চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৭৯॥ সুশীল সাহা


অবশেষে খোকন, তুমিও!


বেশিদিনের আলাপ তো নয়। মাত্র কয়েক বছর আগে প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধু মোস্তাক যোগ দিলে ওখানে গেলাম এবং পরিচিত হলাম সদ্য যোগ দেওয়া আর কয়েকজন নবীন অধ্যাপকের সঙ্গে। ঋতমকে তো চিনতাম অনেক আগে থেকেই। পরিচিত হলাম উত্তম, শাওন এবং তোমার সঙ্গে। তোমার স্বভাবগুণে তুমি আমাকে খুব কাছে টেনে নিলে অচিরেই। সেই টানে মিশে আছে অন্তরের অনাবিল ভালবাসার সঙ্গে জরুরি কিছু সাংস্কৃতিক অভিপ্রায়। তোমার সম্পাদনায় গবেষণাঋদ্ধ পত্রিকা ‘অন্তর্মুখ’-এর বার্ষিক আয়োজনে আমাকে শামিল করে নিলে অতি আয়াসে। বার্ষিক এই সেমিনারে বাংলাদেশ থেকে বিদ্বজ্জনদের যোগ দেবার ব্যাপারে তোমার ঐকান্তিক ইচ্ছাপূরণে আমি হয়ে গেলাম একজন অত্যাবশ্যকীয় অণুঘটক। একে একে আমার সক্রিয় ব্যবস্থাপনায় যোগ দিলেন বাংলাদেশের শহিদ ইকবাল, সবুজ শামীম আহসান, লুৎফর রহমান, রুবেল আনছার, হামিদ কায়সার প্রমুখ। আমাকে তো তুমি ছাড় দিলে না কিছুতেই। প্রতিবারেই মঞ্চে উঠতে হত। কিছু বলতেও হত। আমার উপস্থিতিকে তুমি অশেষ গুরুত্ব দিলে এইভাবেই। কতবার বলেছি, আমাকে নেপথ্যেই থাকতে দাও। কিন্তু তোমার সেই আন্তরিক ইচ্ছা ও প্রবল যুক্তির কাছে হার মেনেছি প্রত্যেকবার।
এইভাবেই তোমাদের বাড়িতে যাওয়া, তোমার সূত্রেই অজস্র গবেষক ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। এবং সেইসঙ্গে তোমার জীবনসঙ্গিনী শম্পা ও দুই পুত্র প্রত্যুষ ও প্রতীনের নিবিড় সান্নিধ্যলাভ। কীভাবে যেন তোমার পরিবারের একজন হয়ে গেলাম একদিন। তোমার অনেকদিনের বাংলাদেশ যাবার স্বপ্নকে সফল করার সুযোগও পেলাম অবশেষে। আমার ব্যবস্থাপনায় তুমি একদিন গেলে যশোরের ইতিনায় এক অনুষ্ঠানে। সবার মন জয় করে ফিরেও এলে। সঙ্গে নিয়ে এলে ওপার বাংলার বুকভরা ভালবাসার এক অপরূপ নির্যাস। তারপর আবার, এই তো সেদিন, গত বছরের জানুয়ারিতে সাগরদাঁড়ির মধুমেলায় তোমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম। সে তো শুধু যাওয়া নয়। তুমি তোমার স্বভাবসুলভ মেধা, প্রজ্ঞা আর আন্তরিকতা দিয়ে ওখানকার মানুষের মন জয় করে নিলে।

মনে পড়ছে, তোমার সম্পাদিত অসাধারণ পত্রিকা ‘অন্তর্মুখ’-এর প্রতিভা বসু সংখ্যায় আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেবার কথা। হাতের কাছে তেমন কিছু তথ্য ছিল না। তুমি ওঁর লেখা থেকে নির্মিত ছায়াছবি সংক্রান্ত একটা ঢাউস বই কিনে দিলে। ওঁর লেখা থেকে নির্মিত ছায়াছবি নিয়েই লিখলাম। লেখার আগে দেখে নিলাম ওঁর সাহিত্যনির্ভর দশ/বারোখানা ছবি। তুমি বলেই এই কষ্টটা করতে কোনও দ্বিধাবোধ করিনি। তারপর একবার করলে আরেকটি সেমিনার ‘আত্মপরিচয়ের সংকট’ শিরোনামে। তাতেও আমাকে যোগ দিতে হল। বাংলা সিনেমার কয়েকটি ক্লিপিং দেখিয়ে এবং সঙ্গে কিছু বলে সেই যাত্রা মুক্তি পেলাম। তারপর গতবছর করলে ‘সামাজিক দ্বন্দ্ব : সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি’ শিরোনামে আরেকটি সেমিনার। মঞ্চে উঠতে হল আমাকেও। সম্পর্ক নিয়ে অল্প কিছু বলার পরে একটা স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি দেখিয়ে কোনওরকমে পার পেলাম।
কত আর লিখব! আজ এই উনিশে জুন মাত্র একান্ন বছর বয়সে তোমার চলে যাওয়াকে মেনে নিতে না পারার দহনে জ্বলছি যখন, তখন স্মৃতির সমুদ্র ঘিরে উথলে উঠছে নানা কথা। দেখা হত কম। কথা হত অনেক। তাছাড়া এই লক-ডাউন পর্ব তো আমাদের একেবারে বিচ্ছিন্ন করে দিল, সত্তরের সেই আগুনঝরা দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিল নতুন করে। যখন এ পাড়ার লোক অন্য পাড়ার লোকের খবর নিতে পারত না, দেখা তো দূর-অস্ত।

আজ এই বিষন্ন দিনে যখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে। স্মৃতিবেদনার মালা গাঁথতে গাঁথতে রবীন্দ্রনাথের গানে আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছি। মনে মনে গাইছি, ‘অনন্ত সাগর মাঝে দাও তরী ভাসাইয়া’। কিছুতেই মিলছে না সান্ত্বনা। তুমি যে আমার মনের কতখানি জায়গা জুড়ে ছিলে, আজ তা অনুভব করছি মর্মে মর্মে।

খোকন, তোমাকে বিদায়। যাও অশ্রুনদীর সুদূর পারে। দেখা দিও অন্তরে, মনশ্চক্ষে। অবিরাম, অনুক্ষণ, নিরবধিকাল।