চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৬২॥ সুশীল সাহা


জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া


এইটুকু এই ছোট্ট জীবনে কত মানুষের সান্নিধ্য পেলাম। পথের বাঁকে বাঁকে কত না বিস্ময়। কত অচেনা মানুষ। অচেনার খোলস ভেঙ্গে যারা কাছের মানুষ হয়ে যায় তাদের কথা সারাজীবনেও ভোলা যায় না। মনে পড়ে খুব ছেলেবেলার বন্ধু কমলের কথা। আমার নাচ গান আর নাটক করার পরম উৎসাহদাতা। কমলের অত্যুৎসাহে কলের গানের রেকর্ডের সঙ্গে কত না নেচেছি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। রীতিমতো শাড়ি দিয়ে পর্দা বানিয়ে হতো সেইসব অনুষ্ঠান আমাদের খুলনার বাড়িতে। চার তলা আমরা একদঙ্গল ছেলেমেয়ে, আর কিছু উৎসাহী দর্শক বড়োরা। আর চাই কি। ঘর থেকে বাইরে এলাম একদিন অবশেষে। বন্ধু বিকাশের প্রণোদনায় মঞ্চে উঠলাম। কাছা দিয়ে শাড়ি পরে মাথায় ফেট্টি বেঁধে সেই নাচের ছোটখাট একটা রিভিউ বেরোল তখনকার (১৯৫৮) ইত্তেফাক দৈনিক পত্রিকায়। কতই বা বয়েস তখন আমার। সাকুল্যে এগারো। তারপর ক্লাস এইটে সেন্ট যোসেফস স্কুলে ভর্তি হয়ে পেলাম গোরা স্যারকে। আমার জীবনের অন্যতম মেন্টর। আর বন্ধুদের কথা বলতে গেলে তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। তবু এক লহমায় যাদের নাম মনে পড়ছে, লিখে যাই। হিমাংশু, আলতাফ, গোরা, কালিকিংকর, গুন্ডা, টেনা, রুমি, দারা, দুলু, জিয়া, কামরু। আর কলেজে এসে পেলাম দুলালকে। গান খেলাধুলো আর ছবি আঁকায় যাঁর দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

কলেজেই পেয়েছিলাম শুভেন্দুকে, আমার লেখালিখির অন্যতম প্রেরণা সে। আর পেলাম কায়কোবাদ স্যারকে, আমার শিক্ষাগুরু হয়ে উঠলেন ধীরে ধীরে। সম্পর্ক টিকে রইল আমৃত্যু, আর তাঁর সূত্রেই পেলাম মুক্তিদি, স্যারের সহধর্মিনীকে। এঁদের কথা আলাদাভাবে নানাভাবে লিখেছি। এঁরা আমার শ্বাস প্রশ্বাসের মতো, আমার ধমনীর রক্তের মতো মিশে আছে আমার অস্তিত্বের গভীরে। আর যাঁকে পেয়েছিলাম কলেজে তিনি হলেন হাসান আজিজুল হক। তাঁর সঙ্গেও সম্পর্ক টিকে রইল আমৃত্যু। হাসানভাই-এর সূত্র ধরে পেলাম তাঁর অগ্রজা জাহানারা নওশিন, সনৎকুমার সাহা, শহিদুল ইসলাম, দিলীপকুমার নাথ আর নাজিম মাহমুদকে। শেষোক্ত মানুষটির তুলনা তিনি নিজেই। এত বড়ো সংগঠক ইহজীবনে আমি আর একটিও দেখিনি। তাঁর সূত্রেই পেলাম নিশাত জাহান রানা, জয়ন্ত রায়, টুকু, অপি, কামাল, কল্লোল, রিআ, মুনীর আর টুকুনকে। এঁদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আজও অমলিন।

১৯৭০ সালে দেশান্তরী হয়ে পশ্চিমবঙ্গে এসে অসমসয়েসী বন্ধুত্ব হল যাঁর সঙ্গে তাঁর নাম গৌরীশংকর দে। ইতিহাসবিদ, কবি। তাঁর নিবিড় সাহচর্যে ভারতের অনেক প্রান্ত ঘোরা হল। নবাহ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে ঘনিষ্ট পরিচয় হল মণীন্দ্র গুপ্তর সঙ্গে। কফি হাউসে নিয়মিত আড্ডা দেবার সুবাদে পেলাম কমল সাহা, সুবিমল মিশ্র আর শ্যামলকান্তি দাশকে। পরিচিত হলাম শঙ্খ ঘোষ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, গৌ্রকিশোর ঘোষ আর মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। মানবদার ছোট ভাই সত্যেন ও স্ত্রী মীনাক্ষীর সঙ্গেও হৃদ্যতা হল অনেক পরে। মনে আছে নবাহ পত্রিকার হয়ে লেখা আনতে গিয়েছিলাম শঙ্খ ঘোষের শ্যামবাজারের বাসায়, ওখানেই আলাপ হয়েছিল দিল্লি প্রবাসী কবি বটকৃষ্ণ দের সঙ্গে। বন্ধু অজয় দের সুবাদে পরিচিত হলাম বিশিষ্ট ছড়াকার নির্মলেন্দু গৌতমের সঙ্গে। ওঁর ভাই দেবাশিস আকাশবাণীতে কাজ করত। অজয়ই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল শচীন দাশ আর বিজ্ঞাপন পর্ব পত্রিকার সম্পাদক রবিন ঘোষের সঙ্গে। বন্ধু সুরঞ্জন রায়ের সূত্রে সখ্য হল অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সুধীর চক্রবর্তী আর দেবেশ রায়ের সঙ্গে। অনুষ্টুপ পত্রিকা্র সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত ছিলাম বলে ওই দপ্তরে বহু গুণী মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি। তাঁদের মধ্যে শোভন সোম, দীপেন্দু চক্রবর্তী, পুলক চন্দ অন্যতম। লেখা আনার সুবাদে কয়েকবার যেতে হয়েছিল অশোক মিত্রের বাড়িতে। শঙ্খ ঘোষের মতো তিনিও প্রতিদিন বিদায় জানাতে দরোজা অব্দি চলে আসতেন। আরেক বন্ধু ও দাদা দীপক রায়চৌধুরী আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন সব্যসাচী দেবের সঙ্গে। প্রায় যেচে পরিচিত হয়েছিলাম প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। বন্ধু ও ভাই নিয়ে গিয়েছিল গায়ক সুমন চট্টোপাধ্যায়ের (তখনও কবীর সুমন হননি) বাড়িতে। শেক্সপিয়র সরণির অফিসে বসেই পরিচিত হয়েছিলাম বিভাস চক্রবর্তী ও মনোজ মিত্রের সঙ্গে যথাক্রমে অন্য থিয়েটার দলের সম্পাদক দিলীপ দত্ত সুন্দরম দলের সম্পাদক সোমেন রায়চৌধুরীয় সৌজন্যে। ঊষা গাঙ্গুলির কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন ওঁর ভাসুর অমলেন্দু গাঙ্গুলি (একদা ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতির সভাপতি)। অজিত পাণ্ডের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল এক অনুষ্ঠানে। আলাপ থেকে বন্ধুত্ব। সেটা অবশ্য শেষ পর্যন্ত রাখা যায়নি। খুলনার এক অনুষ্ঠানের আয়োজনে শান্তিদেব ঘোষকে নিয়ে যাবার জন্যে মুক্তিদি দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেজন্যেই আমাকে যেতে হয়েছিল শান্তিনিকেতন কয়েকবার। তারই সুবাদে শান্তিদেব ঘোষের নিবিড় সাহচর্য পেয়েছিলাম। সম্পর্ক ছিল আমৃত্যু। কলকাতায় এলেই দেখা হত। নিয়মিত চিঠি লিখতেন আমাকে। তাঁর লেখা একটি চিঠির (২৮. ৩. ১৯৮৭) কয়েকটি ছত্র নীচে উদ্ধৃত করছি।
“…আমার প্রতি, তোমার শ্রদ্ধার পরিচয়, প্রথম পরিচয়ের দিন থেকে, পেয়ে আমি সত্যিই খুব অভিভূত হয়েছিলাম। তোমার সঙ্গে আমার দেখা সাক্ষাত পূর্বে কখনো হয় নি। অথচ, সেদিন মনে হয়েছিল যে, তুমি আমার বহুদিনের পরিচিত এবং আমাদের উভয়ের সঙ্গে একটা আন্তরিক সম্পর্ক কে যেন রচনা করে রেখেছিলেন।“

তরুণ সান্যালের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন বন্ধু বৈশাখী। তরুণদার বাড়িতেই পরিচিত হই উৎপলেন্দু আর শতরূপার সঙ্গে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন সুনন্দা বৌদি। বন্ধু পল্লব নিয়ে যায় তাঁর জামাইবাবু কালীকৃষ্ণ গুহর বাড়িতে। কবি অমিতাভ দাশগুপ্তর সঙ্গে কবে এবং কীভাবে পরিচয় হয়েছিল মনে নেই। হাসান আজিজুল হকের সূত্রে যোগসূত্র তৈরি হয় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় আর পূর্ণেদু পত্রীর সঙ্গে। এছাড়া বেশ কয়েকজন বাংলাদেশের নবীন কথাসাহিত্যিক যেমন ওয়াসি আহমেদ, মঞ্জু সরকার, নাসরীন জাহান প্রমুখের সঙ্গে নিবিড় সখ্য হয়। আলাপ হয় ইমদাদুল হক মিলন, সেলিনা হোসেন, নাঈম হাসানের সঙ্গে। সেলিনাদির একটি বইয়ের কাজ করেছিলাম আনন্দ পাবলিশার্স-এর হয়ে। সেই থেকে তাঁর সঙ্গে আমার সুমধুর সম্পর্ক। কত না আবদার মিটিয়েছেন তিনি।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সুদুর জার্মানী থেকে মাঝে মাঝেই ফোন করতেন। তাঁর কথা মুগ্ধ হয়ে শুনতে হত। মাঝে মাঝে গানও শোনাতেন। কবিতা পাঠাতেন, চিঠি লিখতেন ফ্যাক্সে। মুক্তিদির মৃত্যুসংবাদ পেয়ে যে ফ্যাক্স (১২. ১১. ২০১৫) পাঠিয়েছিলেন তার ভাষা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। এখানে তার পুরোটাই উদ্ধৃত করছি।
“স্নেহপ্রিয় সুশীল,
মর্মান্তিক সংবাদ পেয়েই এই দ্রুতলেখ। এখন কলকাতায় নিথর রাত, তাই স্বরায়ণের বদলে এই প্লুতলেখ। যদ্দুর প্রতিভাত হচ্ছে, ডিসেম্বরের শুরুতেই তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কলকাতায়। তখন তোমায় বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদব, আর সেটাই হবে আমাদের মুক্তিযজ্ঞ।
অলোকদা”

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে পরিচয় দীর্ঘদিনের হলেও দেখা হয়েছে অনেক দেরিতে। এমন হয়েছে তিনি যখন কলকাতায় আমি তখন বাংলাদেশে। দেখা হল তিনি যখন চিকিৎসার জন্যে এখানে এসেছেন। নিয়মিত তাঁর কাছে যেতাম। তখনকার অনেক মধুর স্মৃতি মনের কোণে জমা আছে। চিকিৎসাপর্ব শেষ করে এখান থেকে চলে গেলে গেলেও চিঠিপত্রের যোগাযোগ ছিল। তারই একটি থেকে (২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬) খানিকটা এখানে,
“ …গতকাল হাসান ভাই এসেছিলেন, ময়মনসিংহে সেমিনার সেরে ঢাকায় একটু দেখা দিয়ে আজ সকালে রাজশাহী ফিরে গেলেন। হাসান ভাইয়ের শরীর ভালো নয়, কিছু লিখছেন বলে মনে হয় না। তুমি তাঁকে চিঠি লিখে উপন্যাসটা শেষ করার জন্য তাগাদা দাও। তোমাকে খুব ভালোবাসেন। হাসান ভাই না লিখলে আমাদের সবার জন্যেই খারাপ।“

আমার জন্মভূমি খুলনার সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রে বাংলাদেশ আমার অস্তিত্বের গভীরে মিশে থাকা এক ভূমি, যার সঙ্গে আমার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আর সেই বাংলাদেশে আবার সূত্র ধরে কত মানুষই না ওখানে গেলেন। মনে আছে ওখানে যাবেন বলে আমার সঙ্গে কথা বলতে আমাদের অফিসে এসেছিলেন সুরজিৎ দাশগুপ্ত। পরে ওঁর সঙ্গে আমার এক নিবিড় সখ্যের সম্পর্ক হয়। ওঁর দু’টি বইয়ের স্বত্ব তিনি আমাকে দিয়ে গেছেন। একবার এখানকার কয়েকজন কথাসাহিত্যিক বাংলাদেশে যাবেন বলে আমাকেই উদ্যোগ নিতে হয়। এঁরা হলেন সাধন চট্টোপাধ্যায়, আফসার আহমেদ, ভগীরথ মিশ্র, কিন্নর রায়, অমর মিত্র, স্বপ্নময় চক্রবর্তী ও তপন বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে আলাপ হয়েছিল মিহির সেনগুপ্ত, অভিজিৎ সেন আর নলিনী বেরার সঙ্গে। এঁদের সকলের সঙ্গেই আমার আজও সুসম্পর্ক বজায় আছে। একটু আলাদা করে লিখতেই হবে বাসুদেব দাশগুপ্তর কথা। কত যে মধুর সময় কেটেছে তাঁর সঙ্গে। আমার অন্যতম সেরা গুণগ্রাহী ছিলেন তিনি। তাঁকে ঘিরে আমার যে অনেক স্মৃতি। সুরজিতদা অনেকদিন আগেই চলে গেছেন, সম্প্রতি প্রয়াত হলেন মিহির।

অনেকেই আমাকে তাঁদের বই উৎসর্গ করেছেন। এঁদের মধ্যে আছেন শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, দেবেশ রায়, সুধীর চক্রবর্তী, অমর মিত্র, সাধন চট্টোপাধ্যায়, কিন্নর রায়, নীহারুল ইসলাম এবং ওয়াসি আহমেদ। শেষোক্ত মানুষটি আমার পরমাত্মীয়ের অধিক। শঙ্খদা তাঁর উৎসর্গ পত্রে আমাকে ‘দুই বাংলার নিরর্গল সেতু’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সুধীরদা লিখেছেন, ‘পরহিতব্রতী’ আর দেবেশদা লিখেছিলেন ‘দুই বাংলার স্বনির্মিত সেতু’। খানিকটা আত্মপ্রচারের মতো মনে হলেও কথাগুলো এখানে লিখতেই হল। কেননা এঁদের স্নেহে প্রশ্রয়ে ভালোবাসায় আমার জীবনপাত্র যে উছলে পড়েছে। অনেক পরে পরিচয় হলেও পবিত্র সরকার আমার খুব কাছের মানুষের একজন।

গৌরী আইয়ুব আমার দেখা সেরা মানুষদের একজন। ওঁর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলী আনোয়ারের মাধ্যমে। গৌরীদির অনুপ্রেরণায় আমি মৈত্রেয়ী দেবীর ‘খেলাঘর’ প্রতিষ্ঠানে অল্প কিছুদিনের জন্যে যোগ দিয়েছিলাম। ওখানকার অনাথ ছেলেমেয়েদের দিয়ে কলকাতার গোর্কি সদনে নৃত্যনাট্য ‘কালমৃগয়া’ মঞ্চস্থ করিয়েছিলাম। ওখানে নিত্য যাতায়াতের সুবাদে মৈত্রেয়ী দেবীর সান্নিধ্য পাই। তিনি খুবই স্নেহ করতেন আমাকে। কিভাবে যেন আলাপ হয়েছিল গায়ক অর্ঘ্য সেনের সঙ্গে। সম্পর্ক বহুদিন অটুট ছিল। খুবই ভালোবাসতেন বহুরূপীর দেবতোষ ঘোষ। অনেক পরে সখ্য হয়েছিল ওই নাট্যদলের এক প্রাক্তনী সৌমিত্র বসুর সঙ্গে। তবে নাটকের জগতের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন বাদল সরকার। এঁর কথা আমি আলাদাভাবে অন্যত্র লিখেছি। এমন নিরহং, গুণী, বন্ধুবৎসল, প্রচারবিমুখ মানুষ আমি আমার এই ইহজীবনে বেশি দেখিনি।

কয়েকজন মানুষকে অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করতাম। কোনওদিন যে এঁদের সান্নিধ্য পাব, ভাবিনি। কিন্তু ভাগ্যবলে এঁদের কাছে পেয়েছিলাম একসময়। এঁরা হলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুচিত্রা মিত্র, ফাদার দ্যতিয়েন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, রবিশঙ্কর বল, তপন রায়চৌধুরী, অমলেন্দু দে আর যামিনী কৃষ্ণমূর্তি।
একসময় নাড়া বেঁধে গান শিখেছিলাম মায়া সেনের কাছে। গানের টানেই খুব কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস, মঞ্জরীলাল, সুধীর চন্দ, দিনেন্দ্র চৌধুরী এবং প্রতিমা বরুয়া। এঁদের প্রত্যেকেরই কমবেশি সান্নিধ্য পেয়েছি একসময়। খুব কাছ থেকে দেখা সেই অভিজ্ঞতা কোনওদিনও ভোলার নয়।

বাংলাদেশের আরো কয়েকজনের কথা তো লিখতেই হবে। এঁরা হলেন অসিতবরণ ঘোষ, ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, আবুল হাসনাত, মামুন হুসাইন এবং নিশাত জাহান রানা। এঁরা প্রত্যেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বমহিমায় উজ্বল। এঁরা সবাই আমাকে কাছে টেনেছেন এঁদেরই নিজগুণে।
তালিকা দীর্ঘায়ত করতে চাইনা। তবে সেলেব্রিটি কিছু মানুষের নাম লিখে অন্যদের ছোট করতে চাইনা আমি। যাঁদের সহায়ে সম্পদে সুখে দুঃখে অগ্রবর্তিতায় কাছে পেয়েছি তাঁরা কেউই কারো চেয়ে কম নয়। এ লেখা একান্তভাবে প্রতীকি। আমি যে আমি হয়ে উঠেছি তার পিছনে রয়েছে যে বিপুল সংখ্যক মানুষের ভালোবাসার অনাবিল প্রশ্রয় সেটুকু জানাবার জন্যেই এত কথা। পরিশেষে সদ্যপ্রয়াত হাসান আজিজুল হকের একটি চিঠির কিছুটা অংশ তুলে ধরব, কত মানুষের ভালবাসায় ধন্য হয়েছে এ জীবন, তারই এক ঝলক এই লেখায়।

হাসান আজিজুল হক
প/৭৬ সি আবাসিক এলাকা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
৬. ৮. ৮৮

প্রিয় সুশীল,
২১ শে জুলাই তারিখে রেজিস্ট্রি ডাকে পাঠানো প্যাকেট পেয়েছি। প্যাকেটের ভিতরে পাঁচ কপি বিজ্ঞাপন-পর্ব, স্কেচ কার্ড ইত্যাদি সবই ঠিক ঠিক মিলেছে। চিঠি লেখার অফ প্রিন্টসহ ইত্যাদি বিজ্ঞাপন পর্ব নাজিম মাহমুদ, সনৎ সাহাকে দিয়েছি। এক কপি দিয়েছি শহিদুলকে। কামালের কপিটি এখনো আমার কাছে, যথাসময়ে অর্থাৎ দেখা হলেই দিয়ে দেব। প্যাকেটটি পাবার কয়েকদিন পরে দীঘা থেকে লেখা চিঠিটিও পেলাম। পরম সৌভাগ্যের কথা এই যে ‘বিজ্ঞাপন পর্ব’: হাসান আজিজুল হক সংখ্যা প্রকাশের দীর্ঘ দেড়বছর সময়কালের মধ্যে তোমার সঙ্গে আমার যেসব দেওয়া নেওয়া হয়েছিল তার কিছুই খোয়া যায়নি।
এইবার বলো আমি কি বলবো। ভালো মন্দের কথা কি বলবো– সেসব বলার সময় আছে, আমি ছাড়াও বলার অসংখ্য লোক পাওয়া যাবে, বলতে কি তোমার আমার নিষেধেও আলোচনা বন্ধ থাকবে না। এই যে এক বড়ো একটা কাজ শেষ পর্যন্ত করে তুললে, স্রেফ এটার জন্যে আমি আজ অভিভূত, অসহায়রকম অভিভূত। সেটা এইজন্যে নয় যে আমার একটা প্রচার হলো, কোনো একরকম মূল্যায়ন, এইবার খ্যাতিবৃদ্ধি ঘটবে প্রসিদ্ধি চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে আরো হাজাররকম ব্যাপার ঘটতে থাকবে– না সুশীল এইসবের জন্যে নয়– এসবের প্রতি সর্বপ্রকার মোহ প্রলোভন জয় করেছি একথা আদৌ ঠিক নয়, কিন্তু এসবকে যথার্থ পরিপ্রেক্ষিতে, সংযমের সঙ্গে গ্রহণ করার মনোভাব নিজের মধ্যে বোধহয় তৈরি করতে পেরেছি। আমি এখন অশ্রুজলের ভিতর দেখতে পাচ্ছি ভালোবাসায় ভরা একটি বিরাট হৃদয় যা কোনো প্রতিদানের অপেক্ষা না রেখে বিজ্ঞাপন পর্ব হাসান আজিজুল হক সংখ্যার পিছনে বরাবর কাজ করে গেছে। আমার নিজের হিশেব থেকে যখন দেখি তখন মনে হয়, সুশীল আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা একরোখা, আপোষহীন এবং অনেকটাই যুক্তিরহিত। জীবনে এই জিনিশ ফেলাছড়া পাওয়া যায় না, আমি পাইনি। সেইজন্যে ভিতরে ভিতরে এর প্রচণ্ড জোর অনুভব করি। বিজ্ঞাপন পর্ব হাতে পাবার পর থেকে আমি এই আনন্দেই মগ্ন আছি– পত্রিকার দিকে তেমন যে চেয়ে দেখতে পেরেছি তা বলতে পারি না। এই যে কথাগুলি লিখলাম, সুশীল, তা শুধু তোমার জন্যে।’

লেখা এখানেই শেষ করতে চাই। কথাচ্ছলে আমার জীবনের কিছু সেরা মানুষদের স্মরণ করলাম। স্মরণ করার ছলে নিবেদন করলাম আমার অন্তরের শ্রদ্ধা। এদের প্রতিদানহীন দানে আমার জীবনপাত্র পূর্ণ হয়ে উপচে পড়েছে। আজ এই জীবনের প্রান্তবেলায় পিছন ফিরে দেখা একটুখানি, অন্তরের বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো।