চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৬১॥ সুশীল সাহা



নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী– সম্পাদক : কালি ও কলম


শিরোনাম দেখে কেউ কেউ চমকে উঠতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি। প্রায় আড়াই বছর ধরে কলকাতা থেকে প্রকাশিত কালি ও কলম পত্রিকার ছাব্বিশটা সংখ্যা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদনা করেছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। অবশ্য অনতি অতীত হলেও এই পর্ব এখন ইতিহাস। একটু পিছন ফিরে দেখাই যাক না, কীভাবে সম্ভব হল এই স্মরণীয় ইতিকথা।

দীর্ঘ সতের বছর ধরে ঢাকা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে কালি ও কলম মাসিক পত্রিকা। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই পত্রিকাটি যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন অনেকেই এর আয়ুস্কাল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। সুখের কথা পত্রিকাটি কেবল মানসম্মত নয়, দুই বাংলার লেখকদের মুখপত্র হয়ে উঠল অচিরেই। এই পত্রিকার সঙ্গে আমার নিজের এক যোগসূত্র তৈরি হল ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে। এই বঙ্গ থেকে লেখা সংগ্রহ করে পাঠানোর গুরুদায়িত্ব আমি সেই সময় থেকেই পালন করে আসছি। পত্রিকার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কারণে কিছুদিনের মধ্যেই জানতে পারলাম কালি ও কলম অনেকদিন ধরেই ঢাকা এবং কলকাতা থেকে একই সঙ্গে প্রকাশিত করার এক আন্তরিক চেষ্টা করছেন এর কর্তৃপক্ষ। মূলত আইনী জটিলতায় এর প্রকাশ বিলম্বিত হচ্ছিল। অবশেষে জানা গেল সব বাধা কাটিয়ে এর প্রকাশ প্রায় নিশ্চিত হয়েছে ২০১৫ সালের প্রথমার্ধ্ব থেকেই। সম্পাদক হিসেবে কাজে যোগ দেবার সানন্দ সম্মতি জানিয়েছেন বর্ষীয়ান কবি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। নীরেনদার সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক আগে থেকেই। কালি ও কলম পত্রিকার জন্যেই তো কতবার তাঁর কাছ থেকে লেখা আনতে গিয়েছি! ঠিক হল তাঁর পুত্রবধূ শ্রীমতী কাকলী চক্রবর্তী তাঁকে ওই কাজে সাহায্য করবেন আর আমি ওঁদের সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ রেখে করব সমন্বয়কের কাজ। শুরু হল আমাদের পথচলা। কালি ও কলম পত্রিকার কার্যালয় হল জহরলাল নেহরু রোডের এভারেস্ট হাউসের তিন তলায়। এতে যোগ দিলেন এখানকার কয়েকজন। আমার কাজ অফিসে বসার নয়, অর্থাৎ আগে যেমন ছিল- ঘুরে ঘুরে লেখা সংগ্রহ করা, পত্রিকা ও সম্মান দক্ষিণা ঠিকমত লেখক পাচ্ছেন কিনা তার নজরদারি করা। একটা স্থায়ী ঠিকানা হয়েছে বলে মাঝে মাঝে সেখানে যাই। অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই অফিস উঠে এলো পার্ক স্ট্রিটের কাছাকাছি ‘চ্যাটার্জি ইন্টার ন্যাশনাল’ বহুতলের আঠারো তলায়।

অবশেষে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে (শ্রাবণ ১৪২২ বঙ্গাব্দ) কলকাতা থেকে প্রকাশিত হল কালি ও কলম পত্রিকার এই বঙ্গের প্রথম সংস্করণের প্রথম সংখ্যা। ডিক্লারেশন নম্বর 35/15 (dt 8.5.2015)। সম্পাদক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। প্রথম সংখ্যাতেই তিনি একটি সুন্দর সম্পাদকীয় লিখে দিলেন। পাঠকদের অবগতির জন্যে তার পুরোটা এখানে উদ্ধৃত করা সম্ভবত অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

“বাংলাদেশের মাসিক সাহিত্যপত্র কালি ও কলমের নাম প্রথমে শুনি তা প্রায় বছর দশেক আগে। শুনে, যা স্বাভাবিক, এখানকার কাগজ কালিকলমের কথা চকিতে আমার মনে পড়ে যায়। সেও ছিল মাসিক সাহিত্যপত্র এবং বাংলা কথাসাহিত্য, ও কবিতার ক্ষেত্রে যাঁরা তখন নূতন পথের দিশারি, দীনেশরঞ্জন দাসের কল্লোলের মতো মুরলীধর বসুর কালিকলমও সর্বদা তাঁদের পাশে থেকে উৎসাহ জুগিয়ে এসেছে, যে উৎসাহ ও আন্তরিক সমর্থন না-পেলে পরবর্তীকালে-বিখ্যাত অনেক লেখকেরই কলমের কালি হয়তো শুকিয়ে যেত। সে-দুটি কাগজের কোনোটিই অবশ্য দীর্ঘায়ু হয়নি। না কল্লোল, না কালিকলম।

বাংলাদেশের এই মাসিক সাহিত্যপত্র কালি ও কলমের আয়ুস্কাল সম্পর্কেও যে প্রথম দিকে আমার মনে দুর্ভাবনা জাগেনি, তা নয়। ভাবতুম, কাগজ তো চমৎকার, কিন্তু চলবে তো? দুর্ভাবনা ক্রমশ কেটে যায়। যখন দেখি যে, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর এই কাগজখানা একেবারে ঠিক সময়ে বার হয়ে চলেছে, এবং তাতে প্রকাশিত পাঠ্যবস্তুর মানেরও ঘটছে না কোনো অবনমন তখন ভরসা জাগে যে, এর দম চট করে ফুরোবার নয়। মনে পড়ে যায় প্রবাসী, ভারতবর্ষ, বিচিত্রা, ও আরো খানকয় পত্রপত্রিকার কথা, গত শতকে দীর্ঘদিন ধরে যারা শিক্ষিত বাঙালি সমাজের নান্দনিক ক্ষুধা মিটিয়ে এসেছিল। প্রশ্ন জাগে, সেই সব মাসিক সাহিত্যপত্র তো আর নেই, কিন্তু তাদের শূন্যস্থান কি কখনো পূর্ণ হবে না?পূর্ণ করতে হলে যা থাকাই চাই, তা হলো পাঠকসমাজের নান্দনিক ক্ষুধার তৃপ্তিসাধন (যার আভাস আগে দিয়েছি)। এবং একইসঙ্গে তার সাংস্কৃতিক কৌতূহলের উত্তর যুগিয়ে তাকে আরো দীপিত করে তোলার সামর্থ্য। আর চাই কাগজখানাকে নিয়মিত প্রকাশ করার ক্ষমতা। তা কালি ও কলম তো এসব ব্যাপারের কোনোটিতেই কিছু মাত্র পিছিয়ে নেই, বরং অনেকের তুলনাতেই এগিয়ে আছে। উপরন্তু এর পরিচালকবৃন্দ যে-রকম নিষ্ঠাভরে গত প্রায় এক যুগ ধরে প্রতি মাসের একটা নির্দিষ্ট দিনে বার করে যাচ্ছেন এই সাহিত্যপত্র, তাতেও বোঝা যায় যে, এটা তাঁদের একটা ক্ষণিকের খেয়ালের খেলা নয়, রীতিমতো আটঘাট বেঁধেই তাঁরা কাজে নেমেছেন।
কালি ও কলমের সঙ্গে আমার পরিচয় তো বেশ কয়েক বছরের। ইতিমধ্যে এই কাগজে প্রকাশিত রচনারাজির ধাঁচধরন দেখে যা বুঝি তা এই যে, নূতনকে অবশ্যই দু-হাত বাড়িয়ে স্বাগত অভ্যর্থনা জানাতে চায় এই সাহিত্যপত্র, কিন্তু সেটা পুরাতনকে নির্বিচারে বর্জন করে নয়। তাছাড়া চায় বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সমন্বিত সাহিত্য-সংস্কৃতির গৌরবময় যৌথ উত্তরাধিকারের মর্যাদাকে সম্পূর্ণ অক্ষত রাখতে। চিন্তার কূমণ্ডুকতা এখানে প্রশ্রয় পায় না। সাহিত্যিক ও সামাজিক সব রকমের মতামতকেই যুক্তির কষ্টিপাথরে ঘষে দেখতে চায়।

বাংলাদেশের এই জনপ্রিয় সাহিত্যপত্র এতদিন ঢাকা থেকে বেরিয়েছে। এবারে বেরোবে কলকাতা থেকেও। এই বাংলাতেও যে তার সমান সমাদর হবে, এমন আশা তো করাই যায়।
কলকাতা
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (স্বাক্ষর)
জুলাই ২০১৫
সম্পাদক : কালি ও কলম
বলাবাহূল্য পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা থেকেই পাঠকদের বিপুল সাড়া পাওয়া গেল। এই সংখ্যায় কলকাতার লেখকদের প্রাধান্য ছিল চোখে পড়ার মত। প্রবন্ধ লিখেছিলেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, অনির্বাণ রায়, প্রলয় চক্রবর্তী, আজিজুর রহমান এবং শান্তি সিংহ। এরমধ্যে অনির্বাণ রায়ের ‘জীবনানন্দ দাশের কবিতায় পাখি’ প্রবন্ধটি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গল্প লিখেছিলেন এই বাংলার অর্ণব রায়, কিন্নর রায় এবং বুবুন চট্টোপাধায়, বাংলাদেশের সেলিনা হোসেন ও ইমদাদুল হক মিলন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশিষ্ট কথাকার অমিতাভ ঘোষকে নিয়ে অংকুর সাহার বিশ্লেষণ ছিল চমৎকার। সৈয়দ শামসুল হক, তরুণ সান্যাল, শ্যামলকান্তি দাশ, আসাদ চৌধুরীসহ দুইবাংলার নির্বাচিত কবিদের এক গুচ্ছ কবিতা প্রকাশিত হয় এই সংখ্যায়। সংগীত বিভাগে শুচিশ্রী রায়ের ‘সুরগুলি পায় চরণ’ এক অসামান্য রচনা। শিল্প বিভাগে মৃণাল ঘোষ, রফিকুন নবী, আবুল হাসনাত এবং মোবাশ্বির আলম মজুমদারের রচনা পত্রিকার ধ্রুপদী আঙ্গিককে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। এছাড়া ছিল নাট্য সমালোচনা এবং কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের আলোচনা। কানাই কুণ্ডূর ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘কিন্নরীদের দেশে’ বেশ মনোগ্রাহী। আগাগোড়া বহুমূল্য কাগজে সুমুদ্রিত ক্রাউন সাইজের ১৩৬ পৃষ্ঠার এই পত্রিকার দাম মাত্র তিরিশ টাকা। যথারীতি প্রকাশিত হওয়া মাত্রই বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পেল কলকাতা থেকে প্রকাশিত কালি ও কলমের প্রথম সংখ্যা।

মাসচারেক বাদে কলামন্দির মিলনায়তনে বেশ ঘটা করে পত্রিকার প্রকাশ অনুষ্ঠান হল। অনুষ্ঠানে মঞ্চ আলো করে বসেছিলেন শঙ্খ ঘোষ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং সম্পাদক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। শরীর সুস্থ ছিল না তবু নীরেনদা এসেছিলেন। মূল্যবান বেশ কয়েকটি কথাও বলেছিলেন সেদিন। অনুষ্ঠানে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গান ও তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদারের সরোদ ও জয় গোস্বামীর কবিতাপাঠের যুগলবন্দি সবাইকে মোহিত করে।
প্রত্যেক বাংলা মাসের এক তারিখে পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকল। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকেও ওখানকার সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছিল। কিছু কিছু লেখা দুটো সংখ্যাতেই থাকত। ক্রমশ কালি ও কলম হয়ে উঠল দুই বাংলার সাহিত্য পত্রিকা। তখন নীরেনদার বাঙ্গুরের বাড়িতে নিয়মিত যেতাম, লেখালিখি নিয়ে কথা হত। বুঝতে পারি লেখাপত্র যা পাওয়া যাচ্ছে তা নিয়ে তিনি ততটা সন্তুষ্ট নন। প্রত্যেক সংখ্যায় ভাল লেখা সংগ্রহ করার জন্যে তিনি নিয়মিত লেখকদের ফোন করতেন। একটা তালিকা করে নিয়ে সেইসব লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতাম। সব সময় যে প্রত্যাশিত সাড়া পেতাম, তা নয়। তবু পত্রিকা নিয়মিতই প্রকাশিত হতে থাকল। প্রত্যেক সংখ্যায় নীরেনদা বড় একটি সম্পাদকীয় লিখে দিতেন। প্রত্যেক সংখ্যায় আলাদা আলাদা বিষয় নিয়ে লিখতেন। বলাবাহূল্য পত্রিকায় প্রকাশিত গল্প প্রবন্ধ কবিতার পাশাপাশি এই সম্পাদকীয়গুলোও পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। মাঝে মাঝেই তিনি ডেকে পাঠাতেন ওই লেখা পড়ে শোনাবেন বলে। পড়া শেষ হলেই মতামত চাইতেন। কিছু একটা বলতেই হত। কিন্তু সত্যি সত্যি ভেবে পেতাম না অমন অসাধারণ বিষয়সমৃদ্ধ সম্পাদকীয় সম্পর্কে কী বলব! দু’একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি মনে হয় বোঝানো সম্ভব হবে।

অক্টোবর-নভেম্বর সংখ্যায় তিনি চিঠি লেখা নিয়ে তিনি লিখলেন, “…মোবাইল বা চলভাষ যন্ত্রটি হাতে এসে যাওয়ায় মানুষের চিঠি লেখার অভ্যাস প্রায় লোপ পেতে বসেছে। বড়-একটা কেউ আর আজকাল চিঠি লেখে না, সবাই এস-এম-এস করে। প্রিয় পাঠক, আপনিও কি সেই দলে নাম লিখিয়েছেন নাকি? যদি না-লিখিয়ে থাকেন তো চিঠি লিখে আমাদের জানান যে কাগজখানা আপনাদের কেমন লাগছে।

অগাস্ট ২০১৬ সংখ্যায় তিনি অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে নিয়ে লিখলেন, “…তেমন অনুবাদের সাক্ষাৎ মেলে কালেভদ্রে। সত্যি বলতে কী, আমাদের যেটা চলিত বাগধারা, এখনকার অধিকাংশ অনুবাদে সেটাই গায়েব হয়ে যায়। ফলে ভাষার প্রবহমানতা নষ্ট হয়, তার মধ্যে আড়ষ্টতা দেখা দেয় এবং এক-আধ পাতা পড়েই আমরা হাঁফিয়ে উঠি। এই যে সমস্যা, এই নিয়ে এক আলোচনাচক্রে একজনকে বলতে শুনেছিলুম যে, আমাদের প্রতিষ্ঠিত লেখকরা যদি মাঝেমধ্যে অনুবাদেও হাত দেন, সদ্য অতীতকালে দিয়েছিলেন লীলা মজুমদার ও সত্যজিৎ রায়, একমাত্র তা হলেই এর প্রতিকার হতে পারে। কথাটা ভেবে দেখার মতো।

মে ২০১৭ সংখ্যায় বৃক্ষবিহীন কলকাতার ক্রমাগত নগরায়ন নিয়ে লিখলেন, “…গোটা কলকাতা জুড়েই এখন গাছপালার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। না আছে ফুলগাছ, না ছায়াতরু। কী করেই বা থাকবে? লোকসংখ্যা বেড়ে গেছে ও বেড়েই চলেছে। সেইসঙ্গে বেড়েছে গাড়ি। মানুষের জন্য ঘরবাড়ি চাই, আর গাড়ির জন্য চাই রাস্তা। কিন্তু তার জন্য যে বাড়তি জায়গাজমি চাই, তা না-থাকায় একদিকে যেমন পুরনো সব একতলা-দোতলা বাড়ি ভেঙ্গে সেখানে দশতলা-বারোতলা পায়রাখুপি হাইরাইজ উঠেছে, অন্যদিকে তেমনি ফুটপাথ ছেঁটে বাড়ানো হচ্ছে রাস্তার পরিসর। এর মধ্যে গাছপালা বাড়ানোর কথা বলতে একটু ভয়ও করে। কী ভয়? না, লোকে ভাববে, ওটা স্রেফ বিলাসিতা! এইরকমই যদি চলতে থাকে, তবে শহরটা যে স্রেফ কংক্রিটের জঙ্গল হয়ে দাঁড়াবে, তাও ঠিক।

অক্টোবর ২০১৭ সংখ্যায় তিনি উষ্ণায়ন প্রসঙ্গে হকিং-এর প্রসঙ্গ টেনে লিখলেন, “…মানব সভ্যতার ইতিহাসে যেটা একেবারে প্রথম ধাপ, সেই কৃষিকর্মের ব্যাপারটা যাঁরা একেবারে হাড়ে-মজ্জায় চেনেন, গ্রহান্তরে পাঠানো হোক তেমন কিছু কৃষিজীবী গ্রামীণ মানুষকে। কেননা তাঁরাই সবচেয়ে ভাল জানেন যে নিসর্গ প্রকৃতিকে নির্বিচারে ধ্বংস করে নয়, বস্তুত তাকে যত্নভরে বাঁচিয়ে রাখলে তবেই মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব। যা-ই হোক, হকিং সাহেবের আর্জি, হাতে তো সময় অতি অল্প, তাই আর বছর পাঁচ-দশের মধ্যেই মহাকাশচারী প্রযুক্তিবিদদের চাঁদে আর মঙ্গলে পাঠানো হোক। তাঁরা সেখানকার পরিবেশকে মনুষ্যবাসের উপযোগী করে রাখুন। ব্যস সে-কাজটা হয়ে গেলেই মহাকাশে আবার একটা নোয়ার নৌকা ভাসিয়ে দেওয়া হবে। তা সেটা হোক আর না-ই হোক, কথাটা ভেবে দেখার মতো। আমি ভাবছি, আপনারাও ভাবুন।”
দুঃখের কথা, এই সংখ্যাটিই কলকাতা থেকে প্রকাশিত শেষতম সংখ্যা। কী কারণে এটা হয়েছিল সেই নেপথ্যকাহিনির অনুসন্ধান করে কোনও লাভ নেই আজ। মাত্র ছাব্বিশটা সংখ্যা প্রকাশের মধ্য দিয়েই পত্রিকাটি রীতিমতো এক প্রত্যাশা জাগিয়েছিল বিপুল পাঠকের মনে। এখনও অনেকের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে নিরুত্তর হয়েই থাকতে হয় আমাকে। কি উত্তর দেব জানা নেই তো আমার। তবে সুখের কথা পত্রিকাটির বাংলাদেশ সংস্করণ এখনও নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে চলেছে। ভাবি, হয়ত আরেক শুভক্ষণে সব বাধা কাটিয়ে কালি ও কলমের কলকাতা সংস্করণ প্রকাশিত হবে।

কিন্তু সে তো অলীক স্বপ্ন! আমাদের অনেক অবাস্তব কল্পনাও তো কখনও কখনও সফল হয়। সেই স্বপ্ন যদি সফল হয়ও, সম্পাদক হিসেবে তো আর পাব না আমাদের পরম আদরনীয় শ্রী নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে। এই আক্ষেপ আমি রাখব কোথায়?