চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৭৮॥ সুশীল সাহা



একদিন গোর্কি সদনে


১৫/১৬ বছর আগে একটা অনুষ্ঠানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা ছিল অম্লমধুর। আমাদের সমস্ত কাজে যে সেইভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে না, সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম তখন। আজ এতদিন পরে সেই ঘটনাবলির রোমন্থন করতে করতে পৌঁছে যাই অনতি অতীতের সেই দিনগুলোয়। সেদিনের সেই কথাগুলো লিখছি আজ। চেনাশোনার কোন্ বাইরে এর অবস্থান কোথায়, জানিনা।
আসলে সেটা ছিল কলকাতায় এক প্রামাণ্যচিত্রের প্রিমিয়ার শো। বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত শিল্পীকে নিয়ে সেই ছবিটা নির্মাণ করেছিলেন আমার এক বন্ধু। তাঁর আগ্রহাতিশয্যে ওই অনুষ্ঠান নিয়ে একটু বেশি রকমের মেতে উঠেছিলাম। বীরভূমের ভূমিপুত্র ওই মানুষটির জীবন ছিল একান্ত বর্ণময়। বামপন্থায় বিশ্বাসী এই শিল্পী যৌবনের প্রারম্ভে জড়িয়ে পড়েছিলেন ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে। সেজন্যে তাঁকে কারাবাস করতে হয়। ঠিক এই কারণেই শান্তিনিকেতনের সংগীত ভবনে তাঁর গান শেখা হয়ে ওঠেনি। তবে রবীন্দ্রানুরাগী এই মানুষটি কলকাতার এক বিখ্যাত সংগীত শিক্ষায়তনে গান শিখে ওখানেই শিক্ষকতা করেন, পাশাপাশি যুক্ত হন প্রখ্যাত নাট্যদল ‘বহুরূপী’র সঙ্গে। তারপর দেশভাগের কারণে তিনি দেশান্তরী হয়ে চলে যান ঢাকায়। এককথায় বহুবর্ণময় তাঁর জীবন। সেই তাঁকেই অত্যন্ত দক্ষতায় ক্যমেরাবন্দি করেছিলেন পরিচালক।

সেই ছবির প্রিমিয়ার শো হবে কলকাতায়। বন্ধু গৌতম ঘোষের সৌজন্যে গোর্কি সদনে দেখানোর ব্যবস্থা করা গেল। নিমন্ত্রণ করা হল শঙ্খ ঘোষসহ বহু গুণীজনকে। ওই ছবির সঙ্গে যুক্ত দু’জন মানুষ খালেদ চৌধুরী এবং আনন্দগোপাল সেনগুপ্তকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। শম্ভু মিত্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন বলে আমন্ত্রণ জানানো হল ওঁর কন্যা শাঁওলী মিত্রকে। অবশেষে আমরা গেলাম সেই সংগীত শিক্ষায়তনে যেখানে একদা তিনি শিক্ষার্থী ও পরে শিক্ষক ছিলেন। ওখানকার কর্ণধারকে আমাদের আমন্ত্রণ জানালাম। অনুরোধ করলাম তাঁরা যদি ওই দিনের অনুষ্ঠানের অন্তত উদবোধনী সংগীতটা করেন সম্মেলকভাবে। ভদ্রলোক তাঁর স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্যে হ্যাঁ বা না কিছুই বললেন না।

ক্রমশ অনুষ্ঠানের দিন এগিয়ে এল। কলকাতায় দেখানোর আগে আমাদের বারাসাতে দু’জায়গায় ছবিটা দেখানো হল একই দিনে। দর্শকের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সদর্থক হওয়ায় আমরা খুব উৎসাহ বোধ করলাম। কলকাতায় জনতার মূল্যায়ন বড় একটা ব্যাপার সবসময়। অনুষ্ঠান বেশিক্ষণের নয়। ছবির সময়সীমা ঘন্টাখানেক। ওই সংগীত শিক্ষায়তন থেকে ওঁরা আসবেন কিনা, তখনও জানতাম না। সেই অনিশ্চয়তায় কারণে একজনকে দিয়ে একটা উদবোধনী সংগীত গাওয়াব বলে ঠিক করে রাখলাম। শঙ্খদা কিছু বলবেন না, আগেই বলে রেখেছিলেন। পরিচালক কিছু বলবেন অবশ্যই। আর কে কে আসেন সেটা দেখে ঠিক করা হবে চার/পাঁচজন বক্তাকে। কাউকেই দু’তিন মিনিটের বেশি সময়ে দেওয়া হবে না । অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব আধ ঘন্টায় শেষ করে ছবিটা দেখানো হবে, এমনটাই ঠিক করা হল।

ছ’টায় অনুষ্ঠান। পাঁচটা থেকেই লোকজন আসতে শুরু করেছিল দেখে খুব উৎসাহ বোধ করলাম। শঙ্খদা চলে এলেন সাড়ে পাঁচটায়। সবার সাথে কথা বলছি গেটের বাইরে, এমন সময় দেখি সদলবলে এসে হাজির সেই সংগীত শিক্ষায়তনের কুড়ি/বাইশ জন। খুবই পুলকিত বোধ করলাম। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক গৌতমবাবুকে খবরটা দিতে ছুটলাম। কিন্তু তার আগে যা হবার তা হয়ে গেছে। ততক্ষণে সেই শিক্ষায়তনের কর্ণধার গৌতমবাবুর কাছে পৌঁছে গেছেন। তখন তিনি বলে চলেছেন, “অনুষ্ঠানের শুরুতে আমাদের পনেরোজন শিল্পী গান গাইবেন, প্রত্যেকে এককভাবে দু’খানা করে”। আমি তো হতভম্ব। বললাম, আপনাদের তো সম্মেলক গান গাওয়ার কথা। তিনি আমার কথার কোনও উত্তর না দিয়ে গটগট করে হলের দিকে চলে গেলেন। ততক্ষণে ওঁদের শিল্পীবৃন্দ গ্রিনরুমে এসে গেছেন। আমি তবুও গৌতমবাবুকে একান্তে বললাম এই ব্যাপারটাকে বন্ধ করা যায় কিনা! কেননা অত সময় ধরে গান শুনে ছবিটা দেখার জন্যে শেষ পর্যন্ত লোকজন থাকবেন তো! আমাকে গৌতমবাবু আশ্বাস দিয়ে বললেন যাঁরা সত্যিকারের দর্শক, তাঁরা থাকবেন। এখন আর ওদেরকে নিবৃত্ত করা যাবে না। যা হোক কথাবার্তার ব্যাপারটা সংক্ষিপ্ত করে অনুষ্ঠান শুরু হল। গান চলল দেড় ঘন্টার অধিক সময় ধরে। ভয় হচ্ছিল, ওদের গান শেষ হলেই তো ব্রেক দেওয়া হবে। তখন যেন লোকজন চলে না যায়!

যা হোক, গানের পালা শেষ করে ওই মহামান্য শিল্পীবৃন্দ চলে গেলেন, কিন্তু অন্য দর্শকের প্রায় কেউই গেলেন না। ছবি শুরু হল, শেষও হল। সামান্য একটু চায়ের আয়োজন ছিল। দর্শকেরা ঘিরে ধরল পরিচালককে। ভাল লাগছিল এই ভেবে যে এতো কান্ডের পরেও তাঁরা থেকে গেছেন শেষ পর্যন্ত।
জীবনে নানারকম অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে গেছি নানাভাবে। একেকটার অভিজ্ঞতা একেকরকম। তবে আজ মনে হয় সব অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে গেছে গোর্কি সদনের সেদিনের সেই অনুষ্ঠান। আজ এতদিন পরেও যা ভুলে যাইনি। হয়তো কোনওদিন ভুলবও না।