চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৭৬॥ সুশীল সাহা


হরিদাসপুর থেকে বোমাসান্ড্রা


বনগাঁর পেট্রাপোল রেল স্টেশন যেখানে সেখানকার অপর নাম হরিদাসপুর। কে এই হরিদাস? ইনি হলেন গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর অতিপ্রিয় সহচর। বিখ্যাত হয়েছেন যবন হরিদাস নামে। জন্মেছিলেন এই অঞ্চলে। হরিনাম যজ্ঞের অন্যতম ঋত্বিক এই ভক্তের নামাঙ্কিত এই স্থান এখন ভারত–বাংলাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত। এই লেখার যাত্রাশুরু এখান থেকেই কয়েক বছর আগে। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক আসবেন এখান দিয়ে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। হৃদপিণ্ডের কঠিন অসুখের জন্যে যাবেন ব্যাঙ্গালোরে। আমাদের গন্তব্য ওখানকার এক হাসপাতাল যেখানে আছেন স্বনামখ্যাত দেবী শেঠীর মতো ডাক্তার। এক বুক শঙ্কা নিয়ে শারদীয় পুজোর সময়ে আমাদের গন্তব্য কর্ণাটক। শরতের এক আলো ঝলমল সকালে আমরা পৌঁছালাম যশবন্তপুরম স্টেশনে। সেখান থেকে আমরা যাব শহরের আরেক প্রান্তে বোমাসান্ড্রা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় যেখানে রয়েছে ওই হাসপাতাল, যার খুব কাছে আছে কয়েকটি অতিথিশালা যার একটিতে আমরা থিতু হলাম। আহামরি কিছু নয়, একেবারেই মধ্যমানের তায় তার নাম শান্তিকেতন। অবশ্য কন্নর উচ্চারণে শান্থিনিকেতন।

পাশেই রয়েছে অনলাইন স্যুটস নামে আরেকটি অতিথিশালা। সেটা বেশ ছিমছাম, আয়োজন এলাহি, ভাড়াও অনেক। সংলগ্ন সবুজ গালিচামোড়া লন দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। সেখানে আবার বেশ কয়েকটি গার্ডেন চেয়ার পাতা, মাথার ওপর বিশালাকায় ছাতা। দুই অতিথিশালার মাঝখানে একটিই রেস্তোরা। নাম মেগাবাইট। কম্পিউটার কারবারের পীঠস্থানে বেশ তাৎপর্যময় নামকরণ। আমরা ভাগ্যক্রমে তিনতলা বাড়ির দোতলায় দক্ষিণ পূর্ব কোণের একটি চমৎকার ঘর পেয়ে গেলাম। ভাড়া তিনজনের জন্যে দৈনিক মাত্র তিনশো পঁচিশ টাকা। আর পঁচিশ টাকা দিলে থালাবাসন ও গ্যাসসহ রান্নাঘর ব্যবহার করতে পারতাম। সারাক্ষণ জল, বিদ্যুৎ ও লিফটের ব্যবস্থা আছে। প্রশস্ত করিডোরগুলো যেভাবে দু’বেলা ঝাড়পোঁছ করে মোছা হত তা দেখে মনে হয়েছে কেবল ব্যবসা নয়, কোথায় যেন একটা সেবার মনোভাব প্রচ্ছন্নভাবে রয়েছে। হৃদপিণ্ডের চিকিৎসা করাতে এসে থাকার এমন সুন্দর ব্যবস্থা দেখে স্বভাবতই আমাদের মনমেজাজ খুব খুশি। তার ওপর মনোরম আবহাওয়া, শরতের নীল আকাশ এখানেও। চারদিকে দূষণের কোনও নামগন্ধ নেই। কোথায় ছিলাম আর কোথায় এলাম!

পরদিন আমরা তিনজনে হাসপাতালে গেলাম। আমাদের অতিথিশালা থেকে খুব কাছেই ওই কমপ্লেক্স। গেটে দাঁড়ানো দু’জন কন্নর কন্যা, হাতজোড় করে সবাইকে অভ্যর্থনা করছে। অভ্যাগতদের দিকে উৎসুক নয়নে ওঁরা তাকিয়ে আছে। কিছু একটা জিজ্ঞেস করলেই হল, গড়গড় করে ওঁরা উত্তর দেয় ইংরেজি বা হিন্দিতে। কোথায় পাওয়া যাবে দুপুরের খাবার কিংবা চা কফি তাও তাঁরা বলে দেয়। এমনকি প্রার্থনা করার জন্যে সংলগ্ন মসজিদ বা মন্দিরের খোঁজও দিয়ে দেয় তাঁরা। হাসপাতালে ঢোকার মুখে এই উপাসনা গৃহ সম্পর্কে দু’একটি কথা বলতেই হবে। একটি ছোট্ট বৃত্তাকার গৃহকে চারভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেখানে চারটি প্রধান ভারতীয় ধর্মের সহাবস্থান। হিন্দু, মুসলিম, শিখ ও খৃষ্টান। প্রশ্ন উঠতে পারে কেন নেই জৈন, বৌদ্ধ কিংবা পার্শীদের জায়গা! আসলে যে কেউ যেখানে খুশি বসতে পারেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, ‘ধ্যান করবে মনে, বনে কিংবা কোণে’ বোধহয় এই দর্শনটাই ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মনে কাজ করেছে। কার্যত দেখলাম সবগুলো ঘরেই মানুষজন বসে আছে। অখণ্ড ভারতে এই বাস্তবতা সেইভাবে বিরাজ করলে দেশভাগ হয়তো হতই না। এসব এখন যদিও অলস কল্পনা।

হাসপাতালে ঢুকে প্রথম কাজ নাম নথিভূক্ত করা। রোগীর কাগজপত্র দেখে কর্তব্যরত ডাক্তার কতগুলো পরীক্ষা করার নিদান লিখে দিলেন। এ ঘর সে ঘর ঘুরে সেগুলোর কাজ শুরু হল। কোথাও কোনও অপেক্ষার ব্যাপার নেই। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে একই ব্যবস্থা। ইতঃমধ্যে হাসপাতালের ভিতর স্থাপিত বিশাল বিষ্ণুমূর্তির ভাস্কর্য চোখে পড়ল। অপরূপ তার কারুকাজ। শিল্পীর নাম লেখা নেই। কে বা কারা কতদিনে এই মূর্তি তৈরি করেছেন জানি না। অপূর্ব সেই শিল্পকীর্তি। তবে কাজটা মনোলিথিক নয়। অতি সূক্ষ্মভাবে কয়েকটা জো্ড়া দেওয়া হয়েছে। ওই মূর্তির সামনেই অপেক্ষাকৃত ছোট একটা গনেশ মূর্তি। তার সামনে একটি পাত্রের মধ্যে জলে ভাসমান নানা বর্ণের ফুল। দক্ষিণীরা ফুলের খুব কদর করে। নানারকমভাবে তারা ফুলের ব্যবহার জানে। পাশেই রয়েছে বিশাল এক দানপাত্র সেটিতে উপচে পড়ছে দশ/বিশ/ পঞ্চাশ বা একশো টাকার নোট। কয়েকটা পাঁচশ টাকার নোটও দেখলাম। বিষ্ণুমূর্তির পিছনেই শিব-পার্বতীর একটি অনন্য ভাস্কর্য। তার সামনেই হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীযুক্ত বাবু নারায়ণের মূর্তি। ইতি বিখ্যাত নারায়ণ গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির কর্ণধার। জনান্তিকে জানলাম সম্পর্কে ইনি ডাক্তার দেবী শেঠির শ্বশুর হন। হাসপাতাল যে নামেই হোক না কেন, সবাই একে দেবী শেঠীর বলেই জানে। চিকিৎসা করাতে এসে বেড়াবার প্রফুল্লতা নেই কারো মনে। একটু লক্ষ্য করে দেখলাম বেশিরভাগ মানুষের মুখ বিষণ্ণতায় ভরা। বিশেষ করে মেগাবাইট রেস্তোরায় কিছু খাওয়ার জন্যে গেলেই দেখতাম দু’জন সবল সুস্থ মানুষের পাশে একজন স্বাস্থ্যহীন মানুষ বসে আছেন পাণ্ডুর মুখে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি কোনওদিন। কেননা জানতাম কেউ এখানে বেড়াতে আসে না। খেতে হয় তাই খাচ্ছেন কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ আসন্ন ভবিতব্যের দুশ্চিন্তায় কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে আছেন। তবু আমাদের সঙ্গী যে হাসানভাই! তাঁর রোগের নিরাময়ের জন্যে এখানে এলেও তাঁর চোখেমুখে কোনও উদবেগ বা আশঙ্কার চিহ্নমাত্র নেই। জীবনরসিক এই মানুষটা যে সবকিছু অবলোকন করেন নিরাসক্ত মন নিয়ে। তাই তো তিনি লিখতে পেরেছেন ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’-এর মতো গল্প। ‘আমৃত্যু আজীবন’, জীবন ঘষে আগুন’, কিংবা ‘বিধবাদের কথা’র মতো এপিকধর্মী আখ্যান। আমরা তাই চিকিৎসা পর্বের সময়টুকু বাদ দিয়ে বেরিয়ে পড়ি এক সময়ের মহীশূর তথা আজকের কর্ণাটকের রাজধানী ব্যাঙ্গালোর অর্থাৎ বেঙ্গালুরু দর্শনের উদ্দেশে। বোমাসান্ড্রা থেকে ম্যাজেস্টিক যাকে ওখানকার এসপ্লানেড বলা যায়, তার দূরত্ব দেড় ঘন্টার। এসি বাসে মাথাপিছু ভাড়া পঞ্চাশ টাকা। আমরা তিনজন তিনটে জানালার পাশের সিটে একদিন সকালে রওনা হলাম ওই ম্যাজেস্টিকের পথে। যান জটহীন চওড়া রাস্তা। গাড়ি চলেছে আপন বেগে। আমরা বাস থেকেই দেখছি আধুনিক ভারতের ঝাঁ চকচকে এক সর্বাধুনিক শহর। বহুতল বাড়ি তেমন চোখে পড়ল না। তবে যা চোখে পড়ল তার সৌকর্য অসাধারণ। আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের নমুনা চতুর্দিকে, ইলেকট্রনিক সিটিতে তার সংখ্যাধিক্য চোখে পড়ার মতো। তবে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর ব্যাপার হল যতই মূল শহরের দিকে এগোচ্ছি ততই গাছপালার সংখ্যা যেন বাড়ছে। বেশিরভাগই শতাব্দীপ্রাচীন। আবহাওয়া চমৎকার। মধ্য অক্টোবর মাসের রোদ ঝলমলে দিনের তাপমাত্রা ২৫/২৬ ডিগ্রি। শরীরে এক ফোঁটা ঘামের দেখা নেই।

আমরা ব্যাঙ্গালোর শহরে গিয়ে প্রথমেই গেলাম ইতিহাসের এক মহানায়ক টিপু সুলতানের প্রাসাদ দেখতে। কাঠ ও পাথরের অপূর্ব সমন্বয়ে তৈরি শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত দুশো বছরের সেই প্রাসাদ এখন ভ্রমণার্থীদের অবশ্য দ্রষ্টব্য। প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে কত মানুষ এখানে আসেন। গোটা ভারতবর্ষে যখন গেরুয়া রঙের রমরমা, কর্ণাটক বিধানসভায় যখন পদ্মফুলের একচ্ছত্র আধিপত্য তখনও যে এখানে এই বিজাতীয় নায়কের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাসাদ পরম যত্নে সুরক্ষিত দেখে স্বস্তি পাই। বামিয়ান তো অনেক দূরের ব্যাপার… অযোধ্যা কাণ্ড তো এই দেশেই ঘটে গেছে।

যাদুঘর দেখার সখ আমার বরাবরের। আর এটা ভাল করেই জানি প্রত্যেক বড় শহরে সরকারি যাদুঘর থাকবেই। খুঁজে খুঁজে আমরা গেলাম ওখানকার যাদুঘরে। দেখলাম সেটা খুব একটা বড় কিছু নয়। তবু মহীশূরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নানা উপকরণ সুন্দরভাবে সাজানো রয়েছে। দেখলাম শ্রীরঙ্গমপত্তন কেল্লার একটা ছোট্ট মডেল রয়েছে। মডেল তো নয়, যেন গোটা একটা শহর।
যাদুঘরের পাশেই ভেঙ্কাটাপ্পা আর্ট গ্যালারি। অবনীন্দ্রনাথের ছাত্র কে ভেঙ্কাটাপ্পাকে (১৮৯৮-১৯৬৫) কর্ণাটকের সরকার যোগ্য সম্মান দিয়েছেন। একজন শিল্পীর নামে এতবড় একটা গ্যালারি, ভাবলে অবাক হই। কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের ছাত্র এই গুণী শিল্পীর সতীর্থ ছিলেন সমরেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার এবং নন্দলাল বসুর মতো শিল্পীরা। সমগ্র গ্যালারি জুড়ে শিল্পীর তৈরি প্রচুর ভাস্কর্য ও ছবি। ভাল লাগে গ্যালারির প্রবেশ মুখে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষমূর্তি দেখে।
ব্যাঙ্গালোরকে সাজানো বাগানের শহর বলা হয়। সেটা যে কেবল বৃন্দাবন গার্ডেনের অসাধারণ শিল্প সৌকর্যের জন্যে নয়, বুঝতে পারলাম মূল শহরে ঢুকে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে যে বিশাল বিশাল বৃক্ষরাজির সমারোহ দেখেছি তা ভূ ভারতে আর কোথাও আছে কিনা জানি না। শহরের মধ্যে বাঁশঝাড়, ডোবা, ছায়া সুনিবিড় ছোটখাট প্রান্তর, সত্যিই অকল্পনীয়। অথচ কোথাও ঝরাপাতার লেশমাত্র নেই। চতুর্দিকে ছড়ানো ছিটোনো সবুজ গালিচামোড়া জায়গাগুলোয় অনায়াসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। লোহার ফেন্সিং দিয়ে ঘেরা বাগানগুলো ওই সুন্দর শহরের সম্পদ– এ কথা বুঝেছে ওখানকার সাধারণ মানুষ থেকে সরকার, এটাই সবচেয়ে বড় কথা।

ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে গেল মনে হয়। এসেছিলাম হাসানভাইয়ের চিকিৎসার জন্যে, তার বিবরণ না দিয়ে ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখতে বসে গেলাম। আসলে বিখ্যাত শল্য চিকিৎসক দেবীপ্রসাদ শেঠীর দেখা পাবার জন্যে আমাদের বেশি কাঠখড় পোড়াতেই হয়নি। ওখানে যাবার দ্বিতীয় দিনেই তাঁর দেখা পেয়ে গেলাম। আমাদের আগে ওখানে ঢুকেছিল মেদিনীপুরের এক দরিদ্র পরিবার। শতচ্ছিন্ন পোশাক পরা এক দম্পতি, তাদের কোলে এক শিশু। রোগী তাদের বছর দশেকের ছেলে। কোলের বাচ্চাটিকে সামলাতে হিমসিম খাচ্ছিল তার মা। আমরা যখন ঢুকলাম তখন ওদের সাক্ষাৎকার প্রায় শেষ। দেখলাম মহিলাটি ডাক্তারের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। দুর্বোধ্য ভাষায় কী বলছিলেন সেটার কিছুই না বুঝলেও ডাক্তার দেবী শেঠীর আশ্বাসবাণীতে বুঝলাম ছেলের অপারেশানের পর্যাপ্ত অর্থের কিছুই ওদের নেই। তাছাড়া দরিদ্র-পীড়িত মানুষের আর্তস্বরের ওই ভাষা কে না বোঝে! ডাক্তার তার মাথায় হাত বুলিয়ে পরিস্কার হিন্দিতে শান্ত নম্র ও মমতাময় কণ্ঠে জানালেন ওর চিকিৎসা হবে নিখরচায়। চোখের সামনে ঘটে গেল এক অনন্য দৃশ্য। আমরা বিস্মিত ও হতবাক হয়ে গেলাম। এরপর ডাক্তার শেঠী আমাদের কথা শুনলেন, দেখলেন সবরকম টেস্টের ফলাফল। হাস্যোজ্জ্বল তাঁর মুখাবয়ব। হাসানভাইয়ের অর্ধেক রোগ সেরে গেল যেন।

পরদিন হাসানভাইয়ের ‘হার্ট স্ক্যান’ করা হল ডাক্তার শেঠীর পরামর্শ মেনে। রিপোর্ট পাব পরদিন। সেই রিপোর্ট নিয়ে অন্য ডাক্তারের শরণ নিতে হবে। মাঝে একটা দিন ফাঁকা পাওয়া গেল। গেলাম আবার শহরে ওঁদের দু’জনের ‘রেসিডেন্ট পারমিটে’র জন্যে। গেলাম পুলিশ কমিশনারের অফিসে। এসব ব্যাপার মানেই অকারণ বিরক্তি আর নাজেহাল হওয়া অন্তত আমাদের পশ্চিমবঙ্গে। সেই ধারণাটা অবশ্য এখানে এসে একেবারে বদলে গেল। দেখা পেলাম বহু বিদেশির। জাপানি, ইতালিয়, ইরানি, পাকিস্তানি, স্প্যানিশ আর বাংলাদেশি তো ছিলই। কাজ হয়ে গেল খুব সুশৃঙ্খলভাবে। না, কাউকে উৎকোচ দিতে হল না। পুলিশ মানেই তো আমাদের মনে সব সময় এক অস্বস্তি আর আতঙ্ক। এখানে তার তিলমাত্র নেই। আশ্চর্য! যথাসময়ে পারমিট হাতে এল।

পরদিন আবার দেবী শেঠীর শরণ নেওয়া, বিদায়ী সাক্ষাৎ। আবার সেই স্বর্গীয় অনুভবে ভরা কয়েকটি মিনিট। না, এ যাত্রায় অপারেশন করতে হবে না। এক বছর পরে এনজিওগ্রাম করে সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি। অতএব এবারের মতো পালা সাঙ্গ করে ঘরে ফেরা। ফেরার টিকিট কাটতে গিয়ে এক অভিনব অভিজ্ঞতা হল। হাসপাতালের ট্রাভেল ডেস্কে গিয়ে জানালাম আমাদের অভীপ্সা। সেদিন ছিল শুক্রবার। ওখান থেকে টিকিট কাটলে আমাদের ট্রেন ধরতে ধরতে সেই মঙ্গল/বুধবার হয়ে যাবে। শুধু শুধু এই ক’টা দিন বসে না থেকে ওরা বললেন শহরে গিয়ে বিটিএম নামে এক ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে টিকিট কাটতে। তাহলে আগেই যাবার টিকিট পেয়ে যাব। ওখানে গিয়ে এক সদাশয় এজেন্টের দেখা পেলাম। তিনি কম্পিউটারের বোতাম টিপে টিপে অবশেষে জানালেন টিকিট মিলতে পারে সোমবারের। কিন্তু বিধি বাম। ভদ্রলোক অনেক চেষ্টা করেও নির্দিষ্ট টিকিট ডাউনলোড করতে পারলেন না! সার্ভার ডাউন। তিনিই আমাদের পরামর্শ দিলেন একটা বাসে চেপে একটু এগিয়ে গিয়ে রেলের রিজার্ভেশান কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে নিতে। আমাদের খুব ভাল করে পথ নির্দেশনাও দিয়ে দিলেন। তিনি ইচ্ছে করলেই আমাদের আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করাতে পারতেন। নিজের প্রাপ্য পারিশ্রমিক হাসিমুখে ছেড়ে দিয়ে আমাদের দ্রুত ওখানে যেতে বললেন। দেরি করলে টিকিট নাও মিলতে পারে। এমন সৎ, বিশ্বস্ত, সহৃদয় ও পরোপকারী মানুষ বিদেশ বিভূঁইয়ে আমি আর কখনও পাইনি। যা হোক আমরা যথাসময়ে যথাস্থানে গিয়ে টিকিট নিয়ে এলাম। দু’টো দিন এদিক ওদিক ঘুরব। শেষ হবে আমাদের চিকিৎসা উদ্দেশ্যে আটদিনের ভ্রমণ।

হরিদাসপুর থেকে এসেছিলাম ব্যাঙ্গালোরের বোমাসান্ড্রায়। এবার সত্যি সত্যি ঘরে ফেরা। খোঁজ নিয়ে জানলাম, কন্নর ভাষায় বোমা কথাটার অর্থ হল পুতুল আর সান্ড্রা হল গ্রাম। অর্থাৎ বোমাসান্ড্রা মানে পুতুলের গ্রাম। জানি না, এখানে আদৌ কোনও গ্রাম আছে কিনা। হয়তো একসময় ছিল। সেখানে এখন আর পুতুল তৈরি হয় কিনা কে জানে! যদি নাও হয়, তবুও ওই নামটাই অনেকদিন ধরে বহন করবে ওই এলাকা। আধুনিকতার চাপে যতই ভেঙ্গে যাক প্রাচীনত্বের প্রকার কিন্তু নিভেও যে নেভে না ঐতিহ্যের আলো!