চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৮৫॥ সুশীল সাহা



গিয়েছিলাম এক দৈব পিকনিকে, বিদেশে


বাংলাদেশ, বিদেশ হলেও আপন জন্মভূমি বলে দেশটির প্রতি একটা আলাদা আকর্ষণ আছে আমার কাছে। তাই ওখানে যাই বারবার। আমার আমি হয়ে ওঠা খুলনা শহরের প্রান্তে প্রান্তে খুঁজে ফিরি ফেলে আসা অতীত। খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে যাই এক অনাবিল অনুভূতির জগতে।
না, এই লেখা কোনও আত্মজৈবনিক কথকতা নয়, এই লেখা পিকনিকের উদ্দেশ্যে একবার বাংলাদেশে যাওয়া এবং ফিরে আসার এক মজার গল্প। হ্যাঁ, একবার পিকনিক করতেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম পাশপোর্ট ভিসার ঝক্কি সামলে। সে এক মজার অভিজ্ঞতা। সে কথাই এবার সবিস্তারে।
বনগাঁ দিয়ে হরিদাসপুর সীমান্ত পেরিয়েই বেনাপোল। আর ওই বেনাপোলেই থাকে আমার এক ভাই, রহিম। পেশায় ডাক্তার এবং সাংবাদিক। বছর কুড়ি আগে এক বন্ধুর সৌজন্যে ওঁর সঙ্গে পরিচয়। তখন তাঁর পেশা ডাক্তারি। বেনাপোলেই তাঁর ওষুধের দোকান। সাংবাদিক হয়েছেন অনেক পরে। তবে সাংবাদিক হবার পরে আগের পেশা থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন। এখন তাঁর বড়ো পরিচয় ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক হিসেবে। প্রায়শই তিনি ক্যামেরা নিয়ে এদিকে ওদিকে ছোটেন। সীমান্তের নানারকম খবর তাঁর মাধ্যমেই দেখতে পান অগণিত দর্শক। প্রথম পরিচয়েই খুব আপনজন হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। আসলে সীমান্তের ঝামেলা এড়াবার জন্যেই ওঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন আমার সাংবাদিক বন্ধু বিধান দাশগুপ্ত। বলতে দ্বিধা নেই রহিমের সঙ্গে পরিচিত হবার পরে বাংলাদেশের প্রান্তে আমার যাকে বলে ‘জামাই আদর’। এইভাবেই রহিমের সঙ্গে আমার সখ্য। আসা যাওয়ার পথে ওঁর বাড়িতে যেতে হয়, যেতেই হয়। ওঁর স্ত্রীর আদর আপ্যায়নে আমি রীতিমতো আপ্লুত। কখনও তা প্রায় অত্যাচারের শামিল হয়ে যায়। তবে সবটাই আমার ভাল লাগে। ভালবাসা কি এইভাবে ফেলাছড়া পাওয়া যায়! রহিমের স্ত্রী অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির মেয়ে। প্রথম দিন থেকে আমাকে দাদা বলে সম্বোধন করে আসছে। ওঁদের দুই ছেলে। বড়োটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আর ছোটটা স্কুলে। রহিমের ভাই করিম পাশেই থাকে। ওর দুই মেয়ে। দুই ভাইয়ে প্রবল সখ্য। বলাবাহুল্য করিম পরিবারের সবাইই আমাকে সেইভাবেই গ্রহণ করেছে। ফলে যা হল, সীমান্ত পেরোলে রহিম পরিবারের আতিথ্যের ঝামেলা পোয়াতে হয়। অনেক কষ্টে ওদের নিবৃত্ত করতে হয়। শুধু খাইয়ে দাইয়ে আপ্যায়ন করা নয়, নানারকম উপহার দেয় ওঁরা। আমিও সাধ্যমতো ওঁদের জন্যে কিছু না কিছু নিয়ে যাই সবসময়। খুব খুশি হয় ওঁরা। এখানকার বোরোলিন আর জবাকুসুম তেল বড়ো প্রিয় ওঁদের।
সাংবাদিক হিসেবে রহিমের বেশ নামডাক। তাঁর কাছে হাতে কলমে অনেকেই সাংবাদিকতার পাঠ নেয়। রহিম তাঁর সাংবাদিক বন্ধুদের নিয়ে একটি কো-অপারেটিভ করেছে। বেনাপোলেই ওঁদের অফিস। অনেক সদস্য নিয়ে ওঁদের কাজকর্ম। তিন চারজন কর্মী নিয়ে বেশ জমজমাট ওঁদের অফিস। বেনাপোলে গেলে রহিম আমাকে ওঁদের অফিসে নিয়ে যাবেই। একবার রহিম আবদার করে বসল, ওঁদের কো-অপারেটিভের বার্ষিক বন-ভোজনে অংশ নিতে হবে। সেটা এক ডিসেম্বর মাস। পিকনিক হবে জানুয়ারির মাঝামাঝি। ওঁদের জোরাজুরিতে কথা দিতেই হল। মাল্টিপল ভিসা ছিল আমার, তাই ঠিক করলাম পিকনিকের আগের দিন যাব এবং ওটা সেরে পরদিন ফিরে আসব। আমার এই পরিকল্পনার কথা শুনে অনেকেই হাসাহাসি করল। শেষ পর্যন্ত পিকনিক করতে বিদেশে, বাংলাদেশে। ভাবলাম হতে পারে ওটা বিদেশ, কিন্তু যাওয়া তো খুব সহজ। ভিসা থাকায় নতুন করে ভিসার ঝামেলা নেই। আমাদের হৃদয়পুর থেকে বনগাঁ ঘন্টা খানেকের পথ, ওখান থেকে অটো রিক্সায় সীমান্ত আধ ঘন্টায় পৌঁছানো। তারপর ওপারে পৌঁছালে তো রহিমের কল্যাণে রীতিমত ‘জামাই আদর’। সকালে রওনা হয়ে দুপুরের ভাত খাওয়া যায় ওদের বাড়িতে। যথাসময়ে ছোট্ট একটা ব্যাগ ঘাড়ে করে পৌঁছে গেলাম রহিমের বাড়িতে। দুপুরে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিতে না নিতেই রহিমের ডাকে উঠে পড়া এবং ওঁদের অফিসে যাওয়া। গিয়ে দেখি একেবারে সাজো সাজো রব। তিনটে বাসে শ’দেড়েক মানুষ যাবে পিকনিকে। সব পরিবারের বাচ্চা বুড়ো শামিল এতে। আমি হলাম বিশেষ অতিথি। ওঁদের ভাষায় ভারত থেকে আসা একজন গণ্যমান্য মানুষ।

ঘটনাক্রমে সেদিন ছিল পৌষ সংক্রান্তি। কনকনে শীতের সকালেই স্নান টান সেরে বাসে উঠলাম। সবাইকে ডেকে বাস ছাড়তে ছাড়তে বেলা সাড়ে আটটা হয়ে গেল। আমাদের গন্তব্য ঝিনাইদহের তমান্না পার্ক। বাস ছাড়তেই হাতে এলো সেদ্দ করা ডিমসহ ভুনা খিচুড়ির প্যাকেট। আধা প্যাকেটেই পেট ভরে গেল আমার। সকালে সোনা রোদে হৈ হৈ করতে করতে আমাদের বাসটা পৌঁছে যথাস্থানে। পরপর তিনটে বাস এসে পৌঁছালে আমরা সদলবলে ঢুকলাম পার্কের ভিতর। অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি করা পার্কটা সত্যিই খুব সুন্দর। যেদিকে তাকাই শুধু সবুজ আর সবুজ। বিশাল বিশাল গাছের ফাঁকে ফাঁকে নানারকম ভাস্কর্য আর স্থাপত্যের সমারোহ। কেউ একজন এটা বানিয়েছেন বাণিজ্যিক কারণে। তবে নির্মাতার রুচি আমাকে মুগ্ধ করল। সারাবছর, বিশেষ করে শীতকালে অনেকেই দলবল বেঁধে এখানে আসে পিকনিক করতে। আমরা যেদিন গিয়েছিলাম, সেদিনই আরো চারটে দল এসেছিল পিকনিক করতে। তবে জায়গাটা বড়ো বলে মোটেই ভিড়াক্রান্ত মনে হচ্ছে না। এমনকি সব দলই মাইকে গান বাজাচ্ছিল। একটা দলের সেই শব্দ আরেকটা দলকে পীড়িত করছে না কোনওমতেই। এত বড়ো ওই পার্কটা!

আমাদের বড়ো দলটা খুব তাড়াতাড়িই ছোট বড়ো নানা দলে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। স্বভাবতই আমি একা এবং একা। চিনি অনেককে, কিন্তু এমন সুন্দর জায়গায় একাকী হতেই ভাল লাগল। দেখলাম রহিম খুব তৎপরতার সঙ্গে হেঁসেলের সব আয়োজনে ব্যস্ত। খুব তাড়াতাড়িই রান্নার কাজ শুরু হয়ে গেল। আমি আর কী করব! সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা একা ‘নীল দিগন্তে’ গাইতে গাইতে অপেক্ষাকৃত একটা নির্জন জায়গা খুঁজে নিলাম। সেখানে গিয়ে সটান ঘাসের উপর শুয়ে পড়ে দূরের নীলাকাশ দেখতে থাকলাম। কখন যে দু’চোখের পাতা বুজে এসেছে টের পাইনি। হঠাৎ রহিমের ডাকে তন্দ্রা কেটে গেল। এবার শুরু হবে প্রকৃতই বনভোজন। খাবার আয়োজনে মেনু সংক্ষিপ্ত, খাসির বিরিয়ানি, স্যালাড আর বোরহানি। সার সার পাত পড়ল। বসে পড়লাম অনেকের সঙ্গে। ঘন্টাখানেক লাগল সবার খাওয়া শেষ হতে। তখন বেলা তিনটে। এবার শুরু হবে লটারি। কুড়ি টাকা টিকিট। কেউ কেউ পনেরো কুড়িটাও কিনল। আমি একটাই কিনলাম। শুরু হল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আবৃত্তি, গান আর নাচ। মাইক নিয়ে আমিও কিছু বললাম। সবার অনুরোধে গানও গাইলাম। ইতোমধ্যে লটারি শুরু হয়ে গেছে। নানারকম জিনিসপত্র ছড়ানো রয়েছে। দামি কিছু নয়। আমার ভাগ্যে জুটল একটা পা-পোষ। দেখা গেল কমবেশি সবাই কিছু না কিছু পেয়েছে। প্রথম পুরস্কার ছিল একটা টেবিল ফ্যান। সেটা যিনি পেলেন তাঁর মুখে আর হাসি ধরেনা। সমবেতভাবে ছবি তোলা হল। পরিচয় হল অনেক নতুন মানুষের সঙ্গে।

শীতের বেলা অতি দ্রুতই ফুরিয়ে যেতে থাকল। এবার ঘরে ফেরার পালা। দেখা গেল কারোই তেমন ফেরার তাগিদ নেই। তবু তো ফিরতেই হবে! বাস ছাড়তে ছাড়তে সন্ধ্যা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই দেখা গেল, এ ওর ঘাড়ে ঘুমে ঢলে পড়ছে। আমারও চোখ বুজে আসছিল। শীতও পড়েছিল সেদিন। ফেরার পথটা কেমন দীর্ঘ মনে হল। রাত প্রায় সাড়ে আটটার দিকে আমরা এসে পৌঁছালাম। খুব ক্লান্ত লাগছে তখন। কোনওরকমে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়তে চাইলাম। আগামীকালই তো আমাকে ফিরতে হবে। একটু রাতের দিকে রহিমের ডাকে বিছানা ছেড়ে উঠে রাতের খাওয়া সেরে আবার ঘুমের দেশে হারিয়ে গেলাম। ছোট্ট একটা ব্যাগই তো এনেছি, তা আর গোছাবার কী আছে। যা করার সকালেই করব।
ঘুম ভাঙ্গল একটু দেরিতে। যথারীতি রহিম ও তাঁর বাড়ির সবাই আরেকটা দিন থাকার জন্যে পীড়াপীড়ি করতে লাগল। ওদের কোনওরকমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করলাম। ঠিক হল দুপুরের খাওয়া সেরে রওনা হব।

রওনা হবার সময়ে দেখি, লাগেজ বেড়ে হয়েছে চার। রহিমের উপহার সামগ্রীর বহর দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ। গাছের নারকোল থেকে শুরু করে বাড়িতে বানানো পিঠে, নলেন গুড়, এমনকী খানিকটা লাউ শাকও নিতে হবে। সেটা নিতে না চাওয়ায় রহিমের স্ত্রীর প্রায় কেঁদে ফেলার দশা। কী আর করব! যথাসময়ে প্রায় হনুমানের মতো গন্ধমাদন পর্বত ঘাড়ে নিয়ে রওনা হলাম সীমান্তের দিকে। রহিম ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ অব্দি এগিয়ে দিল। বিদায়ের মুহূর্তে প্রায় কাঁদ কাঁদ হয়ে জড়িয়ে ধরল আমাকে। কোনওরকমে ওঁর বাহুপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করে আমি এগিয়ে গেলাম একটু একটু করে।
ফেলে এলাম আমার কিছু প্রিয়জনকে। সঙ্গে নিলাম আমার জীবনের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতাকে।