চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৫৯॥ সুশীল সাহা



আদর্শ বিদ্যামন্দির


শিয়ালদা স্টেশন থেকে রাজাবাজারের দিকে একটু এগোলেই বাঁদিকে সূর্য সেন স্ট্রিট। ওই রাস্তার বাঁদিকে একটি পুরনো আমলের তিনতলা বাড়িটা হল একটা স্কুল, ‘আদর্শ বিদ্যামন্দির’। ওখানেই প্রায় স্বেচ্ছাশ্রমের সুবাদে আমি কাজ করেছি ঠিক দশ বছর। আমার একটা গালভরা পদ ছিল ‘গ্রন্থাগারিক’। স্কুলের শিক্ষক তালিকায় আমার নামটা ছাপাও হত। আমার মূল কর্মজীবন থেকে অবসর নেবার পরে এই কাজের সুযোগ আসে। অনেক ভেবেচিন্তে আমি সেটা গ্রহণও করি। আসলে কলকাতার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে মন চায়নি। সপ্তাহে মাত্র তিনটে দিন, সোম/বুধ আর শুক্রবার বেলা সাড়ে বারোটা থেকে সাড়ে তিনটে, মাত্র এই তিন ঘন্টার কাজ। ওখানকার লাইব্রেরিটা দেখাশোনা করা। সময়টা খুব তাড়াতাড়ি চলে যেত। স্কুল থেকে বেরিয়ে কলেজ স্ট্রিট, কফি হাউস, ফেভারিট কেবিন, বইপাড়া ইত্যাদি জায়গায় ঢুঁ মারতাম।

২০০৯ সালের জুন থেকে ২০১৯ সালের জুলাই মাস, ঠিক দশ বছরই তো হয়! অবসর নেবার পরেও আমি থেমে যাইনি। টানা দশ বছর কাজটা কীভাবে করেছি, সেটা ভাবলে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই।

তাহলে এবার জানাই, কী করে আমি একদিন আদর্শ বিদ্যামন্দিরের একজন কর্মী হলাম। আমার পূর্বতন কর্মস্থলে শেষ চব্বিশটা বছর ওখানকার লাইব্রেরি ইন-চার্জ ছিলাম। তাই লাইব্রেরি সম্পর্কে আমার বেশ কিছু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল। ২০০৭ সালে অবসর নেবার পরে টুকটাক এটা সেটা করছি। অবসর জীবনের ক্লান্তি আমাকে সেইভাবে গ্রাস করেনি। আরো কিছু কাজ খুঁজছি মনে মনে। এমন এক দিনে ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধু বিশ্বজিৎ আমাকে ফোন করে জানাল এই সুযোগের কথা। প্রায় স্বেচ্ছাশ্রমের ব্যাপার। আমি শোনামাত্র ওকে হ্যাঁ বলে দিলাম। একদিন ওখানকার হেড মাস্টার ও সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করলাম। ঠিক ইন্টারভিউ নয়, আমার কী কাজ, কবে কবে এবং কখন আসতে হবে, কতক্ষণ থাকতে হবে এইসব আরকি! আমি ওঁদের সব শর্তে রাজি হয়ে খুব উৎফুল্ল চিত্তে বাড়ি ফিরলাম। ২০০৯ সালের পয়লা জুন থেকে শুরু আমার নতুন কাজ।
স্কুলের ছাত্রসংখ্যা খুব বেশি নয়, সব মিলিয়ে তিনশোর কাছাকাছি। অধিকাংশই দরিদ্র ও দুঃস্থ পরিবারের। স্কুলে হিন্দু ছাত্রের সঙ্গে প্রচুর মুসলমানও আছে, যারা এসেছে মূলত অনাথ আশ্রম থেকে। ওয়াক্ফ পরিচালিত এইসব অনাথ আশ্রমের কয়েকটি ওই স্কুলের খুব কাছাকাছিতেই আছে। প্রথম দিন লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখলাম বইপত্র সব এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে, একেবারে ধূলিধূসরিত। কয়েকজন ছাত্রের সাহায্য নিয়ে লাইব্রেরিটাকে একটু ভদ্র গোছের করে তুলতে মাসখানেক সময় লেগে গেল। যাহোক পূর্ব নির্ধারিত একটি দিনে লাইব্রেরির কাজ শুরু হল। আগে থেকে নোটিশ দিয়ে ছাত্রদের জানানো হল।

নির্দিষ্ট দিনে দেখি প্রচুর উৎসাহী ছাত্ররা চলে এসেছে। গোটা লাইব্রেরি ভিড়ে ভিড়াক্কার। যা হোক তখন ঠিক করা হল কোন কোন দিন কোন কোন ক্লাসের ছাত্ররা আসবে। এতে কাজ হল। আমারও চাপ একটু কমল। তবে কিছু দিন যেতেই টের পেলাম, লাইব্রেরিতে উপস্থিতির সংখ্যা বেশ কম। আসলে যে কৌতূহল নিয়ে ওরা প্রথমটায় এসেছিল সেটা কাটতে বেশি সময় লাগেনি। তবে যে দু’চারজন আসত তারা পড়বার আনন্দেই আসত।

এইভাবে কেটে গেল গেল অনেকগুলো শীত গ্রীষ্ম আর বর্ষার দুরন্ত দুপুর। আমার জীবনের ছকটাও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে বেঁধে চলতে থাকল আপনমনে। আদর্শ বিদ্যামন্দিরের ওই দিনগুলো কাটতে থাকল নানা রঙের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তার দু’একটির কথা এখানে লিখতেই হবে আমাকে।

স্কুলে বেশ ধুমধাম করে সরস্বতী পুজো হত। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে ছাত্ররা পুজোর কাজে হাত লাগাত। পুজো হত সাড়ম্বরে। আশ্চর্যের ব্যাপার অনেক মুসলমান ছেলেরাও দেখতাম পুজোয় অঞ্জলি দিত। পরে ওদের ডেকে জিজ্ঞেস করে অবশ্য তেমন কোনও সদুত্তর পাইনি। পুজোর পর হত একদিন খাওয়ার আয়োজন, সেইসঙ্গে হত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। যা করার ছাত্ররাই করত। শিক্ষকেরা দিতেন ভাষণ। আর আমি গাইতাম গান। ভাল হোক, মন্দ হোক আমার গান ছিল ওই সময়কার যে কোনও অনুষ্ঠানের এক অন্যতম আকর্ষণ। আমি মূলত গাইতাম রবীন্দ্রসংগীত। গানের শেষে ছেলেদের হাততালি ছিল অন্যতম প্রাপ্তি। সেটা অবশ্য ওদের একটা অভ্যাসই ছিল। কেউ কিছু একটা করবার পরেই হৈ হৈ করে ছাত্ররা হাততালি দিল।
স্কুলের অন্যতম সেরা অনুষ্ঠান হত শিক্ষক দিবসে। মূলত উপরের ক্লাসের ছাত্রদের উদ্যোগেই হত। আগে থেকে আমাদের নেমতন্ন করা হত। বলাবাহুল্য তালিকায় আমাকেও রাখা হত। বেশ বড় করে অনুষ্ঠান হত। ভাল খাওয়া দাওয়াও হত। যথারীতি আমাকে গান গাইতে হত। সেদিন স্কুলের অন্য কোনও কাজও সেই অর্থে হত না। এছাড়া প্রতি বছর না-হলেও রবীন্দ্রজয়ন্তী হয়েছে বেশ কয়েকবার। বলাবাহুল্য প্রত্যেকটাতেই আমাকে অংশ নিতে হত। সে ছিল বড় আনন্দের সময়। অংশ নিতাম সত্যি সত্যি আনন্দের সঙ্গেই।

স্কুলের দু’চারজন ছেলে আমার কাছে নিয়মিত আসত। ওদের সবারই প্রায় দুঃখে ভরা জীবন, বিশেষ করে যারা অনাথ আশ্রম থেকে আসত। কারো মা গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেছে, কারো বাবা মাকে ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গেছে। কারো বাবা মা দু’জনেই মারা গেছে অসুখে। পরে আর কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতাম না ভয়ে। তবে অনেকের মধ্যে যে আনুগত্য আর ভালবাসার আভাস দেখেছি, তা সত্যিই অবিস্মরণীয়।

আমি স্কুলের একজন কর্মী হলেও ওখানকার ভিতরের নানারকম দ্বন্দ্ব বিবাদের মধ্যে আমি থাকতাম না। সর্বত্র যা হয়, দলাদলি সেটা ওই স্কুলেও ছিল। আভাসে ইঙ্গিতে অনেকে অনেক কথা বলেছেন আমাকে। আমি ওইসব একেবারেই গায়ে মাখতাম না। এজন্যে কারো কারো বিরাগভাজনও হয়েছি মাঝে মাঝে। শিক্ষকদের মধ্যে আমি সবসময় বিশ্বজিতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম। ওর সঙ্গে আমার বহুদিনের সখ্য। ও নিজেও আমাকে স্কুলের অন্য সব ব্যাপারে এড়িয়ে চলতে বলত। এতে আমার উপকারই হয়েছে।

স্কুল নিয়ে বেশি কথা বলার নেই আমার। কোথা থেকে দশটা বছর কেটে গেছে সেটা ভাবতেই অবাক হয়েছি। তবে সবকিছুর শুরুর মতো শেষও তো আছে। স্কুলের শেষপর্বের ব্যাপারটা সংক্ষেপে হলেও বলতে চাই।
এমনিতেই কাজের মধ্যে একঘেয়েমি আসলে সে কাজে কোনও উৎসাহ থাকে না। স্কুলের ব্যাপারেও আমি তাই একসময় কেমন যেন উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। কাজটায় কোনও আনন্দও পাচ্ছিলাম না বেশ কিছুদিন ধরে। তাই মনে মনে ভাবছিলাম হেড মাস্টারকে বলি আমাকে ওই কাজ থেকে অব্যাহতি দেবার জন্যে। একটু সময় নিয়ে ওঁরা যদি অন্য কাউকে খুঁজে নেন। কথাটা একদিন তাই বলেও ফেললাম অনেক দ্বিধা সঙ্কোচ জয় করে। আশ্চর্যের কথা হেড মাস্টার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমার কথাটা মেনে নিলেন। সেটা ছিল ২০১৯ সালের জুলাই মাসের শেষদিক। সেদিনই ঠিক হয়ে গেল ওই মাসে ৩১ জুলাই হবে আমার ওই স্কুলের শেষদিন। ওইদিন অবশ্য আমাকে আসার জন্যে তিনি বারবার বললেন। বিদায় সম্বর্ধনা দেবেন বোঝা গেল।
ভেবেছিলাম যাব না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গিয়েছিলাম। ছাতা বই ডায়েরি ফুল মিষ্টি ইত্যাদি অনেক কিছুই দিলেন ওঁরা। অনেকে অনেক কথা বললেন। এইসব সভায় যা হয়, আরকি! এবার আমার পালা এল। আমাকেও যে কিছু বলতে হবে! দু’একটা কথা বলেছিলাম ঠিকই। এবং সবশেষে সবার অনুরোধে গান গাইলাম।

না, সেদিন আর রবীন্দ্রসংগীত নয়। সবাইকে অবাক করে গাইলাম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের একসময়ের বিখ্যাত গান, ‘এক গোছা রজনীগন্ধা হাতে নিয়ে বললাম, চললাম’।