চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৫৮॥ সুশীল সাহা


দু’টি মৃত্যুহীন প্রাণের উপাখ্যান অথবা একটি অস্থির সময়ের দিনলিপি


জীবনভিত্তিক উপন্যাস লেখা একটি নিদারুণ দুরূহ কর্ম। বাংলা সাহিত্যে এমন উপন্যাস অজস্র লেখা হয়েছে। মানুষের জীবন তো সময়বিযুক্ত কোনও ব্যাপার নয়। তাই সেই সময়কে কলমের আঁচড়ে মূর্ত করে তোলার পাশাপাশি পাত্রপাত্রীকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার এক কঠিন দায়িত্ব লেখকের উপর ন্যস্ত হয়। তাই আখ্যানের সাফল্য অসাফল্য সবটাই নির্ভর করে লেখকের কল্পনাশক্তি, দূরদৃষ্টি এবং লেখনীশক্তির উপর। নিরাসক্ত এবং মোহমুক্ত মন লিখতে পারাও এক কঠিন কাজ। চরিত্রের অন্ধকার দিকগুলোকে ঢেকে তাকে দেবদীপ্ত করে তোলার ঝোঁক কমবেশি সব লেখকের মধ্যে অল্পবিস্তর থাকে। সেটা যে তেমন দোষাবহ, তাও নয়। আসল কথা হল ভারসাম্য, সেটা থাকলেই লেখা হয়ে ওঠে মনোগ্রাহী, হৃদয়কে স্পর্শ করে সেইসব সাহিত্যকর্ম।

সেলিনা হোসেন ইতিপূর্বে একাধিক উপন্যাস লিখেছেন যা নির্দিষ্ট মানুষের জীবন ও সেই সময়ের কথা বলেছে। তাঁর লেখার উদ্দিষ্ট হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো অবিসংবাদিত মানুষেরা। বলাবাহুল্য তাঁর এই উপন্যাসদ্বয় সর্বজনসমাদৃত। আশ্চর্যজনকভাবে লেখিকা এই দুই মেরুর দুই মহান চরিত্রকে তাঁর কলমের আঁচড়ে চমৎকারভাবে বিধৃত করেছেন। এই দুটি উপন্যাসের অভিজ্ঞতাকে সম্বল করেই তাঁর বহুল প্রশংসিত উপন্যাস ‘নিরন্তর ঘন্টাধ্বনি’ পড়তে শুরু করেছিলাম। বলাবাহুল্য একেবারেই হতাশ হইনি, বরং লেখকের মন ও মানসিকতার আশ্চর্য এক প্রগতিবাদী পরিচয় পেয়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি। তিনি তাঁর পূর্ব সুনাম শুধু অক্ষুণ্ণই রাখেননি, আমাদের প্রত্যাশাকেও অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছেন। চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকের একটি নির্দিষ্ট সময়কে তিনি এমন সুন্দরভাবে তাঁর এই উপন্যাসে ধরেছেন যে এর চরিত্রগুলো আমাদের চোখের সামনে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছেন। উপন্যাসের পরতে-পরতে লেখিকা গেঁথে দিয়েছেন তাঁর প্রজ্ঞাদীপ্ত মন ও মানসিকতা। অসাধারণ এক প্রগতিমুখী এই অভিজ্ঞান তাঁর লেখাকে করে তুলেছে আকর্ষণীয় ও মহিমময়।

এই উপন্যাসের দুটি প্রধান চরিত্র- সোমেন চন্দ এবং মুনীর চৌধুরী। এঁদের পাশে সমানভাবে দেদীপ্যমান রণেশ দাশগুপ্তসহ সেই সময়কার অজস্র চরিত্র। ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ শিকার সোমেন চন্দের হত্যাকাণ্ড চল্লিশ দশকের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বস্তুত তখনকার লেখক শিল্পীসহ মানবতাবাদী আপামর জনগোষ্ঠীর মনে প্রবলভাবে ছাপ ফেলেছিল এই ঘটনা। ১৯৪২ সালের ২৩ মার্চ আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত তদানীন্তন বাংলার বিশিষ্টজনের বিবৃতি ছিল নিম্নরূপ- “সম্প্রতি ঢাকা হইতে এক মর্মান্তিক সংবাদ আমাদের নিকট আসিয়া পৌঁছিয়াছে। তরুণ সাহিত্যিক সোমেন চন্দ যখন শ্রমিকদিগের একটি শোভাযাত্রা লইয়া ফ্যাসিস্ট বিরোধী সম্মেলনে যোগ দিতে যাইতেছিলেন তখন তাহাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হইয়াছে। আমরা জানি যে শ্রীযুক্ত চন্দ মার্কসপন্থী আন্দোলন এবং জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রামের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। লেখক হিসাবে ন্যায়ত এবং স্বভাবত তিনি যে ফ্যাসিস্ট বিরোধী হইবেন ইহাতে সন্দেহের কিছুই নাই। যে সমস্ত সংবাদ আসিয়াছে তাহা হইতে বোঝা যায় যে তিনি এবং তাঁহার সহকর্মীরা তাঁহাদের রাজনৈতিক বিপক্ষদলের বিরাগভাজন হইয়াছিলেন। একথা নিশ্চিত সত্য যে, পূর্ব হইতে চিন্তা করিয়া ও সম্পূর্ণ অকারণেই তাঁহাকে হত্যা করা হইয়াছে এবং সম্ভবত তাঁহার বিপক্ষ দলই এই কার্য করিয়াছে। বাংলার রাজনৈতিক জটিলতা আমাদের নিকট দুর্বোধ্য। বিশেষ করিয়া ঢাকায় যে প্রতিহিংসা বিষাক্ত বাষ্প সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক আকাশকে দূষিত করিয়া তুলিয়াছে, আমরা তাহার পশ্চাতের মনোবৃত্তি অনুধাবন করিতে অক্ষম।
সোমেন চন্দ একজন উদিয়মান এবং বিশিষ্ট লেখক ছিলেন। তিনি যে মাত্র লেখক ছিলেন তাহা নয়, তিনি তাঁহার নিজের চিন্তাধারার সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া অনুরূপভাবে দেশের ও দশের সেবায় যে নিযুক্ত হইয়াছিলেন তাহাতেই তাঁহার প্রকৃত উৎকর্ষ সূচিত হইতেছে। ফ্যাসিবাদের কুৎসিত মূর্তি দেখিয়া প্রত্যেক দেশের সাহিত্যিকরা ফ্যাসিবাদের প্রতি নিজেদের ঘৃণা জানাইয়াছেন। ভারতবর্ষে আমরা আমাদের সভ্যতার অভ্যন্তরে এই দুষ্ট ক্ষত সম্পর্কে তীব্রভাবে এবং একবাক্যে নিজেদের মনোভাব জ্ঞাপন করিয়াছি। আমাদের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অপেক্ষা এত তীব্রভাবে সম্ভবত আর কেহই ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করেন নাই। এই দুর্দিনে দেশের মধ্যে ফ্যাসিস্ট বিরোধী দল সংঘটন করিতে সোমেন চন্দ যে অগ্রসর হইবেন তাহাতে আশ্চর্যের কিছুই থাকিতে পারে না। মাত্র এই কারণেই এবং অভিযোগেই গুপ্ত ঘাতকের হস্তে তাঁহাকে আত্মবলি দিতে হইয়াছে। আমাদের একজন নির্ভীক সহকর্মীর মৃত্যুতে আমরা সন্তপ্তচিত্তে দেশের জনসাধারণের নিকট এই রক্তলিপ্সা এবং বিষকলুষ মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে একবাক্যে তীব্র ঘৃণা জ্ঞাপন করিতে আবেদন জানাইতেছি।” (স্বাক্ষরকারী– প্রমথ চৌধুরী, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, ইন্দিরা দেবী, আবু সৈয়দ আয়ুব, প্রমথনাথ বিশী, সুবোধ ঘোষ, জ্যোতির্ময় ঘোষ, নীরেন্দ্রনাথ রায়,কিরণশংকর সেনগুপ্ত, বিমলাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, আবদুল কাদের, কামাক্ষাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, হিরণকুমার সান্যাল, সুবোধ মুখোপাধ্যায়, সমর সেন, বিনয় ঘোষ, স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য, অরুণ মিত্র, অমিয় চক্রবর্তী, সরোজ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, অজিত দত্ত, বিষ্ণু দে)

এই উপন্যাসের পটভূমি বোঝানোর জন্যেই উপরোক্ত দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিতে হল। তবে এই উপন্যাসটি কেবল সোমেন চন্দর জীবন ইতিবৃত্ত নয়, বরং তাঁর সংগ্রামী জীবন ও যাপনবৃত্তান্তনির্ভর একটি বস্তুনিষ্ঠ আলেখ্য রচনার হাত ধরে এই রচনা পৌঁছে গেছে অমর একুশের পটভূমিতে। আর সেই পর্বে উপস্থাপিত হয়েছে মুনীর চৌধুরীর মতো একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিক তথা লড়াকু মানুষের জীবনগাথা। লেখক নিজেই বিবৃত করেছেন এই উপন্যাস লেখার ইতিকথা। তাঁর নিজের কথায়, “সোমেন চন্দের ‘ইঁদুর’ গল্প এবং ঢাকার রাজপথে মিছিল নিয়ে যাবার সময়ে তাকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনাটি দীর্ঘদিন আমার মগজে গেঁথে ছিল। এই প্রসঙ্গে চল্লিশ দশকের আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক পটভূমি পড়েছি। সোমেন চন্দ ছিলেন প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৪২ সালে, যে বছর সোমেন নিহত হন, সে বছর মুনীর চৌধুরী প্রগতি লেখক সংঘের সদস্য হন। যে ফ্যাসিস্ট শক্তি সোমেন চন্দকে হত্যা করেছিল, ১৯৭১ সালে অর্থাৎ ২৯ বছর পরে আর একটি ভিন্ন ফ্যাসিস্ট শক্তির হাতে মুনীর চৌধুরী নিহত হন। খুঁজে পাওয়া যায় নি তাঁর লাশ। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসে মুনীর চৌধুরী জেলে বসে একুশের পটভূমিতে রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘কবর’। অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, বাংলাদেশের মাটিতে কোথাও তাঁর কবর নেই। পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে আছেন মুনীর চৌধুরী। ভাবলাম, সংগ্রামের ঐতিহ্যের এই ঘন্টাধ্বনি সব প্রজন্মের মানুষের হৃদয়ে বাজুক, যা অনাদিকাল থেকে বর্তমানের। যেদিন এই বিষয়টিকে মেলাতে পারলাম সেদিন মাথার ভেতর আলোর ঝলকানি। ভাবলাম, এই আমার ঐতিহ্য, একে আমি পুনঃনির্মাণ করতে পারি। …যা হোক, উপন্যাস শুরু করলাম সোমেনকে দিয়ে, “বুকের নিচে বালিশ চেপে উপুড় হয়ে শুয়ে নিজের নামটা বারবার লিখছে আর কাটছে সোমেন। মন খারাপ থাকলে এমনই করে, ঠিক আক্রোশে নয়, অসহায় বিষণ্ণতায় নিষ্পেষিত হয় বলে।” এভাবেই চলতে থাকে। শেষ হয় একটি বাক্য দিয়ে, ‘রচিত হচ্ছে মুনীরের কবর’।

সেলিনা হোসেন এই উপন্যাসটি রচনা করেছেন মাত্র তেরো দিনে। বাংলা একাডেমির ‘একুশের উপাখ্যান’ গ্রন্থমালা প্রকল্পেভুক্ত এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হতেই পাঠকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে। সম্ভবত এই প্রথম সোমেন চন্দর মতো একজন লড়াকু ব্যক্তিত্ব এমন সংবেদনশীল ভঙ্গিতে বিধৃত হলেন। পাশাপাশি মুনীর চৌধুরীর মতো অকালপ্রয়াত মানুষ এই উপন্যাসের একটা বড় অংশ জুড়ে আছেন। ১৭৫ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের ৭৫ পৃষ্ঠা জুড়ে আছে সোমেনের কথা। তাঁর মৃত্যু তথা মৃত্যুত্তীর্ণ পর্ব জুড়ে রয়েছে মুনীর চৌধুরী তথা সদ্যস্বাধীন পাকিস্তানের পূর্বভাগের আত্মপরিচয়ের সংকট ও ভাষা আন্দোলনের পটভূমি, আন্দোলন, ভাষার জন্যে আত্মবলিদান এবং অমর একুশ অবলম্বনে ‘কবর’ নাটক রচনার দীর্ঘ দিনলিপি। বস্তুত এই পর্বে সোমেন চন্দের সার্থক উত্তরাধিকার মুনীর চৌধুরীকে ঘিরেই রচিত হয়েছে আখ্যান। তাঁর একটি দীর্ঘ সংলাপেই লেখক বিবৃত করেছেন সোমেন চন্দ ও মুনীর চৌধুরীর একাত্মতা।

“…সোমেন তুমি যে অদৃশ্যেই চলে যাও না কেন, তুমি আছ আমাদের মাঝে। তোমার মৃত্যু নেই, এই আমি এখন তোমার সঙ্গে ঘুমোতে যাচ্ছি, দেখবে এক দারুণ স্বপ্নের ভেতরে দুজনে হাঁটব, কথা বলব, রাস্তার ধারে বসে চা খাব আর দুজনে লেখালিখির ভেতরে ডুবে যাব– আমাদের সৃজনশীল কাজগুলো কি আমাদেরকে অনেক দূরে নিয়ে যাবে সোমেন? জানি না আমরা কতটা পথ হাঁটতে পারব, তবে তুমি যাবে অনেক দূরে সোমেন। যাচ্ছি ঘুমোতে। স্বপ্নের ভেতরে এসো কিন্তু।” (পৃষ্ঠা ৮৯)
এক ক্যানভাসে গত শতাব্দীর দুই বিখ্যাত ব্যক্তিত্বকে পাশাপাশি আঁকতে চাওয়ার অভীপ্সাকে লেখক আমাকে জানিয়েছেন এইভাবে, “চল্লিশের দশকের প্রেক্ষাপট আমাকে টেনেছে প্রথমে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু, কবি নজরুলের অসুস্থতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভয়াবহ মন্বন্তর, কৃষক বিদ্রোহ, ইত্যাদি আমার মাথায় ছিল। নায়ক হিসেবে সোমেন চন্দ, তাঁর মৃত্যুর পরে মুনীর চৌধুরী প্রগতি লেখক সংঘের সদস্য হন। দুজন লেখকই প্রগতিশীল সৃজনশিল্পে যুক্ত ছিলেন। একজন শ্রমজীবী মানুষের মানবিক বোধের চিন্তায় প্রদীপ্ত ছিলেন অন্যজন মুনীর চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের অংশ নিয়ে গ্রেফতার বরণ করেছিলেন। দু’জনের পথ ছিল ভিন্ন কিন্তু লক্ষ্য ছিল এক। সেজন্যে চল্লিশের দশকের পটভূমিতে এই উপন্যাস লিখেছি। ইতিহাস– ব্যক্তিজীবন দুটোই সমান্তরাল ”
ইতিহাসের ধারায় সোমেন চন্দের আত্মবলিদান বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। যে উত্তাল সময়ে তিনি একইসঙ্গে সাহিত্যরচনা এবং শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন সেই চল্লিশের দশকের প্রারম্ভকালটা সারা পৃথিবীর জন্যেই ছিল চরম অস্থিরতা, অবক্ষয় ও মূল্যবোধহীনতার। সেই দুঃসময়ে সোমেন চন্দ যেটুকু সাহিত্যরচনা করে গেছেন, মানুষের মুক্তির জন্যে লড়াই করতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, সেই ব্যাপারটা লেখকের চিত্তপটে এমনভাবে চিত্রিত হয়ে ছিল যে তিনি স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক মুনীর চৌধুরীর মধ্যে দেখেছিলেন সোমেনের ছায়া। তাই এই দুই কর্মিষ্ঠ মানুষের অসমাপ্ত কর্মপ্রয়াসের চিত্র এঁকে আমাদের উপহার দিয়েছেন এক মলাটের মধ্যে। কিন্তু তিনি জানেন সোমেনের লড়াই আজও শেষ হয় নি, মুনীর চৌধুরীর স্বপ্নও হয়নি সেইভাবে বাস্তবায়িত।

একান্ত সাক্ষাৎকারে লেখক তাই বলতে দ্বিধা করেননি :
“সোমেন চন্দ যে প্রগতিশীল ধারায় রাজনীতি করে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে স্বস্তি আনতে চেয়েছিলেন ১৯৪০ থেকে ২০২০ সালের এই বিশাল পরিব্যাপ্তিতে কোনও পরিবর্তন সাধিত হয়নি। শ্রমজীবী মানুষ দেখেছেন মাতৃভাষার মর্যাদার প্রশ্নে তরুণরা জীবন দিয়েছেন, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাঙ্গালি হয়ে এটুকু দেখার সুযোগ সোমেন চন্দের তাঁর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিবাদী চরিত্র যে সুস্থ এবং সাম্যের সৃষ্টি চেয়েছিল তাদেরকে খানিকটুকু দিয়েছে বর্তমান সরকার। বাংলাদেশেই এই দায়িত্ব পালন করা হয়নি। বিশ্বজুড়ে সমতার জায়গা তৈরি করা সুদূর পরাহত। কারণ শ্রেণী বৈষম্যহীন সমাজ গড়া সহজ ব্যাপার নয় ”
লেখকের এই অকপট স্বীকারোক্তির মধ্যে দিয়েই আমরা বুঝে যাই সমাজ প্রগতির ধারায় তাঁর নিঃশঙ্ক মনোভাব। তাই এই উপন্যাসের নাম দিয়েছেন ‘নিরন্তর ঘন্টাধ্বনি’। লড়াই চলতেই থাকবে, মানুষের মুক্তির স্বপ্ন সুদূর পরাহত থেকে যাবে না। এ যেন আত্মদীপের মশাল, এ-হাত থেকে ও-হাত তারপর আরেক হাত- এইভাবে নিরন্তর বয়ে চলেছে অখণ্ড কালস্রোতের ধারা বেয়ে। সেই সংগ্রামের ধারাকে তাই এগিয়ে নিয়ে যাবার লক্ষ্যে সোমেন চন্দের আত্মবলিদান কিংবা মুনীর চৌধুরীর মাতৃভাষার মর্যাদা পাবার লক্ষ্য যেন একই বৃন্তে গাথা একটি মালা। আপাতবিচ্ছিন্ন অথচ নিবিড় নিগড়বদ্ধ। আগুনের শিখার মতো প্রজ্বলিত যেন এই ঘন্টাধ্বনি- অবিরত যেন বেজেই চলেছে। লেখকের এই উপন্যাসের সার্থকতা সেইখানেই। অসাধারণ বর্ণনা এবং চরিত্রচিত্রনের ভিতর দিয়ে তিনি ব্যক্ত করেছেন আমাদের অতীত গৌরবের একটি অত্যুজ্বল অধ্যায়। তাই তো তাঁর এই বিবৃতি একান্তই প্রাসঙ্গিক মনে হয়–“চল্লিশের দশকে ঘটে যাওয়া ঘটনা কিন্তু বহুধাবিস্তৃত। আমি সময় ও ইতিহাসের বাইরে যাইনি। যে সময়ে সমাজের বিস্তৃতি থাকে তাকে ত সেইভাবেই তুলে আনতে হবে। নইলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে সামাজিক দায়। সোমেন চন্দ লেখক, শহীদ মুনীর চৌধুরীও লেখক। দু’জন লেখকের বার্তা একই রকম। একজন শ্রেণী বৈষম্যেহীন সমাজ চেয়েছেন, অন্যজন মাতৃভাষার মর্যাদা চেয়েছেন। সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সূত্রে দু’জনই সমান। শুধু ঘটনা আলাদা। উপন্যাসের সুদূরগামী পরিসরের কথা ভেবে আমি দু’জনকে একই সুতোয় গেঁথেছি। দেখিয়েছি একজন রাজপথে মৃত্যুবরণ করেছেন। অন্যজন জেলে বসে ভাষা আন্দোলনের নাটক লিখেছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শহীদ তিনি। নিজের লেখা নাটক অভিনীত হয়েছিল ওই জেলেই। তারই নির্মম পরিণতি আমরা দেখি স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁকে প্রাণ দিতে হয় আরেক ফ্যাসিস্ত শক্তির হাতে, তাঁর লাশ গুম করা হয়, ঠাঁই হয় গণকবরে। এ সবই ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা। তারপরও মানুষ তাঁর আচরণ মানবিক চেতনায় সঠিক পথে রাখে। বিড়ম্বিত হলেও তার জায়গা শূণ্য হয় না। মূল বার্তা এই।”

সোমেন চন্দের জন্মশতবর্ষে আমরা নানাভাবেই নানাপ্রশ্নের সদুত্তর খুঁজতে চাইব। প্রথম ও প্রধান প্রশ্নটি হল কমিউনিস্ট সোমেনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল দক্ষিণপন্থী কোনো সংগঠনের গুণ্ডাদের হাতে নয়, তাঁকে মেরেছিল ফরোয়ার্ড ব্লক এবং রেভিলুশানারি কমিউনিস্ট পার্টির ভাড়াটে খুনীরা। কেন এই ভ্রাতৃঘাতী ঘটনাটা ঘটল! এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাম্প্রতিক একটি প্রবন্ধের প্রাসঙ্গিক অংশ উদ্ধৃত করছি, “তবে ভ্রান্তি যে কেবল সুভাষপন্থীদের ক্ষেত্রেই সত্য ছিল তা মোটেই নয়। কমিউনিস্টরাও ভুল করেছেন। তাঁদের প্রথম ভুল এই যে, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে তাঁরা নেতৃত্ব দিতে পারেন নি। সেটা শুধু ভুল নয়, অপারগতাও। অথচ তাঁরাই ছিলেন সবচেয়ে বেশি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। কেবল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নন, ছিলেন পুঁজিবাদবিরোধীও। সাম্রাজ্যবাদ যে পুঁজিবাদেরই রাজনৈতিক রূপ, এটা তাঁরা জানতেন। এবং তাঁদের লড়াইয়ে আপোষের কোনো অবকাশ ছিল না। কিন্তু তাঁরা জোর দিয়ে, সাহসের সঙ্গে, বলতে পারেননি যে, দেশে একটা সামাজিক বিপ্লব চাই, এবং সেটা ঘটবে জাতিয়তাবাদীদের হাতে নয়, কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে। বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা। সে পরিকল্পনাও তাঁরা করতে পারেন নি। তাঁরা আওয়াজ তুলেছেন, ‘কংগ্রেস-লীগ-কমিউনিস্ট পার্টি এক হও’। ফলে জনগণের মনেও ধারণা হয়েছে যে এঁরা ভালো মানুষ, কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা এঁদের কাজ নয়”। প্রকৃতপক্ষে সোমেন চন্দের হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের এক অমোঘ পরিণতি, নানা বামপন্থীদের বিভ্রান্তি ও অক্ষমতার এক অনিবার্য ফলশ্রুতি যা থেকে আজও শিক্ষা নেননি বামপন্থীরা।

তাই বর্তমান সময়ে এই উপন্যাস নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত জরুরি। মানুষের মুক্তির সংগ্রাম আজও শেষে হয়নি। আমাদের দেশে, বাংলাদেশে নানা সমস্যাভারে জর্জরিত মানুষ। একদিকে ধর্মীয় উন্মাদনা, অন্যদিকে ধনী দরিদ্রের প্রভেদ। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পাশে পাল্লা দিয়ে চলেছে পৃথিবীব্যাপী নয়া ফ্যাসিবাদের উন্মত্ত উল্লাস। এই দুঃসময়ে সোমেন চন্দের মতো আত্মত্যাগী সমাজকর্মীর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা খুবই জরুরি। সেলিনা হোসেনের এই উপন্যাসটি তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের সত্তর বছর অদূরেই। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে যে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম, তারও পঞ্চাশ বর্ষপূর্তিও সমাগত। স্বভাবতই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে সোমেন চন্দের স্বপ্ন কি সফল হয়েছে? সফল হয়েছে কি মুনীর চৌধুরীর ভাষা নিয়ে নাটক লেখার গূঢ় উদ্দেশ্য? যে ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধের আবহ আমরা রামায়ণ মহাভারতের ছত্রে ছত্রে বিধৃত হতে দেখেছি, তার রেশ আমরা দেখেছি মানবেতিহাসের পরতে-পরতে। মানুষে-মানুষে ভুল আদর্শবোধের অহমিকার ফলশ্রুতি অসংখ্য রক্তমোক্ষণের ইতিহাস। একজন সোমেন চন্দ তাই হাজার আত্মত্যাগী মানুষের প্রতিভূ হয়ে দেখা দেয়। তবে তাঁর মৃত্যুই তো শেষ কথা নয়। যে মানুষের অবিমৃশ্যকারিতায় ধ্বংসের আগুন জ্বলে, সেই মানুষই জ্বালে ধ্বংসস্তুপে আলো। যে আলোর রেশ ছড়িয়ে যায় সভ্যতার অগ্রগতিতে। তাই সেলিনা হোসেনের এই উপন্যাস রচনার মনোভঙ্গির কথা অবহিত হয়ে জীবনানন্দের একটি অমোঘ পংক্তিকে পরিশেষে লিখতেই হবে :
“মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব থেকে যায়”।