চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৬৫॥ সুশীল সাহা



‘নেপোয় মারে দই’


এই বাক্যবন্ধটি কে বা কারা তৈরি করেছিলেন, জানিনা। তবে এর সঙ্গে ‘লাভের গুড় পিঁপড়েয় খেয়ে যায়’-এর সঙ্গে খানিকটা মিলতো আছেই। প্রকৃত অর্থ যাই হোক না কেন, আমার জীবনে এমন অভিজ্ঞতা অনেকবার হয়েছে। প্রচুর পরিশ্রমের লভ্যাংশ নিয়ে গেল অন্য কেউ অথবা হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফসল অন্যের হাতে তুলে দিয়ে বোকা বনে যাবার কর্মকাণ্ড তো কম করলাম না এই ছোট্ট জীবনে!
১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের কয়েকজন শিল্পী বন্ধুদের নিয়ে কলকাতায় ‘অমর একুশে’ পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। প্রস্তাবটা ওই পক্ষ থেকেই এসেছিল। আর আমার যে স্বভাব, ‘উঠল বাই তো কটক যাই’, মনের মতো কিছু পেলেই হল, অগ্রপশ্চাৎ কিছু চিন্তা না করে ঝাপিয়ে পড়া, তো তেমনই মনের মতো কাজ পেয়ে মাঠে নেমে পড়লাম। কাজের শুরুতে কীভাবে যেন তখনকার এক প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী আমার বা আমাদের এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন, খানিকটা গায়ে পড়েই। মূল লেখায় যাবার আগে এই শিল্পী সম্পর্কে কিছু জানাই। ইচ্ছে করেই নামটা গোপন রাখছি। সেটা না জানলেও ক্ষতি নেই। তবু একটা নাম দিয়ে রাখলাম, ‘অনিল’।

তখন বামফ্রন্টের আমল। গণসংগীতশিল্পীদের বাজার ভালই। অনেকের মধ্যে ওই অনিলদা’র গান শুনি, ক্যাসেটে, রেডিও টেলিভিশনে। তাছাড়া নানারকম ফাংশান তো ছিলই। আমি তখন দত্তপুকুরের এক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তাদের এক বার্ষিক অনুষ্ঠানে অনিলদাকে আনা হল। যোগাযোগের ব্যাপারটা আমিই করেছিলাম। সম্পর্কটা তৈরি হয়েছিল এইভাবেই। তিনি মাঝে মাঝেই আমাকে ফোন করতেন। অফিস যাওয়া আসার পথে ওর মেসে যেতাম। এটা ওটা কথা হত। অত্যন্ত মিশুকে মানুষ ছিলেন তিনি। একা থাকতেন। স্ত্রী স্কুলশিক্ষিকা, থাকতেন কর্মক্ষত্রে। সঙ্গে তাঁদের একমাত্র পুত্র।

যা হোক একুশের আয়োজনের প্রস্তাব যখন এলো আমার কাছে, তখন আমি অনিলদার সঙ্গে আলোচনা করি। তিনি অত্যুৎসাহে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করতে বসে গেলেন। বুঝতে পারলাম পুরো ব্যাপারটা সেই অর্থে আমার হাতে আর নেই। তবে নেপথ্যকর্মীর দায়টা রয়েই গেল। ঠিক হল বাংলা একাডেমি/নন্দন চত্বরে একুশে ফেব্রুয়ারির বিকেলে ওই অনুষ্ঠান হবে। যোগ দেবেন এখানকার নামিদামি অনেক শিল্পীদের সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পীরা। বলে রাখা ভাল বাম সরকারের স্নেহধন্য অনিলদার সঙ্গে নামিদামি অনেক শিল্পীর ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যথাসময়ে বিরাট এক তালিকা তৈরি হল। ফোন করে অনেকের উপস্থিতির সম্মতিও পাওয়া গেল। তবে সমস্ত উদ্যোগটা যে অনিলদার, সেটাও ঠারেঠোরে তিনি প্রচার করে যাচ্ছিলেন। তখন তো আর পিছিয়ে আসা যায় না! পূর্ণোদ্যমে আমরা তখন কাজে নেমে পড়েছি।
অনিলদাই ঠিক করলেন আনন্দবাজার পত্রিকায় বড় করে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। সেই টাকাও নানাভাবে সংগ্রহ করা হল। সাহায্য করেছিলেন আমার দুই অধ্যাপিকা দিদি। তাঁরা এখন আর ইহজগতে নেই। তবু তাঁদের সেই সময়কার নিঃস্বার্থ সাহায্যকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি। যথাসময়ে আনন্দবাজারে বড় একটা বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হল। যথারীতি ক্ষুদে ক্ষুদে অক্ষরে ছাপা হল কলকাতার অসংখ্য শিল্পীর আর বাংলাদেশের অতিথিদের নাম। তবে বড় বড় অক্ষরে উদ্যোক্তা হিসেবে ছাপা হল অনিলদার নাম। কী একটা গালভরা নামের কমিটিও করা হয়েছিল, যার শীর্ষে ছিলেন তিনি। আমি যেমন নেপথ্যে ছিলাম, নেপথ্যেই থেকে গেলাম।

যথাসময়ে বাংলাদেশের বন্ধুরা এসে গেলেন। দলে গানের শিল্পীর সঙ্গে এলেন কয়েকজন বাচিকশিল্পী। আর এলেন একজন চারুকলা একাডেমির অঙ্কনশিল্পী, তিনি নন্দন চত্বরটাকে সাজিয়ে দিলেন অসামান্য এক আলপনা দিয়ে। সবটা হল ওঁদের পকেটের টাকায়। ওদের থাকার ব্যবস্থা হল হাজরা মোড়ের কাছাকাছি এক অতিথিশালায়, যার খরচ বহন করলেন ওঁরাই। তখন কিন্তু অনিলদা মুখে কুলুপ এঁটেই ছিলেন।

১৯৯৪ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটার কথা ভুলব না কোনওদিন। দুপুরেই পৌঁছে গেলাম ওখানে। গিয়ে দেখি বিরাট বিরাট সাউন্ড সিস্টেমে বাজছে অনিলদার গান। বিরাট বিরাট ব্যানারে জ্বলজ্বল করছে অনিলদার নাম। মেজাজটা বিগড়ে গেল। অনেক কষ্টে বলে কয়ে বাজাতে পারলাম একুশের কিছু গান। আমার সেই উদ্যোগটা যে অনিলদা খুব যে ভালভাবে নিলেন না সেটা তাঁর ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজে’ই প্রকাশ পাচ্ছিল। আমি তখন খানিকটা মরিয়া হয়ে গিয়েছিলাম। জানতাম ওই দিনের পরে আর সেইভাবে অনিলদার সঙ্গে সম্পর্কটা রাখা যাবে না। যা হোক, তখন একটু একটু করে দর্শক আসতে শুরু করেছে।

বেলা সাড়ে চারটের দিকে হঠাৎ করে কোথা থেকে এল তুমুল বৃষ্টি। কোনওরকমে সাউন্ড সিস্টেমগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হল। ব্যানারগুলো ভিজে চুপসে গেল। লেখাগুলো অস্পষ্ট হয়ে গেল। অনেক কষ্টে দেওয়া সেই আল্পনাটাও ধুয়ে মুছে গেল। আমাদের মুখ ব্যাজার। বৃষ্টি থামার কোনও লক্ষণ দেখা গেল। ক্রমে সন্ধ্যা নেমে ঘনিয়ে এল। বামফ্রন্টের একজন নেতাকে দেখা গেল সেই সময়। তাঁর সঙ্গে অনিলদাকে কথা বলতে দেখলাম। এমন সময় কীভাবে যেন অনিলদা বাংলা একাডেমির বড় হলটাকে ব্যবস্থা করে এলেন। মাইকে ঘোষণা করা হল। আমরা সবাই সমবেত হলাম ওই সভাঘরে। ভিড় উপচে পড়ছিল।
যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হল। গান গাইলেন লোপামুদ্রা মিত্র, তখনও তিনি সেইভাবে স্বনামখ্যাত হননি। এছাড়া কাজি কামাল নাসের, তপন রায় ছিলেন। জমিয়ে দিয়েছিলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়। অনিলদা গাইলেন ‘প্রাইম টাইমে’। বাংলাদেশের অতিথিদের সুযোগ দেওয়া হল ভাঙ্গা হাটে। অনুষ্ঠান চলল রাত ন’টা অব্দি।

পরদিন বাংলাদেশের অতিথিদের নিয়ে অনিলদার মেসে গিয়েছিলাম এক সৌজন্য সাক্ষাৎকারে। তারপর থেকে আমি আর সত্যি সত্যি ওঁর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখিনি। রাখা সম্ভবও ছিল না । তিনি তখন উঠছেন আরো অনেক উপরে। কিন্তু সেই উত্থান অবশ্য স্থায়ী হল না। একদিন শুনলাম তাঁর প্রয়াণসংবাদ।
আজ এতদিন পরে ওই স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে মনে পড়ল বাংলার প্রচলিত একটি বাগধারা,
‘যার ধন তার নয়, নেপোয় মারে দই’
এখানে অর্থ নেপো অর্থ নৃপ সে কথা তো জানেন সবাই।