চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৬০॥ সুশীল সাহা


মরণের মুখে রেখে

এই লেখাটির আরেকটি শিরোনাম হতে পারত, ‘মরণসাগরপারে’। অবশ্য গীতবিতান অন্তর্ভূক্ত ‘মরণের মুখে রেখে দূরে দূরে যাও চলে’– এই শিরোনামটাও দেওয়া যেত। সে নাম যাই হোক না কেন, মৃত্যু ব্যাপারটা থেকেই যাচ্ছে। আর তা থেকে পাঠকের ধারণা হতে পারে এই লেখাটি সম্ভবত মৃত্যুবিষয়ক। না, মৃত্যু নিয়ে আমার কোনও রচনা লেখার অভিপ্রায় নেই। বরং মরণোত্তর একটি বিষয়কে আধার করেই এই লেখাটি তৈরি করতে চাই। তা হল ‘চক্ষুদান’, ‘দেহদান’। তবে এই বিষয়ে কোনও তাত্বিক আলোচনা নয়, তবে এ নিয়ে আমার একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই আজকের এই লেখার প্রধান উপাত্ত।

বাইশ/তেইশ বছর আগে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে আমার মায়ের চক্ষুদান ও দেহদানের ব্যাপারটা সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম। আজ এতদিন পরে সেই ব্যাপারটাকেই বিবৃত করতে গিয়ে প্রথমেই রবীন্দ্রনাথের দুটি গানের উল্লেখ করলাম, যাতে স্পষ্টভাবে ‘মৃত্যু’ শব্দটি গ্রথিত। পঁচাশি বছর বয়সে তাঁর সেই মৃত্যু আকস্মিক কোনও ব্যাপার ছিল না। যা বিশেষভাবে উল্লেখ্য, তা হল ওই বয়সে চক্ষুদান ও দেহদানের ব্যাপারে তাঁর সানন্দ অনুমতির কথা। বলাবাহুল্য মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁর এই ইচ্ছা বা অঙ্গীকারে স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর করে যান। বিষয়টা নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার বিশদে আলোচনাও হয়। আমি তাঁর এই সানন্দ অঙ্গীকারকে বাস্তবায়িত করার জন্যে মনে প্রাণে প্রস্তুতি নিতে থাকি। তাঁর সেই শেষের সেদিনের অপেক্ষার পাশাপাশি তাঁর সবরকমের সেবাযত্ন ও পরিচর্যার আয়োজন করতে থাকি।

মায়ের শরীর ক্রমশ খারাপ হয়ে আসছিল। প্রধান সমস্যা বার্ধক্য। শেষ কয়েকমাস প্রায় শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি। শুয়ে থাকতে থাকতে তাঁর শরীরে শয্যাক্ষত দেখা দিয়েছিল। সেই সময়টায় বড় অসহায় বোধ করেছি। সবরকম আন্তরিকতা দিয়েও তাঁর শেষের সেই দিনগুলোর কষ্টের নিরাময় করতে পারিনি। ভুক্তভোগীরা জানেন মৃত্যুপূর্ব ওই দিনগুলো কী কষ্টের! তাঁকে তাঁর আগের জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারব না জেনেও যথাসাধ্য করেছি আমরা। অবশেষে একদিন তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমি বাড়িতে ছিলাম না। কী একটা কাজ সেরে বাড়ি ফিরছি, পথেই খবরটা পেলাম। তখন সকাল দশটা/সাড়ে দশটা হবে। বাড়ি ফিরেই শুরু করলাম মায়ের শেষ ইচ্ছাপূরণের প্রক্রিয়া। পাশাপাশি আত্মীয় পরিজনদের খবরটা দিতে থাকলাম টেলিফোনে। আমাদের বাড়িতে ওই সংযোগ ছিল না বলে এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে কাজটা সম্পন্ন করলাম। সবাইকে জানালাম মায়ের চক্ষুদান দেহদানের ব্যাপারটা। খুব যে সমর্থন পেলাম, তা নয়। জানতাম এই ব্যাপারটাকে সবাই সানন্দে মেনে নেবেন না। কিন্তু তখন কারও সঙ্গে বাদানুবাদে না গিয়ে শুরু করলাম আমার আরব্ধ কাজকর্ম।

মধ্যমগ্রামের যে সংস্থার মাধ্যমে মায়ের অঙ্গীকার নথিভুক্ত করেছিলাম, সর্বাগ্রে তাঁদেরকেই খবর দিলাম। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাঁদের অনেকেই আমাদের বাড়িতে চলে এলেন। তাঁদের পিছন পিছন এলেন ব্যারাকপুরের ‘দিশা’ আই ফাউন্ডেশনের ডাক্তার। মৃত্যুর ঘন্টাতিনেকের মধ্যে যে কর্ণিয়া তুলে নিতে হয়! তাই ওঁরা আসার কিছুক্ষণের মধ্যে প্রক্রিয়াটা শুরু হয়ে গেল এবং অতিদ্রুত সম্পন্ন হল। ওঁরা চলে যাবার পরে বিজ্ঞান চেতনা সমিতির লোকজন যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ শুরু করলাম। এবার দেহদানের ব্যাপারটা করতে হবে। খবরের কাগজ দেখে কয়েক জায়গায় ফোন করে আম্বুলেন্স ডাকা হল। তারা যথাসময়ে চলেও এল। ইতঃমধ্যে আমার দুই বোনসহ কয়েকজন আত্মীয় এসে গিয়েছিলেন আমাদের বাড়িতে। আমার উদ্যোগকে তাঁরা যে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তা কিন্তু নয়। পরে অনেক কথা শুনেছি অনেকের মুখে। এসবই জানতাম বলে কিছুই গায়ে মাখিনি। স্রোতের বিরুদ্ধে যাওয়া তো খুব সহজ ব্যাপার নয়। তবে নিজের ওপর আস্থা রেখে কাজ করে গেলে যে কেউ বাধা দিতে আসে না, সেটাও সেদিন প্রত্যক্ষ করলাম।

দুপুরের দিকে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে চললাম কলকাতার মেডিকেল কলেজের উদ্দেশ্যে । মায়ের নিথর দেহটা আম্বুলেন্সের মধ্যে শোয়ানো ছিল। বুক ভেঙ্গে কান্না বেরিয়ে আসছিল। কিন্তু নিজেকে কোনওরকমে সামলে নিয়েছিলাম। বেলা তিনটের দিকে পৌঁছালাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চত্বরে। দেহ যাদের হাতে তুলে দেব, তারা অনুপস্থিত। এদিক ওদিক খবর দেওয়া হল। অনেকক্ষণ পরে হেলতে দুলতে তিনি বা তারা এলেন। দেহটা নিলেন। প্রাপ্তিপত্র পরের দিন নিয়ে যাবার জন্যে বললেন ওরা। কী আর করা! আমরা চলে এলাম। বুকটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। আমার সঙ্গীরা কিছু কি বুঝলেন? জানি না। পরদিন মেডিকেল কলেজ থেকে দেহদানের প্রাপ্তিপত্র নিয়ে এলাম। ইতঃমধ্যে খবর এল, দু’জন অন্ধ মানুষের চোখে মায়ের দুটি কর্ণিয়া প্রতিস্থাপিত হয়ে গেছে। কথাটা জেনে কী যে আনন্দ হয়েছিল আমার।

মায়ের জন্যে প্রথাসিদ্ধ শ্রাদ্ধশান্তি করিনি। এজন্যে কম সমালোচিত হইনি। একটা স্মরণসভার আয়োজন করেছিলাম। অনেক মানুষ এসেছিলেন। একটা ছোট পুস্তিকাও প্রকাশ করেছিলাম। মানুষের মনে যদি সামান্য বোধোদয় ঘটাতে পারি, এই ছিল আমার অভিপ্সা। কিন্তু দীর্ঘ দীর্ঘকাল ধরে বয়ে বেড়ানো সংস্কার কি এত তাড়াতাড়ি যায়! গত বাইশ/তেইশ বছরে কত না মৃত্যু ঘটল এই এলাকায়। কিন্তু কারো চক্ষুদান/দেহদান সংক্রান্ত কোনও খবর এল না আমার কাছে। কতদিনে আসবে, জানি না। তবে বাড়ির উঠোনে মায়ের নামে একটি মুক্তমঞ্চ তৈরি করেছিলাম। সেই নির্মলা মুক্তমঞ্চে কতনা অনুষ্ঠান করেছে শিশু কিশোররা! কত গুণী মানুষ কতবার এসেছেন তা দেখতে! আজ সেই মঞ্চে প্রতিদিন অজস্র ফুল ফোটে। অনেক অনেক গাছের শোভায় আমাদের উঠোন আলোয় আলোয় আলোকময় হয়ে ওঠে।

সেই মঞ্চ আজও আছে। সেখানে প্রতিদিন অজস্র ফুল ফোটে। আমার সকালটা আনন্দে ভরে যায়।