চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৭৭॥ সুশীল সাহা


হায়াৎ মামুদের সঙ্গে এক বেলা


বাংলাদেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী হায়াৎ মামুদের লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় বহুদিনের। সেই কবে তাঁর লেখা ‘মৃত্যুচিন্তা রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জটিলতা’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ছোটদের জন্যে প্রচুর লিখেছেন। রুশ ভাষা থেকে তাঁর সাবলীল অনুবাদে পড়েছি অনেক গল্প উপন্যাস। সরল বাংলায় তাঁর লেখা ‘গিলগামেশ’ পড়ে খুবই আপ্লূত হয়েছিলাম একসময়। আর এখানকার বাংলা একাডেমি প্রকাশিত তাঁর লেখা ‘লিয়েবেদেফ’ একটি অসামান্য গ্রন্থ । স্বভাবতই এই মানুষটা সম্পর্কে খুব আগ্রহান্বিত ছিলাম। অবশেষে দেখা হল একদিন এই কলকাতা শহরেই বছর কুড়ি/বাইশ আগে। উঠেছিলেন তাঁর অনেকদিনের বন্ধু সুদর্শন সাহা’র পঞ্চাননতলার বাড়িতে। তিনি ফোন করলেন সেখান থেকেই। কণ্ঠস্বরে প্রবল আন্তরিকতা। হাসান আজিজুল হক সাহেবের কাছ থেকে আমার ফোন নম্বরটা পেয়েছেন। দেখা করলাম পরদিনই। তিনি যেতে চান পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। অতএব অন্ধের যষ্টি আমিই। আসলে ওঁর বাবা পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘মীর আম্মানের চাহার দরবেশ’ গ্রন্থের পুনর্মুদ্রণ করতে চান বাংলাদেশের এক প্রকাশক। বলাবাহুল্য এই বইয়ের সন্ধান তিনিই দিয়েছেন। সেই বই প্রকাশের অনুমতি নিতে চান ওঁর কাছ থেকে। পবিত্রবাবুর উত্তরাধিকারী তো তিনিই। আমি একটু অবাকই হলাম তাঁর এই অভিপ্রায় শুনে। সেই পাকিস্তান আমল থেকে ওই দেশে ভারতীয় গ্রন্থের আকছার মুদ্রণ হয়ে চলেছে কোনওরকম অনুমতি ছাড়াই। বাইরে যতই বিদ্বেষ থাকুক, মনে আছে পাকিস্তান আমলে এক প্রকাশক (ঝিনুক পুস্তিকা) কলকাতার বইয়ের ফটোকপি বিক্রি করত অতি সস্তায়। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলে আসছে। তারই মধ্যে হায়াৎভাইয়ের এই প্রস্তাব শুনে আমার সত্যি সত্যি অবাক হবার পালা। শুনলাম তিনি নাকি অগ্রিম বাবদ হাজারখানেক টাকাও দিতে চান। শুনে আমি তো রীতিমতো আশ্চর্য। ঠিক হল পরদিনই যাওয়া হবে পৃথ্বীশদার উল্টোডাঙ্গার বাড়িতে, যাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা অনেকদিনের। ওঁদের ওই উল্টোডাঙ্গার ফ্ল্যাটে গিয়েছি অনেকবার পবিত্রবাবুর বেঁচে থাকাকালীনই।

ঠিক হল পরদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে হায়াৎভাই উল্টোডাঙ্গা স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে আসবেন। ওঁকে সঙ্গে নিয়ে আমি যাব পৃথ্বীশদার কাছে। যথাসময়ে আমি উল্টোডাঙ্গা স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমেই দেখি ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে আছেন হায়াৎভাই। আমি তো অবাক। আমি বললাম, আপনি এখানে কেন? এখানে তো আপনার দাঁড়াবার কথা ছিল না। তাছাড়া তো বিনা টিকিটের দায়ে পড়তে পারেন! আমার কথা শুনে তাঁর সেই চিরাচরিত হাসি হাসি মুখের নির্বাক অভিব্যক্তি। উত্তরে বললেন, দেখা তো হয়েই গেল আর কেইবা আমাকে বিনা টিকিটের দায়ে ফেলবে! কেউ তো নেই। যা হোক ওঁকে নিয়ে গুটি গুটি পায়ে পৃথ্বীশদার কাছে গিয়ে পৌঁছালাম। বেশি কথা ব্যয় করতে হল না। কাজটা অতি দ্রুতই হয়ে গেল। হল খানিকটা আড্ডা। এদিকে আমার অফিসে যাবার তাড়া। পৌনে বারোটার মধ্যে না পৌঁছালে ‘অনুপস্থিত’ চিহ্ন পড়ে যাবে হাজিরা খাতায়।

একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমরা পৌনে বারোটার আগেই পৌঁছে গেলাম লিন্ডসে স্ট্রিটে। হায়াৎভাইকে নীচে দাঁড় করিয়ে রেখে বললাম, আমি সই করেই আসছি। দ্রুত লিফটে উঠে অফিসে গেলাম। হাজিরা খাতায় সই করে কিছুক্ষণের ছুটি নিয়ে নীচে আসতে গিয়ে ছোট্ট একটা কাজে আটকে গেলাম। যা হোক কাজটা মিটিয়ে নীচে এসে দেখি তিনি যথাস্থানে নেই। একটু পরেই দেখি কী একটা হাতে নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। কাছে এসে বললেন, এই বস্তুটার নাম ‘ড্রাই মেলন’, মরুভূমির দেশের ফল। কোনওদিন খাইনি, তাই কিনলাম। চলো কোথাও বসে কিছুক্ষণ আড্ডা দিই, কিছু খাওয়া যাক। আমি ওঁকে নিয়ে খুব কাছের এক রেস্তোরায় গেলাম। কিছু খাবারের অর্ডার দিয়ে ওঁর মুখোমুখি হলাম। কিছু কথাও হল। কিন্তু কিছুতেই আড্ডাটা জমছিল না।

আমারও অফিসে ফেরার তাড়া। অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাই বললাম ঠিক আছে, এখানকার পর্ব সেরে খুব কাছেই একটা জায়গায় আপনাকে পৌঁছে দেব। আসলে বেলা চারটে নাগাদ ওঁকে সাহিত্য আকাডেমির অফিসে যেতে হবে। আমরা পাশাপাশি হাঁটছিলাম। হঠাৎ তাঁর একটা ফোন করার কথা মনে পড়ল। ঢাকার বাড়িতে কী যেন একটা খবর দেওয়া দরকার। খুব কাছের একটা টেলিফোন বুথে গেলেন ফোন করতে। ভিতরে ঢুকেই একটু পরেই ফিরে এলেন। সেই একগাল হেসে বললেন, বাড়ির ফোন নম্বরটা ভুলে গেছেন। এই হল হায়াৎভাই! পার্স থেকে ওঁর কার্ডটা বার করে দিলাম। সেটা নিয়ে তিনি ভিতরে ঢুকলেন এবং ফোনের কাজটা সেরে বেরিয়ে এলেন। দেখতে দেখতে তখন প্রায় বেলা দেড়টা বেজে গেছে। আমি হায়াৎভাইকে একটি বার কাম রেস্টুরেন্টে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিতে চাইলাম। তিনিও হাসিমুখ আমাকে বিদায় দিলেন। কিন্তু ওখানে ঢুকতে গিয়ে বাধা পেলেন দারোয়ানের কাছ থেকে। ওই ফলটা হাতে নিয়ে ওখানে ঢোকা যাবে না। হায়াৎভাই আমাকে পিছু ডাকলেন। ড্রাই মেলনটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, এটা তুমিই নিয়ে যাও। ইহজীবনে মনে হয় এর স্বাদ আমার নেওয়া হল না! আমি একটু দ্বিধার সঙ্গেই ওটা নিলাম। তারপর আস্তে আস্তে অফিসের দিকে এগিয়ে গেলাম।
হায়াৎভাইয়ের সঙ্গে পরে আরো কয়েকবার দেখা হয়েছে। হ্যাঁ, এই কলকাতাতেই। বইটা বেরোলে তিনি বেশ কিছু কপি আমাকে দিয়েছিলেন পৃথ্বীশদার বাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্যে। অবশ্যই আমাকে একটি কপি দেন। মনে একটা সুপ্ত ইচ্ছে ছিল সুযোগমতো তাঁকে একদিন ড্রাই মেলন কিনে খাওয়াব। কিন্তু ওঁর সঙ্গে অনেকটা সময় কাটালেও সময়টা কেটেছে আড্ডা গল্পে। কিছুতেই ওটা সংগ্রহ করে ওঁকে খাওয়াতে পারিনি। তবু একদিন কথায় কথায় ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওঁর ড্রাই মেলন খাওয়ার সখ মিটেছে কিনা! যথারীতি একগাল হেসে তিনি বলেছিলেন, জীবনে কত ইচ্ছাই তো অপূর্ণ থেকে যায়। তিনি তো তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় কথাটা বলেন তবু আমার আক্ষেপ যায় না। সু্যোগ খুঁজতে থাকি, ওঁকে ‘ড্রাই মেলন’ কিনে দিতে পারার।

অবশেষে সেই আক্ষেপ ঘোচানোর একটা সুযোগ এল। বাংলাদেশ থেকে আমার কাছে এসেছিল ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধু হামিদ কায়সার। কিছুদিন থাকার পরে ফেরার আগের দিন ওর হাতে ড্রাই মেলন কিনে দিয়ে বলেছিলাম ও যেন প্রথম সুযোগেই ওটা হায়াৎভাইকে দিয়ে আসে। হামিদ কথা রেখেছিল। ঢাকায় পৌঁছাবার পরদিনই ও ওই বস্তুটা হায়াৎভাইয়ের হাতে দিয়ে আসে। ওঁর দীননাথ সেন রোডের বাড়ি থেকে বেরিয়েই আমাকে ফোন করে ও।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম সেদিন। ইচ্ছাপূরণের এক মহানন্দ হয়েছিল।