চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৬৮॥ সুশীল সাহা




আমার গান শেখা


ছোটবেলা থেকেই গান ভালবাসতাম। বাড়িতে বেশ ভাল একটা গানের পরিবেশ ছিল। গ্রামোফোনে নানারকম গান শুনতাম। আর রেডিওতে গান শোনা প্রায় অভ্যেসে দাঁড়িয়েছিল। বাড়তি একটা ব্যাপার ছিল বাড়ির কাছের এক সিনেমা হলের লাউড স্পিকারের গান শোনা। তখনকার দিনে আমাদের খুলনার ওই ‘উল্লাসিনী’ সিনেমা হলে শো শুরু হবার আগে বেশ কিছুক্ষণ ওদের লাউড স্পিকারে গান বাজত। সেইসব গান মূলত তখনকার বাজারচালু অর্থাৎ জনপ্রিয়। সেগুলো শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে যেত। তাছাড়া বাড়িতে মাঝে মাঝেই ঘরোয়া অনুষ্ঠান হত। তাতে গলা ছেড়ে গান গাইতাম আমরা। কখনও কোরাসে, কখনওবা একা। তবে সেই বয়সে আলাদাভাবে গান শেখার ব্যাপারটা হয়ে ওঠেনি। তখন দেখতাম কোনও কোনও বাড়ির উদ্যোগে কেবলমাত্র মেয়েরাই গান শিখত। হয়ত বিয়ের বাজারে দর বাড়াবার জন্যে ওসব হত। একটু বড় হয়ে যখন কলেজে ঢুকেছি তখন কিন্তু আমার মধ্যে গান শেখার একটা প্রবল ঝোঁক এসেছিল। তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। অনেকগুলো ভাই-বোনের সংসারে পড়াশুনোর বাইরে অন্য কিছু শিখবার সুযোগ মেলেনি। বিকেলের দিকে মাঝে মাঝে ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টন খেলেছি। কলেজের কমনরুমে মাঝে মাঝে টেবল টেনিসও খেলেছি। কিন্তু গান শেখার ব্যাপারটা মনের মধ্যেই রয়ে গেছে। তবে অল্প বিদ্যা নিয়ে নানা জায়গায় কখনও কখনও গানের দলে গলা মিলিয়েছি।

আমার জ্যাঠামশাই গানের লোক ছিলেন। গ্রামে গ্রামান্তরে নানারকম যাত্রাদলে তিনি গানের নেপথ্যশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন। নানারকম বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। সংগীতের অনুপ্রেরণা হয়ত পরোক্ষভাবে তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। তবে গানের প্রতি আমার এক স্বভাবজাত আকর্ষণ বরাবর ছিল। ছোটবেলা থেকেই আমি হারমোনিয়াম বাজাতে পারতাম। তাই সুযোগ পেলে ওতে গানের সুর তুলতাম। অবিরত বাজাতে বাজাতে একধরনের আনাড়ি দক্ষতাও অর্জন করেছিলাম ওই বয়সেই। তাই গান আমার সত্তায় মিশে থাকল একটু অন্যরকমভাবে, নাড়া বেঁধে শেখার সুযোগ নাইবা হল!
আসলে চাকরি পাবার (১৯৭৩) পরে সেইভাবে শেখার কথা ভাববার সুযোগ পেলাম। কার কাছে যাব, কার কাছে যাব, এসব ভাবতে ভাবতেই বছর চারেক কেটে গেল। অফিসের এক বন্ধুর মামার সুবাদে অবশেষে এক গানের গুরুর সন্ধান পেলাম। তিনি আমাকে নিয়ে যাবেন বালিগঞ্জ প্লেসে মায়া সেনের কাছে। মায়া সেন! নামটা শুনেই, মহিলার কাছে গান শিখব ভেবে প্রথমে একটু কুঁকড়ে গিয়েছিলাম। ভিতর থেকে কেমন একটা বাধা কাজ করছিল। কিন্তু পরে যখন জানলাম শিক্ষক হিসেবে মায়া সেন তখন কলকাতার সেরাদের একজন, তখন সব সংস্কার ভেঙ্গে ওঁর কাছে যাবার জন্যে তৈরি হলাম।

সেটা ১৯৭৭ সাল। মনে আছে জুলাই মাসের এক বিকেলে আমার সেই সহকর্মীর মামার সঙ্গে গেলাম বালিগঞ্জ প্লেসে মায়া সেনের বাড়িতে। তিনি তখন একদল ছাত্র ছাত্রীদের শেখাচ্ছিলেন। আমরা বাইরে অপেক্ষা করতে থাকলাম। ক্লাস শেষ হলে ওঁর কাছে গেলাম। আমার কথা আগেই বলে রাখা হয়েছিল বলে বেশি কথা হল না। আমি ওঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। প্রত্যেক মঙ্গলবার সন্ধ্যে সাতটা থেকে আটটা পর্যন্ত ক্লাস। অফিস ছুটি পাঁচটায়। থিয়েটার রোড থেকে বালিগঞ্জ প্লেসে আসতে বড়ো জোর আধ ঘন্টা। বাকি সময়টা শুধু অপেক্ষা। এদিক ওদিক ঘোরা কিংবা অন্য কাজ করা। বেশিরভাগ দিন অফিস থেকে বেরোতামই দেরি করে। দীর্ঘলালিত ইচ্ছেকে বাস্তবায়িত করতে এটুকু তো স্বীকার করে নিতেই হবে। শুরু হল এইভাবেই।
প্রথম দিন ক্লাসে গিয়ে দেখি পনেরো ষোলজনের মধ্যে আমাকে নিয়ে মাত্র চারজন ছেলে। বাকিরা সব অল্পবয়েসি কয়েকটা মেয়ে। আমার বয়সও তখন খুব বেশি নয়, তিরিশ। প্রথম দিনেই যে গানটা শিখলাম সেটা হল, ‘আজ শ্রাবণঘন গহন মোহে’। দিনটাও ছিল বর্ষণমুখরিত। তাই গান আর বাইরের প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। ক্লাস থেকে বেরিয়ে একজনকে সঙ্গী হিসেবে পেলাম। তার নাম তপন, থাকে নৈহাটিতে। পেশায় ব্যাঙ্কার। ওর পরামর্শে বালিগঞ্জ থেকে ট্রেন ধরে শিয়ালদা অব্দি এলাম। তারপর দীর্ঘ দেড় ঘন্টার পথ বেয়ে হাবরার বাড়িতে ফেরা। তপনের কাছে ভিতরকার নানারকম গল্প শুনলাম। মফস্বলের হাবাগোবা ছেলের মাথায় তখন সেসব ভাল করে ঢোকেনি। এইভাবে চলতে চলতে তিন/চার বছর যে কীভাবে কেটে গেল, বুঝতেই পারিনি।

গানের ক্লাস করতে করতে মায়া সেন কখন যে আমাদের মায়াদি হয়ে গেছেন, মনে নেই। প্রতি সপ্তাহে একটা করে গান শেখা। কোনও কোনও গান শেখা হয় দু’সপ্তাহ ধরে। আমরা শিখি সমবেতভাবে। মায়াদির ক্লাস করতে গিয়ে টের পেয়েছিলাম সমবেতভাবে গান গাওয়া খুব কঠিন ব্যাপার। সামান্য বেসুরো হলেই কানে বাজে। মায়াদির নজর এড়িয়ে শুধুমাত্র ঠোঁট নাড়াও সম্ভব ছিল না। তাই যতক্ষণ ক্লাসে থাকতাম, অত্যন্ত সতর্ক হয়ে গানটা গাইতে চেষ্টা করতাম। মায়াদি মাঝে মাঝেই আলাদাভাবে আমাদের কাউকে কাউকে শেখানো গান গাইতে বলতেন। ভুল ধরিয়ে দিতেন। আমি নিজেও অনেকদিন এককভাবে গান গেয়ে অনেক বকা খেয়েছি। অনেক ভুল শুধরে নিয়েছি। কীভাবে কোন গান গাইতে হয়, অত্যন্ত সহজভাবে বুঝিয়ে দিতেন। আজ বুঝি তাঁর গান শেখানো ছিল সত্যিই অন্যরকম। গান শিখতে শিখতে বুঝতাম কেন তাঁকে সংগীতগুরু হিসেবে সবাই অত মান্যতা দেয়। আমাকে যখনই কেউ জিজ্ঞেস করত, কার কাছে গান শিখি- তাঁদের সেই প্রশ্নের জবাবে মায়াদির নামোচ্চারণ করতেই দেখতাম প্রশ্নকারীর চোখেমুখে এক ধরনের সম্ভ্রম। বুঝতে পারতাম গান কতটা শিখতে পেরেছি জানি না, কিন্তু প্রথম সুযোগেই একজন সেরা শিক্ষককে পেয়েছি।

মায়াদির পাশের বাড়িতেই থাকতেন বিখ্যাত গায়িকা রুমা গুহঠাকুরতা। ওখানেই হত ক্যালকাটা ইউথ ক্যয়ারের গানের মহড়া। মায়াদি গান শেখানোর সময় জানালা বন্ধ করে দিতেন। প্রায়শই যে সমবেত কণ্ঠধ্বনি ভেসে আসত! আমি ওই গান শোনার জন্যে অনেকদিন আগে এসে বাইরে থেকে ওঁদের গান শুনতাম। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। এছাড়া খুব কাছাকাছি থাকতেন বিশ্ববিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্কর। ওখান দিয়ে যাতায়াতের পথে দু’দিন আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁকে দেখার।

মায়াদির ক্লাসে একদিন হঠাৎ করে এসেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সংগীত জগতের কত মানুষজন ওঁর কাছে আসতেন! সবাইকে চিনতাম না। তবে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ওঁদের সঙ্গে কথা বলতেন না মায়াদি। একদিন ওখানে গিয়েই শুনলাম সেদিন আমাদের ক্লাস নেবেন স্বনামখ্যাত দেবব্রত বিশ্বাস। আমরা তো যেন হাতে চাঁদ পেলাম। সেদিনের সেই এক ঘন্টা ক্লাসের কথা কোনও দিন ভুলব না। সেদিনের গানটা ছিল ‘শ্রাবণের পবনে আকুল বিষণ্ণ সন্ধ্যায়’। ওই ক্লাসে একটা কথাও বলেননি মায়াদি। তবে গান শেখানোর পরে দেবব্রত বিশ্বাস যখন বললেন, ‘এতক্ষণ যেভাবে শেখালাম সেটা তোমাদের ওই স্বরলিপির বিধান মেনে, তবে আমি কিন্তু গানটা যখন গাইব, সেটা কিন্তু একটু অন্যরকম’। সেই অন্যরকম গানটা যখন তিনি গাইতে শুরু করলেন, তখনই মায়াদি হা হা রবে তাঁকে বাধা দিলেন। বললেন, উনি যেভাবে শিখিয়েছেন সেভাবেই তোমরা গাইবে, একেবারে অন্যভাবে নয়। খুব মজা পেয়েছিলাম সেদিন।

একবার মধ্যমগ্রামের কাছে বাদুতে আমাদের পিকনিক হল। সেদিন প্রায় শতাধিক ছেলেমেয়েরা এসেছিল। অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল সেদিন। খুব ভাল লেগেছিল মায়াদির জীবনসঙ্গী ত্রিদিব সেনকে। কথায় কথায় জেনেছিলাম তাঁর আদিবাড়ি খুলনায়। সেদিন তাঁর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ খুলনার ভাষায় কথা বলে খুব মজা পেয়েছিলাম। সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছিলাম। কে যেন আমার পাতে একটু বেশি মুরগির মাংস দিয়ে গিয়েছিল আমার আপত্তি থাকা সত্বেও। খাবার অনেকটাই নষ্ট হয়েছিল। মায়াদি আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘হাবরার ঘরাণা তো দেখছি বেশি ভাল নয়’। মজা করার জন্যে বললেও আমি খুব লজ্জা পেয়েছিলাম সেদিন। অবশ্য ত্রিদিবদা হৈ হৈ করে পুরো পরিবেশটাকে সহজ করে দিয়েছিলেন।
মায়াদি বছরে একবার বসন্তোৎসব করতেন। সুচয়িত সেইসব গান আর নাচের কথা কোনওদিন ভুলব না। কীভাবে যেন আমার নাচ জানার কথা ক্লাসে রটে গিয়েছিল। মায়াদি একদিন আমার নাচও দেখলেন। খুব খুশি হয়ে একটি ছোট্ট মেয়েকে ‘ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে’ গানের সঙ্গে নাচ শিখিয়ে দেবার জন্যে আমাকে বললেন। সেই মেয়েটি তখন এক সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করে বেশ নাম করেছে। রামকৃষ্ণ সেবাসদনের কাছে ওঁদের বাড়িতে দু’তিন দিন গেছি নাচ শেখাতে।

এভাবেই চলছিল। কীভাবে তিন/চারটে বছর কেটে গেছে, টের পাইনি। একদিন ক্লাসে গিয়ে শুনলাম পরের মাস থেকে টানা ছ’মাস মায়াদি লণ্ডনে থাকবেন ওঁর ভাইয়ের কাছে। চিকিৎসা ইত্যাদি ছাড়াও আরো যেন কীসব কাজ ছিল! ওঁর ক্লাসগুলো নেবেন অন্য শিল্পীরা। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন অর্ঘ্য সেন। তাঁর ক্লাসে একদিন মাত্র গিয়েছিলাম। তাছাড়া যাঁদের সঙ্গে একসঙ্গে শিখতাম তাদের পাইনি সেদিন। কেমন যেন মন খারাপ হয়ে গেল। আমার গান শেখায় একটা ছেদ পড়ল। ছ’মাস পরে মায়াদি ফিরে এলে একদিন অবশ্য দেখা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ততদিনে মনের মধ্যে অন্যসব ভাবনা উঁকি মারতে শুরু করেছে। তখন মাথায় ঢুকেছিল, গলা তেমন ভাল না হলে গানের জগতে নাম করা যাবে না। তাছাড়া মাথায় তখন সাহিত্যের পোকা কিলবিল করছে। আমার গান শেখা বন্ধ হয়ে গেল। এইভাবেই তো পল্লবগ্রাহীতা করে আমার পক্ষে কোনও কিছুই তেমনভাবে শেখা হয়নি।

আর কারো কাছে নাড়া গান শিখতে যাইনি ঠিকই। তবে মায়াদির কাছে যেটুকু শিখেছি সেটুকুকেই সম্বল করে রবীন্দ্রসংগীতকে প্রবল ভালবেসেছি। গীতবিতানকে করেছি জীবনের পরম আশ্রয়। গান শোনার অভ্যেসটা দিনদিন বেড়েছে। ভাল গাওয়া মন্দ গাওয়ার তফাৎ বুঝতে পারি অন্তত। সেদিন বুঝিনি, আজ বুঝি সবাই গায়ক হয় না। গান ভালবেসে গানের মধ্যে আত্মমুক্তির এক পথের সন্ধান মেলে। সেটাও কিন্তু কম নয়। ভাল গান, মন্দ গানের তফাৎটা অন্তত বুঝি আজ। এও ওই মায়াদির আশীর্বাদ। খুব বেশি রেকর্ড করেননি তিনি। তবু যে ক’টা রেকর্ড আছে সেগুলো শুনলেই বোঝা যাবে কী উঁচুদরের ছিল তাঁর গায়নগঙ্গি! শেষদিকে তাঁর গলা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। গান শেখাতেও খুব কষ্ট হত তাঁর। তবে ক্লাস ফাঁকি দিতেন না। গানের ফাঁকে ফাঁকে যে কথাগুলো বলতেন তা সত্যি অনন্য। একদিন এক ক্লাসে আমাকে গাইতে হয়েছিল সদ্যশেখা গান ‘পুরানো জানিয়া চেওনা আমারে’। অনেক বড় গান। খুব সন্তর্পনে সেদিন পুরো গানটা গেয়েছিলাম। গানশেষে তিনি যে কথাগুলো বলেছিলেন তা আজও আমার কানে বাজে।
এইটুকু এই জীবনে মায়াদির সামান্য আশীর্বাদধন্য যে হতে পেরেছিলাম তাতেই আমার পরমানন্দ।