চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৬৬॥ সুশীল সাহা




আমার সিনেমা দেখা



আমার প্রথম পাসপোর্ট হয়েছিল ১৯৬১ সালে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়েসে। ওই বয়সে কেন আলাদা পাসপোর্ট! এ প্রশ্নের সদুত্তর আমার জানা নেই। তখন ইন্ডো-বাংলাদেশ পাসপোর্টের ব্যাপারটা তেমন ঝামেলার ছিল না। আবেদন করলেই পাওয়া যেত। মূলত বাবার উদ্যোগেই এটা হয়েছিল। স্কুল ফাইনালের পরে আমাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেবার কথা বাড়িতে মাঝে আলোচনা হত। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন নতুন একটা দেশে পাকাপাকিভাবে যাবার আগে কয়েকবার ওখানে গিয়ে ওখানকার হালচাল একটু বুঝে নিক। এসব কথা আড়াল থেকে শুনতাম আর ভাবতাম আহা কবে কলকাতায় যাব। প্রাণ ভরে সিনেমা দেখব। আমার তখন সপ্তম শ্রেণি। বলাবাহুল্য ওই বয়সেই আমি সিনেমার পোকা হয়ে উঠেছিলাম। আমাদের খুলনায় তখন তিনটে সিনেমা হল– উল্লাসিনী, পিকচার প্যালেস আর সোসাইটি। শেষোক্ত হলটি ছিল নাট্যমন্দির থিয়েটার দলের সম্পত্তি। সিনেমা হল হিসেবে লিজ নেওয়া হয়েছিল। চুক্তি ছিল, মাঝে মাঝেই ওঁরা যখন নাটক করবেন তখন সিনেমা দেখানো বন্ধ থাকবে। স্বভাবতই মাঝে মাঝে ওখানে নাটক হলে সিনেমা হল বন্ধ থাকত। কিন্তু আমাদের বাড়ির কাছের উল্লাসিনী এবং পিকচার প্যালেসে নিয়মিত ছবি দেখানো হত। আর লুকিয়ে চুরিয়ে মাঝে মাঝে সস্তা দামের টিকিট কেটে হলে ঢুকে পড়তাম। সেই সময়ে দেখেছি সুচিত্রা-উত্তমের ছবি– শাপমোচন, অগ্নি পরীক্ষা, সবার উপরে, শিল্পী, হারানো সুর, পথে হল দেরী, রাজলক্ষী ও শ্রীকান্ত, চন্দ্রনাথ ইত্যাদি। উত্তমকুমার নেই অথচ সুচিত্রা সেনের অবিস্মরণীয় অভিনয়দীপ্ত ছবি হসপিটাল ও দীপ জ্বেলে যাই সেই সময়েই দেখা। মৃণাল সেনের ছবি দেখতে না পেলেও সত্যজিৎ রায়ের অপুর সংসার আর ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা আমি ওই সময়েই দেখেছিলাম খুলনার পিকচার প্যালেস সিনেমা হলে। আগের যুগের ছবি দেবদাস, মুক্তি, মেজদিদি, বাবলা, মানময়ী গার্লস স্কুল, একই গ্রামের ছেলে ওই সময়েই দেখা। এছাড়া সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়দীপ্ত শেষ পরিচয় (এই ছবিতে বসন্ত চৌধুরীও ছিলেন) এবং কাবেরী বসুর শ্যামলী আর উত্তম মালা সিনহার পৃথিবী আমারে চায় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম।
কিশোরকুমারের লুকোচুরি ছবির গানে প্রায় পাগল হবার দশা আমার। বরযাত্রী আর পাশের বাড়ি দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরার যোগাড়। উত্তমকুমার বিশ্বজিৎ আর সন্ধ্যা রায়ের হিট ছবি মায়ামৃগ ওই সময়ে খুলনাতেই আমার দেখা হয়ে যায়। হিন্দি ছবিও তখন সব হলেই দেখানো হত। রাজ কাপুরের বরসাত, আওয়ারা খুলনায় বসেই দেখেছিলাম। নার্গিসকে দেখেছিলাম রুশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার ছবি পরদেশিতে। দেখেছিলাম দিলীপ কুমারের আন, দিদার, বৈজয়ন্তীমালার বাহার আর সুরাইয়ার বাজার। দেব আনন্দের ট্যাক্সি ড্রাইভাব আর সোলবা সাল দেখেছি তখনই। শেষোক্ত ছবির নায়িকা ছিলেন ওয়াহিদা রহমান। এই ছবির ‘হ্যায় আপনা দিল তো’ গানটা তখন সবার মুখে মুখে ফিরত। দিলীপকুমার আর দেব আনন্দের যুগল অভিনয়ে সমৃদ্ধ ইনসানিয়াৎ তখনকার হিট ছবি। এছাড়া মধুবালার বহুত দিন হুয়ে আর শিবাজি গণেশনের চন্দ্রলেখা দেখে তো আমার চক্ষু চড়ক গাছ। কী জাঁক রে বাবা!! আন ছবিটা আবার রঙ্গিন। ওই ছবিতে নাদিরার অভিনয়ও মনে রয়ে গেছে। নাদিরা আর গায়ক তালাত মাহমুদের একটা ছবি দেখেছিলাম। নামটা মনে নেই। এছাড়া কিশোরকুমার অশোককুমারের যুগলবন্দি ভাই ভাই বেশ মজাদার ছবি। বম্বের অভিনেত্রী শ্যামা, নিম্মি আর নিরুপা রায়কে খুব ভাল লাগত। ভাল লাগত মতিলাল, ওমপ্রকাশ, মেহমুদ, মুকরি আর ডেভিডকে। এসব ছবি দেখার ফাঁকে পূর্ব পাকিস্তানে নির্মিত ছবিও দেখেছি অনেকগুলো। ষাট দশকের গোড়ায় রহমান-শবনম জুটির হারানো দিন, চান্দা, তালাশ সুপার ডুপার হিট ছবি। এছাড়া সুজাতা-আজিম আর সুচন্দা-রাজ্জাকের অনেক ছবি আমার ভাল লাগত। খান আতাউর রহমানের সিরাজউদ্দৌল্লা খুব ভাল লেগেছিল। জহির রায়হানের কাচের দেওয়াল, বেহুলা, জীবন থেকে নেয়া, সুভাষ দত্তের সুতরাং, কাগজের নৌকা আর আয়না ও অবশিষ্ট কয়েকবার দেখেছি। রূপবান সালাউদ্দীনের এক অপূর্ব নির্মাণ। পাঠক এতক্ষণে আমাকে ইচোড়ে পাকা ভেবে নিয়েছেন নিশ্চয়ই। কিন্তু সত্যি বলতে কী, ওই সময়ে বিনোদন বলতে সিনেমাকেই বুঝতাম আমি। কোনওদিনও খেলাধুলোর ধারেকাছে তেমনভাবে ছিলাম না। একসময় অন্যের দেখাদেখি ক্রিকেট ফুটবল এবং ব্যাডমিন্টন খেলিনি যে তা নয়। লুডো, ক্যারাম, তাস বা টেবিল টেনিসও খেলেছি। কিন্তু কোনটাতেই তেমন মজা পাইনি। সবসময় পিছনের সারিতে থাকতাম বলে আমাকে দলেও নিতে চাইত না কেউ। তাই সিনেমা দেখার মতো নির্ভেজাল দুনিয়ায় মগ্ন থেকেছি অতি কিশোরকাল থেকে। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে সিনেমা দেখতাম। তাছাড়া কিছু বন্ধুদের সৌজন্যে অনেক ছবি দেখেছি। ভাল লাগার আকর্ষণ যাতে তা থেকে কি মুখ ঘুরিয়ে থাকা যায়! ইচ্ছেটাই বড়ো কথা। সুযোগ ঠিকই এসে যায়। পয়সার অভাবে এসব বিনোদন থেকে বঞ্চিত হতে হয় না।

কথা হচ্ছিল প্রথম পাসপোর্ট নিয়ে, চলে এলাম বাল্য বয়সের সিনেমা দেখার সালতামামিতে। আসলে একাকী কলকাতায় এসে সিনেমা জগতের সুলুক সন্ধান নতুন করে পেলাম যেন। ছোট মামার বাড়িতে (উল্টোডাঙ্গা) থাকতাম তখন আর মাঝে মাঝে যেতাম দিদি জামাইবাবু কাছে শোভাবাজারে। সারাদিন ঘুরে বেড়াতাম শ্যামবাজারের সিনেমা পাড়ায়। রাধা, উত্তরা, শ্রী, মিনার, মিত্রা, দর্পণা আর টকি শো হাউস। শেষোক্ত হলে (ফড়িয়াপুকুর) মূলত ইংরেজি ছবিই দেখানো হত। আমার আকর্ষণ অবশ্য বাংলা সিনেমায়। তখনই দেখেছিলাম সুচিত্রা-উত্তমের সপ্তপদী আর সুচিত্রা-সৌমিত্রর সাত পাঁকে বাধা। মাথা প্রায় ঘুরে গিয়েছিল। জুটি হিসেবে উত্তম-সুচিত্রা আমার খুব প্রিয় হলেও দুজনকে আলাদাভাবে আমি মূল্যায়ন করতে চাই। সুচিত্রার সেরা কাজ হারানো সুর থেকে শুরু আর শেষ হয়েছে উত্তরফাল্গুনীতে। আঁধি (১৯৭৪) ছাড়া আগে পরের কয়েকটি ছবি তিনি না করলেও পারতেন। যে যাই বলুন না কেন তিনি কিন্তু অন্তরালে গিয়েছেন অনেক দেরিতে। অনেক আজেবাজে ছবি আছে তাঁর। নামগুলো আর নাইবা লিখলাম। অন্যদিকে উত্তমকুমার অনেকদিন পর্যন্ত তাঁর গ্লামার ধরে রেখেছিলেন। নায়ক তাঁর অন্যতম সেরা কাজ। তাঁর অভিনীত চাঁপাডাঙ্গার বউ, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন বহুদিন মনে থাকবে আমার। সুপ্রিয়ার সঙ্গে তাঁর কেমিস্ট্রিটা কিন্তু সেইভাবে জমেনি। বরং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর অভিনীত নিশিপদ্ম, মৌচাক আর কাল, তুমি আলেয়া মনে থাকবে অনেকদিন। বাদশা ছবির গানগুলো দারুণ। গেয়েছিলেন রাণু মুখোপাধ্যায়।
মেলোড্রামাটিক ছবি আদ্যন্ত। তখনই দেখি মায়ার সংসার, বধূ, শেষ পর্যন্ত, দুই ভাই ইত্যাদি ছবিগুলো। দেখেছিলাম গানে গানে মাতোয়ারা করে দেবার মতো ছবি মণিহার, দেয়া নেয়া ইত্যাদি। অজয় বিশ্বাসের প্রথম প্রেম ছবিতে রাখি বিশ্বাসকে (তখন অজয়বাবুর স্ত্রী) দেখেছিলাম। ওই ছবিতে কিছুক্ষণের জন্যে ফুটবলার চুণি গোস্বামীকেও দেখা যায়। পাশাপাশি উত্তমকুমারে্র সুপার ফ্লপ হিন্দি ছবি ছোটিসি মুলাকাত এবং রাজ কাপুরের হিট ছবি সঙ্গম দেখেছিলাম। এছাড়া শাম্মি কাপুর আর শর্মিলা জুটির হিট ছবি কাশ্মীর কী কলি আর বাসু ভট্টাচার্যের তিসরি কসম দেখি। আর ডি বর্মণের সংগীত সমৃদ্ধ তিসরি কসম ছবিতে শাম্মি কাপুর আর আশা পারেখের ঝলমলে নাচের দৃশ্য দেখি, দেখি একাধিক ছবিতে মোহময়ী হেলেনকে। তারই পাশাপাশি শাম্মি কাপুর অভিনীত জানোয়ার, জংলী, রাজকুমার ছবিও দেখি। দেখি মীনাকুমারী অভিনীত মেরে অপনে ছবিটিও। মধুমতি, দিল দিয়া দর্দ লিয়া দিলীপকুমার অভিনীত একটি হিট ছবি। আর মুঘলে আজম-এর কথা আর কী বলব! চোখ প্রায় ট্যারা হবার যোগাড়। ইংরেজি ছবি যে দু’চারটে দেখিনি, তা নয়। তখনই দেখেছি রোমান হলিডে, সাউন্ড অফ মিউজিক, ক্লিওপেট্রা, বেকেট, গানস অফ নাভারন, লরেন্স অফ আরাবিয়া বা ম্যাকানাজ গোল্ড-এর মতো বিখ্যাত ছবিগুলো। এছাড়া আমার প্রিয় ছবি করিয়েদের একজন হলেন হিচকক। তাঁর সাইকো দেখেছিলাম খুলনায় বসেই। বার্ডস ছবির কথা আজও ভুলিনি। সংলাপ সেইভাবে না বুঝলেও ভাল লেগেছিল ঠিকই।

সত্তরের গোড়ায় এদেশে পাকাপাকিভাবে যখন চলে এলাম তখন আমার সিনেমা দেখার অভ্যেসটা একটু একটু করে বদলাতে শুরু করল। বুঝলাম এতদিন যেসব ছবি দেখেছি তারমধ্যে অজস্র বিনোদনের উপকরণ থাকলেও প্রকৃত শিল্প নেই। অনেক পরে দেখা পথের পাঁচালী থেকেই আমার মনোভাব বদলাতে শুরু করে। অপরাজিত, জলসাঘর, পরশপাথর, তিন কন্যা, মহানগর, চারুলতা, গুগাবাবা দেখলাম। ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি থেকে পালিয়ে, কোমল গান্ধার, সুবর্ণরেখা দেখা হল, দেখলাম মৃণাল সেনের প্রতিনিধি, আকাশকুসুম এবং ভুবন সোম ছবিটিও। তপন সিংহর অনেকগুলো ভাল ছবি করেছেন। তাঁর নির্জন সৈকতে সত্যিই খুবই ভাল ছবি। এছাড়া কাবুলিওয়ালা, ঝিন্দের বন্দী, হাটে বাজারে, আপনজনও বেশ ভাল । আর একজনের কথা না বললেই নয়। তিনি হলেন তরুণ মজুমদার। তাঁর এতটুকু বাসা, নিমন্ত্রণ, ফুলেশ্বরী, পলাতক, দাদার কীর্তি, বালিকা বধূর কথা কোনওদিনও ভুলব না। হাল আমলের গৌতম ঘোষ, উৎপলেন্দু, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আর ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবিও দেখলাম বেশ কয়েকটি। অনেক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন উৎপলেন্দু আর ঋতুপর্ণ। প্রথমজন কোথায় যে হারিয়ে গেলেন! আর অপরজন তো অকালপ্রয়াণের শিকার। ততদিনে ক্রমশ বিনোদনের জগৎ পেরিয়ে আমার মধ্যে শিল্পের অনুসন্ধানের প্রবণতা শুরু হয়েছে। টের পেলাম আমার ভিতরে রুচির পরিবর্তন ঘটছে। এক দাদার সৌজন্যে ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির সদস্য হয়ে অনেক ভাল ভাল বিদেশি ছবি দেখার সৌভাগ্য হল। বুঝলাম সিনেমা হল এক উচ্চাঙ্গের শিল্প। শুরু হল নতুন করে নতুন সিনেমার পাঠ। দেখা হল ফেলিনি, ডি সিকা, কুরুসাওয়া, বার্গম্যান, আন্দ্রেই ওয়াজদা, তারাকভস্কি আর বুনুয়েলের ছবি। মাথা নতুন করে ঘুরে গেল।
কিন্তু সেসব কথা এখানে নয়।