চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৬৩॥ সুশীল সাহা



তিনি আমাদের সত্তায় মিশে আছেন নিরবধিকাল


“নির্মেঘ দিনের চোখে স্বচ্ছ দৃষ্টি-দুরূহ যখন
শেখানো পাখির ঠোঁটে নিরুপায়
হৃদয়ের মিথ্যা উচ্চারণ,
তখন যে-নাম
বিব্রত কঙ্কাল কণ্ঠে জীবনের লক্ষ জয়ধ্বনি
চোখে চোখে উদ্ভাসিত
প্রত্যয়ের দিগন্ত সরণি
ভয়ঙ্কর দানবের সমুদ্যত খড়্গমুখে
দৃপ্ত ঋজুগ্রীব
সে-নাম মুজিব।
(সে নাম মুজিব : সিকান্দার আবু জাফর )

অনেক ঘাত প্রতিঘাতের পর্ব পেরিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামের দীর্ঘ ন’মাসের ত্যাগ ও তিতিক্ষার অবসানে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। বাংলা ও বাঙালির স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে উপযুক্ত সম্মান ও সম্ভ্রমের সঙ্গে জায়গা করে নিতে পেরেছে যে মানুষটার জন্যে, তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাসের পাতা থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলার অনেক অপচেষ্টা হয়েছে এই রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই। তবে সবংশে তাঁকে নির্মম হত্যার পরেও তিনি থেকে গেছেন বাঙলির হৃদয় ও মননের সমস্ত সত্তা জুড়ে। এই অর্জন সম্ভব হয়েছে তাঁর সারা জীবনের ত্যাগের বিনিময়ে, যে ত্যাগ ছিল বাংলা ও বাঙালির জন্যে সর্বৈব নিবেদিত।

১৯৬৯ সালের উত্তাল দিনগুলোয়, যখন শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সমগ্র পূর্ব বাংলার মানুষজন সংগ্রামমুখর, তখনই তাঁর নামের আগে বঙ্গবন্ধু অভিধাটি যুক্ত করেন ওই দেশের আপামর সাধারণ মানুষ। দেশবন্ধু, নেতাজি, শেরে-বাংলার পরে বাঙালি জাতি পেয়েছিল বাংলার একজন প্রকৃত বান্ধব। তাই ওই শিরোপাটি তাঁর শিরস্ত্রাণে পরিয়ে দিতে কারো মনে কোনও কুণ্ঠা ছিল না। তখনকার পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ইতিহাসের এক দুর্মর ঘুর্ণাবর্ত ধাপে ধাপে তাঁকে এই অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছিল। তবে তাঁর দেশপ্রেম ও নিষ্ঠা ছিল আকাশচুম্বি এবং এ লক্ষণ যৌবনকালেই তাঁর মধ্যে দেখা দিয়েছিল। তারপর ধাপে ধাপে তা পরিণতির দিকে এগোতে থাকে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মধ্যে নেতৃত্ব দেবার লক্ষণ তাঁর ছাত্রাবস্থাতেই দেখা দেয়। বস্তুত স্নাতক শ্রেণিতে পাঠরত অবস্থাতেই তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা বিকশিত হয় এবং দেশ ও দশের কাজে তিনি ক্রমশ জড়িয়ে পড়েন। তাঁর অসামান্য সাংগঠনিক ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে যুক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী (১৯৪৬) হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী তাঁকে তাঁর পিতৃভূমি গোপালগঞ্জ মুসলিম লীগের শাখা এবং মুসলিম ছাত্র সংগঠন গড়ে তুলতে বলেন। বলাবাহুল্য সেই কাজ অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গেই তিনি করতে পেরেছিলেন। অত্যন্ত ব্যক্তিত্বপূর্ণ তাঁর চেহারা, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অসাধারণ বাগ্মিতা। তাঁর ভাষণের মধ্যে মিশে থাকত দেশজ উপমা উৎপ্রেক্ষার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলাম। কবিগুরুর ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি তাঁর সমগ্র সত্তাজুড়ে এমনভাবে ছিল, যা উত্তরকালে স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে মর্যাদা পায়। তাঁর সাতই মার্চের ভাষণ শুনলেই বোঝা যায়, অতি সংক্ষেপে বলবার বিষয়টি বুঝিয়ে বলার ক্ষমতা তাঁর কতখানি! শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করার অবিস্মরণীয় এই ক্ষমতা কেবল নয় একই সঙ্গে অতি সাধারণ গ্রামীণ মানুষ ছাড়াও তিনি শহরের কেতা- দুরস্ত শিক্ষিতজনের সঙ্গেও সহজে মিশে যেতে পারতেন। একদিকে ছিল গ্রামের সঙ্গে তাঁর নাড়ির যোগ এবং অন্যদিকে অনেকদিন কলকাতা শহরে থাকার সুবাদে নাগরিক বোধের সঙ্গেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন মুসলিম লীগের ছত্রছায়ায় শুরু হলেও দেশভাগের বছরের প্রারম্ভেই তিনি ওই দল ত্যাগ করেন। দেশভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিমা প্রভুদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা তাঁকে নানাভাবে আলোড়িত করে। ওই সময় তিনি ক্রমান্বয়ে অনুভব করেন দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারতা। এই তত্ত্ব যে কেবল ক্ষমতা লাভের এক অনিবার্য হাতিয়ার, তাও তিনি মর্মে মর্মে অনুভব করেন। এভাবেই তিনি আস্তে আস্তে বাঙালি জাতীয়তাবোধে উদবুদ্ধ হয়ে ওঠেন। মুসলিম লীগ থেকে নিজেকে সরিয়ে সেই সময় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’। একই সময়ে তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’ গঠন করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ’-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন, পরে ১৯৫২ সালে এই দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হয়ে দলকে সুসংগঠিত করেন। অচিরেই এই দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ পড়ে শুধু আওয়ামী লীগ হিসেবে পরিচিত হয় এবং হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে দেশের আপামর সাধারণ মানুষের দল হয়ে ওঠে এবং তাঁর নেতৃত্বে সমস্ত পূর্ব বাংলায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন গণমানসে এক নতুন চিন্তা চেতনার জন্ম দেয়। স্বাধিকার অর্জনের এক দুর্মর সাহস একটু একটু করে সবার মধ্যে বিস্তার লাভ করে তাঁরই নেতৃত্বে। ১৯৫৪ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে তিনি পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদে সদস্য নির্বাচিত হন। ’৫৪ সালের আগে তিনি চারবার কারাবরণ করেন। এরপর পাকিস্তান মন্ত্রিসভায় বাঙালি আধিপত্য এবং মুসলিম লীগ বিরোধী জোটের কারণে পশ্চিমা প্রভুদের উস্কানি দেশে নিরন্তর এক অশান্তির জন্ম দেয়। এরই ফাঁকফোকর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব খানের নেতৃত্বে ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল’ জারি হয়। দেশব্যাপি নেমে আসে এক অশান্তির কালোছায়া। সমগ্র পূর্ব বাংলায় চালু হয় এক অঘোষিত স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষের মনে জমতে থাকে ক্ষোভ, দেখা দেয় দ্রোহকালের অশনি সংকেত। আপাত নীরিহ অতি সাধারণ মুখচোরা ও গোবেচারা বাঙালিও ক্রমশ ফুঁসতে থাকে এই অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে। ক্রমশ এই ধূমায়িত ক্ষোভ সমগ্র দেশের মানুষের মনের মধ্যে সঞ্চিত হতে থাকে।

এই পরিস্থিতিতেই কালক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন পূর্ব বাংলার অবিসংবাদিত নেতা ‘বঙ্গবন্ধু’, যার চূড়ান্ত পরিণতি তাঁর ছয় দফা আন্দোলন এবং যা ক্রমান্বয়ে দেশের মুক্তিসংগ্রামে পর্যবসিত হয়। প্রকৃতপক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের দমন পীড়ন নীতির কারণে সারা পূর্ব বাংলায় তখন এক অভূতপূর্ব গণ জাগরণ ঘটে। দেশের সাধারণ নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করার পরেও আওয়ামী লীগকে সরকার গড়তে দেওয়া হয় না। উপরন্তু মিলিটারি শাসনের কালোছায়া সারা পূর্ব বাংলাকে গ্রাস করে। তাই ওই দেশে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। এই যুদ্ধে ভারতের প্রত্যক্ষ সাহায্য এবং সোভিয়েত রাশিয়ার সমর্থন স্বাধীন বাংলাদেশকে বাস্তব করে তোলে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই দেশের জন্ম এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। পাকিস্তান অর্জনের মূল আদর্শ দ্বিজাতিতত্বকে ভূয়ো প্রমাণ করার জন্যে কতখানি অনিবার্য ছিল এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, তা আজ ইতিহাস অনুসন্ধানের বিষয়। কিন্তু বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশ যে একটি কঠিন বাস্তব ব্যাপার তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের এই সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে খুব জোর দিয়েই বলা যায়। বাংলাদেশের ক্রমশ স্বনির্ভর হয়ে ওঠার যে নজির আমরা দেখতে পাই তাও বিশেষভাবে উল্লেখ্য। আজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতি এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক অগ্রগতি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মত।
তবে যে আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল তার পিছনে সবচেয়ে বড় যাঁর অবদান সেই বঙ্গবন্ধুকেই ১৯৭৫ সালের পনেরোই অগাস্ট পাকিস্তানপন্থী ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল। একাত্তর থেকে পঁচাত্তর এই অল্প কয়েকটি বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ বিরোধী শক্তি এমনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে যে বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক শক্তি মাথা তুলে দাঁড়ায়। সারা দেশে এক চরম অস্থিরতা ও অশান্তি দেখা দেয়। স্বাধীনতার পক্ষের চিন্তা চেতনার বিলোপ ঘটাতে সামরিক শক্তির অশুভ কালোছায়া সারা দেশকে গ্রাস করে।

সেই অপশক্তিকে হটাতে দীর্ঘ কুড়ি বছর অপেক্ষা করতে হয়। এই কুড়ি বছরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে। দেশের অগ্রগতি নানা কারণেই ব্যহত হয়। সুখের কথা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য উত্তরাধিকারিনী তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা পিতার আরব্ধ ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার জন্যে তাঁরই আদর্শে উদবুদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে ক্ষমতায় আসেন। একবার নয়, দুবার নয় চারবার। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি আজ তাই একান্তভাবেই চোখে পড়ার মত।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি তাঁর আত্মীয় পরিজন ও ঘনিষ্ঠ অনুগামিদের কয়েকজনকে হত্যা করে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি মুছে দিতে চেয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নাম, সেইসঙ্গে তাঁর নীতি ও আদর্শের জলাঞ্জলি দিয়ে পাকিস্তানেরই পুনপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। প্রকৃতপক্ষে সেই কাজে তারা অনেকটাই সাফল্যও পায়। মনে রাখা দরকার সত্তরের নির্বাচনে অভুতপূর্ব সাফল্য পেলেও তার বিপক্ষে পড়েছিল ২৮% ভোট। সেই ২৮ ভাগ অপশক্তিই ফুলে ফেঁপে বাংলাদেশের বিরোধী শক্তি হিসেবে পাকিস্তানী আধিপত্যের বিস্তার ঘটাতে চাইছে। তবে নানা ঘটনাবর্তে সেই অপশক্তিকে পরাহত করেছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। পরবর্তীকালে শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনপ্রতিষ্ঠা হয়েছে। একটু একটু করে ফিরে এসেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নীতি ও আদর্শ।

বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দুটি সমার্থক শব্দ। পাকিস্তানের অপশাসন থেকে মুক্তিলাভের জন্যেই এই রাষ্ট্রের জন্ম। এই রাষ্ট্রের জন্ম বাঙালি চিন্তা চেতনার এই পীঠস্থান হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে। তাই শেখ মুজিবকে অস্বীকার করলে বাংলাদেশের অস্ত্বিত্বেরও কোনও মূল্য নেই। এই দেশকে পাকিস্তানের পদানত করার স্বপ্ন যারা দেখেন তারা আসলে এক আত্মঘাতি চক্রান্তেরই প্রণেতা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু অসম্পূর্ণই নয়, বিকৃত।
কবিতা দিয়ে এই লেখার সূচনা করেছিলাম, কবিতা দিয়েই এই লেখা শেষ করতে চাই। কেননা আমি বিশ্বাস করি কবিরাই শেষ কথাটি বলতে জানেন।
“শোণিত-সাগরে রক্তকমল সহস্রদল প্রাণ
শত মানবের নিত্য স্মরণে প্রীতিতে ঝরিছে নাম।
বাংলাদেশের মাটির মানুষে মাটিরে বাসিয়া ভালো
যে প্রাণ প্রদীপ জ্বলিয়া জ্বলিয়া ছড়াইয়া দিল আলো।
যত দুর্গম বিপদ সিন্ধু পাড়ি দিয়া দিয়া তরী
কূলে এনে দিলে বাংলা মায়ের ছিন্ন আঁচল ভরি।
ফসলের ঘ্রাণ, তাজা তাজা প্রাণ হে নাবিক নির্ভয়!
উদার বক্ষ-কপাট মেলিয়া অন্তর করি জয়
কোটি কণ্ঠের ধ্বনিতে শোনালে জয় বাংলা এ স্বাধীন দেশ
এ মাটির প্রাণ এ মাটির শোভা নাহিক তাহার শেষ।
তাইতো তোমার সারা জীবনের ও প্রাণের নাহিক ক্ষয়
মানুষের হাতে স্বজনের হাতে মরিয়া হয়েছে মৃত্যুঞ্জয়।
(মুজিব মৃত্যুঞ্জয়ী : বেগম সুফিয়া কামাল)