চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৬৭॥ সুশীল সাহা




একজন সাধারণ মহিয়ষী নারীর কথা



অরবিন্দ দাসের ‘মাতৃরূপে রেবতী’ গ্রন্থটি ‘একজন অতি সাধারণ স্বল্প শিক্ষিতা বালবিধবার অসাধারণ হয়ে ওঠার বৃত্তান্ত’,- লেখকের এই স্বীকারোক্তি দিয়েই এই লেখা শুরু করতে চাই। তবে এই গ্রন্থে সেই নারী ও তাঁর পরিবারের কথাই কেবল নয়, লেখকের কলমে সমসাময়িককালের ইতিহাসের কিছু জরুরি তথ্যও পরিবেশিত হয়েছে। সেই নারী, যাঁর পোশাকি নাম রেবতী মালাকারের সত্তর বছরের জীবতকালের সংগ্রাম, দুঃখকে জয় করে তাঁর সুখ ও শান্তির অভিলাষ এবং তাকে পরম মমতায় পরিজনের মধ্যে বিলিয়ে দেবার কথাও অত্যন্ত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখক বিবৃত করেছেন। তাই তাঁর কলমে রেবতী হয়ে উঠেছেন আবহমান কালের বাংলা ও বাঙালির এক চিরন্তন মা, যাঁর কাছে আপন-পরের কোনও ভেদরেখা নেই। নিজ মেধা মনন ও প্রতিভার জোরে তিনি হয়ে ওঠেন সারদাময়ী মা বা মাদার টেরেসার দেশের এক অতি ক্ষুদ্র প্রতিমূর্তি যার মধ্যে প্রতিফলিত বাংলার ঘরে ঘরে লুকিয়ে থাকা আত্মপ্রচারবিমুখ সব অনন্যা নারীরা।
রেবতী জন্মেছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র একটি পরিবারে। পূর্ব বাংলার এক সমৃদ্ধ জনপদ ওড়াকান্দি থেকে উঠে আসা এক দরিদ্র ঘরে জন্ম নেয়া এই কন্যার বিবাহ হয়েছিল তাঁর মাত্র ন’বছর বয়সে। ওই বয়সের একটি মেয়ে যার মধ্যে কোনওমতেই গৃহস্থ হয়ে ওঠার কোনও লক্ষণই দেখা দেয়নি, সেই মানুষটাই বিয়ের মাত্র দু’বছরের মাথায় স্বামীকে হারায়। তারপর তাঁর ঠাঁই হয় ভাইয়ের সংসারে। এই আখ্যানের শুরু সেখান থেকেই। ভাই অমৃতর বেঁচে থাকা দুই পুত্র অমিয় ও আনন্দকে ঘিরে শুরু হয় রেবতীর নতুন জীবন। আনন্দকে অকালে জন্ম দিয়েই তার মা প্রয়াত হন। আট মাসে প্রসবের এই অপুষ্ট সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে প্রবল মাতৃস্নেহে রেবতী তাকে এক নতুন জীবন দান করেন এবং নিজেও জড়িয়ে পড়েন সংসারের এক জটিল জটাজালে। কিন্তু সেই জটাজাল তাঁকে দমিত না করে নতুন এক জীবনবোধে উদ্দীপিত করেছিল, যার ফলশ্রুতিতে ওই বয়সেই তিনি লেখাপড়ার মধ্যে নিজেকে সঁপে দেন। কাজটি তেমন সহজসাধ্য ছিল না। তবে ওড়াকান্দি গ্রামের আর্থসামাজিক পটভূমি তাঁকে শিক্ষিত হতে সাহায্য করে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর বেশিদূর এগোয়নি। বরং সামান্য কিছু জ্ঞানার্জনের পর তিনি ধাত্রীবিদ্যায় নিজেকে পারঙ্গম করে তোলেন।
প্রসঙ্গত ওড়াকান্দি গ্রামটি সম্পর্কে দু’চারটি কথা বলা দরকার। কেননা এই সমৃদ্ধ জনপদে ছিলেন বলেই রেবতীর জীবনধারা তৎকালীন সমাজের আর দশজন বিধবার মত থোর বড়ি খাড়ার প্রবাহে ভেসে যায়নি। তবে তার মধ্যেও কোথাও যেন এক প্রথাবিরোধী মনোভাব বাসা বুনেছিল, সঙ্গে ছিল অদম্য ইচ্ছাশক্তি। তারই জোরে তিনি অনেক প্রতিকূলতাকে জয় করেছিলেন। একথা সর্বজনবিদিত যে, ওড়াকান্দি ছিল হরিচাঁদ প্রবর্তিত ‘মতুয়া’ সম্প্রদায়ের পীঠস্থান। হরিচাঁদ (১৮১২) দরিদ্র তথা নিম্নবর্গের মানুষদের প্রতি তথাকথিত উচ্চবর্ণের বঞ্চনা ও ঘৃণার প্রতিবাদে ‘মতুয়া’ নামে একটি পৃথক ধর্ম সম্প্রদায়ের আন্দোলন প্রবর্তন করেন। হরিচাঁদের চিন্তা চেতনায় নারীর মর্যাদা বিশেষভাবে স্থান পেয়েছিল। হরিচাঁদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে বহু দলিত মানুষকে তাঁর অনুগামী করে তোলেন। তাঁর ভাবনার মধ্যে সকলের জন্যে শিক্ষাবিস্তার একটি বড় জায়গা করে নেয়। এতে তিনি একজন অস্ট্রেলীয় ধর্মযাজক ডা. সি এস মিড সাহেবের সাহায্য পান। মিড সাহেব ওই গ্রামকেই বেছে নিয়েছিলেন তাঁর সেবামূলক কাজের জন্যে। লক্ষনীয় বিষয় যে, মিড সাহেবের সেবামূলক কাজে সাহায্য নিতে এই ‘মতুয়া’ সম্প্রদায়ের মানুষদের ধর্মান্তরিত হতে হয়নি। অন্যদিকে মিড সাহেবের চিন্তা চেতনার মধ্যে মানুষের সেবা করাই প্রাধান্য পায়। এ হেন অনুকূল পরিবেশে রেবতীর মত একজন অতি সাধারণ বাঙালি রমণী নিজেকে তৈরি করার সুযোগ গ্রহণ করেন। তাঁর এই শিক্ষাগ্রহণ সম্পর্কে লেখক জানাচ্ছেন, “ঠিক কোন ক্লাস পর্যন্ত রেবতী পড়াশুনা করতে পেরেছিল তা জানতে পারিনি। তবে ইংরেজি লিখতে পড়তে পারত…সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার জন্যে পড়াশুনা বন্ধ করে তাড়াতাড়ি কাজ পাবার আশায় ওড়াকান্দির মিশন হেলথ ওয়েলফেয়ার পরিচালিত মিডওয়াইফারি ট্রেনিং-এ ভর্তি হয়…১৯৪৪ সালে এই ট্রেনিং সেন্টার থেকে একটি কোর্স শেষ করে। “ এছাড়া তিনি অর্জন করেছিলেন ‘চাইল্ড ওয়েলফেয়ার ক্লিনিকের শংসাপত্র। মিশন প্রদত্ত এই শংশাপত্রগুলি সরকার কর্তৃক স্বীকৃত ছিল, তাই রেবতীর পক্ষে সরকারি কাজ পাওয়া সহজ হয়েছিল। বস্তুত তিনি ১৯৪৫ সালের নভেম্বরেই সহকারি নার্স হিসেবে মেদিনীপুরের বালিসাই অনাথ আশ্রমে যোগ দেন। শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন।
এই অনাথ আশ্রমের আবাসিকরা অসুস্থ হলে তাদের সেবা করার জন্যে একটা মেডিকেল ইউনিট তৈরি হয়। এতে একজন ডাক্তার, মেট্রন কাম নার্স, কম্পাউন্ডার, ও সহকারি নার্স ছিলেন। রেবতী এই ইউনিটেই টানা ১৪ বছর কাজ করেন। এই ১৪ বছর তাঁর জীবনে এক স্মরণীয় কালখণ্ড। ওদিকে যে দাস পরিবারের সঙ্গে তাঁর এক অচ্ছেদ্য বন্ধন ভবিষ্যতে তৈরি হবে, তাঁরা পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম বাংলায় চলে আসেন ইতোমধ্যে। এই গ্রন্থের প্রধান অথচ একেবারেই অপ্রধান চরিত্র হিসেবে যাকে চিত্রিত করেছেন লেখক সেই আনন্দর পিতা অমৃতলাল দাদা শীতলচন্দ্রের সহায়তায় চিত্তরঞ্জন রেল কারখানা কেন্দ্রীক শহরের ‘আমলাদহি’ বাজারে একটি মুদি দোকান খোলেন। প্রথম পুত্র সন্তান অমিয়কে তাঁরা নানা কারণে সেইভাবে দেখভাল করতে পারছিলেন না। এমন সময় তাঁদের অনুরোধে অমিয়কে মানুষ করার দায়িত্ব রেবতী নেন। ইতঃমধ্যে অনাথ আশ্রমের শিশুদের দেখাশোনা করতে করতে রেবতীর মধ্যে সুপ্ত মাতৃত্ব জেগে উঠেছিল। শুরু হয় দুরন্ত অমিয়কে নিয়ে রেবতীর এক নতুন জীবন। ওদিকে অমিয়র মা কৈকেয়ী ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়েও একাধিক সন্তানের জন্ম দেয়, তারা কেউই বাঁচেনি। অবশেষে পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে আনন্দকে জন্ম দিয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্মানো অপুষ্ট আনন্দকে মানুষ করার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন রেবতী। শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। স্বাধীনতা উত্তর সেই দুঃসময়ে স্বল্পবেতনভূক রেবতী বহু কষ্টে আনন্দকে মানুষ করে তোলেন। এ এক চিরন্তন বাঙালি বালবিধবার আত্মত্যাগের কাহিনি যাঁদের কথা ইতিহাসে লেখা থাকে না, লিখিত হয় মানুষের হৃদয়ে। সময়ের চিহ্ন বহন করে সেই ইতিহাস চোখের জলের ধারায় মুছেও যায় একসময়।
এই গ্রন্থ আনন্দ ও রেবতীর মাতাপুত্রের সম্পর্কের সূত্র ধরে একটি মনোজ্ঞ আখ্যান হতেই পারত। কিন্তু লেখক একে জনরুচির প্রসাদধন্য না করে সমসাময়িক ইতিহাস ও উল্লেখযোগ্য নানা ঘটনাবলীর দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। এইসব তথ্যাবলীর মধ্যে মাঝে মাঝেই উঁকি মেরেছে রেবতীর জীবন সংগ্রামের নানা পর্ব। লেখক অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আখ্যানমূলক বিন্যাসের পথ পরিহার করেছেন। তাই রেবতীর জীবন বৃত্তান্তের পাশাপাশি আমরা গত শতাব্দীর একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার তথা দেশ ও কালের একটি মনোজ্ঞ বিবরণ পেয়ে যাই। লেখক অরবিন্দ দাস অত্যন্ত সংযমের সঙ্গে টুকরো টুকরো ঘটনাবলীকে একত্রগ্রথিত করেছেন। আমরা উপন্যাস পাঠের স্বাদ নিতে নিতে ঘুরে আসি গত শতাব্দীর নানা অলিন্দে যার পরতে পরতে মিশে আছে ব্রিটিশ যুগের শেষ পর্ব তথা স্বাধীনতা দেশভাগ ও ভিটেমাটি থেকে উন্মূল মানুষের কঠিন সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। লেখকের বর্ণনায় এক আশ্চর্য সংযম ও নিরপেক্ষতা কাজ করে যা এই গ্রন্থের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
প্রখ্যাত একজন ঐতিহাসিক এক ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ইতিহাসে ন্যায়বিচার বলে কিছু নেই’। কথাটা যে কতখানি সত্যি সেটি মর্মে মর্মে অনুইভব করেছি এই গ্রন্থের শেষ পর্বে এসে। তাঁর মধ্যে ছিল এক অসাধারণ মাতৃত্ব, যার ছত্রছায়ায় অমিয় এবং আনন্দই কেবল নয় আরো অনেকেই লালিত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর সমস্ত আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল এই দুই ভাই অমিয় ও আনন্দ, বিশেষ করে আনন্দ। আসলে আনন্দ তো নিজের মায়ের সঙ্গ কোনওভাবেই পায় নি। জন্ম থেকেই সে রেবতীকেই মা বলে জেনে এসেছে। তাঁর স্নেহচ্ছায়ায় সে বড় হয়েছে। পৃথিবীর আলো বাতাস রূপ রস গন্ধ ও স্পর্শধন্য হয়েছে। তাই রেবতীই তাঁর মা এবং তার সমস্ত ভুবন জুড়ে এই অপরিসীম আনন্দময়ী মা। তাই এই গ্রন্থের মূল আকর্ষণ আনন্দর বড় হয়ে ওঠা, তার জীবন সংগ্রাম। সেইসঙ্গে তাঁকে যিনি পুনর্জীবন দিয়েছেন সেই রেবতীর একজন সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠার সংগ্রাম এখানে অনেকটা জায়গা করে নিয়েছে। সেখানে অবশ্যই প্রাধান্য পেয়েছে সেই সময়কার কিছু উল্লেখ্য ঘটনা। ইতিহাস পরিক্রমার সেই পথ ধরে গ্রন্থের আখ্যানভাগ এগিয়েছে। সেইসব ঘটনাবলীর সঙ্গে চমৎকারভাবে বিধৃত হয়েছে একজন বালবিধবার এক অসম লড়াইয়ের গল্প।
নিছক জীবনীচিত্র রচনা লেখকের উদ্দেশ্য ছিল না, বোঝাই যায়। তবে নানারকম ঘটনাবিন্যাসের পথ ধরে একজন অতি সাধারণ নারীর জীবনবৃত্তান্ত এই গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য হয়ে ওঠে শেষ পর্যন্ত। লেখকের চাওয়া না চাওয়ার জন্যেও অপেক্ষা করে থাকেনি সচেতন পাঠক। তাদের মনোজগৎ জুড়ে এক বিপুল প্রচ্ছায়া ফেলেছে ইতিহাসে উপেক্ষিতা এক নারী। লেখকের মুন্সিয়ানা সেখানেই। নানা ঘটনা আর দুর্ঘটনার জাল ছিন্ন করে রেবতী মালাকার নামের এক অখ্যাত বিধবা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেয়। অনেকটা ওরাল হিস্ট্রির আদলে রচিত হয়ে যায় অরবিন্দ দাসের এইসব বিবৃতি যা পরিশেষে এক মর্মস্পর্শী আখ্যানের জন্ম দেয়। বাংলার ঘরে ঘরে এমন আত্মত্যাগী ও পরার্থে নিবেদিত অসংখ্য মানুষ আজও আছেন। তাঁরাও যদি এমন একজন জীবনবাদী লেখকের কলমে উঠে আসেন তাতে সাহিত্যের একনতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।