চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৭৩॥ সুশীল সাহা



সম্পাদক কমলকুমার


বাংলা কথাসাহিত্যে কমলকুমার মজুমদার ব্যতিক্রমী মানুষ। তাঁকে বাংলা গদ্যসাহিত্যের এক অনন্য কারিগর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর গদ্য নানাভাবে নন্দিত ও নিন্দিত। দুরূহ শব্দচয়ন ও জটিল বাক্যবিন্যাসের জন্য তাঁর লেখার পাঠক সংখ্যা সীমিত। তবুও তাঁর স্থান আধুনিক বাংলা গদ্যসাহিত্যের এক অতি উচ্চকোটির আসনে। তাঁকে গ্রহণ করা যেমন কষ্টকর তেমনি খারিজ করাও সহজ ব্যাপার নয় কিন্তু! বাঙালির পঠন পাঠনের চিরায়ত অভ্যাস প্রক্রিয়ায় তাঁর গদ্য রীতিমত এক বিরাশি সিক্কার ধাক্কা। অবশ্য সেই ধাক্কা যাঁরা কাটিয়ে উঠে নতুন করে পাঠে মনোনিবেশ করতে পারেন তাঁরাই সন্ধান পেয়ে যান এই অনন্য কথাসাহিত্যিকের কর্মকৃতিসমৃদ্ধ এক সোনার খনির। তাই তো তিনি লেখকদের লেখক, বোদ্ধা পাঠকের একান্ত প্রিয়জন। মৃত্যুর তিরিশ বছর পরে আজও তাঁকে নিয়ে সাহিত্য বিতর্ক ও চর্চা অব্যাহত।

মাত্র চৌষট্টি বছরের আয়ুষ্কাল পেয়েছিলেন যে মানুষটি, তাঁর সন্ধিৎসা যে শিল্পসাহিত্যের কতদিকে বিস্তৃত ছিল তার পরিচয় আমরা ইতোমধ্যেই পেয়ে গেছি। লেখালিখির বাইরে তিনি অসম্ভব ভাল ছবি আঁকতেন। তাঁর নাট্যনির্মাণের কথা কমবেশি অনেকেই জানি। চলচ্চিত্র শিল্পে তাঁর দক্ষতা ছিল, নিজে তিনটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন। ফরাসি ভাষা জানতেন। একসময় কবিতা লিখেছেন। পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। সাহিত্য সমালোচনা করেছেন। তবে তাঁর সর্বোৎকৃষ্ট অবদান কথাসাহিত্যে। কয়েকটি গল্প ও উপন্যাসে তিনি যে দক্ষতা দেখিয়েছেন, বাংলা সাহিত্যে তা চিরকালীনভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আমার এই নিবন্ধে আলোচ্য কমলকুমার মজুমদার সম্পাদিত ‘উষ্ণীষ’ পত্রিকা, যার মাত্র পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায়। একেবারে বিস্মৃত এই ইতিহাসটুকু বহু পরিশ্রমে পুনরুদ্ধার করে জ্ঞানপিপাসু পাঠকের সামনে হাজির করেছেন অধ্যাপক জ্যোতিপ্রসাদ রায়। এ নিয়ে গোটা একটা বই রচনা করেছেন তিনি। অত্যন্ত সুদৃশ্য মলাটে গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ‘দরগা রোড’। বাংলা গ্রন্থজগতে এই ধরনের পরিশ্রমী কাজের বহর ক্রমশই কমে আসছে। সেজন্য অধ্যাপক রায়কে অকুণ্ঠ অভিবাদন জানাই।

বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে কমলকুমারের আবির্ভাব ঘটে তিরিশের দশকে, একই সঙ্গে লেখক ও সম্পাদক হিসেবে। পত্রিকার নাম ‘উষ্ণীষ’ (১৯৩৭) বয়স তখন তাঁর ২৩ এবং পত্রিকার সহযোগী হিসেবে প্রথম থেকেই যাঁদের পেলেন তাঁরা প্রত্যেকেই স্বনামখ্যাত। এঁরা হলেন, বরেন বসু, নরেন্দ্রনাথ মল্লিক এবং সহোদর নীরদ মজুমদার। এছাড়া মনীষী চৌধুরী ও আইনজ্ঞ শান্তি চৌধুরীর অবদানও বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। মনে রাখা দরকার বিখ্যাত সাহিত্যিক বরেন বসু ১৯৪২ সালে যুদ্ধে অংশ নেবার আগ পর্যন্ত বরেন্দ্রনাথ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যা হোক, বরেনের আদ্যক্ষর ‘ব’, নীরদের ‘নী’, কমলের ‘ক’ এবং নরেন্দ্রনাথের ‘ন’ নিয়েই তৈরি হয় ‘বনীকন’ শব্দবন্ধটি এবং ওই নামেই শিল্প সাহিত্য চর্চাকেন্দ্র স্থাপন করে সেই সময়কার মজুমদার বাড়ি হয়ে উঠেছিল প্রাণখোলা আড্ডার এক কেন্দ্রবিন্দু। একই নামে গোটা একটা প্রেসের মালিকানাস্বত্ব অধিকার করে ‘উষ্ণীষ’ পত্রিকার অভিযাত্রা (ভাদ্র, ১৩৪৪) শুরু হয়। অভিন্ন ওই চার ইয়ারি সংঘে আসতেন তখনকার দিনের বহু নামি দামি মানুষ। সাহিত্যিক হিসেবে বরেন বসুর পরিচিতি ঘটলেও নরেন্দ্রনাথ মল্লিককে আমরা মনে রাখি নি। সৈনিক চিত্রকর হিসেবে খ্যাত এই মানুষটি জন্মেছিলেন ১৯১০ সালের ১০ অক্টোবর খিদিরপুরের পঞ্চাননতলায়। ছবি আঁকা শিখেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ ও নন্দলাল বসুর কাছে। এছাড়া তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন অসিত হালদার, ও সি গাঙ্গুলী ও ক্ষিতিন্দ্রনারায়ণ মজুমদারকে। ভারতীয় রীতিতে দক্ষ এই চিত্রকর লেখালিখিতেও পারদর্শি ছিলেন। একসময় ‘সাধারণ পাবলিশার্স’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলে অনেক বই প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৪২) তিনিও সাধারণ সৈনিক হিসেবে যুদ্ধে যোগ দেন। দেশে বিদেশে তাঁর ছবি প্রদর্শিত হলেও আজ ইনি বেশিরভাগ মানুষের কাছে অপরিচিত।

‘উষ্ণীষ’ প্রথম সংখ্যা বেরিয়েছিল ১৩৪৪ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে। সম্পাদক হিসেবে ছাপা হয়েছে কমল (কুমার নয়) মজুমদার। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন নীরদ মজুমদার। এই সংখাতেই কমলবাবুর ‘লালজুতো’ গল্পটি ছাপা হয়। শুধু এই গল্প নয়, তিনি ধ্রুবকুমার ছদ্মনামে ‘অজানা’ এবং অনামী ছদ্মনামে ‘উপহাস’ – এই দুটি গল্প লেখেন এতে । এছাড়া কনুদেব ছদ্মনামে ‘রাধিকার প্রতি’ নামে একটি কবিতাও লেখেন। এছাড়া এতে ছাপা হয় নরেন্দ্রনাথ মল্লিকের ‘কল্প-লোক’ নামে একটি কবিতা, বরেন বসুর ‘প্রতিকৃতি’ নামে একটি গল্প, রাজেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণের কাব্যনাট্য ‘আহূতি’। ‘আহূতি’র নীচে ক্রমশ লেখা হলেও পরে এর আর কোনও কিস্তি প্রকাশিত হয় নি। লুইজি পিরানদেল্লোর গল্প অনুবাদ করেছিলেন বাণী মজুমদার, যার প্রথম কিস্তি ছাপা হয়েছিল এই সংখ্যায়। এছাড়া কুমার মণীন্দ্র দেবরায়ের ‘পশ্চিমে বাণী তীর্থে’ শীর্ষক ভ্রমণবৃত্তান্ত, একলব্য শর্মার প্রবন্ধ ‘বাংলার সাধারণ রঙ্গমঞ্চ ও অভিনীত নাটক, ‘ঊনপঞ্চাশী’ শীর্ষনামে রম্যরচনা ও ‘বসন্তলোক’ শিরোনামে বিখ্যাত ব্যক্তিজীবনের কথকতার উন্মোচন– ‘চেঙ্গিজ খাঁর প্রেম (লেখকের নাম নেই) ছাপা হয়েছিল। এই সংখ্যার অন্যতম সেরা আকর্ষণ ছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার। এছাড়া এতে নবীনদের লেখালিখির পাশে বর্ষীয়ান এই মানুষটির সাক্ষাৎকার কিছুটা দলছুট মনে হলেও সম্পাদক হিসেবে কমলকুমার দূরদর্শীতার পরিচয় দিয়েছিলেন। মৃত্যুর মাত্র ছ’মাস আগে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত সাহসী কিছু মন্তব্য করেছিলেন শরৎচন্দ্র। তাঁর সেই অকপট বিবৃতিতে উজ্জীবিত হয়েছিলেন সম্পাদক স্বয়ং এবং অবশ্যই পত্রিকার পাঠকবৃন্দ। ক্রাউন সাইজে ছাপা এই পত্রিকার মূল্য ছিল তিন আনা।

বলা যায় আবির্ভাব সংখ্যাতেই ‘উষ্ণীষ’ তার স্বকীয়তার ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছিল। দ্বিতীয় সংখ্যা ওই বছরেই আশ্বিন-কার্তিক যুগ্ম সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম সংখ্যা আগের মাসেই প্রকাশিত হয়েছিল বিধায় ধরে নেওয়া যায় উদ্যোক্তারা একটি মাসিক পত্রিকাই প্রকাশ করতে মনস্থ করেছিলেন সম্পাদক। কিন্তু যথারীতি কালপ্রবাহের নিয়মে পত্রিকাটি মাত্র পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশের পরেই বন্ধ হয়ে যায়। যদিও অনেকের মতে পত্রিকাটির মাত্র তিনটি সংখ্যা বেরিয়েছিল। গ্রন্থকার জ্যোতিপ্রসাদ আরো দুটি সংখ্যার সূচিপত্রসহ যাবতীয় তথ্যাদি এই বইতে সন্নিবেশিত করেছেন।
দ্বিতীয় সংখ্যা শুরুই হচ্ছে কমলবাবুর কবিতা দিয়ে অবশ্য কনুদেব ছদ্মনামে। কবিতার নাম ‘রাধা’। বাকি দুটি কবিতা লিখেছেন নরেন্দ্রনাথা মল্লিক (খণ্ডিতা) ও বসন্তকুমার মিত্র (আবেদন)। গল্প ছাপা হয়েছিল পাঁচটি। তারমধ্যে একটি কমলবাবুর ( প্রিন্সেস)। অন্য গল্পগুলোর মধ্যে একটির (অলক্ষণা) লেখক বরেন বসু ( তখনও তিনি বরেন্দ্রনাথ), অন্য তিনটি লিখেছেন সুকুমার মিত্র (মনের মত), শান্তি চৌধুরী (প্রায়শ্চিত্ত) ও পরিমল কুমার দত্ত (কলেজিয়া)। বাণী মজুমদারকৃত অনুবাদ গল্প ‘চেঞ্জলিঙ্গ’ এই সংখ্যাতেই শেষ হয়েছে। রম্যরচনা পর্বে বসন্তলোক শিরোনামে বিখ্যাত ব্যক্তিজীবনের কথকতার উন্মোচন অংশে এতে ক্লিওপ্যাটরা নিয়ে লিখেছেন মনীষী চৌধুরী। অন্যটি (ঊনপঞ্চাশী) লিখেছেন ভুবনমোহন ঘোষ। ব্যক্তিগত গদ্য অংশে ‘এপিঠ ওপিঠ’ শিরোনামে লিখেছেন হরেন ঘোষ ও অন্যটির (আবছায়া) লেখক অরুণকুমার চক্রবর্তী। এই সংখ্যায় দুটি প্রবন্ধ ছিল। একটির (লীলাখেলা) লেখক জ্যোতির্ময় রায় অন্যটির (ছউ) হরেন ঘোষ। প্রচ্ছদ একেঁছিলেন নরেন্দ্রনাথ মল্লিক। ক্রাউন সাইজ ছাপা তিন ফর্মার এই সংখ্যার মুল্য ছিল যথারীতি তিন আনা।

তৃতীয় সংখ্যা বেরোতে একটু দেরি হয়। ওই বছরেরই (১৩৪৪ বঙ্গাব্দ) মাঘ মাসে সেটি বেরোয়। পত্রিকার চারটি কবিতার একটি (বঁধু) লিখেছেন নীরদ মজুমদার নীরদেব ছদ্মনামে। অন্য তিনটি কবিতার একটির (স্বপন) লেখক নরেন্দ্রনাথ মল্লিক, আরেকটির (বিংশ শতাব্দী) লেখক বিশু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্যটির (প্রিয়া) কাশীনাথ চন্দ্র। চারটি গল্পের দুটি কমলবাবুর। এরমধ্যে একটিকে (বাঁচা) স্কেচ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাহলে ওটা কি গল্পের খসড়া? অন্যটির নাম মধু। বাকি দুটির একটি (অনুভূতি) লিখেছেন বরেন বসু। তখনও তিনি বরেন্দ্রনাথ। রম্যরচনা ছিল দুটি। একটির (ভূতের মুখে) লেখক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। অন্যটি বসন্তলোক শিরোনামে বিখ্যাত ব্যক্তিদের কথকতার উন্মোচন অংশে ‘ফুলমতী’র লেখক মনীষী চৌধুরী। দুটি প্রবন্ধের একটির (সাহিত্য) লেখক অতীন্দ্রকুমার সিংহ এবং অন্যটির (বিদেশী সাহিত্য) লেখক সুশীলকুমার সেনগুপ্ত। প্রচ্ছদ শিল্পী নরেন্দ্রনাথ মল্লিক এবং ক্রাউন সাইজে তিন ফর্মার এই সংখ্যাটির মুল্যও তিন আনা।
আগেই জানিয়েছি, অনেকের মতে ‘উষ্ণীষ’ পত্রিকার মাত্র তিনটি সংখ্যাই প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু লেখক আরো দুটি সংখ্যার সন্ধান দিয়েছেন। বিলুপ্ত ইতিহাসের গর্ভ থেকে তিনি সেই দুটি সংখ্যারও সূচিপত্র এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন।
চতুর্থ সংখ্যা বেরোয় ওই বছরেরই ফাল্গুন মাসে। এই সংখ্যায় কমলবাবুর ‘আঁখিয়া’ কবিতাটি ছাপা হয়, যদিও কনুদেব ছদ্মনামে। অন্য তিনটি কবিতার একটির (সুজাতা) লেখক নরেন্দ্রনাথ মল্লিক, আরেকটির (শতাব্দ পরে) রাখালদাস চক্রবর্তী এবং অন্যটির (একটি কবিতা) জনক আশু বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনটি গল্পের একটি (মহামানবের জন্ম) লিখেছেন কমলবাবু স্বয়ং। অন্য দুটির একটি (পরস্পর) বরেন বসুর, অন্যটির (সহযাত্রী) লেখক শান্তি বসু। রম্যরচনা বস্তুত আগের সংখ্যার ‘ভূতের মুখে’র দ্বিতীয় কিস্তি এবং ‘ফুলমতী’র শেষ কিস্তি এতে ছাপা হয়েছে। ব্যক্তিগত গদ্য অংশে হরেন ঘোষ লিখেছেন ‘আবছায়া’ শিরনামে। প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল চারটি। সেগুলো যথাক্রমে অবিনাশ ঘোষালের ‘শিল্প’, সুনন্দ দেবের ‘ভারতীয় নৃত্যে মুদ্রার ব্যবহার, শেখর মৈত্রের ‘সঙ্গীতের ধারা ও সুশীলকুমার সেনগুপ্তর ‘স্পানিশ থিয়েটার। প্রচ্ছক এঁকেছিলেন নরেন্দ্রনাথ মল্লিক। ক্রাউন সাইজে ছাপা দুই ফর্মার এই সংখ্যারর মূল্যও তিন আনা।

‘উষ্ণীষ’ পত্রিকার পঞ্চম ও শেষ সংখ্যাটি বেরোয় ১৩৪৪ বঙ্গাব্দের বর্ষশেষে অর্থাৎ চৈত্রমাসে। নীরদেব ছদ্মনামে নীরদ মজুমদার ‘বিরহ’ ছাড়া এই সংখায় মুদ্রিত অন্য কবিতার নাম ‘প্রেম সে-কি পুরাতন। লেখক নরেন্দ্রনাথ মল্লিক। কমলবাবুর ‘সমাহিত’ গল্প ছাড়া এই সংখ্যার অন্য গল্পের নাম ‘প্রিয়া ও জননী’, লেখক বরেন বসু। রম্যরচনা ‘ভূতের মুখে’র তৃতীয় ও শেষ কিস্তি ছাড়া এই বিভাগে মনীষী চৌধুরী লিখেছেন ‘যদুমল্ল’। ‘বসন্তলোক’ শিরোনামে বিখ্যাতদের ব্যক্তিজীবনের কথকতার উন্মোচন উল্লিখিত। ব্যক্তিগত গদ্য অংশে লিখেছেন সম্পাদক স্বয়ং ‘বম্বে’ শিরোনামে আর অন্যটির (আবছায়া) লেখক অরুণকুমার চক্রবর্তী। ‘ইমপ্রিসারিও’ নামে একমাত্র নিবন্ধটি লিখেছেন হরেন ঘোষ। ললিত কলা অংশে লিওনার্দো দ্য ভিন্সিকে নিয়ে লিখেছেন বিজন ঘোষ। প্রকাশ চৌধুরী তিনটি প্রবন্ধের একটি (সাহিত্যের চলতি ধারা) লিখেছেন। ‘নাটকের চলতি ধারা’ নিয়ে লিখেছেন সুশীল সেনগুপ্ত ও শেষ প্রবন্ধটির (গান) লেখক শেখর মৈত্র। এই সংখ্যার প্রচ্ছদ শিল্পীও নরেন্দ্রনাথ মল্লিক। ক্রাউন সাইজে ছাপা আড়াই ফর্মার এই সংখ্যারও মূল্য তিন আনা।

এই সমস্ত তথ্যই পরম যত্নে লেখক জ্যোতিপ্রসাদ তাঁর গ্রন্থে সাজিয়ে দিয়েছেন। লেখক তাঁর মরমী নিবন্ধসমূহের এক জায়গায় ব্যক্ত করেছেন, “…এখন আমরা আশা করতে পারি, আগামীতে ‘উষ্ণীষ’ পত্রিকায় ছড়িয়ে থাকা এই সমস্ত ছোটগল্প, গদ্য-কথিকা, কবিতা রসিক পাঠক-সমালোচকের মনে সঞ্চার করবে নবমূল্যায়নের প্রেরণা এবং সেই সূত্রে বিশেষ করে কমলকুমার মজুমদারের সমগ্র গল্পমালা, যাবতীয় কিংবদন্তীর স্তর অতিক্রম করে হয়ে উঠবে বাস্তব সত্য-তথ্যের অনুসারী। যার মাধ্যমে আগামীদিনে কমলকুমার সম্পর্কিত যে কোনো চর্চা যেমন সঠিক পথে এগিয়ে যাবে; তেমনি অনেক ‘দুর্বোধ্য’ ভাবনার জট, হয়তো অল্প আয়াসেই খুলে গিয়ে ‘লালা জুতো’, ‘সমাহিত’ ইত্যাদি রচনার লেখক হয়ে উঠতে পারেন পাঠকের ‘যাপন’ ক্রিয়ার নিত্যসঙ্গী। মরমের রসকলি। আমরা তাঁর সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একমত।

বাঙালি স্বভাবে যে বিস্মৃতিদোষের অভিযোগ আছে তাকে লেখক খণ্ডন করেছেন তাঁর মেধা ও প্রজ্ঞার প্রলেপে। আমরা তাঁর কাছে ঋণী হয়ে থাকলাম। কমলকুমার মজুমদারের লেখক হয়ে ওঠার পিছনে এই পত্রিকার অবদান অনস্বীকার্য। আমরা মূলত তাঁর পরিণত লেখকসত্তার পরিচয় নিয়েই সতত মগ্ন হই। কিন্তু একজন লেখক তাঁর জীবনের সমস্ত কীর্তি ও কৃতিকে নিয়েই অখণ্ড। তাই কমলকুমারের এই প্রাথমিক পর্বটিকে কিছুতেই উপেক্ষা করা যাবে না। বলাবাহূল্য সেই পর্বটি পরিপূর্ণভাবে আমাদের কাছে হাজির করেছেন লেখক। তাঁকে আমাদের বিনম্র ধন্যবাদ।