চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৮২॥ সুশীল সাহা


মংপু’র কথা

মংপুর কথা উঠলেই কেন জানি না রবীন্দ্রনাথের কথাটা এসেই যায়। আসলে মৈত্রেয়ী দেবীর ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বাংলা ভাষার এক বিখ্যাত বই। আর অনেকের মতো ওই বইটি পড়ে আমি প্রথম ওই জায়গাটা সম্পর্কে অবহিত হই। শুধুমাত্র অবহিত হওয়া নয়, বইটি পড়ে মৈত্রেয়ী দেবীকে নিয়েও নানারকম সন্ধিৎসা জন্মায় মনে। এমন একজন বিদুষী মহিলা, কলকাতাতেই থাকেন। ভাবতেই রোমাঞ্চ হয়। অনেক পরে ‘ন হন্যতে’ পড়ে অন্য এক মৈত্রেয়ী দেবীকে জানতে পারি। এই মানুষটারই মুখোমুখি হয়েছিলাম ১৯৮৬ সালের কোনও এক সময়। শুধু মুখোমুখি হওয়া নয়, তাঁর অনুরোধে আমি কিছুদিনের জন্যে যুক্ত হয়ে যাই ওঁরই তৈরি অন্যরকমের অনাথ আশ্রম খেলাঘর-এ। মধ্যমগ্রামের কাছে বাদুতে ওখানে প্রতি রবিবার যেতে থাকি ওই আশ্রমেরই ছেলেমেয়েদের দিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘কাল্মৃগয়া’ নৃত্যনাট্যটি করাব বলে। অবশেষে বহু পরিশ্রমে সেটা নির্মাণ করতে পেরেছিলাম, যা অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে কলকাতার ‘গোর্কি সদনে’ ১৯৮৮ সালের এপ্রিল মাসে মঞ্চস্থও হয়েছিল।

কিন্তু এ তো ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে যাচ্ছে। মংপু’র কথাতেই ফিরে আসি। অনেক সাধ্যসাধনা করে ওখানে একবার যাবার সুযোগ হয়েছিল আমার। বড় আনন্দময় সেই একদিনের ভ্রমণ। অবশ্য তারও বেশ কিছুদিন আগে মংপু ছাড়িয়ে কালিম্পং-এ কিছুদিন ছিলাম। ওই জায়গাটা আমার খুব একটা ভাল লাগেনি। তবু আগে থেকে পরিকল্পনা করা ছিল বলে ওখানে ছিলাম দু’তিনটে দিন। ফেরার পথে রাম্বিবাজারে মংপু যাবার তীরচিহ্ন দেখে খুব আফসোস হচ্ছিল, কেন অন্তত একটা দিনের জন্যে ওখানে গেলাম না! যাহোক সেই আফসোস দূর হল বন্ধু কৌশিকের সৌজন্যে বছর দশেক আগে।

এবার সেই বৃত্তান্ত। কৌশিক উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবার পর ওঁর কাছে যাবার কথা অনেকবার ভেবেছি, ও নিজেও বহুবার বলেছে। কৌশিকের স্ত্রী সুতপা, কন্যা দিয়া আর পুত্র তাতাই আমাদের খুব প্রিয়। তাই একবার ওঁদের কাছে যাবার কথা ভাবলাম। ওঁদের কাছে গেলে বাড়তি প্রাপ্তি হবে ‘মংপু’ যাওয়া, সেটাও কম আকর্ষণীয় নয়। যা হোক, একদিন আমরা তিনজন অর্থাৎ অরুণিমা আর রাকাকে সঙ্গে উঠে পড়লাম দার্জিলিং মেলে। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে যথারীতি সহাস্য কৌশিক এসে হাজির। শুরু হল আমাদের ছোট্ট এক ঠাঁইবদলের গল্প।

ঠাঁইবদল মানে কয়েকটা দিনের জন্যে নিজের পরিচিত গণ্ডী থেকে বেরোনো। কোথায় যেন পড়েছিলাম, খুব অল্প সময়ের জন্যে নিজের জায়গাটা বদলানোটাও এক ধরনের বিশ্রাম। ঠিক তাইই হল। আমরা কয়েকটা দিন পরমানন্দে ওঁদের সঙ্গে কাটালাম। ওই কয়েকটা মধ্যে একটা দিনে আমরা বেরোলাম মংপু’র উদ্দেশ্যে। খুব বেশি দূরের পথ নয়, তবে আমার যে কোনও অভিযানই রোমাঞ্চকর। ছোট বড় যাইই হোক না কেন! দূরত্ব তো মাত্র ৪০/৪২ কিলোমিটার। সমতল ভূমি থেকে যখনই আমরা পাহাড়ি পথ ধরলাম, রোমাঞ্চটা যেন তখন দ্বিগুণ হয়ে গেল। আসার পথে কৌশিক দেখাল সেবক নদীর সেতু থেকে খরস্রোতা তিস্তার বহমান দৃশ্য। ওঁর মতে পৃথিবীর সেরা দশটি দৃশ্যের মধ্যে একটি। ভাল করে চেয়ে দেখে মনে হল, কথাটা ও খুব একটা বাড়িয়ে বলেনি।

সবাই জানেন পাহাড়ি পথে গাড়িতে ভ্রমণের মজাই আলাদা। একদিকে পাহাড় আর অন্যদিকে নয়নাভিরাম নানারকম দৃশ্য দেখতে দেখতে সময়টা কীভাবে যেন হুস করে ফুরিয়ে যায়। অবশেষে সেই কালিম্পং-এর রাস্তা ধরে আমরা রাম্বাবাজার থেকে একসময় মংপু’র পথে পা বাড়ালাম। খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওঠা। পথ খুব বেশি নয়, তবে সময় লেগে যায় অনেকটাই। মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথ যখন এখানে আসতেন তখন তো আর এত মোটরগাড়ির চল ছিল না। খাড়া পাহাড়ে সেগুলো ততটা যেতেও পারত না। তাই ওই রাম্বাবাজার থেকে মংপু পর্যন্ত আসতে হত পালকিতে। মনুষ্যবাহিত সেই যানের কথা ভাবলে অবাক হতে হয়। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কত অভ্যেসই না পালটে যায়! দিন যত যাচ্ছে, আমাদের যাপন হয়ে যাচ্ছে অতিদ্রুত। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে দিতে আমরা এগোচ্ছি। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে আমরা একসময় পৌঁছে গেলাম মংপু’তে।

মংপু’র রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটার অবস্থান বড়ই সুন্দর। বাড়িতে ঢোকার মুখে বাগান। আর সেখানে রয়েছে সোমনাথ হোরের তৈরি কবিগুরুর আবক্ষ মূর্তি, যার দিকে তাকালেই মাথা হেঁট হয়ে আসে। বাগান পেরিয়ে সেই বিখ্যাত বাড়ি যেখানে মৈত্রেয়ী দেবীর আতিথ্য গ্রহণ করে রবীন্দ্রনাথ এসে থেকেছেন কয়েকবার। আসলে স্বামীর কর্মসূত্রে মৈত্রেয়ী ওখানে আসেন। স্বামী মনমোহন সেন ছিলেন একজ কুইনোলজিস্ট। সিঙ্কোনা গাছ, যা থেকে আবিষ্কৃত হয় ম্যালেরিয়ার অব্যর্থ ওষুধ কুইনাইন, তারই চাষ হত ওখানে মনমোহনবাবুর নিবিড় তত্বাবধানে। ওঁরা ওখানে ছিলেন বেশ কয়েক বছর। আর অমন সুন্দর পাহাড়ি পরিবেশে থাকার জন্যে মৈত্রেয়ী দেবীর আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ এসেছেন চারবার। ভাল লেগেছে বলে এক একবার এসে থেকেছেন বেশ কয়েকদিন। লিখেছেন অনেক কবিতা। তাঁরই স্মৃতিধন্য হয়ে সেই বাড়ি আজ এক অনন্য রবীন্দ্রতীর্থ।

ওখানে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে একজন ছোটখাট মধ্যবয়স্ক পাহাড়ি মানুষ সহাস্যে এগিয়ে এলেন আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে। তাঁর নাম জানা গেল শিশির রাউত। তিনি ওখানকার যাকে বলে ‘কেয়ারটেকার’। কথায় কথায় জানা গেল তাঁর দাদু ভীমলাল রাউত ছিলেন রবীন্দ্রনাথের একজন পালকিবাহক। সেই সুত্রে শিশিরের বাবাও রবীন্দ্রনাথকে দেখেছেন। শিশির আসলে ওখানকার সিঙ্কোনা বাগানের শ্রমিক ছিল। প্রসঙ্গত জানাই ওই চাষ এখনও ওখানে হয়। আসলে পাহাড়ি পরিবেশে সিঙ্কোনার চাষ ভাল হয়। শিশির আসলে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ওই বাড়ি দেখাশোনা করার স্বেচ্ছাশ্রমে লিপ্ত হয়েছে। হয়ত ভিতরে ভিতরে তার মধ্যে এক অকৃত্রিম রবীন্দ্রানুরাগ কাজ করেছে। প্রথম দর্শনেই শিশির খোলা গলায় গেয়ে ওঠে ‘এসো এসো আমার ঘরে এসো’। স্পষ্ট বাংলায় কথা বলে। কথার ফাঁকে ফাঁকে গান করে, কবিতা বলে। বলাবাহুল্য সবই রবীন্দ্রনাথের। দক্ষ গাইডের মতো তাঁর আচরণ। বেশ সুললিত ভাষায় সে বলে যেতে থাকে ওই বাড়ি, সেন দম্পতি আর রবীন্দ্রনাথের কথা। অযত্নে অবহেলায় বাড়িটা কীভাবে জীর্ণ হয়ে যাচ্ছিল, সে কথাও সে বলে। সম্প্রতি সরকারি আনুকূল্যে বাড়ির চেহারা ফিরেছে। এ ঘর থেকে ও ঘরে যেতে যেতে সে বলে যায় সেই সময়কার ইতিবৃত্ত। আমাদের দেখায় কবির স্নানঘর, লেখা ও আঁকার টেবিল। আমরা মুগ্ধ বিস্ময়ে তাঁর কথা শুনি। তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরাও গেয়ে উঠি ‘মেঘ বলেছে যাব যাব, রাত বলেছে যাই’। আমাদের মংপু দর্শন সার্থক হয়। বাড়ির কাঠের তৈরি সিঁড়িতে বসে আমরা দূরের পাছপালা আর পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে থাকি। এমন সময় শিশির এসে আমাদের সামান্য কিছু খাবার এনে দেয়। গলায় পরিয়ে দেয় উত্তরীয়। হাত পেতে আমরা সব কিছু নিই। ও কিন্তু আমাদের কাছে হাত পাতে না। তবু আমরা সামান্য কিছু টাকা গুঁজে দিই ওঁর হাতে। হাঁটতে হাঁটতে ও কথা বলে। ও এইসব করে নিজের তাগিদে। বেতন তো দূরের কথা, এজন্যে কিছুই ও পায় না। এই জায়গাটা যে ও বড় ভালবাসে! সেই খুব ছোটবেলা থেকে এখানে আছে যে! শিশিরের কথা অবশ্য পরে অনেকের মুখেই শুনেছি। এই সেদিন দেখলাম একজন ফেসবুকে ওঁকে নিয়ে একটা ছোট্ট ভিডিও আপলোড করেছে। অমন নির্জন জায়গায় ওর মতো এক প্রাণবন্ত মানুষকে পেয়ে সবাই বর্তে যায় যেন! রীতিমতো পেশাদার গাইডের মতো সে সবাইকে সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখায়।

দুপুর গড়িয়ে কখন বিকেল আসছে। আমরা এবার ফিরে যাবার জন্যে প্রস্তুতি নিই। সারাদিনের ক্লান্তি এবার যেন এসে ভর করে শরীরে। তাছাড়া পাহাড়ি রাস্তা ধরে ফেরার জন্যে সন্ধ্যে বা রাত্রি মোটেই ভাল সময় নয়। আমরা আস্তে আস্তে আমাদের গাড়ির দিকে এগিয়ে যাই। পিছন ফিরে দেখি এক দল ভ্রমণার্থীকে নিয়ে শিশির আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ওর মধ্য থেকেই ও হাত নাড়ে, আমরা প্রত্যুত্তর দিই। আমরা ফেরার পথে পা বাড়াই।
মংপু আমার কাছে প্রেমেন্দ্র মিত্রর ‘তেলেনাপোতা’র মতো অল্প সময়ের জন্যে আবিষ্কৃত হয়ে স্মৃতির অতলে তলিয়ে যায় না। বরং আমার মনের ক্যানভাস জুড়ে এক অনাবিল দৃশ্যরাজির আলবাম হয়ে থাকে নিরবধিকাল।