চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৮৩॥ সুশীল সাহা


প্রসাদ বসুর কথা


প্রসাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল চিরঞ্জিতের সূত্রে। এসেছিল ফুলতলায় পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে। গান নাচ আর নাটকের পরিপূর্ণ আয়োজন ছিল সেবার। বলাবাহুল্য সবকিছুতে এই বান্দার একটু না একটু অবদান ছিলই। তাই যখন অনুষ্ঠান শেষ হলে সবার মুখে যখন ভুরি ভুরি প্রশংসাবাক্য শুনছিলাম, তখন বেশ ভালই লাগছিল। দশদিনের নিরন্তর মহড়ার একটা ভাল ফলশ্রুতি ঘটেছে। সকালের অনুষ্ঠান। শেষ হতে হতে প্রায় দুপুর। সবার জন্যেই আহারের আয়োজন। দরাজদিল গৃহস্বামী সবাইকে ডেকে ডেকে খেতে বসালেন। আর খাবার সময়ে আমার পাশে এসে বসলেন চিরঞ্জিত। কথায় কথায় জানা গেল ও দৌলতপুরের একটা স্কুলের হেডমাস্টার। স্কুলের পিছনেই থাকে। বারবার করে একদিন ওঁর ওখানে যাবার জন্যে বলতে থাকলেন। এমন তো কত জনাই বলে! সময় কোথায় অতো!! তবু একদিন যেতেই হল বারবার ফোন করে তাগিদ দেবার জন্যে। ওখানেই সেদিন দেখা প্রসাদ বসুর। আসল নাম রণদাপ্রসাদ বসু রায়চৌধুরী। নামটা নিজেই সংক্ষেপ করে নিয়েছেন। ওই নামেই কবিতা লেখেন। ইতঃমধ্যে এগারোটা কবিতার বই বেরিয়েছে তাঁর। সবগুলোরই প্রকাশক ঢাকার। বেশ সুমুদ্রিত, ভাল বাঁধাই। দেখলেই বই হাতে নিতে ইচ্ছে করে। প্রথম পরিচয়ের দিনই প্রসাদ তাঁর সবগুলো বই আমাকে উপহার দিল। চিরঞ্জিতের সৌজন্যে সেদিন অনেক গল্প হল। খাওয়া দাওয়া তো ছিলই। কথায় কথায় সেদিন জেনেছিলাম প্রসাদের জীবিকা ব্যবসা। এম এ পাশ করে পারিবারিক ব্যবসায় সে মনোনিবেশ করেছে। চাকরি করতে চায়নি সে কোনও দিন। বরং তাঁর সংস্থায় চার/পাঁচজন কাজ করে। কীসের ব্যবসা জিজ্ঞেস করতেই ও স্মার্টলি বলেছিল ‘চিটেগুড়ের’। শুনে মনটা বেশ দমে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত চিটেগুড়! পরে ওঁর সঙ্গে মিশে বুঝেছি, ও আসলে একজন কবিই। ব্যবসা করে অর্থোপার্জনের জন্যে। ব্যবসা তাঁকে গিলে খায়নি। সে লিখতে ভালবাসে, গান শোনে। ভীষণ আমুদে স্বভাব তাঁর। সুযোগ পেলেই সিনেমা থিয়েটার দেখে। খুলনায় ওসবের সুযোগ খুব কম। তাই মাঝে মাঝে ও কলকাতায় যায়। কয়েকটা দিন খুব হৈ হৈ করে কাটায়। পরিচয়ের পরে প্রথমবার ও যখন কলকাতায় এল, তখন ওঁর যাত্রাসঙ্গী আমাকে হতেই হল। ওঁকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম একদিন বাঙ্গুরে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বাড়িতে। আরেকদিন গেলাম শঙ্খ ঘোষের ফ্ল্যাটে। প্রসাদ তো খুব খুশি। আরেকবার গেলাম অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর কাছে। অলোকদার কথায় রীতিমতো উদ্দীপ্ত হল প্রসাদ। এমনি করে ওঁকে নিয়ে গেছি আলোক সরকারের কাছে, মণীন্দ্র গুপ্তর ফ্ল্যাটে, যেখানে বাড়তি প্রাপ্তি দেবারতি মিত্র। এছাড়া আইনক্স আর আকাডেমি, রবীন্দ্র সদন কিংবা চাং ওয়াতে তো বহুবার গেছি। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে প্রসাদ আমার এক বড় মাপের বন্ধু হয়ে গেছে। মুশকিল শুধু একটাই, বড্ড সিগারেট খায় ও। এসি ট্যাক্সির জানালা তাই বন্ধ করা যায় না। এ নিয়ে অনেকবার বলেছি ওঁকে। কিন্তু কোন কাজই হয়নি তাতে।

কথায় কথায় জেনেছি পাঁচ ভাইয়ের বড় প্রসাদ সকলের অভিভাবক। বাবা মা নেই। ওঁদের দৌলতপুরের বাড়িতে গিয়ে দেখেছি দারুণ এক যৌথ পরিবারের বন্ধনে আবদ্ধ ওঁরা। প্রসাদ নিঃসন্তান। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাইও ব্যবসা করে। ওদের একটি করে দুটি কন্যা। চতুর্থ ভাই জন্মান্ধ, বিয়ে করেনি। খুব ভাল গান গায়। এখানে ওখানে অনুষ্ঠান করে। শিল্পী হিসেবে খুব নামডাক তার। পরের ভাই সুমঙ্গলও বিয়ে করেনি। ফিলোসফিতে মাস্টার্স করে হ্যান্ডিক্রাফটের ব্যবসা করে। দেশ বিদেশের মেলায় তার পাঠানো জিনিস বেশ উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। ব্যবসার কারণে ও কয়েকবার ইওরোপ ঘুরে এসেছে। বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই, তবু বিয়ের ব্যাপারে তার প্রবল অনাগ্রহ।

প্রসাদের দৌলতপুরের বাড়িতে বেশ কয়েকবার যাবার সূত্রে তাঁদের সন্তান না হওয়ার দুঃখের শরিক হয়েছি। কলকাতায় ভাল ডাক্তারের পরামর্শে চলেও ওতে কোনও কাজ হয়নি। পঞ্চাশ পেরোনো প্রসাদ ওই ব্যাপারে মোহমুক্ত হয়েছে মনে হয়। কিন্তু তাঁর স্ত্রীর মধ্যে রয়েছে এক না পাওয়ার কষ্ট। দত্তক নিতে বলেছিলাম ওঁদের। কিন্তু সেই সন্তান মানুষ করা কঠিন বলেই ও চেষ্টা থেকে ওঁরা বিরত থেকেছে। তাই বিষয়টা নিয়ে আর বেশিদূর এগোইনি আমি। যে সমস্যা থেকে ওঁদের মুক্তি নেই, তা নিয়ে এইভাবে নাড়াঘাঁটা করা আমার স্বভাববিরুদ্ধ।
একদিন জানলাম প্রসাদের মেজ ভাই আমাদের বাড়ির কাছে মধ্যমগ্রামে একটা বহুতল বাড়ি তৈরি করছে। ঠিক ব্যবসা করার জন্যে নয়। ভাইবোনেরা সব একসঙ্গে থাকবে। যথাসময়ে সেই বাড়ির কাজ শেষ হল। প্রসাদসহ সব ভাইবোনেরা ওখানে চলে এল। সবচেয়ে বড় ফ্ল্যাটটা কিনল সুমঙ্গল। কানাঘুষোয় জানা গেল এবার নাকি ও বিয়ে করবে। ওই বাড়িতে প্রসাদও একটা ফ্ল্যাট কিনল। তবে সবাই তো সেইভাবে বাংলাদেশের পাট চুকিয়ে চলে আসতে পারেনি! বিশেষ করে প্রসাদ। ব্যবসায় প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করে ফেলেছে। সেইসবের দায় মিটিয়ে তাঁর আসাটা মুশকিল। তবে অন্যেরা চলে গেলেও সে যাবে সবার শেষে। তাঁর ছিল ‘বিজনেস ভিসা’। তাই মন চাইলেই যখন খুশি সে চলে আসত কলকাতায়। এবং তাঁর আসা মানেই সিনেমা থিয়েটার রেস্টুরেন্ট সেলিব্রেটিদের বাড়িতে যাওয়া এবং কয়েকটা দিন প্যাসিভ স্মোকিং সহ্য করা। ওঁর ওই একটাই দুর্বলতা। বলে বলে আমি ক্লান্ত। অগত্যা মেনেই নিয়েছি ব্যাপারটা।

বছর তিনেক আগে প্রসাদ খুব আনন্দের সঙ্গে বলল, ছোটভাই সুমঙ্গল নাকি এবার বিয়ের জন্যে তৈরি হয়েছে। পাত্রী দেখা ও নির্বাচন চূড়ান্ত করেছে। মেয়ে উচ্চশিক্ষিত, কলকাতা হাইকোর্টে প্র্যাক্টিস করে। বেশ ভাল আইনজ্ঞ। বিয়েতে নিমন্ত্রিত হলাম। বালিগঞ্জের এক হোটেলে আয়োজন। নিমন্ত্রিতের সংখ্যা কম। বেশ একটা আন্তরিক পরিবেশে সুমঙ্গলের বিয়েপর্ব সম্পন্ন হল। একদিন ওর সুন্দর সাজানো গোছানো ফ্ল্যাটটা নব বধূর আগমনে গমগম করে উঠল।
‘তারপর তাহারা সুখে শান্তিতে সংসার করিতে লাগিল’ – এই ধরনের আপ্তবাক্য দিয়ে এই লেখাটা শেষ করতে পারলে ভালই হত। কিন্তু জীবন যে অন্যরকম কথা বলে! আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে কত না অজানিত অভিজ্ঞতা!

বহুদিন প্রসাদের সঙ্গে দেখা হয়নি। ২০২০ সালের গোড়া থেকেই গোটা বিশ্বকে করোনা আতঙ্ক গ্রাস করল। বাংলাদেশও তার থেকে রেহাই পেল না। প্রসাদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়। তাঁর বিজনেস ভিসা থাকলেও সে আসছে না ভয়ে। তাছাড়া লক ডাউন পর্বে তো সবার গৃহবন্দী অবস্থা। এমনি করে গোটা বছরটা কাটল। ’২১ সালের শুরুতে করোনা প্রকোপ কিছুটা কমে ক্রমশ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করল। কত যে চেনা মানুষ চলে গেলেন এরমধ্যে! হাসপাতালগুলো ভরা রোগীতে। প্রতিদিন মৃত্যুর গ্রাফ বাড়ছে। এ কী দুর্দৈব! চতুর্দিকে কেবল গণচিতার দাউ দাউ লেলিহান শিখা।

এরই মধ্যে একদিন খুলনা থেকে প্রসাদের ফোন, দাদা আমাদের বড় বিপদ। সুমঙ্গলের স্ত্রী করোনায় মারা গেছে। রেখে গেছে একটি সদ্যজাত কন্যা, মাত্র দশ/বারোদিন যার বয়েস। এটা শুনে আমি প্রায় স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
খবরটা শোনার পর থেকেই মাঝে মাঝেই সুমঙ্গলের মুখটা চোখের সামনে ভেসে আসে। অনেক বয়সে সে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন এইভাবে ভেঙ্গে যাবে, কে জানত! শুধু ভাবি, যে চলে গেছে সে তো আর ফিরবে না, কিন্তু ওই ছোট্ট বাচ্চাটার কী হবে! সুমঙ্গল কি আবার বিয়ে করবে? কোথায় পাবে উপযুক্ত মেয়ে? বাচ্চাটাকে নিজের মতো করে ভাববে কি সে? নিত্যদিন এমন সব নানা প্রশ্ন এসে ভিড় করে মনে। উত্তর পাই না। শেষে একদিন ফোন করলাম খুলনায়।
আমার ব্যাগ্র প্রশ্নের উত্তরে প্রসাদ বলল, না সুমঙ্গল আর কিছুতেই বিয়ে করবে না। ওই বাচ্চাটাকে প্রথম সুযোগেই ও আমাদের দিয়ে যাবে। আমার শ্রীমতী ওকে মানুষ করবে। মনে মনে ভাবলাম, ভালই তো হবে, কিন্তু সুমঙ্গলের কি হবে! উত্তরে প্রসাদ বলল, ভাই বড় স্বাধীনচেতা। ওকে ওর নিজের মতো করেই থাকতে দিতে হবে। আমাদের কথা শুনবে না।
এরপর থেকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই প্রসাদ ফোন করে। বাচ্চাটার নাম ওরা ঠিক করেছে, ‘অদিতি’ – ডাক নাম মুন্নি। ওর জন্যে ভাল একটা দোলনা কেনা হয়েছে। কেনা হয়েছে দেশি বিদেশি নানারকম খেলনা। বাচ্চার জন্যে গয়না বানানো হয়েছে অনেক। লক ডাউন উঠে গেলেই প্রথম সুযোগেই মুন্নি আসবে ওদের কাছে। মাস পাঁচ/ ছয় বাদে খুব ঘটা করে মুন্নির অন্নপ্রাশন করতে চায় ওরা। ততদিনে নিশ্চয়ই অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তখন আমাকে নাকি যেতেই হবে।
প্রসাদের কথাগুলো শুনতে চোখের সামনে ভেসে আসে ওঁদের আলো ঝলমল দৌলতপুরের বাড়ির ছবিটা। প্রসাদের স্ত্রীর উজ্জ্বল মুখটা একবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তারপর সুমঙ্গল এবং অবশেষে প্রসাদ।
ভবিতব্য কাকে যে কোথায় নিয়ে যায়, কে জানে !


*এই আখ্যান মূলত সত্যমূলক। জীবন্ত এই চরিত্রগুলোর নাম অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই পালটানো হয়েছে, সেইসঙ্গে ঘটনা বিন্যাসে কিছু কল্পনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।