চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৭৫॥ সুশীল সাহা



পরম্পরা

কারো সঙ্গে কথা বলা ব্যাপারটা এখন আর কোনও সমস্যাই নয়। মোবাইল যন্ত্রটি হাতে নেই এমন মানুষ এখন খুঁজে পাওয়াই দুস্কর। কাছে দূরে যখন খুশি, যাকে খুশি পেয়ে গেলেই হল। প্রায় নিখরচায় ভিডিও কলও করা যায়। অথচ এই সেদিনও ফোনের লাইন পাওয়া ছিল এক ভাগ্যের ব্যাপার। লাইন পেলেও কথা হতে হতে প্রায়শই কেটে যেত। আর দূরের কারো সঙ্গে কথা বলতে গেলে ট্রাঙ্ক কল করে কথা বলতে হত। সে এক রীতিমতো ঝক্কি। কল বুক করে অপেক্ষা এবং অপেক্ষা এবং তারপর কোনও এক মাহেন্দ্রক্ষণে লাইন হয়তো মিলল কিন্তু লাইন মিললেও কথা স্বচ্ছন্দে বলা যেত, তাতো নয়। অনেক সময় প্রায় চিৎকার করেও কথা বলতে হত। অথচ এখন একটু ইচ্ছে জাগলেই হল। কাছে দূরে যার সঙ্গে কথা বলা যায়। অনর্গল।

সেদিন কী একটা বই পড়ছিলাম। হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল। ঢাকা থেকে বন্ধু ওয়াসির ফোন। বলল, এখন বেশি কথা বলব না। মেসেঞ্জারে একটি ছোট্ট ভিডিও পাঠিয়েছি। ওটা আগে দেখুন, তারপর কথা হবে। ফোনটা ছেড়েই খুললাম মেসেঞ্জার। প্রথমেই কানে এলো একটি অতি পরিচিত গান, ‘আমি বাংলায় গান গাই’। বছর দশেকের একটি মেয়ে গাইছে। বাংলা গান, অথচ উচ্চারণে একটু ইংরেজিয়ানা– বলা ভাল ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় গানটা হচ্ছে আর তার সঙ্গে হাত পা ছুড়ে নাচছে ছোট্ট একটা মেয়ে। বয়স কতই বা হবে! পাঁচ কিংবা ছয়। লম্বা গান কিন্তু পুরো গানটাই মুখস্থ গাইল মেয়েটা। আমি একটু বিহবল হয়ে কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে রইলাম। গান ও নাচ শেষ হলে ওয়াসি বলল গান গেয়েছে ওদের বড়ো নাতনি সোরা আর নেচেছে মেজ নাতনি আরিয়া। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উদযাপনে বিভিন্ন দেশের ভাষার এক ঘরোয়া নৃত্যগীতের আসর বসেছিল ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের এক শহরে। নানান দেশের মানুষেরা একসঙ্গে হয়েছে এক ঘরোয়া আসরে। সেখান থেকেই পাঠানো এই নৃত্য ও গীতের তাৎক্ষণিক ভিডিও। ততক্ষণে আমি চলে গেছি আমার অনতি অতীতের সোনালি কয়েকটি দিনে। স্মৃতির পথ বেয়ে উঠে আসতে থাকল প্রায় ভুলে যাওয়া কিছু দৃশ্যের স্মৃতি। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে বিস্ময়ের পরত!

১৯৯৪ সালে বেরিয়েছিলে প্রতুল মুখোপাধ্যেয়ের ক্যাসেট ‘যেতে হবে’। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের ‘তোমাকে চাই’-এর জ্বরে প্রায় ভূতগ্রস্ত যখন বাংলার সংগীতপিপাসু মানুষজন তখন যেন অন্য আরেক দমকা হাওয়ার স্রোত বইয়ে দিয়েছিল প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের এই গানের ডালি। কালক্রমে একে একে বাংলা গানের জগতে আপন আপন গানের সম্ভার নিয়ে হাজির হলেন নচিকেতা, পল্লব কীর্তনীয়া, কাজি কামাল নাসের, তপন সিনহা, মৌসুমি ভৌমিক এবং আরো অনেকে। বাংলা গানের জগতে এলো এক নতুন উন্মাদনা, বলা যায়, প্রাণবন্যার নতুন ঢেউ। না সেইসব গান নিয়ে সালতামামি করতে বসিনি আজ। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের একটি অবিস্মররণীয় সৃষ্টি ‘আমি বাংলায় গান গাই’-এর প্রসঙ্গসূত্র ধরে কয়েকটি কথা বলতে চাই। অচিরেই ওই গানটা যেন কীভাবে অতিদ্রুত মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকল। অনেক লম্বা গান। কিন্তু এতটাই তার মর্মস্পর্শী সুর ও কথা যে কয়েকদিনের মধ্যেই গানটা আমার তোলা হয়ে গেল। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, কেবল ওই গান নয়, ওই ক্যাসেটের অনেক গানই আমাদের অনেকের ভাল লেগে গিয়েছিল। যা হোক, ভাল গাই কিংবা মন্দ গাই এইসবের তোয়াক্কা না করে ওই গানটা তখন যেখানে সেখানে গাইতাম। ইতঃমধ্যে গানটা পৌঁছে গেছে বাংলাদেশে। ওখানকার একটি টিভি চ্যানেলে একজন গায়কের গাওয়া ওই গানের সঙ্গে একটা ভিডিও প্রায়শই দেখানো হত ফিলার হিসেবে। তখন কিছুদিন গানটি সেই গায়কের গান হিসেবেও লোকেরা জানত। তবে এসব কাণ্ডকারখানা ঘটার আগে ওই গান আমি ঢাকার এক বাড়িতে ঘরোয়াভাবে গেয়েছিলাম কয়েকজনের সামনে। আমার এই আখ্যানের শুরু এখান থেকেই।

১৯৯৫ সালের কোনও একসময় সস্ত্রীক ঢাকায় গিয়েছিলাম। ঢাকায় তখন অনেক নবীন বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়েছিল শ্রদ্ধেয় হাসান আজিজুল হকের সৌজন্যে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাসরীন জাহান, ওয়াসি আহমেদ, মঞ্জু সরকার, নাঈম হাসান প্রমুখ। স্ত্রী ও কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে তখন অনেকের বাড়িতে যেতে হয়েছিল। যাওয়া মানেই গল্প হাসি ঠাট্টা আর গান সঙ্গে বহুবিখ্যাত বাংলাদেশের অতিথি আপ্যায়নের ঘটা লেগেই থাকত। আমাদের একমাত্র সন্তান রাকা তখন খুবই ছোট। ছোট হলেও সে তখনই সুমনের তোমাকে চাই গানটা একটানা পুরো গাইতে পারত। এমনকি খুব সাবলীলভাবে গাইতে পারত প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের ওই গানটাও। কখনও কখনও আমরা দুজনে একসঙ্গে ওই গানটা গাইতাম। যা হোক ওয়াসিদের বাসায় যেদিন যাই সেদিন আমি একাই গানটা গাই। ওয়াসির মেয়ে সৌতি গানটা খুব মন দিয়ে শুনেছিল। আমরা চলে যাবার পরে নাকি গানটা গুনগুন করতে থাকে অনেকক্ষণ। ওর ওই আগ্রহের কথা পরে ওয়াসির কাছে শুনে দেশে ফিরে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের ক্যাসেটটা পাঠিয়ে দিই। পরে শুনেছি, ক্যাসেটটা পাবার পরে ছোট্ট সৌতি অনেক অনেকবার শুনেছে ওই গানটা। তারপর নানান জায়গায় গোটা গানটা মুখস্থ গেয়ে শোনাত মেয়েটা। ছোট্ট একটা মেয়ের মুখে অত লম্বা গানটা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হত শ্রোতারা।

এর পরের আখ্যান অতি সংক্ষিপ্ত। একসময় সৌতির বিয়ে হয়। স্বামীর ঘর করতে পাড়ি জমায় সুদূর আমেরিকায়। ওই গানটা সে কিন্তু ভোলেনি। বড়ো মেয়ে সোরাকে সে শিখিয়েছে। গানের সঙ্গে নাচটা শিখিয়েছে মেজ মেয়ে আরিয়াকে। সেদিনের সেই সেই মেসেঞ্জারে ভিডিওর নেপথ্য বৃত্তান্ত এখানেই শেষ।
মনে মনে ভাবি ওই গান হয়তো সোরার মেয়েও শিখবে, তারপর তার সন্তান। এবং এইভাবেই চলতে থাকবে আমাদের এক অদৃশ্য পরম্পরা।
হয়তো আমাদের মেয়ে রাকা তার সদ্যোজাত পুত্রসন্তানকে একদিন ওই গানটা শেখাবে। সে হয়তো শোনাবে অন্যদের। তাদের কেউ কেউ অন্যদের। তারপর!
‘তার আর পর নেই নেই কোনও ঠিকানা
যা কিছু গিয়েছে থেমে যাক থেমে যাকনা !’