চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৬ ॥ সুশীল সাহা




প্রতারণার রকমফের


আমাদের চারপাশে প্রবলভাবে বিছানো আছে প্রতারণার নানা জাল, ভালো বাংলায় বলা যায় ‘বিতত বিতংস’। নানাভাবে সতর্ক থেকেও এর থেকে যেন আমাদের রেহাই নেই। নিত্যদিনের বাজারে পচা মাছ, কাঁকর মেশানো চাল কিংবা ভেজাল মশলাপাতির কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম। ভেজাল ওষুধ কিংবা নামি কোম্পানির জাল কসমেটিকস আমরা কতবার কতভাবে কিনে ঠকেছি, তার ইয়ত্তা নেই। ভেজাল নিয়ে সুকান্ত তো কবেই লিখে গেছেন।
“ভেজাল, ভেজাল, ভেজাল রে ভাই, ভেজাল সারা দেশটায়,
ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস মিলবে নাকো চেষ্টায়।”

আমরা তাই এইসব ভেজাল খেয়েই বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যেনো। আর ঠকে যাওয়াটাকেও আমরা নিরুপায় হয়ে একরকম মেনেই নিয়েছি। ধরে নিয়েছি, এইভাবেই আমাদের চলতে হবে। অতি সতর্ক থাকলেও কখন যে কীভাবে আমরা ঠগবাজদের শিকার হবো, কে জানে। তবু সতর্ক হতে দোষ কোথায়? কিন্তু আমরা জানি, অতি সতর্ক হয়েও মাঝে মাঝে আমাদের নানারকম প্রতারণার শিকার হতে হয়। তাইতো আর আগের মতো অজানা অচেনা লোকের সঙ্গে আমরা আর সেইভাবে কথা বলতে পারি না। বিশেষ করে গায়ে পড়া লোকেদের তো আমরা সাধারণত এড়িয়েই চলি। আগেকার দিনের মতো পথচলতি মানুষের সঙ্গে আমরা আর সেইভাবে মিশি না। আগে ট্রেনে বাসে কত না মানুষের সঙ্গে আলাপ হত। আলাপ থেকে ঘনিষ্টতা হতে সময় লাগত না। কিন্তু এখনকার দিনে নানাভাবে ঠকতে ঠকতে আমরা আর সহজে কাউকেই বিশ্বাস করতে চাই না। কী জানি কে কোন ছদ্মবেশে কী ক্ষতি করে যাবে।

এই প্রতারণার জগতে নতুন একটা শব্দ আমদানি হয়েছে, ‘কেপমারি’-সাদা বাংলায় যাকে বলা যায় বন্ধুবেশে চরম ক্ষতি করার ফাঁদ ফেলার এক অভিনব প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার কথা মাঝে মাঝেই খবরের কাগজের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। কথার জাল বুনে মোহ মুগ্ধতার পরিবেশ রচনা করে সোনা গয়না টাকা পয়সা হাতিয়ে পালানো কিংবা পলক না ফেলতে হাতসাফাই করে দামি জিনিস নিয়ে চম্পট দেবার খবর তো আমরা হামেশাই পাই। এটিএম জোচ্চুরির কথাও এখন সুবিদিত। আমার এক পরিচিতজন আমেরিকায় গিয়ে এক ফ্যাসাদে পড়েছিলেন। কোনো এক বাসস্ট্যান্ডে তিনি অপেক্ষা করছিলেন বাসের জন্যে। সঙ্গে ছিল তাঁর একটি এটাচি। উল্টোদিক থেকে একজন আগন্তুক এসে তাঁকে বলেন মাটিতে একটা একশো ডলারের নোট পড়ে আছে। তিনি তাকিয়ে দেখেন সত্যি সত্যি একটা নোট পড়ে আছে। মাথা নীচু করে তিনি সেটা তুলতে যান। ইত্যবসরে তাঁর সেই এটাচি ব্যাগটা নিয়ে চম্পট দেয় সেই লোকটা। আমার সেই পরিচিতজন হতভম্ব হয়ে যান ঘটনার আকস্মিকতায়। লোকটা তখন কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে। মহাবিপদে পড়লেন আমার সেই চেনা মানুষটি। ওই ব্যাগের মধ্যে তাঁর পাসপোর্টসহ দরকারি কাগজপত্র টাকাপয়সা ইত্যাদি ছিল। তিনি যে তিনি এটা প্রমাণ করার কোনো নথি তাঁর কাছে নেই। বিদেশ বিভূঁইয়ে এমন মহা সংকটে পড়ে তা থেকে উদ্ধার পেতে নানা জায়গায় ঘুরে অনেক ঠোক্কর খেয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তাঁর নিজেকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।

অনেকদিন আগের কথা। আমাদের খুলনার বাড়িতে এক সাধুবাবার আবির্ভাব ঘটেছিল। অবশ্য তিনি আমাদের বাড়ির অন্য এক বাসিন্দার সম্মানীয় অতিথি হয়েছিলেন। কয়েকদিন তাঁকে খুব হৈ চৈ হল। অনেকে আসছেন নানা জায়গা থেকে হাত দেখাতে। তিনি সবার হাত দেখে নানারকম ভালমন্দ কথা বলছেন। আসন্ন বিপদ থেকে উদ্ধারের পথও বাতলে দিচ্ছেন অবলীলায়। মুগ্ধ মানুষেরা তাঁকে নানা উপঢৌকন দিয়ে সম্মান জানাচ্ছে। কয়েকদিন কাটল হোম যজ্ঞ আর ধর্মীয় বাতাবরণে। তারপর হঠাৎ একদিন তিনি কাউকে কিছু না বলে কোথায় যেন উধাও হয়ে গেলেন। পরে জানা গেল ওই বাড়ির অনেক সোনা গয়না টাকা পয়সাও নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। বোঝা গেল এটা ওই সাধুবাবারই কীর্তি। কী কাণ্ড। ছেলেবেলার এই ঘটনা থেকে এইরকম হঠাৎ বান্ধবদের বিশ্বাস না করা শিক্ষা হয়েছিল আমার। কিন্তু সেই বিশ্বাসে সব সময় স্থির থাকতে পারিনি। নইলে পরবর্তী জীবনে কেন নানাভাবে ঠকব।
অনেকদিন থেকে বাড়িতে নানারকম জিনিসের বিক্রেতাদের আগমন ঘটছে। ছোটখাট জিনিস থেকে অনেক বড় জিনিসের সওদা করতে আসেন তারা। বেশ ফিটফাট চেহারা অনেকেরই। পাশাপাশি অনেক দরিদ্র দুঃস্থ মানুষেরাও আসেন নানারকম জিনিস বিক্রি করতে। লকডাউন পর্বে তো শাক সবজি মাছ মাংস এমনকি ফল ও মিষ্টি বিক্রেতাদেরও আসতে দেখেছি। বলাবাহুল্য এদের কাউকে কাউকে বিশ্বাস করে কিছু জিনিস কিনে রীতিমতো ঠকেছি। কেনো জানি না মনে হয়েছে এইসব বিক্রেতারা এক ধরনের প্রতারক ছাড়া আর কিছু নয়। আমার নেতিবাচক মনোভাবের জন্যে আমি বাড়ির লোকজনের কাছে মাঝে মাঝেই সমালোচিত হই। কিন্তু ওই যে প্রাচীন প্রবাদ ‘চুন খেয়ে গাল পুড়ে যাবা’র কথা ভুলি কি করে। তবুও নানারকম ভুলের চক্করে পড়েছি নানা সময়ে। তাই ঠগবাজির শিকার আমিও কম হইনি। নিজের বোকামিকে ধিক্কার দিতে দিতে আরেকটা বোকামির শিকার হতে হয়েছে অনেকবার। সেই যে একটা কথা আছে না, ‘যতদিন বাঁচি,ততদিন শিখি’।

অনেক ঘটনার কথা ভুলে গেলেও একটির কথা আজও ভুলিনি। বেশ কয়েক বছর হয়ে গেলেও ঘটনাটি হুবহু আমার মনে আছে। বেশ টানটান এক চিত্রনাট্যের মতো ছবিগুলো মনের দৃশ্যপটে আসে যায় মাঝে মাঝে । সেটাকে একটা কেপমারির ফাঁদই বলা যায়। আজ সেই অভিনব ঘটনাটির কথাই এখানে বিবৃত করব।

আমার তখন অফিস কলকাতার লিন্ডসে স্ট্রিট-এ। অফিসের খুব কাছে একটি ব্যাঙ্কে ছিল আমাদের ওই অফিসের কর্মীদের ‘স্যালারি আকাউন্ট’। সেদিন ওখানেই গেছি টাকা তুলতে। খুব বেশি ভিড় ছিল না। কাজটা সেরে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বুক পকেটে পাশবই, পকেটে বেশ কয়েক হাজার টাকা। ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে অফিসের দিকে পা বাড়িয়েছি, এমন সময় খুবই হাবাগোবা গোছের এক অতি সাধারণ দেহাতি মানুষ আমার কাছে এসে একটা লটারির টিকিট ও খবরের কাগজের এক লটারি খেলার ফলাফল আমাকে দেখিয়ে বলল ওটা মিলিয়ে দেখতে। লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে খুব সোজা সরল মনে হল তাকে। একটু মন দিয়ে খেলার ফলাফল আর ওই টিকিটের নম্বর মিলিয়ে দেখি একেবারে ফার্স্ট প্রাইজ উঠেছে ওতে। দু’লক্ষ টাকার এই প্রাইজ পেয়েছে মানুষটা, অথচ নিজেই ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না। আমি তাকে বললাম তার প্রাইজ পাবার কথা। বললাম যথাস্থানে যোগাযোগ করার জন্যে। লোকটা আমার কথায় কান না দিয়ে ক্রমাগত আমাকে বলতে থাকল তার দেশের বাড়িতে যাবার আশু প্রয়োজন, কে যেন তাকে বলেছে এই প্রাইজ পাবার কথা, কিন্তু তাকে সে বিশ্বাস করতে পারেনি, আমাকে সে ভালমানুষ ভেবে ওটা দেখিয়েছে। আমি তাকে যত বোঝাই ততই সে বলে অতশত জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে সে যেতে চায় না। কিছু টাকা পেলেই ও টিকিটটা আমাকে দিয়ে দেবে। আমি খুবই বিব্রত বোধ করলাম। সামান্য একটু লোভ যে মনের মধ্যে উঁকি দেয়নি তা এখন আর জোর দিয়ে বলতে পারব না। তবু কিন্তু আমি লোকটাকে নানাভাবে বোঝাবার চেষ্টা করলাম তার এত বড় একটা প্রাপ্তির ব্যাপারে। সে তো কিছুতেই বুঝতে চায় না। এমন সময় ওখান দিয়েই একজন লটারি টিকিট বিক্রেতাকে যেতে দেখলাম। হাতে তার এক বান্ডিল টিকিট। বেশ জোরে জোরে সে ‘লটারি টিকিট, লটারি টিকি্ট’ এই হাঁক দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। চোখে পড়তেই তাকে আমি ডাকলাম। বেশ সপ্রভিত ভঙ্গিমায় সে আমার সামনে এল। আমি তাকে ওই ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়ে সমস্যাটার সমাধান করে দিতে বললাম। লোকটি মন দিয়ে কাগজদুটো মিলিয়ে রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে আমাকে বলল, ‘সেকি মশাই এমন দান ছাড়বেন কেন? ওকে কিছু টাকা দিয়ে টিকিটটা নিয়ে নিন, লটারির টাকা আমিই আদায় করে দেব। নিয়ে নিন দাদা, এ সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। আপনার রীতিমতো লাভ হবে, আমারও কিছু হবে’।

আমার কাছে অত টাকা নেই বলে আমি এড়িয়ে যেতে চাইলাম। কিন্তু সে তখন নাছোড়বান্দা। আমাকে বলল, কত আছে দেখুন না। পাঁচ সাত দশ হাজার যা হোক দিন না। আমি ওকে বলে ম্যানেজ করছি। এই বলে সে ওই দেহাতি লোকটাকে নিয়ে একটু আড়ালে গিয়ে কীসব বোঝাতে থাকল। মুহুর্তের জন্যে আমি একটু নিজের আসন্ন প্রাপ্তিযোগের লোভের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছি কি ফেলিনি, এমন সময় সে এসে আমাকে বলল পঁচিশ হাজারের কমে ও তো রাজিই হচ্ছে না। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে নিয়ে আসুন না, আমরা বাইরে অপেক্ষা করছি। এইভাবে খানিকক্ষণ দর কষাকষি চলতে চলতে হঠাৎ আমার মাথার মধ্যে ঝিলিক দিয়ে উঠল এটা একটা ‘কেপমারি’র ফাঁদ নয় তো। মুহুর্তের মধ্যে আমার মধ্যে এক অন্যরকম আত্মোদয় ঘটল যেন। মনে হল পুরো ঘটনাটাই সাজানো। এই ফাঁদ থেকে আমাকে বেরোতে হবে। কিন্তু কীভাবে বেরোবো? ভাবতে ভাবতে একটা বুদ্ধি মাথায় খেলে গেলো। একটা উল্টোচালে ওদেরকে ধরাশায়ী করার চেষ্টা করলাম। বললাম, ভাই আমার ব্যাঙ্কে অত টাকা নেই, আমি অফিসে গিয়ে এর ওর কাছ থেকে ধার করে টাকা নিয়ে আসছি। আপনারা অপেক্ষা করুন। সে তো আমাকে ছাড়বেই না, ‘আপনার কাছে যা আছে দিয়ে যান না, আমি ওকে আটকে রাখছি’। আমি সেদিকে কর্ণপাত না করে হনহন করে অফিসের দিকে পা বাড়ালাম। লোকটি আরো কিছু বলতে চাইছিল। তাকে সেটা বলবার অবকাশ না দিয়েই আমি দ্রুত আমাদের অফিস বিল্ডিং-এর লিফটের দিকে এগিয়ে গেলাম।

তারপর সেই ন’তলার মহাযাত্রার ক্ষণটুকুতে যেন হাঁফ ছেড়ে নিঃশ্বাস নিলাম। ইহজীবনে অন্তত একবার ‘পা পিছলে আলুম দম’ হবার হাত থেকে তো বাঁচলাম। সেই মুহূর্তে নিজেই নিজেকে ধন্যবাদ জানালাম।