চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৫৭॥ সুশীল সাহা


গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো

এই লেখাটি মূলত তৈরি করছি আমার দুই প্রিয় কথাসাহিত্যিকের দু’টি লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে। এই দু’জন যেহেতু মূলধারার লেখক নন, তাই তাঁদের লেখাপত্র তেমন সহজলভ্য নয়। এঁরা হলেন বাসুদেব দাশগুপ্ত ও সুবিমল মিশ্র। লেখার জোরে এঁরা দু’জনেই বাংলা সাহিত্যে তাঁদের নিজেদের জায়গাটা পাকা করেছেন। বাসুদেববাবু প্রয়াত হয়েছেন বেশ কিছুদিন আগে। সুবিমল এখনও বেঁচে আছেন ঠিকই, কিন্তু শুনেছি সে খুব অসুস্থ। সৌভাগ্যক্রমে এই দু’জনারই সান্নিধ্য পাবার সুযোগ আমার হয়েছে। অনেকগুলো গনগনে দিন কেটেছে ওই দু’জনের সঙ্গে। সেই সুবাদে ওঁদের লেখার সঙ্গে হয়েছে নিবিড় পরিচয়। ওঁদের অনেক লেখাই আমি একাধিকবার পড়েছি, অন্যদের পড়িয়েছি।

নবীন পাঠকদের উসকে দেবার জন্যে এখানে দু’জনার দু’টি লেখার দু’টি নির্বাচিত অংশ রইল। আগ্রহ জাগলে উৎসাহীরা তাঁদের অন্য লেখা সংগ্রহ করে পড়তে পারেন। তাঁদের লেখা সহজলভ্য না-হলেও একেবারে দুষ্প্রাপ্য কিন্তু নয়।

(১)

‘বেরিয়ে গেল প্রথম সংখ্যা। কানপুর গণহত্যা, মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণ করে একটি আলোচনা, এলাকার বিড়ি-শ্রমিকদের ধর্মঘটের উপর একটি বিস্তৃত রিপোর্ট, চরণ সিং-এর ‘সুপার কপ’ আর সম্পাদকীয়। ভয়ে ভয়ে পরিতোষ ৩০০ কপির বেশি ছাপায়নি। কিন্তু দশ দিনে সব শেষ। তবে গোলমাল বাঁধল অন্য জায়গায়। টাইটেল-এর উপর জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতার উদ্ধৃতি ছিল–

‘যতই শান্তিতে স্থির হয়ে যেতে চাই
কোথাও আঘাত ছাড়া,- তবুও আঘাত ছাড়া অগ্রসর সূর্যালোক নেই।’

যুবকদলের মধ্যে বিক্ষোভ শুরু হয়। একজন প্রতিক্রিয়াশীল কবির উদ্ধৃতি দেওয়াটা কি ঠিক হল? বিক্ষুব্ধ দলের মুখপাত্র হিশাবে স্থানীয় কলেজের নাতি তরুণ অধ্যাপক সলিল বলে- ঐ যে ‘আপনজন’ সিনেমার বিজ্ঞাপনে দেওয়া হত, পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন… ওটাও জীবনানন্দেরই লাইন। তা, উনি কি শুধু অসুখই দেখলেন?

-তার পরের লাইন কিন্তু ‘মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।’ আর অসুখ হলেই মানুষ সুস্থতা সম্পর্কে সচেতন হয়। অন্ধকারেই সব প্রাণী জেগে ওঠে, আলো ফোটে তার পর।
-অনেক তো সংগ্রামী কবি ছিল। তাদের থেকে একটা কোটেশন দিতে পারতেন। অভিজিৎ সাহা ছিল…।

পরিতোষ প্রায় আকাশ থেকে পড়ে। অভিজিৎ সাহা? সে আবার কে?
-পড়েননি ওর কবিতা? দারুণ লেখে।
নজরুল, সুকান্তের বদলে হঠাৎ অভিজিৎ সাহা-র নাম শুনে পরিতোষ এত বেশি ঘাবড়ে যায় যে ওর মুখে আর কোন কথা সরে না।
বাড়ি ফিরে পরিতোষ গুম হয়ে থাকে। পরে কী মনে হওয়ায় ওর পত্রিকার গাদা ঘেঁটে একটি পুরনো পত্রিকা বার করে। পাতা ওলটাতে-ওলটাতে পেয়ে যায় অভিজিৎ সাহাকে, বিজ্ঞাপনের পৃষ্ঠায়–

প্রকাশিত হল
পৃথিবীর প্রথম সর্বকনিষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ
পোস্টকার্ডের হাফ-সাইজে বর্জেস টাইপে ছাপা
বিপ্লবী কবি অভিজিৎ সাহার
‘বিদ্রোহ দিকে দিকে’

পরদিন বিকেলে বাদলদের আড্ডায় গিয়ে সে অভিজিৎ সাহার কাব্যগ্রন্থের বিজ্ঞাপনটি দেখায়। গম্ভীর হয়ে বলে-যার বইয়ের বিজ্ঞাপন এই, তিনি বিপ্লবী কবি নন, বালের কবি। তারপর সে সংক্ষেপে বোঝায়- জীবনানন্দ বড় কবি এ জন্য যে তিনি সন্দেহ থেকে ধীরে-ধীরে বিশ্বাসের স্তরে পৌঁছেছিলেন। যেমন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। যারা জন্মবিশ্বাসী, তাদের লেখায় আবেগের পরিমাণটা হয়তো বেশি। কিন্তু শুধু আবেগ দিয়ে যেমন বিপ্লব হয় না, তেমনি লেখাও হয় না। এদের লেখা শেষ পর্যন্ত মনের ভিতরের এবং বাইরের জটিল স্তরগুলোকে বুঝতে সাহায্য করে না। অনেক সময়ই এরা সব কিছু দুইয়ে আর দুইয়ে চার করে মিলিয়ে দেন। এদের লেখা পড়ে অনেক সময় এ রকম ধারণা হয়, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সহজতম কাজটি হল বিপ্লব। কিছুটা রক্ত খরচ করলেই হল। সবশেষে সে বলে, জানেন বোধ হয়, একসময়ে মার্কসকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল : আপনার মূলনীতিটি কী? মার্কস উত্তর দিয়েছিলেন : সব কিছুকেই সন্দেহ দিয়ে পরখ করে দেখা।

পরিতোষ বোঝায় বটে, কিন্তু টের পায় ‘বাল’ শব্দটির উচ্চারণজনিত রোমহর্ষণ শ্রোতারা তখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।’
(উপন্যাস : খেলাধূলা, বাসুদেব দাশগুপ্ত, পৃষ্ঠা ৬৩-৬৫)

(২)

নাট্যকার : (ওপর তলার দিকে দেখিয়ে) ভালো করে চেয়ে দেখুন, ওখানে রেপসিনের অভিনয় হচ্ছে। ভালো করে দেখে নিন…

দর্শকগণ : (সমস্বরে) তাই নাকি! কোথায়?

তারা স্টেজে এসে উঁকিঝুঁকি দেবে। ভালো করে বোধহয় কিছু দেখতে পাবে না। ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠবে।

৫ম দর্শক : কোথায়… কিছু দেখতে পাচ্ছি না…

৩য় দর্শক : লাইট লাইট…

৪র্থ দর্শক : আলো একটু জোর করুন…

১ম দর্শক : কিছুই দেখতে পাচ্ছি না বুঝতে পাচ্ছি না…

৩য় দর্শক : কোথায় তোর রেপসিনরে গেঁড়েমদন? (নাট্যকারকে) ইয়ার্কি পেয়েছিস আমাদের সঙ্গে…

৪র্থ দর্শক : করেছো করেছো… একটু জোরালো আলোর তলায় রেপকেসটা করলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেতো…

৩য় দর্শক : (নাট্যকারের হাতের কাগজগুলো কেড়ে নিয়ে পড়তে থাকে) ‘ঝুনঝুনওয়ালা মেয়েটির বস্ত্র ধরিয়া টানিতে লাগিল। মেয়েটি প্রথমে বাধা দিল। শেষে সামলাতে পারিল না। টানাটানিতে তাহার লজ্জাস্থান বাহির হইয়া পড়িল।… তা এই সিনটা বুঝি অভিনয় কচ্ছিস?… তা লজ্জাস্থান কি মেয়েদের একটা নাকি? কি বাহির হইয়া পড়িল বলবি তো বলবি তো… ভাষাজ্ঞান নেই নাট্যকার হয়েছেন…

৪র্থ দর্শক : বলি, কি বাহির হইয়া পড়িল ডেফিনিট করে না বললে তোমার নাটক চলবে? দর্শকরা কী দেখতে আসবে তোমার নাটক?… যত্তোসব মাক্কিচুস… একটা রেপসিনও ভালো করে দেখাতে পারে না-

(নাটক : ভাইপো পাঁঠার ইসটু- সুবিমল মিশ্র, পৃষ্ঠা ৪৮-৪৯, প্রথম প্রকাশ অক্টোবর ১৯৭৩)

বলাবাহুল্য দু’টি লেখার বিষয় ও লিখনপদ্ধতি নিয়ে অধিক মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।