চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৮০॥ সুশীল সাহা


খুঁজে বেড়াই


“আমি তারেই খুঁজে বেড়াই যে রয় মনে আমার মনে।”
এরা ছিল বলেই তো “আমার আকাশ জুড়ে ফোটে তারা রাতে প্রাতে ফুল ফুটে রয় বনে আমার মনে।” রবীন্দ্রগানের এই মর্মবাণীটুকু অন্তরে ধারণ করে মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে তাকাই। যাঁরা সত্যি সত্যি একদিন আমার গানের দীপে জ্বালিয়েছিল তাদের কত জনা কত দিকে ছড়িয়ে গেছে! অনেকেই চিরতরে ছেড়ে গেছে অকালে। অনেকে জীবন জীবিকার দায় মেটাতে ছড়িয়ে গেছে কোন সুদূরে! তবু তাঁদের স্মৃতি আমার অন্তরে চির জাগরুক হয়ে আছে। মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে তাকাতে গিয়ে মনে পড়ে সেই সাথীদের। কে কোথায় আছে? কেমন আছে, কী করছে? এমন সব কথা ভাবতে ভাবতে একসময় অতীতের সীমায় ঘুরে আসি।
বয়েস বাড়লে বোধহয় সবারই এমনটা হয়। মনে হয় সেইভাবে আরেকটু খুঁজি। এই পৃথিবীর কোনও না কোনও প্রান্তে নিশ্চিতভাবে ছড়িয়ে আছে তাঁরা। একটু খুঁজেই দেখা যাক না! এমনই এক সন্ধিৎসা থেকে বিগত কয়েক বছরে খুঁজে পেয়েছি কয়েকজনকে। আজ সেই তাঁদেরই কয়েকজনের কথা।
আমাদের খুলনা শহরের খুব কাছে বয়রা নামের একটি জায়গায় খোদ রাস্তার পাশে বিরাট বড় এক সরকারি লাইব্রেরি হয়েছিল। সম্ভবত সেটা আজও আছে। কলেজে যাওয়া আসার পথে বাস বা অটো রিক্সা থেকে চোখে পড়ত। একদিন সেখানে নেমেই পরেছিলাম অদম্য এক কৌতূহল নিবৃত্ত করতে। সেটা সম্ভবত ১৯৬৪/৬৫ সাল হবে। ওখানে ঢুকে আমার তো চক্ষু চড়কগাছ। খোলা আলমারিতে থরে থরে সাজানো অজস্র বই। বেশ শান্ত ও সমাহিত পরিবেশ। ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতেই সেদিনের সময়টা কেটে গেল। পরে আরেক দিন গিয়ে গোটা কয়েক বই নিয়ে বসলাম। নাড়াচাড়া করে বইয়ের গন্ধ শুঁকে সেই দিনটাও কেটে গেল। পরের দিন সত্যি সত্যি বই পড়তেই ওখানে গেলাম। সেদিন যে কোথা থেকে সময়টা কেটে গেল টের পাইনি। কানের কাছে কে যেন এসে বলে গেল লাইব্রেরি বন্ধ করে দেবার সময় সমাগত। আমি বই বন্ধ করে সিট ছেড়ে উঠলাম। তাকিয়ে দেখি আমার সামনে দাঁড়িয়ে সুন্দর মুখের এক সহাস্য মানুষ। পরিচয় হল। পোশাকি নাম একটা ছিল বটে। কিন্তু ডাক নাম ‘খোকন’ বলেই তাকে চিরকাল জেনেছি। সেই খোকনকে দিয়েই শুরু করছি আমার কিছু প্রিয় মানুষ খুঁজে বেড়ানোর ইতিকথা। জীবনের অমোঘ নির্দেশে একদিন যাঁদের সংশ্রব হারিয়েছি তাঁদেরই খুঁজে পাওয়া বা না পাওয়ার বা পেয়ে হারানোর কথা। সেইসঙ্গে আমার স্বপ্ন দেখা বা স্বপ্নভঙ্গের অনেক বেদনার কথা। সময় যে বড় কঠিন। কাকে যে কোন গর্তে ফেলে দেয় কে জানে!

খোকনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল প্রায় চল্লিশ বছর বাদে। খুলনার এক ভ্রাতৃপ্রতিম শিক্ষকের সুবাদে তাঁর খোঁজ পেলাম। শুনলাম সে নাকি দাড়ি আর আলখাল্লায় ঢেকেছে শরীর। তবু গেলাম। না গেলেও পারতাম। খোকনের আন্তরিকতা আর হাসিটুকু সেই আগের মতোই আছে দেখলাম। না, এরপর তাঁর সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি।
জীবনের সব অভিজ্ঞতা অবশ্য দুঃখের হয়না। যেমনটা হল না আনোয়ারের বেলায়। তাঁকেও খুঁজে পেলাম ওই বছর চল্লিশেক বাদেই। খুব অন্তর্মুখি মানুষ ছিল। দেখলাম সে তেমনটিই আছে। পড়াশুনো করে মনটাকে বেশ উচ্চমার্গের করে তুলেছে। আমার মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো যখন উগড়ে দিচ্ছিলাম, আনোয়ার তা চুপচাপ শুনছিল। তবে সে যখন আলমারি ঘেঁটে আমার কিছু পুরনো চিঠি নিয়ে এল,আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।

ভাল নাম নূর হোসেন, ডাক নাম গুন্ডা। অমন একটা নিরীহ ও নিপাট ভদ্র ছেলের নাম যে কেন গুন্ডা হয়েছিল কে জানে। গুন্ডা আমার স্কুল জীবনের বন্ধু। খুব সাধাসিধে ও আন্তরিক। তার সঙ্গেও দেখা হল অনেক দিন বাদে। আমি নিজেই খুঁজে বার করেছিলাম। প্রথম দেখায় ওকে কেমন আড়ষ্ঠ মনে হল। আপনি বলবে না তুমি বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না। পরে অবশ্য খুব স্বাভাবিক আচরণ করল। মাঝখানের অদেখার বছরগুলো কোথায় উধাও হয়ে গেছে। তবে কিছুদিন আগে ওর মৃত্যুসংবাদের ঘোর আমি আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
শোভনের সঙ্গে দেখা হওয়াটা বেশ রোমাঞ্চকর। শোভন আমাদের স্কুলে এসেছিল সেশনের মাঝখানে। তবে এসেই হৈ হৈ করে সব ছাত্র আর মাস্টারমশাইদের মন জয় করে নিয়েছিল। অসম্ভব আমুদে ছিল ও। মেধা আর মননে সবাইকে টপকে গিয়েছিল। ১৯৬৪ সালে যশোর বোর্ডের মাধ্যমিক পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছিল। কিন্তু তার পরপরই দেশান্তরী হয়ে কলকাতায় চলে আসে। বহুদিন ওর কোনও খোঁজ পাইনি। অবশেষে পেলাম কয়েক বছর আগে ফেসবুকের মাধ্যমে। বয়েস বেড়েছে ঠিকই কিন্তু আছে একেবারে আগের মতোই।
মৃণাল সরকার বেশ আড্ডাবাজ ছেলে ছিল। আমাদের সঙ্গেই পড়ত। চেহারার মধ্যে কেমন যেন এলভিস প্রেসলের একটা আদল ছিল। ভাল আবৃত্তি করত। ওর সঙ্গে যোগাযোগ হল অতি সম্প্রতি, এই লক ডাউনের মধ্যেই। দেখা হয়নি এখনও। তবে কথা হয়েছে অনেকবার। কথায় সেই আদি অকৃত্রিম খুলনার টান।

শ্রীকৃষ্ণ মলের সঙ্গে অনেকদিন বাদে দেখা হল ট্রেনে। আমার তখন বারাসাতে অফিস। ট্রেনে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি আমার পাশে দাঁড়িয়ে ও। কী আশ্চর্য! চেহারার আদলটা একেবারে একইরকম আছে। ও যাচ্ছিল ওদের জমি যা ওই বারাসাতেই ছিল, সেটার দেখাভাল করতে। হঠাৎ দেখা হওয়ায় সে যে কী আনন্দ আমাদের দু’জনের! সবই দেখলাম আগের মতোই আছে। সেই থেকে শ্রীকৃষ্ণ ওরফে শ্রীকিষাণের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। ওর সঙ্গে আমার বাল্যকালের অনেক মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে যে! কিছুতেই তা ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।
আমার সেন্ট যোসেফস স্কুলের প্লা্টিনাম জয়ন্তী হল ২০১৭ সালে। যদিও তা পূর্ণ হয়েছে ২০১৫ তে। অনেক আশা নিয়ে স্কুলের ওই মহোৎসবে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু ভিড় আর হুল্লোড়ের ঢালে সব যেন কোথায় হারিয়ে গেল। অবশ্য আমার থেকেও অনেক সিনিয়ার দাদাদের দেখা পেয়েছিলাম। আমার ক্লাসের একজনকে পেয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু কেউ কাউকে সেইভাবে চিনতেই পারলাম না। দেখাই হল মাত্র।

আমি প্রথম আসামে যাই আশির গোড়ার দিকে। গন্তব্য গৌহাটি। বোনের বন্ধু হীতেশ স্টেশনে এসে আমাদের নিয়ে গেল ওদের গ্রামের বাড়িতে। গ্রামের নাম বোন্দাপাড়া, জেলা গোয়ালপাড়া। সেই অভিজ্ঞতা লিখতে হবে আলাদাভাবে। বক্ষমান নিবন্ধের বিষয় থেকে সরতে চাইছি না। হীতেশের সূত্রে আলাপ হল ওর ভাই জনবীর, নাট্যবীর আর মিন্টুজবীরের সঙ্গে। এছাড়া হীতেশের বন্ধু বিষ্ণু, খায়রুল আর জনাদর্নের সঙ্গেও আলাপ হয় ওই সময়। কী যে ভাল লেগেছিল ওদের! পরে আরো দু’বার আসামে গিয়ে ওদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। অবিস্মরণীয় সেইসব দিন। আজ এই এতদিন পরে মোবাইল আর ফেসবুকের কল্যাণে ওঁদের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ হয়েছে। হীতেশ বেঁচে নেই। ওঁর সঙ্গে যে আর কোনওদিনও দেখা হবে না!

একটা হিন্দি সিনেমার গান খুব মনে পড়ে, ‘পরদেশিয়ো সে না আঁখিয়া মিলানা, পরদেশিয়ো কো হ্যায় একদিন যানা। ” কথাটা খুব সত্যি মনে হয়। নানাসময়ে অনেক বিদেশি বন্ধুর সঙ্গে আলাপ পরিচয় তথা বন্ধুত্ব হয়েছে। কিন্তু প্রায় কারো সঙ্গেই আর সেইভাবে যোগাযোগ রক্ষা করা যায় নি। এঁদের কথাই এবার।
সংক্ষেপে ডি ডি টেলর, আসল নাম ডেভিড ডেনিস টেলর, এই ব্রিটিশ বন্ধুর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস কংগ্রেসের এক অধিবেশনে (১৯৭৪)। তখন ও পলিটিকাল সায়েন্সের অধ্যাপক লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল আন্ড আফ্রিকান স্টাডিজে। আমারই বয়েসি। আলাপটা এতই নিবিড় হয়ে গেল যে ও আমাদের হাবরার বাড়িতে পর্যন্ত এসেছিল। পরে যতবার কলকাতায় এসেছে, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ওঁর স্ত্রী ও পুত্র কন্যার ছবি পাঠিয়েছে। কিন্তু অনেকদিন ওঁর কোনও খবর পাইনি। কেমন আছে জানিনা।

রাউল অডিবার্ট নামের এক ফ্রেঞ্চ ছেলের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল কাশ্মীরে। একা একাই ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে নানা জায়গায় ঘুরছিল। ওঁকে কলকাতায় আসার জন্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। কলকাতা অবশ্য ওঁর ভ্রমণ তালিকায় ছিল না। আমার কাছ থেকে ঠিকানা ইত্যাদি নিয়েছিল আগ্রহভরে। একদিন সত্যি সত্যি চলে এসেছিল আমাদের হাবরার বাড়িতে। শুধু আসা নয়, প্রায় একমাস আমাদের সঙ্গে ছিল। খুব সিধেসাধা ছেলে। দেশে ফিরে দু’একটি চিঠিও লিখেছিল। কয়েকটি বিখ্যাত ছবির প্রিন্টও পাঠিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎই একদিন যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেল। ১৯৮৮ তে পাঠানো আমার বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র ফিরে এসেছিল। ওঁর কথা আজও ভুলিনি।
এক বর্ষণমুখরিত রাতে আলাপ হয়েছিল উইলিয়াম থ্রনটন নামের এক আমেরিকান ছেলের সঙ্গে। আমি সেদিন শান্তিনিকেতনের জামবুনিতে একজনের বাড়িতে ছিলাম। হঠাৎ জানালায় ওঁকে দেখে চমকে যাই। আসলে বৃষ্টিতে পথ ভুল করেছিল। ওখানে এসেছিল আশ্রয়ের খোঁজে। সেই শুরু। খুব ভাল বাংলা বলত ও। গবেষণার কাজে এসেছিল বিশ্বভারতীতে। যাহোক ও বেশ কয়েকবার আমাদের বাড়িতে এসে থেকেছে। একদিন শুনলাম ও চলে যাবে থাইল্যান্ডে। ওখান থেকে ওঁর পাঠানো একটা লম্বা চিঠিও পেয়েছিলাম। সঙ্গে বেশ কিছু ছবি। এক থাই মেয়েকে বিয়ে করে ওখানেই থিতু হয়েছে। ব্যাস তারপর থেকে আর কোনও যোগাযোগ হয়নি। চিঠি ফিরে এসেছে। সুনামির দাপটের সময় ও সেখানেই ছিল। জানিনা এখনও বেঁচে আছে কিনা!

হাঙ্গেরির বিদ্বজন গেজা বেথলেনফ্যালভির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল এশিয়াটিক সোসাইটির দ্বিশতবর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে। সেটা আশির দশকের গোড়ার দিক। অনুষ্ঠান ছিল মিউজিয়ামের পিছনে আশুতোষ বার্থ সেন্টেনারি হলে। ওখানেই কীভাবে যেন আলাপ হয়ে গিয়েছিল তাঁর সঙ্গে। তিনিও আমাদের হাবরার বাড়িতে এসেছিলেন। প্রথমে বুঝিনি, পরে জেনেছিলাম তিনি ওই দেশের একজন অনেক বড় মাপের বুদ্ধিজীবী। তিনি দেশে ফিরে যাবার আগে আমাকে হাঙ্গেরির ‘বালাতোন’ হ্রদকে নিয়ে একটি চিত্রশোভিত বই উপহার দিয়ে গিয়েছিলেন।
জাপানি ছেলে তোশিহিরো কুবোর সঙ্গে দেখা হয়েছিল লালাবাজারের বিখ্যাত শরৎ সরদারের দোকানে। আমি আমার এক বন্ধুর বেহালা সারাতে গিয়েছিলাম আর ও এসেছিল সেতারের তার কিনতে। প্রথম আলাপেই ও পরিস্কার বাংলা ভাষাতেই আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। ও তখন কল্যাণী রায়ের কাছে সেতার শেখে। ভারতে এসেছে এখানে থাকবে বলেই। কুবো আমাদের বাড়িতে এসেছিল। শুধু আসা নয়, ও আমাদের এক আয়োজনে জাপানি যন্ত্র ‘সামিসেন’ বাজিয়েছিল। পরে শুনেছি কুবো হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে কাশিতে থিতু হয়েছে।
বিদেশি আরো অনেকের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়েছে। কিন্তু বেশি ঘনিষ্ঠতার পথে যাইনি। তবে জন হুড নামের একজন অস্ট্রেলিয়র সঙ্গে বেশ সখ্য হয়। আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড় তিনি। বছরের অনেকটা সময় তিনি কলকাতাতেই কাটান। ঢাকুরিয়াতে তাঁর একটি ফ্ল্যাটও আছে। জন আসলে ভীষণভাবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আসক্ত । খুব ভাল বাংলা জানে। অনেক বই বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। শুধু ভাষা নয় বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমা নিয়েও তাঁর প্রচুর কাজ আছে। ওঁর সঙ্গে অবশ্য যোগযোগটা আছে।

তবে এটা ঠিক যত না খুঁজে পেয়েছি, তার চেয়ে হারিয়েছি অনেক। কোথায় গেল স্কুলের নিমাই? রাখালের কথা খুব মনে পড়ে। কিন্তু এখন তো দেখা হলেও কেউ কাউকে চিনব না। স্কুলের এক সুন্দর মুখের ছেলের কথা খুব মনে পড়ে। হাসান না ফিরোজ তার নাম। স্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে কে কোথায় ছিটকে পড়ল কে জানে! ডাকতাম মোল্লা বলে, আসলে তার পুরো নাম আবুল হোসেন মোল্লা। শুনেছিলাম সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছিল। কতবার যে গেলাম রাজশাহীতে! দেখা হল না কোনওবার। সম্প্রতি তার মৃত্যুসংবাদ পেলাম। কলেজে এক সহপাঠিনীকে পেয়েছিলাম। নাম তার মেহেরুন্নেসা। একটু অন্যরকম স্বভাবের ছিল ও। ডেকে ডেকে আলাপ করত আবার কখন নিজের খেয়ালে চলে যেত। ওর মেয়ে এখনকার বাংলাদেশের এক বিখ্যাত গায়িকা, কৃষ্ণকলি যার নাম। সেই মেহেরুন্নেসার সঙ্গে কলেজ ছাড়ার পর আর দেখা হয়নি। সেও আর বেঁচে নেই।

দু’জন বন্ধুর কথা খুব মনে পড়ে। অমিতাভ দাশগুপ্ত আর বৈশাখী রায়। ১৯৬৫/৬৬ তে অমিতাভর সঙ্গে পত্র মিতালী দিয়ে শুরু। আমার চেয়ে সামান্য কিছু বড়। স্টেট ব্যাঙ্কের কর্মী ছিল। আমার নাচ গান লেখালিখি ইত্যাদি ব্যাপারে ওর উৎসাহ ছিল প্রচুর। তারপর যা হয় আরকি! একসময় জীবন জীবিকার তাড়নায় ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল আমাদের সম্পর্ক। বছর কয়েক আগে ওঁকে হঠাৎ করে আবিষ্কার করেছিলাম কলকাতার জীবন দীপের শাখায়। তারপর থেকে এক নিশ্ছিদ্র দূরতা। অনেক খোঁজ করেও পাইনি সন্ধান। আজও খুব মনে পড়ে ওঁকে।
বৈশাখী ছিল আমার সহকর্মী। অসম্ভব স্মার্ট। খুব ভাল অভিনয় করত। কলকাতার হিন্দি থিয়েটারের মঞ্চে তাকে অনেকবার দেখা গেছে। বিয়ে করে চলে গিয়েছিল সুইডেনের স্টকহোমে। বিয়ে অবশ্য টেকেনি। নতুন করে ঘরও বাঁধেনি ও। কলকাতায় এলে যোগাযোগ হতই। আমাদের বাড়িতে অনেকবার এসে থেকেছে। সেই বৈশাখী কোথায় হারিয়ে গেল! মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছিলাম স্টকহোমের ঠিকানায়। সেটা ফেরৎ এসেছিল।

স্মৃতির আলবামে কত না ছবি জমা হয়ে আছে। যত দিন যায় ততই ছবিগুলো চোখের সামনে ভাসে। কিছু কিছু হারিয়ে গেলেও আবার ফিরে ফিরে আসে। কিন্তু আমি জানি, হাজার চেষ্টা করলেও আমি আমার ফেলে আসা দিনগুলোকে ফিরিয়ে আনতে পারব না। তাই যখন একান্তে নিজেই নিজের মুখোমুখি হই, খুঁজে ফিরি হারিয়ে যাওয়া মুখগুলোকে। জানি তা কোনওদিনও ফিরে পাব না।
তবুও আমি তাদের নিরন্তর খুঁজে বেড়াই।