চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৭২॥ সুশীল সাহা


সারস্বত চিন্তা চেতনার একজন অগ্রপথিক


এবারের লিটল ম্যাগাজিন মেলায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখা বর্ধমানের শ্যামলবরণ সাহার সঙ্গে। নিজের পত্রিকা ‘বাল্মীকি’র স্টল আলো করে বসে আছেন তাঁরা দু’জন, শ্যামল ও তাঁর স্ত্রী সঞ্চয়িতা। শ্যামলের কাজ নিয়ে আমার উৎসাহ অপার। কবিতা লেখে, ছবি আঁকে। ভাল সংগঠক। খুব কষ্ট করে পত্রিকা করে, বই প্রকাশের কাজও করে। ওঁদের স্টলেই সন্ধান পেলাম একটি নতুন বইয়ের। শিরোনাম – রবীন্দ্রনাথের গান : একুশের ভাবনা। লেখক সুভাষ ভট্টাচার্য। সদ্য প্রকাশিত কৃশকায় বইটি হাতে নিতেই রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। এতো আমার নিজেরই বিষয়! রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে কতদিন ধরে ভাবছি! সামান্য কিছু লেখারও চেষ্টা করেছি। যত না লিখেছি, তার চেয়ে পড়েছি অনেক বেশি। অজস্রবার শুনেছি তাঁর গান। রবীন্দ্রনাথের বিপুল গানের ডালির মধ্যে যারা খুঁজে পায় প্রাণের আরাম আমি তাদের মধ্যে একজন। সময় যত এগিয়ে যাচ্ছে, ততই যেন ওই গানগুলো তার অসীম ঐশ্বর্য নিয়ে ধরা দিচ্ছে আমার কাছে। যথারীতি সুভাষবাবুর বইটি হাতে নিয়ে সূচিপত্রে চোখ বোলাতেই রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। আহা, এমন লেখাই তো খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম এতদিন!

বাগুইহাটির বিনোদিনী সিনেমার উল্টোদিকের রাস্তায় একটু এগিয়ে বল্মীক আবাসন। ওখানে একদা থাকতেন মণিভূষণ ভট্টাচার্য, অমলেন্দু চক্রবর্তী, দেবেশ রায়, রণজিৎ দাশ প্রমুখ গুণীজনেরা। এখন সেটা শূন্য পুরী। একা কুম্ভের মতো ওখানে রয়েছেন আমার আর এক কাছের মানুষ সুভাষ ভট্টাচার্য। এমন কর্মীষ্ঠ মানুষ খুব কম দেখেছি। পেশায় ছিলেন অধ্যাপক। অভিধান রচনায় তিনি একজন অগ্রপথিক। রীতিমতো নাড়া বেঁধে শিখেছেন রবীন্দ্র সংগীত ও শাস্ত্রীয় সংগীত। এসরাজ বাজাতে জানেন। শিখেছেন বিষ্ণুপুর ঘরানার শিল্পী পন্ডিত গৌরহরি কবিরাজের কাছে। বছর কয়েক আগে একটি লেখার সূত্রে আমার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। কাছে গিয়ে দেখলাম অমন অশেষ গুণবান মানুষটা অত্যন্ত সহজ ও সরল। নানারকম অভিধান রচনা ছাড়া ভাষা নিয়ে অনেকগুলো গ্রন্থ রচনা করেছেন। ছোটদের জন্যে লিখেছেন বেশ কয়েকটি বই। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে তাঁর মননঋদ্ধ একাধিক গ্রন্থ আছে। তেমনই এই বই ‘রবীন্দ্রনাথের গান : একুশের ভাবনা’, এ বছর (২০২২) প্রকাশিত হয়েছে বর্ধমানের ‘দক্ষিণের বারান্দা’ প্রকাশনা থেকে।

মাত্র ৮৮ পৃষ্ঠার স্বল্পায়তন এই বইটিতে ঊনিশটি ছোট ছোট নিবন্ধ রয়েছে। বলাবাহুল্য সবগুলোই রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে লেখকের মৌলিক চিন্তা ভাবনায় সমৃদ্ধ। প্রয়াণের এত বছর পরেও এই একুশ শতকে বসে লেখক যেভাবে একটু একটু করে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে তাঁর ভাবনাসমূহকে ছোট ছোট নিবন্ধে ব্যক্ত করেছেন তা সত্যিই অনন্য। লেখাগুলো ছোট আকারের হলেও বিপুল ভাবনা উদ্রেককারী। বিন্দুতে সিন্ধুর সন্ধান দেবার মতো লেখক তাঁর চিন্তা ভাবনাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। পড়তে পড়তে একটু শিহরণও জাগে। গভীর কথা কত সহজভাবে ব্যক্ত করা যায় এই বইটি তার এক প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। একেকটি লেখা তাই একাধিকবার পড়তে হয়, ভাবতে হয়। ভাবতে ভাবতে পৌঁছে যেতে হয় অনাবিল এক অনুভবের জগতে।
প্রথম লেখাতেই লেখক তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছেন শতবর্ষীয় সুবিনয় রায়কে। রবীন্দ্রসংগীতে প্রয়াত এই শিল্পী যে কী পরিমাণ নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন তার অজস্র প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর বাণীবদ্ধ রেকর্ডগুলোতে। এমন শুদ্ধভাবে গাইতে পারা পুরুষকণ্ঠ সতি সত্যিই বিরল। ইন্দিরা দেবীচৌধুরানী, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী এবং রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহধন্য সুবিনয় রায় সত্যিকারের পুরুষোচিত বলিষ্ঠ সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটাতে পেরেছিলেন তাঁর কণ্ঠে। লেখক খুব কাছ থেকে শুধুই তাঁকে দেখেননি, নিবিড়ভাবে শুনেছেন তাঁর গান। ছোট্ট এই লেখায় তাই শ্রী রায়ের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন মোহমুক্ত এক অনাবিল ভাষায়। বাংলা গানের জগতে এমন এক নিবেদিত প্রাণ অসীম ক্ষমতাধর এই শিল্পীর মূল্যায়ন গ্রন্থের প্রবেশক লেখা হিসেবে তাই অনন্য মনে হয়। এটি লেখকের মেধা ও প্রজ্ঞার এক অসাধারণ স্বাক্ষর বহন করে। লেখকের অপর একটি গ্রন্থ ‘স্বপ্নের ভুবন : রবীন্দ্রনাথের গান’ (২০১২) –এ তাঁর একটি অসাধারণ লেখা আছে সুবিনয় রায়কে নিয়ে। লেখাটির শিরোনাম ‘ সুবিনয় রায়ের সঙ্গে একটি কাল্পনিক সংলাপ’। শিরোনামেই বিষয়টির সুস্পষ্ট আভাস আছে। মূলত সাক্ষাৎকারের ঢং-এ রচিত এই লেখাটি সুবিনয় রায়ের নিজস্ব সংগীত চিন্তাকে ব্যক্ত করা হয়েছে। এইভাবে এই গ্রন্থে তিনি একে একে স্মরণ করেছেন রবীন্দ্রসংগীতের অগ্রপথিকদের। তাঁদের মধ্যে আছেন অনাদিকুমার দস্তিদার, নীলিমা সেন, ওয়াহিদুল হক প্রমুখ। রবীন্দ্রসংগীতের অঙ্গনে এঁদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রসঙ্গত তাই লেখাগুলো হয়ে দাঁড়ায় অসামান্য এক শ্রদ্ধানিবেদন। রবীন্দ্রনাথের গানে সত্যি সত্যি যাঁরা খুঁজে পেয়েছিলেন আত্মার মুক্তি সেইসব গুণীজনেদের স্মরণ ও মূল্যায়নে লেখকের এই মানসিকতাকে তাই কুর্নিশ জানাই।

অসম্ভব সুন্দর একটি বইয়ের সন্ধান দিয়েছেন লেখক। রবীন্দ্রনাথের গান রচনার পিছনের ইতিহাস নিয়ে আমাদের জল্পনা কল্পনার শেষ নেই। নানাজনে নানাভাবে গবেষণা করে রবীন্দ্রগানের প্রেক্ষাপট জানিয়েছেন। গীতবিতান তথ্যভান্ডারসহ সংগীত বিষয়ক নানা গ্রন্থের মাঝে জনৈক মোহিত গুপ্তের লেখা ‘অশোকরেণুগুলি’ গ্রন্থটি লেখকের বর্ণনার গুণে আমাদের আকৃষ্ট করে। লেখক অকপটে উল্লেখ করেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের গান রচনার প্রেক্ষাপট, মেজাজ ও পরিস্থিতির এমন আন্তরিক ও সুবেদী বয়ান আমি আগে কমই পড়েছি।’ লেখকের বয়ানে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি রবীন্দ্রনাথের সারা জীবনের গানের পিছনের ইতিহাস অনুসন্ধান করে মোহিত গুপ্ত তার হদিশ দিয়েছেন। যে মন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ওইসব কালজয়ী সৃষ্টি করে গেছেন সেই মনটাকে বুঝবার চেষ্টা করেছেন তিনি। বলাবাহুল্য এই বই সম্পর্কে প্রবল আগ্রহ সঞ্চারকারী এই লেখাটি পড়বার পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি মাত্র দশ বছর আগে প্রকাশিত ওই বইটি এখন দুষ্প্রাপ্য।

এই বইয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখা ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের গান’ শীর্ষক লেখাটি। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সদ্য পঞ্চাশ বছর পেরিয়েছে। পাকিস্তানের অপশাসন থেকে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ সাহিত্য শিল্প তথা অর্থনীতিতে অনেক এগিয়েছে। খুব কাছের দেশ, অথচ আমরা সেইভাবে বাংলাদেশের খবর পাই না, অন্যর্থে বলা যায় – খবর রাখি না। অথচ এই অজ্ঞতা থেকে অনেক ভুল বোঝাবুঝির জন্ম হয়েছে এবং হচ্ছে। শিল্প সাহিত্যের সেরা পীঠস্থান হিসেবে কলকাতার ঐতিহ্য বহুদিনের। কিন্তু কলকাতার ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে ঢাকা তথা বাংলাদেশ যে আপন আত্মপরিচয়ের সম্মাননীয় এক নতুনতর ধারার জন্ম দিয়েছে সে খবর আমরা ক’জন রাখি! অন্ধ হলে তো আর প্রলয় বন্ধ হয়না! তাই আমরা খোঁজ রাখি বা না রাখি সাহিত্য শিল্পে বিশেষ করে রবীন্দ্রচর্চায় বাংলাদেশ যে কতখানি এগিয়েছে তার খবর যাঁরা রাখেন, তাঁরাই রাখেন। এই গ্রন্থের শেষ লেখা ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের গান’ শীর্ষক ছোট্ট একটি লেখার মধ্য দিয়ে সুভাষবাবু বাংলাদেশের রবীন্দ্রচর্চার একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরেছেন। আমরা জানি অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নিয়মিত রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করেছে। রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয়ের এক বড়ো সম্পদ। তাই ওঁরা পরমাদরে রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করেছেন, তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ গানকে শুদ্ধতম পদ্ধতিতে চর্চা করে বাঁচিয়ে রেখেছেন। শুধুমাত্র শিল্পীরাই নয়, শ্রোতারাও দিনদিন শিক্ষিত হয়ে উঠেছেন। তাই আমাদের এখানকার মতো ‘ইম্প্রোভাইজাশান’ বা ‘ফিউসান’-এর বেনোজলে রবীন্দ্রগানের আদ্যশ্রাদ্ধ করার কোনও নিদর্শন আজও বাংলাদেশে দেখা যায়নি। এইখানেই ওঁদের জয়। সুভাষবাবুর এই লেখা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিশেষে লেখক সুভাষবাবুর সঙ্গে আমার অতি সাম্প্রতিক একটি সংলাপ বিনিময়ের একটি ছোট্ট নিদর্শন রাখছি। শুদ্ধতম সংস্কৃতি চর্চায় আজন্ম নিবেদিতপ্রাণ মানুষের সংখ্যা যখন ক্রমহ্রাসমান, তখন সুভাষবাবুর মতো মানুষের এমন সব মেধাবী উচ্চারণ আমাদের পথ দেখাবে। কথাগুলোকে দশজনের মাঝে ছড়িয়ে দেবার এক দুর্মর তাগিদ অনুভব করছি। চারদিকে যখন এক দিশাহীন অন্ধ তমসা, তখন এই ধরনের কিছু বাক্যবন্ধ আমাদের মনে জাগায় আশার আলো। তাই সবার সঙ্গে এই কথাগুলোকে ভাগ করে নিয়ে এই লেখার ইতি টানছি।

প্রশ্ন : বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি এখন যেখানে এসে পৌঁছেছে তাতে কি আপনি খুশি? দীর্ঘকাল আপনি অভিধান নিয়ে কাজ করেছেন। সেইসব কাজের প্রকৃত কদর করেছে কি বাঙালি সমাজ? কখনও কি মনে হয়েছে এত পরিশ্রম একেবারেই নিরর্থক?
উত্তর : (ক) বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির কিছুটা যে অবক্ষয় হয়েছে, আমার মনে সে-বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। গত দুই-তিন দশকে একটা প্রবণতা লক্ষ করেছি, করে ব্যথিত হয়েছি। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বাংলা ভাষাকে রীতিমতো অবহেলা করতে শিখেছে। সকলেই নয়, তবে অনেকেই। একথা অস্বীকার করিনা যা, পশ্চিম বাংলায় সরকারি চাকরি আর স্কুল–কলেজ শিক্ষকতার বাইরে যে সুবিপুল পেশাজগৎ তাতে বাংলা নয়, ইংরেজিরই কদর। কিন্তু তার মানে কি এই যে, বাংলাকে অর্থাৎ মাতৃভাষাকে অবহেলা করতে হবে? বাংলা সাহিত্যের জগৎটা বহু বহু ছেলেমেয়ের কাছে অচেনা অজানা। নিজের ভাষাকে সম্মান করা যে যে কোনো মানুষের কর্তব্য তা একালের বাঙালি তরুণ সমাজ ভুলতে বসেছে। এই চিত্রটা মনকে বড়োই ব্যথিত করে।
(খ) আমি অভিধান–চর্চা করছি পঞ্চাশ বছর ধরে। এই কাজে আমি নিরলস আজও এবং এতেই আমার আনন্দ। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, এই কাজ কি খুব ফলপ্রসূ হয়েছে? বাঙালি পাঠক কি এই কাজে উপকৃত হয়েছেন, এর কি যথাযথ কদর হচ্ছে?– তাহলে নিশ্চয় না বলতে হবে। আমরা ত্রিশ বছর ধরে বাংলা বানানকে সুস্থির ও জটিলতামুক্ত করতে প্রয়াসী হয়েছি। অথচ দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ মানুষ বানান ভুলের বিষয়ে বেপরোয়া। তাহলে তো বলতেই হয়, আমাদের এসব প্রচেষ্টা নিরর্থক।

প্রশ্ন : একজন সংগীতবোদ্ধা হিসেবে আপনার এখনকার বেশিরভাগ শ্রোতৃবর্গকে কি মেধাহীন মনে হয়? ধ্রুপদি সংগীতের আবেদন ক্রমশ যে সংকুচিত হয়ে আসছে তার জন্যে কাকে দায়ী করবেন? কেন?
উত্তর : (ক) সংগীতের শ্রোতাদের দুটো ভাগ আছে। একদল– এঁদের সংখ্যাই বেশি- বোদ্ধা নন, শুধু শুনে মুগ্ধ হন, আপ্লুত হন। আর এ শুধু রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রেই নয়, সবরকম সংগীতের সম্পর্কেই খাটে। অধিকাংশ শ্রোতাই মেধাহীন। কোনো গান এঁদের কেন ভালো লাগে সে ভাবনাই নেই এঁদের। থাকতেই পারে না। তার বিশ্লেষণ, তার রীতি-প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবা সম্ভবই নয় এঁদের পক্ষে। দ্বিতীয় ভাগে যাঁরা, তাঁরা সংখ্যায় স্বল্পতর। এঁরা মেধাবী শ্রোতা। বিচার বিশ্লেষণ করতে জানেন। কিন্তু সংখ্যায় এঁরা এতই কম যে, ওই মেধাহীন শ্রোতারাই গুরুত্ব পাবে।(খ) ধ্রুপদি সংগীতের শ্রোতা চিরকালই কম। আগে তা সত্ত্বেও ধ্রুপদি অর্থাৎ শাস্ত্রীয় সংগীতের যথেষ্ট কদর ছিল বাঙালির কাছে। এখন কদর নেই, একথা বলব না, তবে একটু কমেছে তো বটেই। আমি অবশ্য একে অবক্ষয় বলি না। বাঙালির মনোযোগ এখন নানাদিকে বিক্ষিপ্ত ও বিস্তৃত। ফলে সংগীত শিল্পকলা এসব বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করা বা চর্চা করা এখন মুষ্টিমেয় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা যুগের লক্ষণ। বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বহু বাঙালি সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, এখন তা পারছেন কই। এখনকার কতজন বাঙালি সাহিত্যিককে প্রকৃতই ‘মহান’ বলতে পারি? সংগীতের ক্ষেত্রেও তাই। শাস্ত্রীয় সংগীতে বিরাট মাপের সংগীতগুণী এখনও আছেন নিশ্চয়, তবে কিছুটা কম।
আর একটা কথা। ধ্রুপদি সংগীত বা ধ্রুপদি সাহিত্য কখনো জনপ্রিয় হয় না। সেই সাহিত্য বা সেই সংগীত হৃদয়ংগম করতে হলে যে ‘বোধ’ দরকার তা কম-সংখ্যক ভোক্তারই থাকে। এতে আক্ষেপের কিছু নেই।

প্রশ্ন : দেবেশ রায় তাঁর ‘গীতবিতান পাঠ’ গ্রন্থে (২০২০) লিখেছেন, “…গীতবিতানকে শুধুই রবীন্দ্রনাথের গানের সংকলন বলে নয়, রবীন্দ্রনাথের সংগীতকল্পনার একমাত্র প্রমাণ হিসেবেই গভীর পাঠ করলে হয়তো রবীন্দ্রনাথের গানের ওতপ্রোত সাংগীতিক জটিলতা আমাদের কাছে কিছুটা পরিচ্ছন্ন হবে।” (পৃষ্ঠা ১৬০) এখানে ঠিক কি বলতে চেয়েছেন লেখক? উত্তর হ্যাঁ হলে তো বটেই, না হলেও বিস্তৃত জানাবেন।
উত্তর : দেবেশবাবু ঠিক কী বলতে চেয়েছেন তা বলতে পারব না। তিনি যদি একথাই বোঝাতে চেয়ে থাকেন যে, ‘গীতবিতান’-এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সংগীতভাবনার সমস্ত প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ উপস্থিত, রবীন্দ্রনাথের গানকে সমগ্রতায় পাওয়া যায় ‘গীতবিতান’-এ, তাহলে তাঁর সঙ্গে একমত হতে বাধা নেই। আমি এই বিষয়ে আর একটা কথা বলতে চাই। ‘গীতবিতান’ রবীন্দ্রনাথের গানের সংকলন। তবে এই সংকলন তাঁর বহু শ্রেষ্ঠ কবিতারও সংকলন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছিলেন, গীতবিতানের গানগুলোকে কবিতা হিসেবেও পড়া যায়।
কবিতা শব্দের আশ্চর্য শক্তি। ছবি রচনার ক্ষমতা আছে কবিতার। সুরও কবিতায় ওতপ্রোত। আর তাই রবীন্দ্রনাথের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল বর্ষার রাগ ব্যবহার না-করে বর্ষার গান রচনা করা, ভোরের রাগ ব্যবহার না করে সকালের গান রচনা করা। সেখানে সহায়ক হয়েছিল কবিতা, কবিতার সৃজনক্ষমতা।

এমন শুদ্ধতম চিন্তা চেতনাসম্পন্ন একজন মানুষের একটি অসামান্য গ্রন্থ নিয়ে লিখতে গিয়ে তাঁর এতখানি নিবিড় সান্নিধ্য ও সহযোগ পাওয়ার জন্যে নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে হয়। তাই তাঁর একটি গ্রন্থের পাঠ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে প্রাসঙ্গিক আর কয়েকটি বিষয়ের অবতারণা করতে হল। ধান ভানতে শিবের গীতের মতো শোনালেও সচেতন পাঠকের এও এক ধরনের প্রাপ্তি।