চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৭৪॥ সুশীল সাহা


হারানো প্রাপ্তি


খবরের কাগজে একসময় বিজ্ঞাপন দেখতাম ‘হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ’, হয়তো এখনও বেরোয়। কার কী আই কার্ড হারিয়েছে, কিংবা জরুরি কিছু নথিপত্র, তার বিজ্ঞাপন অনেক দেখেছি। কেউ কেউ বিজ্ঞাপন দিয়েছেন প্রাপ্তির, হয়তো কথা বলতে না পারা একটি বাচ্চা মেয়ে বা ছেলে কেউ পেয়েছে কিংবা একটা মানিব্যাগ বা এটাচি কিংবা কেউ পেয়েছে ঘড়ি, কলম বা অন্য কোনও দামি জিনিস। তবে বয়স্ক হারিয়ে যাওয়া মানুষের বিজ্ঞাপন দেখেছি অনেক। আজও চলতে ফিরতে এমন হ্যান্ডবিল অনেক চোখে পড়ে। এদের বেশিরভাগ মানসিক ভারসাম্যহীন। আমরা সবাই কোনও না কোনও সময়ে কিছু না কিছু হারিয়েছি। ফেরৎ পেয়ে কত না আনন্দ হয়েছে আমাদের! তবে রাস্তাঘাটে পথ চলতি হারানো জিনিসের প্রাপ্তি হয়েছে খুব কম। জীবন থেকে প্রতিনিয়ত যে সময়টা হারিয়ে যাচ্ছে, তা তো আর ফিরে আসেনা। সেই অর্থে আমরা যারা গোটা একটা দেশকে হারিয়েছি তাদের যেন আর হারাবার কিছু নেই। অত বড় একটা ক্ষতি কেমন হাসিমুখে মেনে নিয়েছি আমরা! তবে এত সব তত্ত্বকথার মধ্যে আজ আর যাব না। আজ লিখছি একটি হারানো ও তার চমকপ্রদ ফিরে পাবার অভিজ্ঞতা।

বছর তিরিশেক আগের কথা। তখন আমি নিত্যদিন ট্রেনে যাতায়াত করি। কর্মস্থল কলকাতা। হৃদয়পুর থেকে বারাসাত লোকাল ধরি। চেনা কিছু মানুষের সঙ্গে হৈ হৈ করতে করতে শিয়ালদহ পৌঁছে যাই। সেদিন যথারীতি ট্রেনে উঠেছি। সঙ্গে ছিল অফিসের ব্যাগ, যার মধ্যে থাকত ছাতা, টিফিন বাক্স, বইপত্র ইত্যাদি। সেদিন সঙ্গে একটা বাড়তি ঝোলা ব্যাগও নিয়েছি, যার মধ্যে ছিল বেশ কয়েকটা সিডি ও বন্ধু সুরঞ্জনের লেখা সদ্যপ্রকাশিত একটি বই। সেদিন ট্রেনে বেশ ভিড় ছিল। ট্রেনে উঠে কোনওরকমে ব্যাগদুটো বাঙ্কে রাখলাম। যত ভিড়ই হোক, আমাদের গল্পগুজবের কোনও খামতি ছিল না সেদিনও। সময়টা কীভাবে যেন কেটে গেল। ট্রেন এসে দাঁড়াল শিয়ালদায়। আমরা সবাই যথারীতি হুড়মুড় করে নেমে গেলাম। শীতের দিনে আমি সাধারণত হেঁটেই অফিসে যেতাম। শিয়ালদা থেকে আমাদের লিন্ডসে স্ট্রিটের অফিসে যেতে লাগত আধ ঘন্টা। সেদিনও হাঁটতে লাগলাম একা একাই। স্টেশন চত্বর ছেড়ে অনেকটা এগিয়ে গেছি, এমন সময় মনে পড়ল সেই বাড়তি ব্যাগটা তো নিয়ে আসিনি! বুকটা ধক করে উঠল। এইরে! ওরমধ্যে যে অনেকগুলো সদ্য রেকর্ডকৃত মূল্যবান সিডি রয়ে গেছে! অতিদ্রুত পা চালালাম স্টেশনের দিকে। প্লাটফর্ম চত্বরে পা দিয়েই বুঝলাম শুধু শুধুই আমি এসেছি এখানে। সেই ট্রেন কখন চলে গেছে। তবু গেলাম সেই প্লাটফরমে। দেখলাম, কোনও ট্রেন দাঁড়িয়ে নেই আমার জন্যে। খুবই ভগ্ন ক্লান্ত হতোদ্যম হয়ে স্টেশন মাস্টারের কাছে গেলাম। তিনি সব শুনে খুবই উদাসীন ভঙ্গিতে বললেন, আগে অনেক কিছুই খোয়া জিনিস জমা পড়ত, এখন তো কেউই কোনও পরিত্যক্ত জিনিসে হাত দেয়না ভয়ে। কী জানি কোনও বিস্ফোরক কিছু আছে কিনা। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর বোধহয় একটু করুণা হয়। সান্ত্বনা দেবার ছলে বললেন, নাম ঠিকানা ফোন নম্বর ইত্যাদি রেখে যান। খবর পেলেই জানাব। বুঝলাম কোনও আশা নেই। অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাসে চেপে কোনওরকমে অফিসে পৌঁছালাম। কাজে মন বসছিল না। দু’একজন সহকর্মীকে বললাম ব্যাপারটা ভারমুক্ত হবার আশায়। তারা কিছু বাঁধা বুলি আউড়ে গেল।

এইভাবে দুপুরের টিফিনের সময় এসে গেল। এমন সময় একটা ফোন এল। ছুটে গিয়ে ধরলাম। ফোন করেছে বন্ধু সুরঞ্জন। বলল, ‘তোমার কিছু হারিয়েছে’? আমি সবটা খুলে বললাম। ও আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে একটা ফোন নম্বর দিয়ে বলল, এই নম্বরে এক্ষুনি ফোন করো। বলেই একটা নম্বর দিলো। আমি আর কালবিলম্ব না করে ওই নম্বরে ফোন করলাম। আমি দেখেছি, খুব প্রয়োজনের সময় ফোনের সংযোগ সহজে হতে চায় না। এবারও ঠিক তাই হল। তবে তিন/চারবারের চেষ্টায় সংযোগ হল। ওপার থেকে একটা ভারি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। আমি পরিচয় দিতেই বললেন, আপনার জিনিসটা বহাল তবিয়তেই আছে। আপনি বেলা পাঁচটার মধ্যে চলে আসুন। ঠিকানাটা দমদম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের কাছে। প্রতিষ্ঠানের নাম ‘হেলথ ইনস্টিটিউট’। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে ওটা ওঁর কাছে গেল। উত্তরে ভদ্রলোক একটু রহস্যের হাসি হেসে বললেন, সটান চলে আসুন, দেখা হলে সব বলব। আমি আর দেরি করলাম না। তিনটে নাগাদ অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম। লিন্ডসে স্ট্রিট থেকে শিয়ালদা হয়ে ট্রেন ধরে ওখানে পৌঁছাতে বেলা সাড়ে চারটে হয়ে গেল তবু। ভদ্রলোকের চেম্বারে গেলাম। হাসি হাসি মুখে তিনি আমাকে অভ্যর্থনা করলেন। দেখলাম যতটা গম্ভীর তাঁর গলা, ততটা ভারিক্কি তিনি নন। আমাকে বসিয়ে এক কাপ চা খাওয়ালেন। তারপর অনতিদুরে রাখা আমার সেই হারিয়ে যাওয়া ব্যাগটা দেখিয়ে বললেন, দেখুন তো চিনতে পারেন কিনা! আমি তো বিস্মিত। তিনি বললেন, আগে দেখুন সব ঠিক আছে কিনা! অবশ্য ওইসব জিনিসের কদর তো সবাই করে করে না! সেই জন্যেই পেলেন মনে হয়। আমি প্রায় ধৈর্যহারা হয়ে তাঁর কাছে শুনতে চাইলাম ওটা ওঁর কাছে আসার বৃত্তান্ত। এবার তিনি আমাকে শান্ত করে সবিস্তারে যা বললেন, তা নীচে লিখছি সংক্ষেপে।

ওই ব্যাগটা পায় ওই প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণির কয়েকজন কর্মচারি, যারা ওই ট্রেনেই আসছিল তাদের কর্মস্থলে। ব্যাগটা নিয়ে অফিসে একটু শোরগোল শুনতে পান ভদ্রলোক অফিসে ঢোকার মুখে। তিনিই ওদের কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে আসেন তাঁর চেম্বারে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের একজন বড় মাপের অফিসার। তিনি ওই ব্যাগে রাখা সুরঞ্জনের বইটা দেখে চেষ্টা করেন কোনও একটা হদিশ বার করতে। অনেক ভেবেচিন্তে উৎসর্গ পত্রে লেখা শমিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম দেখে তাঁর ফোন নম্বর সংগ্রহ করেন নন্দন-এ ফোন করে। শমিকবাবু সুরঞ্জনের ফোন নম্বর দেন। তারপর সুরঞ্জন সবটা জেনে আমাকে ফোন করে।

সবটা শুনে আমি তো বিস্মিত ও হতবাক। ব্যাগটা নিয়ে সেই কর্মীদের কিছু একটা দিতে চাইলাম। ভদ্রলোক ওদের একজনকে ডাকলেন। হাসিমুখে বললেন, দিচ্ছেন, দিন, তবে না দিলেও চলত। আমি একজনের হাতে পঞ্চাশ টাকা গুঁজে দিয়ে কোনওরকমে ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। তারপর বাস ধরে সন্ধ্যায় পৌঁছালাম সব্যসাচীর বাড়িতে। ওঁর জন্যে নিয়ে যাওয়া সিডিগুলো দিলাম। ঠিকমতো কথা রেখেছি বলে ওঁর মুখে তখন আমার অজস্র সুখ্যাতি।
ওঁকে অবশ্য জানতেই দিলাম না, এই কথা রাখার জন্যে আজ কী কী অভিজ্ঞতা হয়েছে!
আহা, কী নিদারুণ সেই অভিজ্ঞতা!