চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৮৪॥ সুশীল সাহা


মানব মিত্র


প্রথমেই জানিয়ে রাখি মানব মিত্র নামটি কল্পিত। অনেকেই ভেবে বসতে পারেন এটা বুঝি ‘দূরের জানালা’র লেখকের আড়ালে থাকা গায়ক সুমন চট্টোপাধ্যায়ের কথা। না, তা নয়। আমার খুব কাছের একজন মানুষকে নিয়ে এই লেখা। আসল নামটা সঙ্গত কারণেই জানালাম না।
এই একটা মানুষ, জীবনটাকে কীভাবে যেন হেসে খেলে কাটিয়ে দিল। একসময় সে আমার নানাবিষয়ে আগ্রহ দেখে বলেছিল, এইভাবে পল্লবগ্রাহীতা না করে বিশেষ একটা ব্যাপারেই মনোনিবেশ করতে। আমি তার কথা শুনিনি। শিল্প-সাহিত্যের নানা অলিগলি ঘুরেছি মনের খেয়ালে। কিন্তু সে কি করল! আমাকে জ্ঞান দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নিজে সে কথা মানেনি। খুব ছোটবেলা থেকেই তার ছবি আঁকার দিকে ঝোঁক। ভেবেছিলাম ছবির জগতেই সে একদিন প্রতিষ্ঠা পাবে। কিন্তু কী হল শেষ পর্যন্ত!

খুলনার সেই আমাদের অতি বাল্যকালের দিনগুলোয় মুখচোরা লাজুক মানব ছিল আমার খুব কাছের মানুষ। কিন্তু হঠাৎ একদিন শুনলাম ওরা চলে গেছে পশ্চিমবঙ্গে। সালটা ৬০/৬১-ই হবে। জীবন তো তার নিজস্ব নিয়মেই চলে। ধীরে ধীরে কেমন করে যেন মেনে নিলাম মানবের অনুপস্থিতি। আমি মেতে উঠলাম আমার তখনকার জীবন নিয়ে। একদিন হঠাৎ আমার স্কুলের ঠিকানায় মানবের একটা চিঠি এসে হাজির। অবাক কাণ্ড! জানলাম, ওরা পশ্চিমবঙ্গের হাবড়ায় থিতু হয়েছে। বাড়ি করেছে প্রফুল্লনগরে। জেনে খুব ভাল লাগল, ও ভর্তি হয়েছে ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে, শর্ত একটাই, চার বছরের সময়সীমার মধ্যে ওকে স্কুল ফাইনাল পাশ করতেই হবে। প্রসঙ্গত জানাই, প্রথাগত পাঠে ওর উৎসাহ ছিল না কোনওদিনও। সেই নিরুৎসাহই কাল হল। কিছুদিন পরে শুনলাম মানব আর্ট কলেজ ছেড়ে দিয়েছে। স্কুলের সীমানা সে কোনওদিনও অতিক্রম করতে পারল না। ’৬৪ তে স্কুলের পাঠ সাঙ্গ করে আমরা কলেজে ঢুকলাম। ওদিকে চিঠিপত্রে জানতে পারি মানব নাকি ফটোগ্রাফার হবে। দামি ক্যামেরা কিনেছে। কিছুদন পরে শুনলাম ফটোগ্রাফির পালা সাঙ্গ করে সে একটা বইয়ের দোকান করেছে। সুন্দর একটা নাম দিয়েছে ‘গ্রন্থবিচিত্রা’। সেই ব্যবসাও সে করতে পারল না। ইতোমধ্যে একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছে, এ কথাও সে জানাল একটি চিঠিতে। বইয়ের দোকান বন্ধ করে শুনলাম সে নাকি একটা বড় বিচিত্রানুষ্ঠান করবে হাবড়ায়। হেমন্ত-শ্যামল-ইলা বসু-যোগেশ দত্তসহ আরো অনেকেই নাকি আসবেন। সেটা ’৬৬ সালে। অসীম কৌতূহল নিয়ে ওই সময়ে বিনা পাশপোর্টে সীমানা পেরোলাম বন্ধু বিকাশের সহায়তায়। অনেকদিন বাদে দেখা হল মানবের সঙ্গে। ওদের বাড়িতে থাকলাম কয়েকদিন। ও আমাকে নিয়ে কলকাতার নানা জায়গায় ঘোরাল। দেখাল ‘ক্লিওপেট্রা’, ‘সাউন্ড অফ মিউজিক’, ‘তিসরি কসম’-এর মত সিনেমা। দেখলাম মুখচোরা লাজুক মানব তখন বেশ চালু হয়েছে। ছবি আঁকা অবশ্য ছাড়েনি তখনও। যা হোক, অনেক ঢাকঢোল পেটানো হল হাবড়ার সেই অনুষ্ঠানের। নানা জায়গায় পোস্টার পড়ল। বিলি হল হ্যান্ডবিল। তখন কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায় বিচিত্রানুষ্ঠান হত, বিশেষ করে শীতকালে। অনেক টাকা টাকা ঢেলেও মানবের সেই অনুষ্ঠান কিন্তু সফল হল না। রাত দুটোর সময় পণ্ড হয়ে গেল বিরোধী পক্ষের প্রচেষ্টায়। অনুষ্ঠান চলাকালে দেখলাম কিছু মানুষ শোরগোল করছে, বলছে অন্য শিল্পীরা কোথায়? শুনতে পেলাম, গোলমালের আভাস পেয়ে অনেক শিল্পী নাকি মাঝপথ থেকেই ফিরে গেছে। হঠাৎ দেখলাম প্যাণ্ডেলে আগুন লাগিয়েছে কারা যেন। এদিক ওদিক ছত্রখান হয়ে গেল সব দর্শক। ততক্ষণে হেমন্ত-শ্যামল-ইলা বসুদের গান অবশ্য হয়ে গেছে। যোগেশ দত্ত সেদিন মুকাভিনয় করেননি। করেছিলেন একক অভিনয়। হঠাৎ যদি নজরুল ইসলাম তাঁর স্মৃতিশক্তি ফিরে পান, তাহলে তখনকার ভারতবর্ষ দেখে তাঁর কী প্রতিক্রিয়া হবে, সেটাই ছিল তাঁর বিষয়। খুব ভাল লেগেছিল আমার। যা হোক পণ্ড হয়ে যাওয়া অনুষ্ঠানের এলাকা ছেড়ে কোনওরকমে মানবদের বাড়িতে ফিরে এলাম। পরদিন সকালে মানবের দাদার আক্ষেপোক্তি আজও কানে বাজে আমার। তাঁর কথাসমূহের মধ্যে মানবের নানা ব্যর্থ উদ্যোগের কথা বলছিলেন তিনি। সেইসব কথা শুনতে আমার একেবারেই ভাল লাগছিল না। মানবকে কিছুই জিজ্ঞাসা করিনি। একটু কৌতূহল ছিল তার প্রেমিকাকে দেখার। কিন্তু তাও হল না। একদিন জানলাম সেই সম্পর্কও ভেঙ্গে গেছে।

’৭০-এ পাকাপাকিভাবে আমিও চলে এলাম এই বঙ্গে। থিতু হলাম ওই হাবড়াতেই আমাদের পৈত্রিক বাড়িতে। মানব তখন চুটিয়ে রাজনীতি করছে। এস ইউ সি আই। পশ্চিমবঙ্গে তখনও নকশাল আমল। কিছুদিনের মধ্যে তাদের হটিয়ে সারা ভারতের সিংহাসন দখল করল ইন্দিরা কংগ্রেস। এই বঙ্গের কর্ণধার তখন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়।
আমরা যখন চাকরির সন্ধানে এদিক ওদিক ছুটছি, মানব তখন হঠাৎ বিয়ে করে বসল। এক দাদার বিয়েতে গিয়ে প্রেমে পড়ল দাদারই শ্বশুরবাড়ির তরফের এক আত্মীয়াকে। প্রেম থেকেই এই বিয়ে। বিয়ের পরে নিজের দাদার সংসার ছাড়তে হল তাকে। সে তার মাকে নিয়ে চলে এলো বারাসাতে। তার আগে ঘটেছে ওদের নানা পারিবারিক বিপর্যয়। বাড়ি বিক্রি করে তার ভাগ নিয়ে এসেছে সে। এবার তার জীবন চলতে থাকল অন্য এক খাতে। ইতোমধ্যে ওর তিন বোনেরই বিয়ে হয়ে গেছে বেশ সম্পন্ন ঘরে। ওরা ওদের মায়ের নামে টাকা পাঠায়, দাদাও কিছু দেয়। আর তা দিয়েই সংসার চলে মানবের। নিজে ছোট ছোট বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখায়। সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিল, সফল হয়নি। শাড়িতে নানারকম নক্সা এঁকে অল্পকিছু অর্জন করে। এরমধ্যে তাদের ঘরে এসেছে একটি ছেলে আর একটি মেয়েও। কীভাবে চলে সেই পাঁচজনের সংসার? মানবের স্ত্রী টুলুকে অবশ্য এজন্য কৃতিত্ব দিতেই হয়ে। মানবের ঘাড় থেকে তখনও রাজনীতির ভূত নামেনি। এইভাবে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো মানুষ আমি জীবনে খুব কম দেখেছি। আমি ততদিনে চাকরি একটা পেয়েছি। মাঝে মাঝে মানব আসে আমার কাছে। ওর তৈরি শুভেচ্ছা কার্ড কিনি। কিন্তু বুঝি অভাব ওর কোনওদিনও ঘুচবে না। কী বলব ভেবে পাইনা। ওর জীবন তো বইছে অন্য খাতে! এখন চেষ্টা করলেও ফেরানো যাবে না ওকে। দারিদ্রের চিহ্ন সর্বাঙ্গে ধারণ করেও ও শোধরাবে না। একদিন শুনলাম ওর মেজ বোনের স্বামী, একদা বন্ধু মানবের, অনাদি একটা গ্যাসের ডিলারশিপ পেয়েছে। সেখানকার ম্যানেজার হল মানব। বুঝলাম এতদিনে বুঝি ওর জীবন পেল সত্যিকারের এক দিশা। কিন্তু সে সুখও টিকল না ওর কপালে। শুনলাম, মালিক বিরোধী আর শ্রমিকের পক্ষে আন্দোলনের ডামাডোলে সেই কাজটাও খোয়াল মানব, কিছু টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাকে বিদায় দিয়েছে তার একান্ত আপনজন। টাকার পরিমানটা খুব কম ছিল না। মানব চেয়েছিল কারো ব্যবসায় ওই টাকাটা খাটাতে। মাসে মাসে একটা লভ্যাংশ পেলেই সে খুশি। এই প্রস্তাব নিয়ে সে গিয়েছিল আমাদের এক ব্যবসায়ী বন্ধুর কাছে। খুব একটা কিছু হয়নি বলেই জানি। আসলে মানবের স্বভাবে ছিল এক ধরনের আলস্য। সারাজীবন ধরে নানারকম ব্যর্থ উদ্যোগের কারণে সম্ভবত নিজের আত্মবিশ্বাস একেবারেই হারিয়েছিল। অথচ ওর মতো সৎ মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। তবে এ যুগে শুধু সততা দিয়ে তো সবকিছু হয়না!

শুধু সততা দিয়ে যে কিছু হয়না, সে কথাও আজ মানি। মানবের আলস্যেভরা জীবনকে তাই আমি সেইভাবে মেনেও নিতে পারিনি। তাই দূর থেকে খানিকটা করুণামিশ্রিত অনুরাগেই ওকে সহ্য করে গেছি। মানবের পরম সৌভাগ্য যে ওর মা দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন। ততদিনে ওর ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে এবং নানাভাবে স্বনির্ভর হবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ওদের স্বভাবে ছিল উদ্যম ও আত্মপ্রতিষ্ঠার তীব্র তাগিদ। ছেলেও ভাল ছবি আঁকত। সেই আঁকার ক্ষমতাকে সম্বল করেই ও অল্প বয়সেই জীবিকার অন্বেষণে নেমে পড়ে এবং তা অচিরেই পথের দিশা পেয়ে যায়। একদিন শুনলাম সে একটা চাকরি পেয়েছে দিল্লিতে এক প্রকাশন সংস্থায়। মাইনে ভাল, নিজের যোগ্যতায় ও ক্রমশ ওই প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি পেয়ে যায় অতি অল্প সময়ের মধ্যেই। এদিকে মেয়েও ডিটিপি’র কাজ শিখে অল্পস্বল্প রোজগার করতে থাকে। এমন সময় মানবদের মাতৃবিয়োগ হয়। কিন্তু ওর সংসার ভেসে যায়নি ছেলে ও মেয়ের জন্যে। ওরাই তখন সংসারের হাল ধরেছিল। এ ব্যাপারে মানবের স্ত্রীর অবদান ভোলা যাবে না। এমন এক দিনে মানব আমার জন্য নিয়ে এল রীতিমতো এক উৎসাহব্যঞ্জক প্রস্তাব।
নানাসময়ে মানবের সূত্রে অনেক মানুষের সঙ্গে আলাপ হত। কিন্তু তারা কোনওভাবেই আমার জীবনে আলো ফেলতে পারেনি। বরং তাদের সঙ্গ আমাকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করত। সবই মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি ঘটনায় আমি ত্যক্তবিরক্ত হয়ে মানবের সঙ্গ পরিত্যাগ করি। এবারে সেই অপ্রিয় প্রসঙ্গটাই আনছি এখানে। নইলে ঠিক বোঝা যাবে না আমার মতো বন্ধুবৎসল মানুষও কেন ক্ষুব্ধ হয়। কোন অনিবার্য কারণে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে বহুদিনের সম্পর্কের। সেটাই এবার সংক্ষেপে জানাই।

নানাকারণে সিনেমা জগতের প্রতি আকর্ষণ আমার বরাবরই। তবে অভিনয় নয়, নির্মাণের দিকেই ঝোঁক ছিল আমার। তবে এটা যে খুব দুরূহ কাজ সেটা আমি তেমনভাবে জানতাম না। ফিল্ম ক্লাবের সদস্য হয়ে একসময় প্রচুর দেশি বিদেশি ভালো ভালো ছবি দেখেছি। তাছাড়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রোৎসবে একসময় অনেক ছবি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকায় একসময় লিখেছিও। তবে ছবি দেখা আর ছবি নিয়ে লেখা আর ছবি তৈরি করা এক ব্যাপার নয়। সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম কাজের রাস্তায় নেমে। প্রথম প্রয়াস, ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে ছবি ‘বোকাবুড়ো’। একটা চিত্রনাট্য লিখে ফেলেছিলাম যা ছাপা হয়েছিল চিত্রকথা নামের এক চলচ্চিত্র পত্রিকায়। দ্বিতীয় প্রয়াস, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ‘কেন এলো না’ অবলম্বনে। চিত্রনাট্য লিখলাম। দেখালাম স্বয়ং কবিকে। তিনি তাঁর মূল্যবান মতামত দিয়েছিলেন। কিছুদূর এগিয়ে ওই কাজ থেকে পিছিয়ে আসতে হয় আমাকে। কী সেই কারণ, তা নিয়ে আর ময়নাতদন্ত আর নাইবা করলাম। এর পরের প্রয়াস, শান্তিদেব ঘোষকে নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ। এ নিয়ে কয়েকবার শান্তিনিকেতনে যাওয়া হয়েছিল। খোদ শান্তিদেবের সঙ্গে হয়েছিল অনেক বাক্য বিনিময়। সেই ছবিও হয়নি। এইসব ছোটখাট উদ্যোগের বাস্তবায়ন হয়নি ঠিকই, কিন্তু মনের মধ্যে ইচ্ছেটা বেঁচেই ছিল। এমন এক সময়ে মানব একটা প্রস্তাব নিয়ে এলো আমার কাছে। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্ম শতবার্ষিকীতে ওই অগ্নিকন্যাকে নিয়ে একটি ছবি করতে হবে। প্রযোজনা করবেন মানবের রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘদিনের এক সাথী। মনটা প্রথমেই একটু খুঁতখুঁত করছিল। তবু স্বাধীনভাবে কাজ করার আশ্বাস পেয়ে রাজি হলাম। একদিন মানবই নিয়ে গেল সেই মানুষটার কাছে। প্রাথমিক কথাবার্তা মোটামুটি ভালই হল। বাড়ি ফিরে সোৎসাহে চিত্রনাট্য লেখার কাজ শুরু করলাম। কিছুদিনের মধ্যে সেটা দাঁড়িয়েও গেল। সেই সময় আমি সবকিছু হাতেই লিখতাম। চার পাঁচটা ড্রাফট তৈরি করে অবশেষে একটা দাঁড় করালাম। দিয়ে এলাম সেই চিত্রনাট্য সেই প্রযোজককে। এরপর রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা। দিন যায়, মাস যায়। কোনও খবর আসেনা। তারপর একদিন ফেরৎ এলো সেই চিত্রনাট্য। ওটা নাকি ওদের পছন্দ হয়নি। মনটা খুব ভেঙ্গে গেল। পছন্দ হয়নি, সেটা জানাতে এত দেরি করল কেন? কী জানি আমার লেখাকে ওরা আত্মসাৎ করে দেয়নি তো। আমার সমস্ত রাগ অভিমান গিয়ে পড়ল মানবের উপর। কেমন একটা বিবমিষা তৈরি হল মানব সম্পর্কে। আমি ক্রমশ ওর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম। আত্মধিক্কারের গ্লানিতে মনটা বিশিয়ে উঠেছিল। ওর তরফে নানারকম চেষ্টাকে আমি অবশ্য ব্যর্থ করে দিলাম। এইভাবে কেটে গেল একটা একটা করে দশ দশটা বছর।
মাঝে মাঝে অবশ্য মনে পড়ত ওর কথা। কিন্তু সেগুলোকে আমল দিতাম না একেবারেই। হঠাৎ আমার এই লেখার উপাত্ত হিসেবে মানবের কথা মনে এলো। জীবনে কত মানুষকে দেখলাম। কিন্তু মানবের মতো গুণী অথচ অলস, সৎ অথচ বিপথগামী এমন কাউকে দেখিনি আমার এই ইহজীবনে। ওকে নিয়ে লিখতে শুরু করলাম। উপসংহারে এসে আটকে গেলাম। কী লিখব! ও এখন কী করছে, কেমন আছে, আদৌ বেঁচে আছে কিনা, এমন সব নানান কৌতূহলে একদিন ওকে একটা ফোন করেই ফেললাম। ওপার থেকে মানবেরই কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। এটা ওটা জানার পরে ওর এখনকার গতিবিধি যা জানলাম তা সংক্ষেপে এই-
মানবের ছেলে কর্মজীবনে উন্নতি করেছে। এখন চাকরিসূত্রে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে হায়দ্রাবাদে থাকে। সেই ধরেছে সংসারের হাল। বারাসাতেই একটা ফ্ল্যাট কিনেছে, যেখানে এখন মানব টুলুকে নিয়ে থাকে। মেয়ে জামাই কাছাকাছিই থাকে। ওরাও বাবা মাকে সাহায্য করে। মানব টুকটাক ছবি আঁকে। শুভেচ্ছা কার্ড আঁকে। বুটিকের কাজ করে। আগের মতোই সামান্য অর্জন করে। কিন্তু সে ভাল আছে। আমাকে বলল, ‘যে নম্বরে তুমি ফোন করেছ সেটা টুলু ব্যবহার করে, আমাকে একটা স্মার্ট ফোন কিনে দিয়েছে ছেলে, সেই নম্বরটা তোমাকে পাঠাচ্ছি– ওতেই এখন থেকে তুমি আমাকে ফোন করবে।
আমি তো তাঁকে আর কোনওদিনও ফোন করব না। ওকে নিয়ে লেখাটার উপংহারের উপকরণ তো পেয়ে গেছি প্রত্যাশার অধিক। অতএব ওই সম্পর্কের এখানেই ইতি। টা টা বাই বাই।