চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৬৯॥ সুশীল সাহা




রবীন্দ্র শতবার্ষিকীর উদযাপন : প্রেক্ষিত পূর্ববঙ্গের মফস্বল শহর সিলেট

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী উদযাপনের কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। বিশেষ করে ভারতে তথা কলকাতায় তাঁকে নিয়ে যে বিপুল আয়োজন হয়েছিল, এককথায় তা অবিস্মরণীয়। সুলভ মূল্যে রচনাবলী প্রকাশ শুধু নয়, অজস্র অনুষ্ঠানের পাশাপাশি রবীন্দ্র সদন নির্মাণসহ রবীন্দ্রনাথের অনেক গান নাটক নৃত্যনাট্যের রেকর্ড ও গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। এইসবই হয়েছিল একান্তভাবে অনুকূল পরিবেশে। প্রতিবেশী পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসন। অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থা। তবু ওরই মধ্যে সারা বাংলাদেশে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে পালিত হয় রবীন্দ্র শতবার্ষিকী। বলাবাহুল্য সরকারি নয়, একেবারেই বেসরকারি উদ্যোগে। সামরিক কর্তাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেই সেদিন পূর্ব বাংলার মানুষ তাঁদের প্রাণের অর্ঘ্য নিবেদন করেছিলেন। তবে এ ব্যাপারে যতটা মহানগর ঢাকা শহরের উদযাপনের কথা জানা যায়, তার বাইরে মফস্বলের ততটা নয়। গল্পের দুয়োরানির মতো বেশ খানিকটা উপেক্ষিতই থেকে গেছে সেইসব আয়োজনের কথা।

অতি সম্প্রতি আমার হাতে এসেছে সিলেট শহরে রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনের স্মরণিকা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা ১৩৬৮ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৯৬২ সালে। সম্পাদনা করেছিলেন মুকুন্দ ভট্টাচার্য। প্রকাশিত হয়েছিল সিলেটের মেডিকেল স্কুল মিলনায়তনে ১৯৬১ সালের ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৭ মে আয়োজিত অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। আমার কাছে এসেছে এটির দ্বিতীয় মুদ্রণ যা সম্পাদনা করেছেন রফিকুর রহমান লজু। প্রকাশিত হয় ১৪০২ বঙ্গাব্দে (ইংরেজি ১৯৯৫ সালে)।

এটির শুরুতেই অধ্যাপক আবুল বশর লিখেছেন, ‘কবি রবীন্দ্রনাথের জন্মের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ১৯৬১ সালে পৃথিবীব্যাপী রবীন্দ্র জন্মোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এসময় অত্যন্ত সাড়ম্বরে সিলেটেও কবির জন্মোৎসব পালিত হয়েছিল। ১৪-১৭ মে’ চারদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে সিলেটবাসী কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জগদ্দল সামরিক শাসন ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর রবীন্দ্র বিরোধিতার মধ্যেও সাহিত্য ও সংস্কৃতিসেবী সুধীমহল অত্যন্ত সফলভাবে এই অনুষ্ঠান সমাপন করেন। বাংলাভাষা ও রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রতি সিলেটবাসীর যে ভালোবাসা তারই প্রতিফলন ঘটেছে এই বড় মাপের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে।

উৎসবের সফল সমাপ্তি শেষে একখানি স্মারক পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। স্মরণিকা- শীর্ষক এই স্মারক পুস্তিকায় উৎসবের বিবরণ এবং সুণী সুধীবৃন্দের ভাষণ প্রভৃতি ছিল। স্মরণিকাখানি এখন দুষ্প্রাপ্য। ৩৪ বছর আগের সেদিনের জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠান আজ নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস হয়ে আছে। সিলেটবাসীর গর্ব সে ইতিহাস বুকে ধারণ করে আছে স্মারক পুস্তিকাটি। সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্দোলন ও কর্মকাণ্ডের স্বাক্ষর রয়েছে এই পুস্তিকায়। বস্তুত স্মরণিকাখানি কালের সাক্ষী হয়ে আছে। রফিকুর রহমান লজু কবির শততম জন্মোৎসবের স্মারক পুস্তিকা স্মরণিকাটি পুনর্মুদ্রণ করে পাঠকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন জেনে আমি আনন্দিত। এই উদ্যোগকে আমি সাধুবাদ জানাই। নতুন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্মরণিকাটি পেলে উপকৃত হবে, প্রেরণা পাবে– এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।’ (সিলেট ২০ বৈশাখ ১৪০২, ৩ মে ১৯৯৫)

সংকলনটির পুনর্মুদ্রণ প্রসঙ্গে সম্পাদক লিখেছেন, “ ‘স্মরণিকা’খানি আজ দুষ্প্রাপ্য। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই জানা নেই যে সিলেটে রবীন্দ্রনাথের শততম জন্মবার্ষিকী বিপুল সমারোহে উদযাপিত হয়েছিল। শতবর্ষ-উৎসবের উদ্যোক্তাদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই।…মূল কমিটির দুজন মাত্র বেঁচে আছেন। কমিটির বাকী দশজনই আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। তাঁদের সাহসী অমর কীর্তি ধরে রেখেছে এই স্মারকগ্রন্থটি।”

স্মরণিকাটির সূচিক্রম বেশ আকর্ষণীয়। প্রথমেই রয়েছে কবিতা বেগম সুফিয়া কামালের ‘হে কবি! জয়তু, জয় জয়’। তারপর মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের একটি ছোট লেখা। ‘সিলেটে বিশ্বকবি’ শীর্ষক একটি লেখা আছে যা মূলত সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহের ‘শ্রীহট্টে রবীন্দ্রনাথ’ নামীয় প্রবন্ধের সারাসৎসার। স্মরণিকা প্রসঙ্গে লিখেছেন সয়ফুল আলম খান। মূদ্রিত হয়েছে অনুষ্ঠানের সভানেত্রীর ভাষণ। এছাড়া উপস্থিত সুধীবৃন্দরা যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা থেকে তিন বিশিষ্টজনের ভাষণ এতে মুদ্রিত হয়েছে। এঁরা হলেন– কাজী মোতাহের হোসেন, গোবিন্দচন্দ্র দেব ও তারোজি ইয়ামামোতো। এছাড়া ওখানকার শতবার্ষিকী কমিটির বিস্তৃত নামোল্লেখসহ আছে চারদিনের অনুষ্ঠানলিপি। শেষ হয়েছে ছোট্ট একটি সম্পাদকীয় দিয়ে। মাত্র ৩২ পাতার এই স্মরণিকাটি সিলেটের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক অনন্য উপাদান হিসেবেই আমি গণ্য করতে চাই।
চারদিনব্যাপী ওই অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভানেত্রী ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল। তাঁর উদ্বোধনী ভাষণটি এই স্মরণিকায় হুবহু ছাপা হয়েছে। দু’পাতা জোড়া এই লেখার এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, “বঙ্গোপসাগর থেকে আরব সাগরের তীরে দাঁড়ালেই আমার রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। উদয় থেকে অস্তরবির আভায় রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। ঋতু ঋতুতে যে তৃণতরুলতা বর্ণাঢ্যরূপে চোখে পড়ে সেখানে কবির বাণী শোকে দুঃখে আনন্দে অন্তরে যে সুর ভেসে উঠে সে রবীন্দ্রনাথের আত্মসমর্থনের নরম প্রশান্তি। বিরাট বিশাল অন্তহীন লীলা দিগন্তে হারানো সিন্ধু, অসংখ্য তারকা, অফুরন্ত উর্মিমালা।” (পৃষ্ঠা ১০-১১)।

মুহম্মদ আবদুল হাই লিখেছেন, “…তিনি দেশ কাল যুগ ও জাতি বিশেষের হয়েও বিশ্ব সভ্যতার এমন বিস্ময়কর চিরন্তন আশীর্বাদ স্বরূপ।”

ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “…রবীন্দ্রনাথ কোন বিশেষ দেশ বা গণ্ডীর দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। তিনি সর্বদেশের সর্বকালের ও সর্বজাতির। তাঁর সাধনাকে বাস্তবে রূপদানের চেষ্টাই হবে আমাদের তাঁর প্রতি সত্যিকারের সম্মান প্রদর্শন।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামখ্যাত অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র দেব অসামান্য একটি দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন যা ওই স্মারকপত্রে মুদ্রিত হয়। এটি সেদিনের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ভাষণ। তিনি সেদিন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন, “…রবীন্দ্র প্রতিভার বড় কথাই সামঞ্জস্য। কবি তাঁর প্রাচীন সাহিত্যে এক জায়গায় বলেছেন– ধর্মের অর্থই সামঞ্জস্য। ধর্মের এই লক্ষণ মোটামুটি সর্বজন স্বীকৃত। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা চলে– রবীন্দ্র সাহিত্যের মুখ্য প্রেরণা ধর্মগত। এ ধর্ম অসাম্প্রদায়িক সর্ব ধর্মের সার। কবি তা’র নাম দিয়েছেন ‘মানুষের ধর্ম’।

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের K & W Fertilizer Factory’র একজন জাপানী কর্মকর্তা তারোজি ইয়ামামোতো ওই অনুষ্ঠানে একটি দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন ইংরেজিতে। তাঁর ভাষণে উঠে আসে জাপানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক। জাপানে কতখানি নিষ্ঠাভরে রবীন্দ্রচর্চা হয় তারই এক স্পষ্ট আভাস ছিল তাঁর ভাষণ।

১৩২৬ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসের কোনও একসময় রবীন্দ্রনাথ শিলং-এ এসেছিলেন। এই খবর পাওয়া মাত্র সিলেটের বেশ কিছু সুধীব্যক্তি কবিকে ওখানে আসার জন্যে আমন্ত্রণ জানান। তখনকার দিনে শিলং থেকে সিলেটে আসা সহজসাধ্য ছিল না। বেশ কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল সেই আসা। তাকেই শিরোধার্য করে কবি এসেছিলেন সিলেটে। বাংলা ১৩২৬ সালের ১৯শে কার্তিক বুধবার সকালে কবির শুভ পদার্পণ ঘটেছিল। যাত্রাপথের বর্ণনাসহ কবির সংবর্ধনা এবং তার উত্তরে তিনি কী বলেছিলেন তার একটি সজীব বর্ণনা এই পুস্তিকার অন্যতম আকর্ষণ। স্মরণিকায় শেষাংশে চারদিনের অনুষ্ঠানের বিস্তৃত সূচি মুদ্রিত হয়েছে। প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন কলিম শরাফী, ভক্তিময় দাশগুপ্ত প্রমুখ। চারদিনের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া, নৃত্যনাট্য, নাটক, আবৃত্তি এবং আলোচনাও ছিল।

রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষ উদযাপনের ষাট অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও প্রতিকূল পরিবেশে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের অবদান আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। সেই মহাযজ্ঞে সমগ্র পূর্ব ভূখণ্ডের সঙ্গে সিলেটবাসীর সম্মাননীয় সেই আয়োজন ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবেই থেকে যাবে নিরধিকাল।