখব! তাঁর অকালপ্রয়াণ বাংলা সিনেমার এক সমূহ ক্ষতি। কথাসাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’ উপন্যাস এঁদের নিয়েই।

একটি শব্দবন্ধ এখন চালু হয়েছে এলজিবিটিকিউআই (LGBTQI ). এল অর্থাৎ লেসবিয়ান (নারী সমকামী), জি অর্থাৎ গে (পুরুষ সমকামী), বি অর্থাৎ বাই সেক্সুয়াল (উভকামী), কিউ অর্থাৎ কিউয়ার (অজ্ঞাত) আর আই মানে ইন্টার সেক্স (উভলিঙ্গ)। এইসব অভিধা এখন সর্বজনবিদিত । তবু আলোচনার সুবিধার জন্যে এগুলোর উল্লেখ করলাম। এ এক বিশাল অচেনা জগৎ। এ নিয়ে অনেক বড় কাজ করেছেন নিলয় বসু। দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে অনেক উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। সোমনাথ মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন তাঁর অসামান্য উপন্যাস, ‘অন্তহীন অন্তরিণ প্রোষিভর্তৃকা’। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ কিংবা ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবি ‘চিত্রাঙ্গদা’ এই বিষয়ের এক অসামান্য দলিল। বিদেশে এমনকি হিন্দি ভাষাতেও বলিউডে এই বিষয় নিয়ে অনেক ছবি তৈরি হয়েছে। প্রথাবহির্ভূত এইসব ছবি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনেকেই আবার মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু খুবই স্পষ্টভাবে এঁদের কথা অনেকেই বলেছেন অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে।

এই অচেনা জগৎ থেকে আবার বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় ফিরে আসি। কবিতার শেষাংশে কবি যেন নিজের কথাই বলেছেন। এক সময়ের প্রবল পরাক্রমশালী যেমন কালচক্রের অমোঘ নির্দেশে নিস্তেজ হয়ে পড়ে তেমনি ধূসর অতীতের বেদনামাখা সেই ইতিবৃত্ত যে ওই কবিতার পরতে পরতে, বিশেষ করে শেষাংশে।
“যেমন দিদিমা হন রসবতী নাৎনির বিয়েতে,
দন্তহীন বিলোল কৌতুকে যেন চান ফিরে পেতে
প্রায় ভুলে যাওয়া তাঁর সমর্থ অতীত;
কিংবা বৃদ্ধ মনোযোগী আদিরসে বর্ণিল ছবিতে
যদি বা অকস্মাৎ ন’ড়ে ওঠে কুলকুণ্ডলিনী;
কিংবা কোনো কবি যেন – নিঃশেষিত, আবেগরহিত,
ব্যর্থতা বুঝেও তবু (বদ্ধমূল যেহেতু বাসনা),
সব সরঞ্জাম নিয়ে সারাদিন সন্নিবিষ্ট যিনি
নিস্তাপ, গুঞ্জনহীন, নিরুত্তর দাম্পত্য নিভৃতে,]
সামনে শাদা পাতা খুলে যার অঙ্গে লাঙলের আঁচড় পড়ে না।
শেষ কাব্যগ্রন্থে নিয়তির এ কোন অমোঘ বাণী শোনালেন সত্যসন্ধ কবি! উৎপাদন ক্ষমতাহীন নপুংসকদের সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন সৃজনরহিত লেখকের অক্ষমতার গ্লানি। এ কি তাঁর নিজের কথা! বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। এক সময়ের অসীম ক্ষমতাধর লেখকের এ কোন কষ্টের বিধিলিপি!
সামনে খোলা রয়েছে শাদা পাতা। কর্ষণের কোন চিহ্ন পড়ছে না তাতে। লেখক জীবনের এই ব্যর্থতার গ্লানি, নিজের সৃজনক্ষমতা নিঃশেষিত হয়ে যাবার প্রত্যক্ষ করার বেদনা যেন একটি লাইনেই। লাঙলের আঁচড় পড়ে না, হায় এর চেয়ে কষ্টের আর কী আছে লেখকের জীবনে!

তবু মনে হয়, প্রজনন তো নানারকমের হয়। ঋতুপর্ণ ঘোষ বিবাহিত জীবন যাপন করেননি ঠিকই, কিন্তু যেসব অসামান্য সৃষ্টি আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন তার মূল্য কম নয়। এও তো এক ধরনের সৃজন। মানবীর কলেজ শিক্ষক থেকে অধ্যক্ষ হবার লড়াইটা তো আমাদের সামনে রয়েছে। তিনি যেভাবে শত অপমান সহ্য করেও নিজের পথে অবিচল থেকেছেন সেও তো আরেক ইতিহাস। তাঁর সৃজন প্রতিভাকে কোনওভাবেই খাটো করা যাবে না। এমন উদাহরণ আর অনেক দেওয়া যায়। এইভাবে লড়াই করে নিজেদের পথে তৈরি করার জন্যে তাঁদের কুর্ণিশ করতেই হবে। তাই হয়ত বুদ্ধদেব বসুর কবিতার শেষাংশে লিখিত আক্ষেপের জ্বলন্ত প্রতিবাদ হয়ে দেখা দিয়েছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ কিংবা মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখেরা।
প্রকৃতির খেয়ালে যাঁদের সৃষ্টি তাঁরা এখন আর প্রতিবন্ধী আখ্যা নিয়ে বাঁচতে চান না। লড়াইটা শুরু হয়েছে মাত্র। এখনও যে অনেকটা পথচলা বাকি!