চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৪ ॥ সুশীল সাহা




দ্বৈত ভূমিকার ভালো-মন্দ

আমাদের চারপাশে কখনও কখনও একইরকম চেহারার দু’জন মানুষকে আমরা অনেকবার দেখেছি। যমজ ভাইবোনেদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। কিন্তু পথচলতি ‘এই অমুকদা’ বলে ডাক নিশ্চয়ই আপনারা কেউ কেউ হয়ত বা শুনে থাকবেন। আমি তো কতবার নিজে শুনেছি। এমনকি খুব চেনা মানুষের মতো পিঠ চাপড়ে কথা বলতে এসেছেন কত মানুষ। তাঁদের ভুল ভাঙ্গাতে হয়েছে ‘এই আমি সেই আমি নই’ – এই কথা বলে। অনেকেই ভুল করেছেন বলে মার্জনা চেয়ে নেন। কিন্তু কেউ কেউ কিছুতেই নড়বার পাত্র নন। আমি বোধহয় মজা করছি, এমন কথাও তাঁরা বলেছেন। গল্পের মতো শোনালেও বলছি, এক সহকর্মী তো আমার চেহারার সঙ্গে অভিনেতা ভিক্টর ব্যানার্জির চেহারার খুব মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। কেউ কেউ আমার সঙ্গে আরেক অভিনেতা উৎপল দত্তের চেহারার মিল খুঁজে পান। যা হোক, চলার পথে এমন অন্য মানুষের ভূমিকায় নিজেকে ভাবতে আমার তো বেশ ভাল লাগে। খুব মজা পাইও বটে। তবে একবার এই ভূমিকায় অবস্থাবিপাকে নিজেকে মানাতে গিয়ে বেশ বিড়ম্বনায় পড়েছিলাম। এখন এই এতদিন পরে নিরাপদ দূরত্বে এসে তাকে এক মহা মধুর বিপত্তি বলতে পারি। এবার সেই ঘটনাটিই লিখি। সবটাই মনে আছে। জীবনের এমন কিছু কিছু অভিজ্ঞতা তো সহসা ভুলে যাবার নয়।

সেটা গত শতাব্দীর আশির দশকের গোড়ার দিককার কথা। মাথায় ঢুকেছিল একটি শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা। যেমন ভাবা তেমন কাজ। আমরা তখন থাকি হাবড়ায়। বাড়ির খুব কাছে খ্রিষ্টিয় পরিষদের একটি হলঘর ছিল। একেবারে বিনা পয়সাতেই দিত ওঁরা। এক রবিবারের জন্যে ওটা নিয়েছিলাম। শিল্পীও ঠিক করলাম তিনজনকে। একজন গাইবেন, একজন সেতার বাজাবেন আর অন্যজন বাঁশি। সঙ্গতকার হিসেবেও পেলাম দু’জনকে, খুবই অল্প সম্মান দক্ষিণায়। শিল্পীদের কাউকেই কিছু দিতে হয়নি। সময়টা তখন এমনই। যা হোক, তবু খরচ তো কিছু ছিলই। এদিক ওদিক থেকে চাঁদা কিছু তুললাম। একজন পরামর্শ দিলেন একটা স্যুভেনির করার। সেটাও করব মনস্থ করলাম। কিছু লেখা পেলাম। বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করার জন্যে একে ওকে ধরে কিছু পেয়েও গেলাম। তখনও জানতাম না, বিজ্ঞাপন পাওয়া যত সহজ, তার চেয়ে অনেক কঠিন, টাকা আদায় করা। মনে আছে, সহকর্মী একজনকে পাকড়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম কলকাতার ইউকো ব্যাঙ্কের প্রধান কার্যালয়ে তাঁর দাদার কাছে। তিনি একজন বিখ্যাত মানুষ, তখন ওখানকার বিজ্ঞাপন সচিব। ভাইয়ের বন্ধু হিসেবে একটু আলাদা খাতিরও পেলাম সেদিন। বেল টিপে বেয়ারা ডেকে চা আনালেন। এককথায় তিনি চারশো টাকার একটা বিজ্ঞাপনও দিয়ে দিলেন আমাকে। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে চারশো টাকা সত্যিই তখন অনেক টাকা। আমাকে তখন আর কে পায়। নানা সূত্র থেকে আরও কিছু বিজ্ঞাপন পেয়েছিলাম। সব টাকা হাতে পেলে অনুষ্ঠানের খরচ উঠে আরো বেশ কিছু টাকা হাতে থাকবে। স্বভাবতই আমার মনে তখন এক পরম এক আনন্দের রেশ। তবে তখন আমি স্বপ্নেও ভাবিনি, ওগুলো আদায় করতে আমার কতখানি কালঘাম ছুটে যাবে।

যথাসময়ে অনুষ্ঠান হয়ে গেল। দর্শকেরা মহাখুশি, সঙ্গে শিল্পীরাও। চাঁদায় পাওয়া আর গাঁটের পয়সায় কেনা ফুল ও মিষ্টির প্যাকেট দিলাম শিল্পীদের। মাঝে মাঝে এমন আয়োজন করবার জন্যে সবাই উৎসাহ দিলেন। অনুষ্ঠান হয়ে যাবার কিছুদিন পরে বিজ্ঞাপনের টাকা তুলতে মনোনিবেশ করলাম। সে এক মহা ধৈর্যের পরীক্ষার সময় আমার। বিশ পঞ্চাশ টাকা আদায় করতেও তিন চারবার যেতে হল। সব মিলিয়ে দশ/বারোটা বিজ্ঞাপন ছিল। সবগুলো আদায় হয়েছিল ঠিকই। তবে দু’একটি ছাড়া বাকিগুলোর অভিজ্ঞতা বেশ তিক্ত। তবে সে কথা এখানে নয়। এখানে কেবল সেই ইউকো ব্যাঙ্কের চারশো টাকা আদায়ের বৃত্তান্তই লিখব। কেননা তার মধ্যে নিহিত আছে আমার জীবনের স্মরণীয় এক ঘটনা। এতদিন বাদে সেই ঘটনার কথা মনে পড়লে সত্যিই এক অন্যরকম রোমাঞ্চ হয় আমার।

একদিন বেশ সেজেগুজে গেলাম সেই ইউকো ব্যাঙ্কে। লিফটে উঠে সোজা আমার সেই বন্ধুর দাদার ঘর। তিনি সেদিন খুব ব্যস্ত ছিলেন। আমার দিকে তাকানোর অবকাশও ছিল না তাঁর। আমাকে বললেন বিলটা তাঁর টেবিলে রেখে যেতে। প্রথম দিনের স্মৃতিটা কেমন যেন ম্লান হয়ে গেল। একটু অযাচিত ধাক্কা খেলাম। খুব মনে আছে ওই বিজ্ঞাপনের টাকা আদায় করতে সাত/আটদিন আমাকে ওখানে যেতে হয়েছিল। বন্ধুর দাদার টেবিল থেকে ওই বিলটা যথাস্থানে যেতেই লাগিয়ে দিল একমাস। তারপর এ টেবিল ও টেবিল ঘুরে ঘুরে আমি একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। একবার তো মনে হল, হয়ত ওই টাকা আদৌ আদায় করা যাবে না। কিন্তু মনের মধ্যে তখন এক ধরনের জেদ বাসা বুনেছে, আমি তখন আর পিছিয়ে আসতে পারি না। কিন্তু যাদের হাতে সব চাবিকাঠি, তাদের মন গলাব কেমন করে। তারা তো আমাকে প্রায় প্রত্যেকদিনই ‘অমুক দিন আসুন, তমুক দিন আসুন’ বলে ফিরিয়ে দিতে থাকলেন। আমি নিজেও তখন নাছোড়বান্দা হয়ে উঠেছি যেন। অবশেষে অনেক অভিজ্ঞতার পথ বেয়ে সেই টাকাটা আদায় হল একদিন। তার জন্যে আমার কৃতিত্ব একটুকুও নেই। কৃতিত্ব দিতে হবে আমার ভাগ্যকে। ঘটনাক্রমে অন্য একজনের সঙ্গে আমার চেহারা মিলে যাওয়ায় এই অঘটনটা ঘটেছিল। সেই ঘটনাটার কথাই লিখব এবার। প্রায় চল্লিশ বছর আগের ঘটনা, তবু যেন সব ছবির মতো চোখের সামনে ভাসছে।
প্রত্যেকদিন যা হয়, সেদিনও দেখি সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত।

আমার দিকে ফিরে তাকানোরও সময় নেই তাদের। আগের কয়েকবারের মতো সেদিনও ‘অমুক দিন আসুন’ বাণীটি শুনে যখন আমি প্রস্থানোদ্যত, তখনই কোথা থেকে ওখানকার একজন কর্মী এসে হঠাৎ ‘স্যার আপনি এখানে’? বলে একরাশ বিস্ময় নিয়ে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। আমি তো একেবারে থতমত। ছেলেটি একরাশ অবাক হয়ে বলল, ‘আমাকে চিনতে পারছেন না তো’? আমি আপনার বসিরহাট কলেজের ছাত্র। অবশ্য একেবারেই পিছনের সারির ছিলাম চিরকাল। তাছাড়া পড়তে পড়তেই তো এই চাকরিটা পেয়ে গেলাম কপালগুণে। তা আপনি এখানে কেন’? আমি প্রায় ঢোক গিলে বলে ফেললাম আমার এতদিনের হয়রানির কথা। সবটা শুনে সে প্রায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘আপনি এখানে বসুন, আমি দেখছি ব্যাপারটা’। আমাকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিল সে। আমি চুপচাপ ওই এসি ঘরে বসেও তখন প্রায় ঘেমে উঠছি। ততক্ষণে ছেলেটি তার সহকর্মীদের বলে চলেছে আমার সম্পর্কে। ইতঃমধ্যে আমার জন্যে চা এসে গেছে, সঙ্গে বিস্কুট। চা খেতে খেতেই শুনছিলাম ওর কথা। যা বুঝলাম তার সারাংশ এই যে আমি ওদের কলেজের ইংরেজির প্রখ্যাত অধ্যাপক ছিলাম। আমার অনেক গুণ। আমি নাকি ভয়ঙ্কর রাগী মানুষ। তবে পড়ানোর ব্যাপারে নাকি ‘একদম ফার্স্টক্লাশ’। এইসব কথা শুনছি আর বিস্কুটে কামড় দিতে দিতে চা খাচ্ছি। অবশ্য ভেতরে ভেতরে বেশ ঘাবড়েও যাচ্ছি। চুপচাপ ওখানে বসে আমার ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছি। ছেলেটি মাঝে মাঝে এসে আমাকে আশ্বস্ত করে যাচ্ছে। সব কাগজপত্র ওকে দিয়ে দিয়েছি। ও আমাকে বারবার বলছে,‘আজই আপনাকে চেকটা পাইয়ে দেব স্যার, একটু কষ্ট করে বসুন’। মাঝে মাঝে ওর জিজ্ঞাসার উত্তরে বানিয়ে বানিয়ে কিছু বলেও যাচ্ছি। ওর তো তখন নানান জিজ্ঞাসা। আমি এখনও বাইক চালাই কিনা। আবৃত্তি করি কিনা। প্রিন্সিপালের সঙ্গে আমার বনিবনা কেমন। আমি এখন ওই কলেজেই আছি কিনা। ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার তখন এক ত্রিশঙ্কু অবস্থা। ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছি না, আবার চেকটা ওই দিনই আদায়ের এক সম্ভাবনা দেখে কিছুতেই আর পিছু হটতেও চাইছি না। তার উপায়ও অবশ্য ছিল না তখন। একটা মিথ্যের মোড়কে নিজেকে আটকে ফেলেছি যে। এমন একটা পরিস্থিতিতে জীবনে কখনও পড়িনি তাই ভেতরে ভেতরে খুব নার্ভাস হয়ে পড়ছিলাম। তবে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে দাঁতে দাঁতে চেপে ওই অবস্থা থেকে মুক্তির প্রহর গুণছিলাম মনে মনে।

অতি তৎপর ওই ছেলেটির ব্যবস্থাপনায় চেকটা ওই দিনই পাবার সম্ভাবনা যখন প্রবল হয়ে উঠেছে তখনই ওদের টিফিন আওয়ার শুরু হয়ে গেল। আমিও প্রমাদ গুণলাম। টিফিন মানেই তো হরেদরে একঘন্টা। এদিকে আমি ঘন ঘন ঘড়ি দেখছি। অফিস থেকে কখন বেরিয়েছি এক ঘন্টার কথা বলে। ইতঃমধ্যে ঘন্টা দুয়েক পেরিয়ে গেছে। আমার বিব্রত অবস্থা খানিকটা ছেলেটা হয়ত বুঝতে পেরে আমার কাছে এসে দাঁড়াল ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে। বলল, ‘স্যার আর মাত্র দশ মিনিট অপেক্ষা করুন, এরমধ্যে একটু টিফিন করুন। আমার বারণ না শুনেই ও চলে গেল। একটু পরেই প্লেট ভর্তি লুচি, আলুর দম আর মিষ্টি চলে এল। বুঝলাম, এর হাত থেকে আজ আর আমার নিস্তার নেই। অবশ্য ক্ষিদেও পেয়েছিল খুব, তাছাড়া চোখের সামনে অমন খাবার দেখলে কি আর লোভ সামলানো যায়। অগ্রপশ্চাৎ আর কিছু না ভেবে গরম গরম লুচি আলুর দমে হাত দিলাম। খাওয়া তখন মধ্যপথে। এরমধ্যে হৈ হৈ করতে করতে সেই ছেলেটা এসে হাজির। হাতে সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত চেক। আমার চেয়ে চতুর্গুণ আনন্দ তার। আর আমার বুকের স্পন্দন তখন বেড়ে গেছে। গপ গপ করে খাবারটা শেষ করে ওর হাত থেকে চেকটা নিয়ে আমি যখন ওখান থেকে চলে আসছি তখন ছেলেটি আমার কাছে এসে ঢিপ করে আবার একটা প্রণাম করল। বলল, স্যার আশীর্বাদ করবেন। বহু কষ্টে এই চাকরিটা পেয়েছি। বাড়িতে অনেক মানুষ। আমার দিকে সবাই চেয়ে আছে। আমি যেন ওদের সবাইকে ঠিকমত দেখতে পারি। সংসার ভেঙ্গে যাবার ভয়ে বিয়েও করতেও ভয় পাচ্ছি। আমি আর কী বলব। দু’হাত তুলে তাকে আশীর্বাদ করলাম। ওকে ওটা করার এক্তিয়ার তো আমার ছিলই, অন্তত বয়সের দাবিতে। চেকটা নিয়ে আমি ক্রমশ লিফটের দিকে এগিয়ে গেলাম, ছেলেটি এল আমার পিছু পিছু। ‘স্যার আবার আসবেন’ বলে ও আমাকে বিদায় জানাল। এই প্রথম আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম। স্বয়ংক্রিয় লিফট চলতে শুরু করার আগে আমি কি ওই ছেলেটির চোখের কোণে জলের আভাস দেখেছিলাম। জানিনা, তবে একটু বিষণ্ণ, একটু হতাশভরা চোখে ও আমার দিকে ছিল, এটা কিন্তু ঠিকই।

তারপর প্রায় পাতাল প্রবেশের মতো নীচে নেমে এসে ডালহৌসির জনারণ্যে মিশে যেতে যেতে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহের মধ্যেও তখন মনে হল চারদিকে সুবাতাস বইছে। এক বুক নিঃশ্বাস ফেলে দ্রুত পা বাড়ালাম অফিসের দিকে।