চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৭০॥ সুশীল সাহা


একজন বিয়ে পাগলীর কথা

হাজার লক্ষ মানুষের ভিড়ে আমি একজন মানুষকে দেখেছি, একটু অন্যরকম। হ্যাঁ, একেবারেই অন্যরমকম। এই অন্যরকম মানুষটির চালচলন হাবভাব এতই অদ্ভুত ছিল যে আজ এতদিন পরেও তার কথা আমার মনে রয়ে গেছে। আমাদের কবিতায় গল্পে উপন্যাসে বা ইতিহাসের পাতায় যেসব বীরাঙ্গনাদের কথা লেখা হয় তিনি কিন্তু তার ধারে কাছেও নেই। তিনি সুরূপা ছিলেন না। গলার স্বর কর্কশ। তার সঙ্গ পাবার জন্যে অন্যান্য অনেকের মতো আমিও আকুল হইনি কোনওদিন। তবে ভাল ছবি আঁকতেন। আর ওই ছবি আঁকার সূত্র ধরেই তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। এবং তারপর তাঁর নানারকম কান্ডকারখানা ও ঘটনাবলির প্রত্যক্ষ করার সুযোগ।

ধারা যাক তার নাম অসীমা বর্ধন। মফস্বলের এক স্কুলের শিক্ষিকা, ছবি আঁকেন। এক বন্ধুর সৌজন্যে আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে কলকাতার একাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর দক্ষিণ গ্যালারিতে তার একক চিত্র প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলাম। ছবিগুলো বেশ ভাল। মূলত প্রকৃতির নিসর্গচিত্র। তার সঙ্গে নিজের একাত্মতার কথা বলতে চেয়েছেন শিল্পী। বিমূর্ততার লেশমাত্র নেই। যা বলার সোজা সাপ্টা ছবির মধ্য দিয়ে তিনি বলেছেন। স্বভাবতই শিল্পীর সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। তবে আমাকে এগিয়ে যেতে হল না শিল্পী নিজেই এগিয়ে এলেন। মানুষের চেহারা নিয়ে কোনওরকম বিরূপ মন্তব্য করার আমি ঘোর বিরোধী। এর সবটাই হল প্রকৃতিদত্ত। এবং এটাও ভাল করেই জানি এই ভালমন্দ চেহারার অস্তিত্ব নিতান্তই সীমিত। অসাধারণ মনোলোভা ভুবনমোহিনী রূপও যে একদিন জরার কবলে হারিয়ে যায় সেতো আমরা অহরহ দেখে আসছি। তবু পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনে সুন্দরীদের চাহিদা অগ্রগণ্য। তাছাড়া ‘সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র’ এই প্রবাদটিই বা কী করে বিস্মৃত হই! যা হোক, শিল্পী অসীমা বর্ধন নিজেই এগিয়ে এলেন আলাপ করতে, অবশ্য সেই বন্ধুই তাকে সঙ্গে নিয়ে এলো। মানুষটি কুরূপা বা বিগতযৌবনা কিনা, সেটার চেয়ে আমার নজরে এলো তার উৎকট সাজ এবং পোষাক। কাছে আসতেই ভুরভুর করে উগ্র পারফিউমের গন্ধ নাকে এলো। ছবি নিয়ে কিছু কথা হল। একটা বিষয় স্পষ্ট হল, সব স্রষ্টা তাঁর নিজের সৃষ্টি নিয়ে তেমন করে বলতে পারেন না, কেউ কেউ তো কিছুই বলতেই চান না। একবার এক সংগীতশিল্পীকে তাঁর গাওয়া একটি গান নিয়ে কিছু প্রশ্ন করেছিলাম। গানটা আমার খুব প্রিয়, কল্পনার ডানা মেলে সেই গানের অন্তস্থিত ছবি আমাকে মুগ্ধ করত। তাই প্রথম সুযোগেই সেই শিল্পীকে ওই গানটা নিয়ে আমার কিছু অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলাম। উত্তরে সেই শিল্পী নিতান্ত কয়েকটি মামুলি কথা বলেছিলেন। বলাবাহুল্য ওই শিল্পী সম্পর্কে আমার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। তাই শ্রীমতী অসীমা বর্ধনের ওইসব কথাবার্তায় আমি মোটেই বিস্মিত হয়নি।

তবে বিস্মিত হলাম আমার অফিসে শ্রীমতী বর্ধনের একদিন এক আকস্মিক আবির্ভাবে। আমার সেই বন্ধুর কাছ থেকে ঠিকানা জেনেই এসেছেন। আমার সেদিনের কথাবার্তায় তিনি নাকি অভিভূত। তাই এসেছেন আলাপ করতে। দু’দিন পরে ফিরে যাবেন। আমি তাঁর সঙ্গে যথোচিত ভদ্রতা করলাম। চা বিস্কুট আনিয়ে খাওয়ালাম। এইভাবে আপ্যায়ন করাটা সম্ভবত কাল হল আমার পক্ষে। শ্রীমতী অসীমা বর্ধন আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই চললেন। প্রথমে চিঠি, তারপর ফোন। তখনও মোবাইল উপদ্রব শুরু হয়নি। তিনি তাঁর বাড়ি থেকে ট্রাঙ্ক কল করতেন। কলকাতায় এলেই সটান চলে আসতেন অফিসে। তারপর একদিন এক অবসরে ব্যক্ত করলেন তার মনের কথা, তিনি সুপাত্র খুঁজছেন। ঘর বাঁধবেন। আমার জিজ্ঞাসার উত্তরে জানালেন তার ভেঙ্গে যাওয়া প্রথম বিয়ের নানা ঘটনা। শরীরের একটা অংশের পোড়া দাগও দেখালেন। সিগারেটের ছ্যাঁকা। স্বভাবতই বিমর্ষ বোধ করলাম। কিন্তু গোল বাঁধল তার জন্যে উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পাওয়া। বন্ধুমহলে ব্যাপারটা নিয়ে একটু কথাও বললাম। বেশিরভাগ বন্ধুই আমার এই অকারণ সহানুভূতিশীল হওয়াকে ‘আদিখ্যেতা’ বলেই মনে করলেন। কিন্তু ততদিনে আমি খানিকটা জড়িয়ে গেছি নিজের অজান্তেই। শ্রীমতী বর্ধন তার সংযমের মুখোশটাকে একদিন খুলে ফেলে প্রায় মরিয়া হয়েই উঠলেন। আমার সঙ্গে যেই কথা বলতে আসুক না কেন তিনি তার সঙ্গেই ভাব জমাতে চান। খোঁজ নেন আমাদের অফিসে অবিবাহিত ছেলে ক’জন আছে। মুশকিল হল চল্লিশোর্ধ অমন উদ্ভট চেহারার একজন মহিলাকে কেইবা পছন্দ করবে! এক বন্ধু মজা করে শ্রীমতী বর্ধনকে একটু প্রশ্রয় দিয়েছিলেন নিজের বিবাহিত পরিচয়কে গোপন করেই। মজা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তার ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। আমার অফিসে আসাই ছেড়ে দিল একদিন। তবে শ্রীমতী বর্ধন তো নিত্য আসতে পারতেন না। নিজের চাকরি বাঁচাতে তাকে তার কর্মস্থলে ফিরে যেতে হত। তবে আমার সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ রাখতেন।

বৎসরান্তে শ্রীমতী বর্ধন কলকাতায় এলেন তার নতুন কিছু ছবির প্রদর্শনী করতে। যথারীতি আমার কাছে এলেন নিমন্ত্রণ পত্র সঙ্গে নিয়ে। কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম উদ্বোধনের দিন। ততদিনে শ্রীমতী বর্ধন আরও শ্রীহীনা হয়েছেন। চড়া রঙের প্রলেপে সেই চেহারা আরও সেদিন আরো উৎকট লাগছিল। সেইসঙ্গে তিনি গাঢ় নীল যে শাড়িটা পরেছিলেন, তাতে আরও বীভৎস লাগছিল। আমাকে আড়ালে ডেকে ব্যক্ত করলেন এবার তিনি একজনের গলায় মালা পরাবেন বলেই প্রতিজ্ঞা করেছেন। বস্তুত প্রদর্শনী চলাকালীন শ্রীমতী বেশ কিছু আগন্তুককে প্রস্তাব দিলেন এবং যথারীতি প্রত্যাখ্যাত হলেন। দু’তিনটে ঘটনা আমার সামনেই ঘটল। কেননা সেইসব পাত্রদের কয়েকজন যে আমার সঙ্গেই গিয়েছিল ওখানে। আমি মরমে মরে গেলাম।

যথাসময়ে একদিন প্রদর্শনী শেষ হল। কিছু ছবি বিক্রি হয়েছিল। অবিক্রিত ছবিগুলো নিয়ে একসময় শ্রীমতী বর্ধন নিজের কর্মস্থলে ফিরে গেলেন। এরপর দীর্ঘ নীরবতা। দেখতে দেখতে বছর পাঁচেক কেটে গেল। শ্রীমতী বর্ধনকে একরকম ভুলেই গেলাম। একদিন এক সহকর্মীর মাধ্যমে খবর পেলাম শ্রীমতী বর্ধন নাকি লন্ডনে গেছেন তার ছবির প্রদর্শনী করতে। অবাক হলাম ঠিকই। কিন্তু এই সেদিনও যিনি নানা বিষয়ে পরামর্শ করতেন সেই তিনি একেবারে কোনওরকম জানান না দিয়ে সোজা লন্ডন চলে গেলেন! ভেবে একটু অবাকই হয়েছিলাম। আসলে তার ইচ্ছাপূরণে আমার ভূমিকায় তিনি সম্ভবত অসন্তুষ্টই হয়েছিলে। কী আর করা! এইভাবে আরো কিছুদিন কেটে গেল।

তারপর একদিন হঠাৎ করে তাঁর আবির্ভাব আমাদের অফিসে। সঙ্গে এক মোটাসোটা বয়স্ক ভদ্রলোক। যথারীতি শ্রীমতী বর্ধন উগ্র সাজে সেজেছেন। এতদিন কোথায় ছিলেন? আমার এই প্রশ্ন করার আগেই তিনি খলবল করে উঠলেন। দেশে তো পাত্তা পেলাম না, তাই ইওরোপের নানা দেশে গিয়ে ছবির প্রদর্শনী করে এলাম। কত ভাল দর্শক, কত ছবি বিক্রি হল। নিজের উপার্জনের টাকায় নানা জায়গায় ঘুরলাম। কপালে বরও জুটল। এই কথা বলে পাশের ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললেন, এই আমার স্বামী। দশাসই চেহারার ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। এক গাল হাসি নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এসে হঠাৎ ঢিপ করে প্রণাম করলেন। আমি তো বিস্মিত হতবাক। শেষ পর্যন্ত আধ বুড়ো এক পাগলাটে মানুষকে জীবনসঙ্গী করলেন শ্রীমতী বর্ধন! কী আর করব, ক্যান্টিন থেকে মিষ্টি আনালাম, সঙ্গে চা বিস্কুট। ভদ্রলোক সারাক্ষণ মুচকি হেসেই গেলেন। একসময় আমাকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দিয়ে ওঁরা চলে গেলেন। আমি ওঁদের গমনপথের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ।
এই আখ্যানটা এখানেই শেষ করা যেত। লেখা যেত ‘তাহার পরে তাহারা সুখে শান্তিতে ঘর করিতে লাগিল’। কিন্তু তা কিন্তু হল না। এই ঘটনার বছর পঁচিশেক বাদে পুরনো বইপত্র গোছাতে গিয়ে শ্রীমতী বর্ধনের এক প্রদর্শনীর নিমন্ত্রণ পত্র খুঁজে পেলাম। চকিতে মনের পর্দায় ভেসে উঠল এক বিয়ে পাগলি বুড়ির এক সামান্য কালখণ্ডের ইতিহাস। মনে প্রশ্ন জাগল কেমন আছে ওঁরা। কতদিন দেখিনি ওঁকে। কোথায় আছে! এখনও কি ছবি আঁকেন তিনি। কেমন করছেন ঘর–সংসার! নিছক কৌতূহল থেকে সেই বন্ধুকে ফোন করলাম। জানতে চাইলাম শ্রীমতি বর্ধনের কুশল সংবাদ। প্রত্যুত্তরে যা জানলাম তাতে আমি কেবল বিস্মিতই হলাম না। হলাম বিষাদাক্রান্ত।

শ্রীমতী বর্ধন এখন তাঁর শহরেই আছেন। বিদেশ থেকে ফিরেছেন বহুদিন আগেই। স্কুল থেকে রিটায়ার করেছেন। ছবি আঁকেন না আর। এখন নাকি স্থানীয় এক এনজিও-তে ফ্রি সার্ভিস দিয়ে সময় কাটান। সংস্থাটি পিছিয়ে পড়া শিশুদের নিয়ে কাজ করে। দিনের একটা বড়ো সময় কাটান শিশুদের নিয়ে। বিয়ে ভেঙ্গে গেছে বহুদিন। কারণ জিজ্ঞেস করতে যা জানলাম তা আমার বিস্ময়ের ঘোরকে আরো খানিকটা বাড়িয়ে দিল।
ভদ্রলোক নাকি ‘ইমপোটেন্ট’।
কী আর বলব!