চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৩ ॥ সুশীল সাহা




অন্য মৃণাল

বছর দু’য়েক আগে প্রয়াত হয়েছেন বাংলার অগ্রগণ্য চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন। পঞ্চাশের দশকে যাত্রা শুরু করে তিনি প্রায় স্বেচ্ছা অবসর নিয়েছিলেন এই শতাব্দীর গোড়ার দিকেই। কেন যে এইভাবে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন আমৃত্যু। বহুভাবে চর্চিত এই মানুষটি মাঝে মাঝেই বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছেন। স্বয়ং সত্যজিৎ রায় শ্রী সেনের ‘আকাশ কুসুম’ ছবি নিয়ে একসময় এক পত্রযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। মৃণালবাবু তার যথোচিত উত্তর দিতে কসুর করেন নি। অন্যদিকে সংবাদ পত্রের দুঁদে সাংবাদিকরাও তাঁকে ছেড়ে কথা বলেন নি। সব সহ্য করেই মৃণাল সেন একটার পর একটা ছবি করে গিয়েছেন। আশ্চর্যের কথা, কখনওই পুনরাবৃত্তের পথে হাঁটেন নি তিনি। নানা সময়ে নানা বিষয় নিয়ে ভেবেছেন। পরীক্ষা নিরীক্ষার চুড়ান্ত করেছেন। প্রথাভাঙ্গার এক বামপন্থী ইমেজের বর্ম পরে সমসাময়িক ঘটনাবলিকে তাঁর মত অমনভাবে ব্যবহার করার সাহস কেউই দেখান নি, বস্তুত এ ব্যাপারে তিনি এক এবং অনন্য।

মৃত্যুর পরে যা হয়, স্তুতি এবং প্রশংসার বাক্যবন্ধে ভরে উঠেছিল সংবাদপত্র এবং সোস্যাল মিডিয়ার শূন্য স্থানগুলো। রাগী, বামপন্থী, জীবনবাদি ইত্যাদি তকমায় তাঁকে ভূষিত করে এক ধরনের বন্দনায় রত হয়েছিলেন কিছু মানুষ। আবার অন্যদিকে তাঁর বেশ কিছু গুণগ্রাহী শিল্পী ও কলাকুশলী ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে চারপাশের পরিবেশকে অশ্রুমেদুর করে তুলেছিলেন। এমন একজন সফল মানুষের শোকগাথা বা স্মৃতিচারণের সময় স্বভাবতই তাঁর সৃষ্টির বহুবিধ দিকে আলোকপাত করেছেন প্রায় সবাই। ছবির নাম ধরে ধরে বিবৃত সেইসব বিচার ও বিশ্লেষণ। সঙ্গত কারণেই তাই উঠে এসেছে বাইশে শ্রাবণ, নীল আকাশের নীচে, ভুবন সোম, কলকাতা ’৭১, পদাতিক, একদিন প্রতিদিন, খারিজ, আকালের সন্ধানে, একদিন অচানক, খণ্ডহর, জেনেসিস ইত্যাদি ছবির কথা। এতসব ছবির ভিড়ে হারিয়ে গেছে ‘ইচ্ছাপূরণ’ নামের একটি ছবির কথা। রবীন্দ্রনাথের এই বিখ্যাত গল্পটিকে শিশুদের উপযোগী একটি নির্ভেজাল আমোদ প্রমোদের ছবি হিসেবে একদা (১৯৭০) নির্মাণ করেছিলেন তথাকথিত রাগী, সমসাময়িক, প্রথাভাঙ্গার কারিগর শ্রীযুক্ত মৃণাল সেন।

১৩০২ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্র্রনাথ এই শিশুতোষ গল্পটি লিখেছিলেন। গল্পটি নিছক শিশুতোষ কিনা, এ নিয়ে স্বয়ং লেখকও কোনও ধন্ধ রাখেন নি এতে। এমন কি অন্য অনেক গল্পে তিনি যেমন দার্শনিক তত্বের মোড়ক ব্যবহার করেছেন, এখানে তার লেশমাত্র নেই। অন্যদিকে এই ছবি নির্মিত হয়েছে ‘শিশু চলচ্চিত্র সংসদে’র ব্যানারে। তাই আমরা ধরেই নিই মৃণাল সেন অত্যন্ত সচেতনভাবেই শিশুদের জন্যে একটি ছবি তৈরির ব্রতী হয়েই রবীন্দ্রনাথের এই গল্পকে বেছে নিয়েছিলেন। গল্পটি আদ্যন্ত মজার। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্প শুরুই করেছেন বেশ একটি মজার আবহ তৈরি করে- ‘সুবলচন্দ্রের ছেলেটির নাম সুশীলচন্দ্র। কিন্তু সকল সময়ে নামের মতো মানুষটি হয় না। সেইজন্যই সুবলচন্দ্র কিছু দুর্বল ছিলেন এবং সুশীলচন্দ্র বড়ো শান্ত ছিলেন না’। বস্তুত মৃণাল সেন আদ্যন্ত রবীন্দ্রনাথকেই অনুসরণ করেছেন অর্থাৎ ছবিটিকে শিশুদের উপযোগী করে তুলতে সচেতনভাবেই সক্রিয় ছিলেন।

‘ইচ্ছাপূরণ’ নির্মিত হয়েছিল ১৯৭০ সালে। পরিচালক হিসেবে মৃণাল সেন তখন সুপ্রতিষ্ঠিত। কিছুদিন বাদেই তিনি ‘কলকাতা ‘৭১’ বা ‘ইন্টারভিউ’-এর মত ছবি তৈরির কাজে হাত দেবেন। তখন তাঁর চারপাশে এক অস্থির কলকাতা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তখন দরজায় কড়া নাড়ছে। এই সময় তিনি খানিকটা কমিক রিলিফের মত ঘন্টাখানেকের এই ছবিটি তৈরি করলেন বাচ্চাদের উপযোগী করে। আজ এতদিন পরে সেই ছবিটি দেখতে গিয়ে আমরা কিছুটা বিস্মিতও হই। প্রকৃতপক্ষে মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রপঞ্জীতে এই ছবিটি একান্তই অন্যরকম। আমরা এখানে পাই এক অন্য মৃণালকে, যিনি তখন তাঁর রাগী, প্রতিষ্ঠানবিরোধী, ব্যতিক্রমী তকমাটিকে খুলে রেখে একেবারেই মজেছিলেন শিশুমনের তলকুঠুরীর অনুসন্ধানে। তাই ছবিটিকে সমালোচকরা যতই মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রপঞ্জী থেকে সরিয়ে রাখুন না কেন এটি কিন্তু স্বমহিমায় এখনও তার জায়গায় অধিষ্ঠিত হয়ে আছে এবং থাকবে বলেই আমার বিশ্বাস।
প্রথম এবং শেষ বাচ্চাদের জন্যে নির্মাণ এবং তাও রবীন্দ্রগল্পের অনুসারী হওয়ায় সাধারণ দর্শক ভাবতেই পারেন নিজেকে এইভাবে প্রথম থেকেই বিতর্কের উর্ধ্বে রাখতে চেয়েছিলেন পরিচালক। আসলে তা নয়। ‘শিশু চলচ্চিত্র সংসদে’র কর্মকর্তাদের অনুরোধেই তিনি এই ছবি নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছিলেন।

জীবনের প্রথম ও শেষ রবীন্দ্রগল্পের আধারে এই নির্মাণে তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবেই আন্তরিকও ছিলেন। ছবিটির প্রতিটি ফ্রেমেই ধরা আছে একজন দক্ষ চিত্রকরের মেধা ও মনন। টানটান চিত্রনাট্যে তিনি গল্পটিকে ধরেছিলেন অদ্ভুত এক মেজাজে। তাই ইচ্ছে করেই গল্পের মূল বিষয়টিকে অবিকৃত রেখে চিত্রনাট্য রচনায় প্রভূত স্বাধীনতা নিয়েছিলেন। গল্পের প্রায় প্রারম্ভেই রবীন্দ্রনাথ সুবলচন্দ্র ও সুশীলচন্দ্রের স্ব স্ব অবস্থানের অসুবিধেগুলোকে দেখিয়ে ইচ্ছাঠাকরুণের আশীর্বাদে উভয়ের ইচ্ছাপূরণের ব্যাপার এনে বেশ বড়ো করে দেখিওয়েছেন তার অসুবিধেগুলোকে। মৃণালবাবু গল্পের পটভূমি নির্মাণেই বেশি সময় নিয়েছেন। আসলে সুবল এবং সুশীল এই পিতাপুত্রের মনোজাগতিক প্রেক্ষাপটটিকে শ্রী সেন নির্মাণ করেছেন অত্যন্ত দক্ষতায়। সম্পূর্ণ গ্রামীণ পটভূমিকায় পিতাপুত্রের পারস্পরিক দূরত্বের এক জটিল সম্পর্কের দৃশ্যায়ন ও তার মোচনের মধুরেণ সমাপয়তের যে গল্পবিন্যাস তিনি করেছেন তা অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ও উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের এই গল্পে হাস্যকৌতুকের যে পরিসর ছিল তাকে খুব সচেতনভাবেই অবলম্বন করে মৃণাল সেন শিশুদের উপহার দেন নির্মল আনন্দের এক অনুপম চলচ্চিত্র।

মৃণাল সেন আউটডোর শুটিং-এ খুবই স্বচ্ছন্দ ছিলেন। ‘ইচ্ছাপূরণ’ ছবিটির অধিকাংশ দৃশ্য গৃহীত হয়েছে স্টুডিওর বাইরে একেবারে গ্রামীণ পরিবেশে। খোলা আকাশের নীচে এই ছবির সুশীল ও সুবল এমনভাবে বিচরণ করেছেন, কখনওই তাদেরকে গ্রামের বাইরের কোনও মানুষ বলে মনে হয় নি। শেখর চট্টোপাধ্যায় এবং শোভা সেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন সুশীল চরিত্রের নবাগত রূপকার। আরেক বড় প্রাপ্তি হল সাধু মেহেরের অভিনয় এবং একটি ছোট্ট চরিত্রে কেয়া চক্রবর্তীকে পাওয়া আমাদের এক বড় প্রাপ্তি। বাংলা নাটকের এই অসামান্য অভিনেত্রীকে আমরা অকালে হারিয়েছি এই সিনেমায় অভিনয় করতে যাওয়া এক দুর্ঘটনায়, এ কথা আমরা ভুলি না কিছুতেই। আর একসঙ্গে আমরা এই ছবিতেই পাই এক দঙ্গল দামাল ছেলেকে সুশীলচন্দ্রের সহপাঠি হিসেবে।

ছবির শিরোনামেই গল্পের এক সুন্দর আভাষ দেওয়া আছে। অভিভাবকের শাসনের নিত্য পীড়ণে বালক সুশীলের বাবা হতে চাওয়া এবং সংসারের দায় বহন করা ক্লান্ত সুবলের পুত্র হতে চাওয়ার ইচ্ছাপূরণের মধ্যেই গল্পের মৌল বীজ নিহিত। ইচ্ছাঠাকরুণের দয়ায় সেই ইচ্ছাপূরণ যে কতখানি বিড়ম্বনা এনে দিল দুজনার জীবনে এবং তা থেকে রেহাই পাবার জন্যে উভয়ের যে আকুল অভীপ্সা তাকে বাস্তবায়িত করার মধ্যে যেটুকু ফ্যান্টাসির আদল পরিচালক ব্যবহার করেছেন, বলা যায় সেই কারিকুরিই তাঁর পরবর্তী অনেক ছবিকে প্রভাবিত করেছে। কোরাস ইন্টারভিউ চালচিত্র তার বড় উদাহরণ।

শিশুদের জন্যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও বড়দের জন্যে অনেক বার্তা দিয়ে দেন অনেক পরিচালক। মৃণাল সেন কি সেই পথে হেঁটেছিলেন? মনে হয় না। দেশকালের পটভূমিকায় ইচ্ছাপূরণের নানা সুবিধে অসুবিধের বার্তা তিনি দিতেই পারতেন। বিশেষ করে যে অস্থির সময়ে তিনি এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন সেখানে আমরা এমন একটি প্রত্যাশা তাঁর কাছে করতেই পারতাম। কিন্তু না, মৃণালবাবু তাঁর পরিচিত আদলটিকে সযত্নে সরিয়ে রেখে এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণে ব্রতী হয়েছিলেন। অভিনেতাদের কথা আগেই লিখেছি, চিত্রগ্রাহক কে কে মহাজন, সংগীত পরিচালক বিজয় রাঘব রাও এবং সম্পাদক গঙ্গাধর নস্করের যোগ্য সঙ্গতে এই ছবি হয়ে উঠেছিল একটি সুঠাম ও সুন্দর শিশু চলচ্চিত্র যা এতদিন পরে দেখেও আমাদের শিশুরা সমান মজা পায়, আমরাও তা থেকে বঞ্চিত হই না।

আমাদের দেশে সফল চলচ্চিত্রকাররা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মের কাছে নানাভাবে তাঁদের ঋণী। সত্যজিৎ রায় কিংবা তপন সিংহের কথা ছেড়েই দিচ্ছি। ঋত্বিক ঘটক রবীন্দ্রনাথের কোনও কাহিনিকে চিত্রায়িত করেন নি ঠিকই কিন্তু অনেকগুলো ছবিতেই রবীন্দ্রসংগীতের সুষম প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের কথা মৃণালবাবু তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্র পরিক্রমায় একবার মাত্র, এই একবারই রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করেছিলেন এবং তা এতটাই অব্যর্থ হয়েছিল যে রবীন্দ্রকাহিনি নিয়ে তাঁর এই একটি নির্মাণই তাঁকে মহীয়ান করে রেখেছে।
প্রায় পঞ্চাশ বছরের চলচ্চিত্র জীবনে মৃণাল সেন একটু একটু করে নিজেকে গড়েছেন, ভেঙ্গেছেন আবার গড়েছেন। সে এক অনন্য সিসিফাসের কষ্টকর অভিযাত্রা। কিন্তু এই একটিমাত্র ছবিতে পাই এক অন্য মৃণালকে আর সেজন্যে তাঁকে কুর্নিশ জানাই যদিও জানি তিনি এই সবকিছুর উর্ধ্বে আজ এক ছবির মানুষ।