চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৫ ॥ সুশীল সাহা



সময়ের খড়িলেপা ধূসর এক জীবনগাথা

রবীন্দ্রনাথে আদ্যন্ত নিমগ্ন সদ্যপ্রয়াত সুধীর চন্দকে (১৯২৯-২০২১) আর কে মনে রেখেছে সেইভাবে। চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুর হয়ে কলকাতা-শান্তিনিকেতন, তারপর দিল্লিতে প্রায় ছয় দশক কাটিয়ে অবশেষে কলকাতায় এ এক আশ্চর্য যাপন। একদা যাঁর উদাত্ত কণ্ঠে গীত হতো রবীন্দ্রসঙ্গীত সেই মানুষটাই শেষ জীবন কাটিয়েছেন কেবল গীতবিতানে চোখ বুলিয়ে। কখনো গানের সুরে আবার কখনোবা শুধুই নিবিড় পাঠে। অবশেষে কণ্ঠে সুর নেই, গলার স্বর অস্পষ্ট, প্রায় স্মৃতিলুপ্ত এই অকৃতদার সেই মানুষটি একসময় হয়ে গেলেন স্তব্ধবাক। তাঁরই সুদীর্ঘ জীবনের আংশিক আত্মকথা ‘সাত ঘাটের জল’ এক অসামান্য স্মৃতিমেদুর মনোলগ। সময়ের খড়িলেপা যেনো এক আশ্চর্য ‘ওয়াস পেন্টিং’, যার পরতে পরতে আঁকা হারিয়ে যাওয়া গত শতাব্দীর যাপনবৃত্তান্ত। তবে তা এতই সংক্ষিপ্ত যে সহৃদয় পাঠকের মনে থেকে যায় এক ধরনের অতৃপ্তির স্বাদ। তবু যেটুকু পেয়ে যাই, তাও কম কি।

সব মানুষের জীবনে শৈশব আসে এক মনোরম আনন্দের বার্তা নিয়ে। সেই শৈশবকে কে কীরকম ভাবে উপভোগ করবেন সেটাই বড় কথা। আর সবার তো সেই অর্থে দেখার চোখ থাকে না। তাই অনেকের জীবনে শৈশব আসে, চলে যায়, কোনো চিহ্ন রেখে যায় না। সুধীর চন্দের শিল্পীমন আপন শৈশবকালের দিনগুলোকে দেখতে চেয়েছেন একটু অন্যরকমভাবে। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তিনি একটু একটু করে অত্যন্ত সরসভাবে ব্যক্ত করেছেন তাঁর সেই অপরূপ দিনযাপনকে। তখনকার চট্টগ্রাম শহরটা যেন ছবির মতো ফুটে ওঠে তাঁর লেখার মধ্যে। ছোট্ট একটা নমুনা দিয়ে আমরাও একটু ঘুরে আসি গত শতাব্দীর মধ্য তিরিশের সেই অনন্য দিনগুলোয়।

“মনে পড়ে আমরা খেলতে যেতাম বাড়ির অনতিদূরে সেটলমেন্টের মাঠ বলে একটা ময়দানে। চট্টগ্রাম শহরের সব প্রধান সরকারি দপ্তর এক একটি পাহাড় বা টিলার ওপর, কমিশনারের বাড়ি, ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়ি, বিশাল জেলা কাছারি অট্টালিকা, জেনারেল হাসপাতাল, ইউরোপীয় পুলিশ ক্লাব, বহু দূরের সরকারি কলেজ, সবই ছিল এক একটি পাহাড়ের মাথায়। বলাবাহূল্য এই দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা সব ভীতিপ্রদ সাহেবকুল। সেটলমেন্টের অফিসও পাহাড়ের চুড়ায়, পাদদেশে বড় মাঠে আমাদের খেলার জায়গা, যদি না ওখানে বড়দের খেলার কোনো প্রতিযোগিতা, বা মেলা বা ওইরকম কিছু বৃহৎ ব্যাপার থাকে। একদিকে কাছারি পাহাড়, নিচে অন্দর কিল্লার দিকে যাবার প্রধান সড়ক, ওদিকে লাল দিঘী এবং আরও পরে দেখা যায় জেলখানার উত্তুঙ্গ প্রাচীর, আমাদের রহস্য আতঙ্ক’’।

এইভাবেই কয়েকটি ছত্রের মধ্য দিয়েই লেখক তখনকার পটভূমি তুলে ধরেছেন। ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্বের আরো অনেকগুলো এইরকম দৃশ্য একজন শিশুর চোখে দেখা হলেও তা এতই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে যে আমরা তাঁর এই স্মৃতিকথা পড়তে পড়তে ফিরে যাই বিগত শতাব্দীর কয়েকটি চিরচেনা অথচ বেশ আকর্ষণীয় পরিবেশে যা লেখকের সাবলীল বর্ণনায় হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সমসাময়িক কালে যাঁর জন্ম তাঁর শৈশবকাল যে নানা রোমাঞ্চকর ঘটনা বিন্যাসে চিত্রিত হবে তাতে আর বিচিত্র কি। বিশেষ করে যাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এমন স্বচ্ছ ও সাবলীল। বলাবাহূল্য তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা তাঁকে নানা সময়ে নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে দিয়েছে। তাই তো এইগ্রন্থের নাম ‘সাত ঘাটের জল’। বর্ণময় জীবন পরিক্রমার এ এক অপরূপ দলিল।

জন্মভূমি চট্টগ্রাম থেকে একসময় তিনি চলে আসেন তাঁর পিতৃভূমি চাঁদপুরে। সেখানকার বিশাল বিশাল নদী এবং তার জলজীবনের গল্পগাথা লেখক বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গে তাঁর লেখায় নিয়ে আসেন। সবুজ পূর্ব বাংলার নদী বিধৌত চাঁদপুরের সেই ছবি লেখকের কলমে এতই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে যে আমরা যেনো চোখের সামনে দেখতে পাই পদ্মা ও মেঘনার সঙ্গমস্থল অর্থাৎ সেই বিখ্যাত মোহনা। বৃষ্টি আর ইলিশের মহোৎসবে ঘেরা সেই যে এই লেখকের নানা রঙের দিন, আমরা যেনো চোখের সামনে দেখতে পাই চাঁদপুরের একটি অখ্যাত গ্রামের ছবি। আদ্যন্ত সোঁদা মাটির গন্ধে ভরা সেই বর্ণনা।

“আমাদের বাজাপ্তী গ্রামের বাড়ির যে স্ক্রোল-চিত্রমালাটি মনের মরচে ধরা সিন্দুকটিতে গোটানো পড়ে আছে, তা কখনো কখনো বা নিভৃত অবকাশে মেলে ধরে চেয়ে চেয়ে দেখি, কত দৃশ্য, কত চরিত্র। কিছু কিছু রঙ আবছা হয়ে গেছে, কোনোটা আবার এখনও বেশ স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে। … মাঠ-ঘাট খালবিল ক’মাসের উপুড় করে দেয়া জলে টইটম্বুর। সেই ঘন সবুজ ও জলময় জগতের ওপর দিয়ে ভেসে ঘন্টা চার পাঁচ পেরোলে দেশের বাড়ি। নৌকোর গলুইয়ের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে নাতিগভীর বিলের জলের শালুক, জলজ গুল্ম, ছোটবড় মাছের ঝাঁকের ছুটোছুটির চলচ্চিত্র দেখতে থাকতাম, মাঝে মাঝে হাত বাড়িয়ে শাপলার ডাঁটা ধরে টান দিতাম, নৌকোর গতিতে ডাঁটা ছিঁড়ে আসতো, পেছন থেকে লগি ঠেলতে ঠেলতে দাস মাঝি হাঁকতো, ‘এমন করিস না, নাও বামু ক্যামনে’। জলের নিচের কিছু ধরে টানলে নৌকোর গতি ব্যহত হবে সে খেয়াল থাকত না। – এমনই সরস ও ছবির মতো বর্ণনা এই গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে। চোখের সামনে ছবিগুলো মুহূর্তের মধ্যে দৃশ্যমান হয়ে আবার মিলিয়ে যায়।

গ্রামের সহজ সরল জীবনকে পেছনে ফেলে একদিন লেখককে চলে আসতে হয় চাঁদপুর শহরে পড়াশুনোর জন্যে। তখন একদিকে যেমন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা আর অন্যদিকে সেই কুখ্যাত ৪৩’এর দুর্ভিক্ষের পটভূমি। অমন একটি মহকুমা শহরেও তখন দলে দলে কঙ্কালসার মানুষের মিছিল শুরু হয়ে গেল। ভাত নয়, একটু
ফ্যানের জন্যে আর্ত চিৎকার। সারা বাংলায় তখন এক অনাহারের কালোছায়া। চাঁদপুরও তা থেকে রেহাই পেল না। মানুষের তৈরি এই খাদ্যাভাব ও মৃত্যুর করালছায়া সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ লেখকেরও চোখ এড়ায় না। তাঁর সংবেদনশীল ব্যথিত মন প্রত্যক্ষ করে সেই দুর্দিনকে। তারপর বহু মৃত্যু হত্যা আর রক্তের বিনিময়ে এলো স্বাধীনতা। এবং তার পরের বছর দেশান্তরী হয়ে শান্তিনিকেতন। তবে এখানে আসা তাঁর প্রথম নয়। তাঁর মেজমামা বরাবর শান্তিনিকেতনে থাকতেন। ১৯৩৮ সালে একবার লেখক এখানে এলেও রবীন্দ্রনাথের দেখা পাননি। তিনি তখন মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর আতিথ্যে রয়েছেন। তার ঠিক দশ বছর পরে স্নাতক শ্রেণিতে পড়তে এসে লেখক মিশে গেলেন শান্তিনিকেতনের জল হাওয়ার সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ তখন সেখানে অনুপস্থিত কিন্তু তাঁর কবোষ্ণ প্রচ্ছায়া সর্বত্র। সেই সময়ে এই মানুষটার চিন্তাকাশে ডানা মেলল রবীন্দ্রগান। উদার মুক্ত প্রকৃতির সংস্পর্শে আসা এক ছিন্নমূল মানুষ যেন খুঁজে পেল জীবনের এক পরম আশ্রয়। এভাবেই তাঁর কণ্ঠে এলো গান, রবীন্দ্রনাথের গান। তাঁর আত্মা যেনো খুঁজে পেল পরম নিভৃতির এক আনন্দ আশ্রয়।

“ একদিন একটি অন্ধ্র ছেলে, আমার চাইতে নিচু ক্লাসের, কথায় কথায় বলল, তুমি আমাদের গানের ক্লাসে যাও না কোনো, বীরেনদা শিক্ষা ভবনের গানের ক্লাস নেন। কিন্তু আমার সে সাহস সঞ্চয় করতে দোনামনা হচ্ছিল। কদিন পরে ওই ছেলেটিই ধরে নিয়ে গেল বীরেন পালিতের গানের ক্লাসে।
বীরেনদা এস্রাজ বাজিয়ে গান শুরু করলেন, আমার জীবনে প্রথম গান ‘সে কি ভাবে গোপন রবে’ সবাই সুরে বেসুরে গলা মিলিয়ে গাইতে লাগল’। এইভাবে তাঁর গানের পাঠ শুরু হল। লেখকের জীবনে যেভাবে গান এসেছে তা বোধ হয় শান্তিনিকেতনের বহু মানুষের জীবনে আসে। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট আশ্রমের হয়ত সেটাই সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য । যাঁরাই সেখানে একটানা বসবাস করেছেন, তাঁরা জানেন কীভাবে যেনো সবার মধ্যে নান্দনিক শিল্পের বোধ সংক্রমিত হয়ে যায়। ছাত্র হিসেবে যাঁরা যান তাঁরা ইচ্ছা অথবা অনিচ্ছায় গান, নাচ আর ছবি আঁকার প্রথম পাঠ অজানিতেই যেনো পেয়ে যান। স্রষ্টা হিসেবে রবীন্দ্রনাথের সেখানেই জয়। আজও শান্তিনিকেতনের পথে ঘাটে চলতে ফিরতে শোনা যায় গান, কোথা থেকে যেনো ভেসে আসে সুর, আর শিল্পের বোধ যাঁদের মধ্যে একবার ঢুকে যায়, তাঁরা ইচ্ছে করলেও ঝেড়ে ফেলতে পারে না তাকে। তাই তো বসন্ত উৎসবের সাজসজ্জায়, বাইশে শ্রাবণের মহোৎসবে আশ্রমিকদের যে সাজসজ্জার বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে তা সম্ভবত সারা বিশ্বে অনন্যতার দাবিদার। লেখকের জীবনেও সেইভাবে গান এলো একদিন।

‘বিশ্বজীৎদা* আমার কাছে প্রথম থেকেই আমার বিগ ব্রাদার ছিলেন,তাঁর সমঝদারি না থাকলে আমার গান শেখা কতটা এগোতো সন্দেহ আছে। ঠিকপথে তো এগোতো না নিশ্চয়। গায়কী ব্যাপারটা বিশ্বজিৎদা না থাকলে কখনো বোঝাই হয়ে উঠতো না। বিশ্বজিৎদা সংগীতভবন থেকে নতুন নতুন গান শিখে আসতেন, আমি সন্ধ্যায় তাঁর কাছ থেকে ওটা সেকেন্ড হ্যান্ড শিখে নিতাম। বিশ্বজিৎদার একটা বড় সাইজের এস্রাজ ছিল। তখন সংগীত ভবনে এস্রাজ শেখা আবশ্যিক ছিল, তাঁর এস্রাজটা বিশ্বিজিৎদা আমাকে দিয়েছিলেন, আমি তাতে হাত মকশো করেছি’।

তাঁর শান্তিনিকেতন বাসের জীবনে অনিল চন্দ এবং রাণী চন্দের একটা বড় ভূমিকা ছিলো। সে কথা অকপটে জানাতে কসুরও করেননি লেখক। অনিলবাবু ছিলেন শিক্ষাভবনের অধ্যক্ষ। লেখকের মতো বহু ছাত্র দূরত্বের কারণে ছুটির সময়েও ছাত্রাবাসে থেকে যেতেন। ছুটির সময়কার সেই শান্তিনিকেতনের চেহারাটাই আলাদা। ছাত্রদের নিঃসঙ্গতা ভরিয়ে দিতেন অনিলবাবু, নিজে এসে থাকতেন ছাত্রদের সঙ্গে। তাঁর অভিভাবকত্বের মায়াময় বন্ধনের কথা লেখক বারবারই স্মরণ করেছেন। শুধু চন্দ দম্পতি নয়, শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন সহপাঠি শুভময় অর্থাৎ শান্তিদেব/সাগরময় ঘোষের অকালপ্রয়াত ভাইয়ের কথা। সেইসঙ্গে আশ্রমিক গুরুজন, যাঁদের সান্নিধ্যে আলোকিত হয়েছে তাঁর জীবন, তাঁদের কথা তিনি লিখেছেন এই গ্রন্থে।

“বৈতালিক– একটি গান দিয়ে দিনের কর্ম– পড়াশুনো শুরু। শিক্ষকরা– অধ্যক্ষরা এসে দাঁড়াতেন। এই নিত্য উপস্থিতিতে অনিলদা তো থাকবেনই, পাশে এসে দাঁড়াতেন নন্দলাল বসু, সুরেন কর, বিনায়ক মাসোজি, কোনো এক আশীর্বাদের ছোঁয়া নিয়ে যে যার কাজে যেতাম’।
‘সাত ঘাটের জল’ সুধীর চন্দের এই আত্মকথাটি হঠাৎ করেই তাঁর শান্তিনিকেতন পর্বে এসেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকার নয়। এক বন্ধুর কাছে বেড়াতে এসে তিনি বাঁধা পড়ে যান দিল্লিপ্রবাসী বাঙ্গালিদের প্রবল ভালবাসার বন্ধনে। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে এসে একাদিকক্রমে সাতান্নটি বছর তিনি সেখানে ছিলেন। অমর্ত্য সেনের মায়ের নির্দেশে তিনি ক্রমশ হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রগানের শিক্ষক। শেখাতে শেখাতে নিজে শিখেছেন, আর নিজের অধীত বিদ্যার প্রয়োগ করেছেন বুভুক্ষু ছাত্রদের মধ্যে। হয়ে ওঠেন বহু প্রবাসী বাঙলিদের শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাই। দিল্লির চিত্তরঞ্জন কলোনীতে তাঁর এক চিলতে গৃহকোণ হয়ে ওঠে রবীন্দ্রগানের ঝরনাতলা। কয়েকজনের স্মৃতিচারণের মধ্যেই আমরা পেয়ে যাই একজন নিবেদিত প্রাণ মানুষের নিজেকে পরিপূর্ণভাবে বিলিয়ে দেবার টুকরো টুকরো আভাস। পেয়ে যাই ঋষিপ্রতিম এই মানুষটার অন্য আর এক পরিচয়।

“অপূর্ব মিষ্ট ও বলিষ্ঠ ভাবাবেগপূর্ণ সুকণ্ঠের অধিকারী, স্বল্পভাষী সুদর্শন যুবক তাঁর সুদক্ষ ও সযত্ন প্রশিক্ষণের বিনিময়ে প্রতিটি ছাত্র ছাত্রীর মনে শ্রদ্ধার আসন পাতলেন। করোলবাগে মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঐ ক্লাসের জন্য সারা সপ্তাহ আমরা উদ্গ্রীব প্রতীক্ষায় থাকতাম। কজন থেকে সবার ‘মাস্টারমশাই’ হতে সুধীরদার খুব অল্পই সময় লাগলো’। (বিনীতা সেন)

‘সুধীরদা আজীবন অবিবাহিত, তাঁর সংগীতালয় রবিগীতিকায় বহু ছাত্রছাত্রী নিষ্ঠাভরে রবীন্দ্রসংগীত শিখেছেন ও শিখছেন, দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে। ওঁর মতো গুরু সত্যি দেখা যায় না’। (বুদ্ধদেব গুহ)
‘মাস্টারমশাই বিধিবদ্ধভাবে ব্রাহ্ম ছিলেন না কিন্তু তার ভাবধারা, আদর্শ এবং সঙ্গীতের প্রতি ওঁর গভীর আকর্ষণ– তারই ফলশ্রুতি দিল্লির বাঙালিদের কাছে ওঁরই অভুতপূর্ব অবদান’। (মায়া ভট্টাচার্য)

‘শান্তিনিকেতনের এই যাদুকাঠির ফুলকি মাস্টারমশাই দিল্লিতে বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। দিল্লি বেড়াত এসে থেকে গেলেন বন্ধুদের সঙ্গে। অণিমাদি বললেন, ‘গান শেখাও’। সেই শুরু’। (আশিস ঘোষ)
‘ভগবানকে দেখিনি। দেবতুল্য মাস্টারমশাইকে ভগবান ভাবি। কেবল দিয়ে গেছেন, বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা রাখেন নি’। (ভারতী সরকার)

এমন মানুষ, আদ্যন্ত রবীন্দ্রনাথে নিমগ্ন নিবেদিত একক মানুষের শেষ জীবনটা কেটেছে একান্তই নিঃসঙ্গ অবস্থায়। কলকাতার পৈতৃক বাড়িতে সময় কাটিয়েছেন গীতবিতানের মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে। কখনও গানে গানে, আবার কখনও বা নিরুচ্চার পঠনে। সাত ঘাটের জল খাওয়া একজন ক্লান্ত পথিকের সেটা একান্তই এক নিভৃত যাপন। সেই যাপনের অবকাশে নেই কোনও পিছুটান, নেই কোনও গ্লানি কিংবা হাহুতাশ। গত বছরের অতিমারির সূচনালগ্নে একসময় তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল, শরীর হয়ে গেল এক নিথর বস্তুপিণ্ডের মতো। তারপর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে করতে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি সায়াহ্নকালে তিনি চিরস্তব্ধ হয়ে গেলেন।
আমাদের মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথের একটি গান, ‘দুঃখ আমার অসীম পাথার হল যে পার হল’।


* বিশ্বজিৎ রায়- একদা সংগীতভবনের ছাত্র, শৈলজারঞ্জন মজুমদারের প্রিয় ছাত্রদের অন্যতম।