চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৮১॥ সুশীল সাহা



‘মিঠি’ একটি শহরের নাম


মিঠি একটি শহরের নাম। এতে কী বোঝা গেল? ওই একটিমাত্র বাক্যবন্ধে কিছুই বোঝানো গেল না। ‘মিঠি’ এই শব্দটার সঙ্গে আমার অনেকদিনের পরিচয়। আশির দশকের গোরার দিকে শঙ্খ ঘোষের উল্টোডাঙ্গার ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসের ফ্ল্যাটে যেদিন প্রথম যাই সেদিন তাঁর ফ্ল্যাটে ঢোকার দরজায় দেখেছিলাম লেখা মিঠি/টিয়া। পরে জেনেছিলাম ও দু’টো ওঁর দুই কন্যার নাম। অনেকবার ভেবেছি, কেন শুধু ওই দুটো নাম! থাকতে পারত আর যাঁরা ওই ফ্ল্যাটে থাকে, তাঁদের নামও। এগুলো শুধুই ভেবেছি, কাউকে কোনওদিন বলিনি। দুই কন্যার বিয়ে হয়ে যাবার পরেও নামদুটো ঠিকই ছিল। একসময় দেখলাম কে বা কার দুষ্টুমিতে ওই ফলক কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত। কিছুদিন পরে দেখলাম ওটা আবার ঠিক করা হয়েছে। তবে মিঠি শব্দটার সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হলাম অতি সম্প্রতি। কীভাবে যেন ছোট্ট একটা ভিডিও এল আমার কাছে। জানলাম ‘মিঠি’ একটা শহরের নাম। তবে শহরটা আর দশটা শহরের থেকে একেবারেই আলাদা।

তবে শুধু একটা শহরের নাম বললে কিছুই বলা হল না কিন্তু! এই শহরটার অবস্থান পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের মরুভূমি অঞ্চলে। ওখানকার ‘থর-পার্কার’ জেলার সদর শহর এই মিঠি। হ্যাঁ, সেই পাকিস্তান যেখানে আজ হিন্দুধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা কমতে কমতে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র আশি লাখে, তখন সেই দেশেরই পূর্বপ্রান্তে, মিঠি নামাঙ্কিত এই ছোট্ট শহরের মানুষজনের ঘুম ভাঙ্গে মন্দিরের ঘন্টাধ্বনিতে। হ্যাঁ, এই শহরে মুসলমানেরা সংখ্যালঘু। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এই তথ্য। এই শহরের কথাই এবার। যদিও সবটাই আমি লিখছি নানা সূত্র থেকে সংগৃহীত নানান তথ্য থেকে। সত্যিই পরমাশ্চর্যের সেইসব তথ্য।

সমগ্র পাকিস্তানে এই একটা শহর যেখানে হিন্দুরা সংখ্যাগুরু। এই শহরের মোট জনসংখ্যা তিন লক্ষ, যার কুড়ি শতাংশ মুসলমান, বাকি আশি শতাংশ হিন্দু। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই এই শহরে মুসলমান ও হিন্দু এই দুই সম্প্রদায় মৌলবাদকে প্রতিরোধ করে পরম শান্তিতে বসবাস করে আসছেন। এই শহরে আজ পর্যন্ত কোনও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। মন্দিরে পুজোর সময়ে এখানে মসজিদের মাইক বন্ধ থাকে। আবার মসজিদে নামাজের সময়ে এ শহরের কোনো মন্দিরে কাঁসর ঘন্টা বাজে না। রমজানের সময় কোনও হিন্দু বাইরে খান না, শিবরাত্রির দিন মাংস বিক্রেতা কোনো মুসলমান দোকান খোলেন না। হোলির দিন দুই সম্প্রদায় একসঙ্গে উদযাপন করে উৎসব, একে অপরকে রঙ লাগায়। মহরমের মাসকে দুঃখের মাস গণ্য করে হিন্দুরাও। ওই মাসে ওঁরা বিয়ে কিংবা অন্য কোনও আনন্দ অনুষ্ঠান করেন না। ঈদের খুশির দিনে মুসলমানেদের সঙ্গে হিন্দুরাও যোগ দেন। ওই মাসে কোনও কোনও হিন্দু রোজা রাখেন। ইফতারে যোগ দেন অনেকে। শুনলে অবাক হতে হয়, ঈদে এই শহরে কেউ গরু কুরবানি দেয়না, এমনকি ঈদুল আযহায় এখানে ছাগল কুরবানি দেওয়া হয়। গোমাংস এখানে নিষিদ্ধ না হলেও গরুকে এখানকার মুসলমানেরা খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখে। হিন্দুদের কেউ মারা গেলে সবার আগে ছুটে আসে মুসলমান ভাইয়েরা। সবরকম শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করেন তাঁরা। অপরদিকে কোনও মুসলমান মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে সেখানে চলে আসেন হিন্দু ভাইয়েরা, আনুষ্ঠানিক সবকিছুতে যোগ দেন। আসলে মিঠির সমস্ত অধিবাসী মিলে গোটা একটা পরিবার। নানা রকম সহায়ে সম্পদে সুখে দুঃখে আনন্দে বিষাদে অগ্রবর্তিতায় যুগ যুগ ধরে এঁরা এইভাবে দিনযাপন করে আসছেন।

থর-পার্কার জেলার হৃদপিণ্ড এই মিঠি শহরটা অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক এগিয়ে থাকায় অন্য জায়গা থেকে অনেকেই জীবিকার সন্ধানে এখানে আসে। মিঠি কাউকেই ফেরায় না। তবে বহিরাগতদের এখানে নেই রাত্রি যাপনের অধিকার। বাইরের মানুষের সংস্পর্শে এসে মিঠি তার নিজস্বতা হারাতে চায় না। শিক্ষার হারে মিঠি পাকিস্তানের অনেক জেলা সদরের থেকে এগিয়ে। ছোট্ট শহর হলেও এখানে স্কুলের সংখ্যা অনেক। এরমধ্যে মেয়েদের স্কুলই সাতটি। সবচেয়ে নামি স্কুলের নাম অমর যোগেশ কুমার মালানি হাই স্কুল। এখানে আছে তিন তিনটে ডিগ্রি কলেজ। আছে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও ইউনিভার্সিটিও।

শুনতে একটু আশ্চর্য লাগবে, তা হল মিঠিতে অপরাধের হার খুব কম। পাকিস্তানের যে কোনও জায়গার চেয়ে অনেক কম। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, মিঠি হল পাকিস্তানের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ জায়গা। মৌলবাদীরা নানাসময়ে নানা জাল বিছিয়েছে এখানে। সেগুলো সবই ব্যর্থ করেছে এখানকার মানুষেরা যৌথভাবে।

অতি সম্প্রতি পাকিস্তানের কোল মাইনিং অথরিটি থর-পার্কার জেলার ৯৬০০ স্কোয়ার কিলোমিটার জুড়ে কয়লা খনির আবিষ্কার করেছে, যার মধ্যে ৭৫০ বিলিয়ন টন কয়লা আছে বলে অনুমান করছেন বিশেষজ্ঞরা। চীনের কারিগরি সহায়তা পাওয়া যাবে এ ব্যাপারে। ওখান থেকে ৩০০০ টেকনিশিয়ান আসবেন এখানে। প্রস্তাবিত কয়লা খনিগুলোর কয়েকটা ব্লকের অবস্থান মিঠি শহর থেকে একটু দূরে। তাই পাকিস্তান সরকার এই শহরের পরিধি বাড়াবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তৈরি হবে প্রয়োজনীয় রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য পরিকাঠামো। আশা করা যায় অচিরেই উন্নত মিঠি উন্নততর হবে। এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভাল হবে আগের চেয়ে।
পাকিস্তান সরকার চাইলেই এই শহরে বহিরাগত মুসলমানেদের পুনর্বাসন দিয়ে এখানকার হিন্দুদের সংখ্যালঘু করে দিতে পারতেন, তবে তা হয়নি। এমন সুন্দর একটা জায়গা স্বাধীনতা প্রাপ্তির এত বছর পরেও তার নিজস্ব চরিত্র হারায়নি, এও কম নয়।

দেশভ্রমণের নেশা আমার বরাবরের। নিজের সামর্থ্যে নানা সময়ে নানা জায়গায় গেছি। প্রাণভরে ঘুরেছি কত না জায়গায়! মিশেছি কতরকমের মানুষের সঙ্গে! আপন বৃত্ত থেকে যত বেরোতে পেরেছি ততই পেয়েছি আনন্দ। এই আনন্দের সন্ধানেই একটি ভ্রমণ শেষ করে আরেকটি ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছি পুনর্বার। তবে নানাকারণে অনেক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন আর সম্ভব হয়নি। তাছাড়া অতিমারীর এই দুঃসময়কালে তো সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিতে হয়েছে আমাদের। ডানাভাঙ্গা পাখির মত অবস্থায় রয়েছি আমরা। তবু তো স্বপ্ন দেখি, নিশ্চয়ই এই দুঃসময়কাল কেটে যাবে। ফিরে আসবে আমাদের আগেকার সেই স্বাভাবিক জীবন।
সেই জীবন ফিরে আসুক বা না আসুক, আমি মনে মনে স্বপ্ন দেখি ‘মিঠি’তে যাবার। আর কোথাও যাই বা না যাই, এই একটা জায়গায় গেলে আমার তীর্থ দর্শনের অভিজ্ঞতা হবে। দেবতা নয়, মানুষরতন খুঁজেছি সারাজীবন। মনে হয় ওই মিঠিতে গেলেই খুঁজে পাব আমার মনের মানুষদের।
স্বপ্ন সত্যি হোক বা না হোক, দেখতে তো আপত্তি নেই!