চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৮৬॥ সুশীল সাহা


‘না চাহিলে যারে…’

প্রত্যেকেরই জীবনে পাওয়া, না পাওয়া আর পেয়ে হারানোর অনেক গল্প আছে। লাভ-ক্ষতির নিরিখে নয়, গ্রহণ-বর্জনের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলে দেখা যাবে সকলেরই জীবন পূর্ণ নানারকম প্রাপ্তির আনন্দে। ওই যে লিখলাম লাভ-ক্ষতির হিসেব দিয়ে কিন্তু এর বিচার করা চলবে না। যত দিন যায় ততই আমাদের প্রাপ্তির ঝুলি ভরে। আর সেই প্রাপ্তির মধ্যে যদি মিশে থাকে অপ্রত্যাশিত আনন্দ, তার তুলনা আরকি! এমনই এক প্রাপ্তির কথা আজ। যা সত্যি সত্যি অভাবনীয় আনন্দময় এক দুরন্ত বার্তা নিয়ে এসেছে আমার জীবনে।
অধ্যাপক সঞ্জয় মজুমদারকে আমি চিনেছিলাম বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বিষ্ণু বসুর মাধ্যমে। বিষ্ণুদাই আমাকে বলেছিলেন ওঁর খোঁজ করতে। হৃদয়পুরে আমরা তখন (১৯৯৪) সদ্য এসেছি। এখানকার কাউকেই ঠিক সেইভাবে চিনি না। তবে জায়গাটা বেশি বড় নয়। তখনও এর গায়ে একটা গ্রাম গ্রাম গন্ধ লেগে ছিল। তাই একে ওকে জিজ্ঞেস করে অচিরেই সঞ্জয়বাবুর সন্ধান পেয়ে গেলাম। দেখলাম খুব কাছে না হলেও মিনিট কুড়ির হাঁটা পথের দূরত্বেই তাঁর বাড়ি। বারাসাত সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, দুই ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন তাঁর ‘সুপল্লবী’ নামাঙ্কিত বাড়িতে। যথাসময়ে একদিন বিষ্ণুদাকে নিয়ে ওঁদের বাড়িতে গেলাম। সেইভাবে আলাপও হল। কথায় কথায় জানলাম তখন তিনি শৈলেন দাসের ‘বাতায়নিক’ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত সহ-সভাপতি হিসেবে। সংগঠনের নানারকম গীতি-আলেখ্য তিনিই রচনা করে দেন। সব অনুষ্ঠানেই মঞ্চে উপস্থিত থাকেন ধারাভাষ্যকার হিসেবে। অচিরেই তিনি সঞ্জয়বাবু থেকে সঞ্জয়দা হয়ে গেলেন। হৃদয়পুরে পাকাপাকিভাবে যাবার মতো একটা জায়গা হল আমার। সুখ-দুঃখের নানা ঘটনাবিন্যাসে ওই পরিবারের সঙ্গে আমার একটা দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি হল।

যথাসময়ে সঞ্জয়দা তাঁর কর্মজীবন থেকে অবসর নেন। এবং সংসার চালাবার দায়ে ছাত্র পড়াতে শুরু করেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর খুবই সুখ্যাতি তখন। ছাত্র-ছাত্রীদের নিত্য আনাগোনায় বাড়ি প্রায় সবসময় গমগম করত। এহেন মানুষটার শরীর কিন্তু বরাবরই দুর্বল। এমনকি বৌদিও বেশ অসুস্থ। দাদার আয়ের একটা বড় অংশ ব্যয় হয়ে যায় ওষুধ কিনতে। এমনই একসময় তাঁর শরীরে দুরারোগ্য কর্কট ব্যাধির লক্ষণ ধরা পড়ল। এই একটা রোগ, যার প্রকোপে বহু পরিবারকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেছি। সঞ্জয়দার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটল না। অনেক ব্যয় করেও তাঁকে সুস্থ করে তোলা গেল না। পাহাড়প্রমাণ ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে একদিন তিনি সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। বৌদি পড়লেন অকূল সমুদ্রে। প্রসঙ্গত জানাই তাঁদের দুই ছেলের কেউই সেইভাবে আর্থিক সঙ্গতি অর্জন করতে পারেনি। তাই নানাভাবে চেষ্টা করেও সঞ্জয়দাকে বাঁচানো গেল না। সমস্ত পরিবার পড়ল এক দুরন্ত সমস্যার সংকটে। অবশেষে অনেক ভাবনা চিন্তার পরে বৌদি তাঁদের বাড়িসহ জমি দিলেন এক প্রোমোটারের হাতে। দুটি ছোট ফ্ল্যাটসহ কিছু টাকার বিনিময়ে দেনার দায় মিটিয়ে আপাতত পরিবারটি বাঁচল।

নতুন ফ্ল্যাটে অনেক কিছুই আনা যাবে না। আনা গেলেও সেইভাবে রাখা যাবে না। তাই শুরু হল জিনিসপত্রের সংক্ষিপ্তকরণ। প্রথম সুযোগেই সঞ্জয়দার বিপুল পুস্তক সংগ্রহের ওপর কোপ পড়ল। পড়ুয়া মানুষটি শত বাধার মধ্যেও বই কিনেছেন প্রচুর। সেগুলোর কী হবে এখন! একদিন বৌদি ফোন করে সেগুলো আমাকেই দেবেন বলে জানালেন। আমি মনে মনে খুবই পুলকিত বোধ করলাম। যাকে সেইভাবে শ্রদ্ধা করতাম, ভালবাসতাম তাঁরই কিছু স্মৃতির উত্তরাধিকার হিসেবে নিজেকে ভাবতে খুব গৌরাবান্বিত বোধ করলাম। সঞ্জয়দার অসংখ্য গুণগ্রাহী, ছাত্র তথা কাছের মানুষ থাকতে আমাকেই ওঁরা ওগুলো দেবেন ভেবেছেন জেনে খুবই আনন্দ হল।
পরমানন্দে আমি ওগুলো গ্রহণ করার সম্মতি জানালাম বৌদিকে। তারপর একদিন রিক্সা করে সঞ্জয়দার বড় ছেলে সায়ন্তন বইগুলো দুই খেপে আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেল। বিশাল বিশাল ধুলিধূসরিত দশটা বস্তা আমাদের বাড়ির দোতলার বারান্দায় রাখলাম সাজিয়ে। তারপর একদিন শুরু করলাম সেগুলো দেখার। সবগুলো সেইভাবে দেখেশুনে সাজাতে চারদিন লেগে গেল। সেই অতুল বৈভবের একটা ছোটখাট তালিকা এবার আমাকে দিতেই হবে।

প্রথম বস্তা খুলেই পেলাম বিশ্বভারতী প্রকাশন বিভাগের রবীন্দ্র রচনাবলীর সুলভ সংস্করণ ১৫ খণ্ড। অবশ্যই ধুলি–মলিন। দু’তিনটি খণ্ড কেমন দুমড়ে মুচড়ে গেছে। পরম যত্নে সেগুলোকে মুছে একে একে সাজালাম, বইয়ের চাপে যদি সোজা হয় এই আশায়। বলাবাহুল্য প্রথম প্রাপ্তিতে তত খুশি হলাম না। কারণ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দ্বিতীয় সংস্করণ আমি আশির দশকের গোড়াতেই সংগ্রহ করে রেখেছিলাম। শুধু নিজের জন্যে নয়, অনেককে বিশেষ করে বাংলাদেশের বহু মানুষকে ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। পেলাম পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকাশিত মানিক গ্রন্থাবলীর বেশ কয়েকটি খণ্ড। পরের প্রাপ্তি প্রশান্তকুমার পালের ‘রবিজীবনী’। সঙ্গে সঙ্গে ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে’। যদিও প্রথম থেকে চারটি খণ্ড আমার সংগ্রহে আছে। দেখা গেল অষ্টম খণ্ড অব্দি আছে, তবে চতুর্থ খণ্ডটি নেই। যাক তবু তো আছে! এখন নবম খণ্ডটি কিনলে কোটা শেষ হয়, যদিও প্রশান্তবাবু তাঁর কাজটি শেষ করে যেতে পারেননি। তবু যতটা করেছেন তাইই বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। ওরই মধ্যে পেলাম বিদ্যাসাগর রচনাবলী (৩ খণ্ডে) আর সেইসঙ্গে এক খণ্ডে সমাপ্ত মধুসূদন রচনা সংগ্রহ।

সঞ্জয়দা ভাল গান জানতেন। একসময় নাড়া বেঁধে সুবিনয় রায়ের কাছে গান শিখেছিলেন। তাই তাঁর সংগ্রহে গান নিয়ে কিছু বই থাকবেই জানতাম। অচিরেই পেয়ে গেলাম সুরেন মুখোপাধ্যের রবীন্দ্র-সঙ্গীত-কোষ। এ যে কত বড় প্রাপ্তি আমার, সে কথা কী করে বোঝাই! পেয়ে গেলাম প্রভাত মুখোপাধায়্যের অশেষ পরিশ্রমলব্ধ বই ‘গীতবিতান কালানুক্রমিক সূচি’। বইটি বহুদিন ধরেই দুষ্প্রাপ্য। পেলাম শান্তিদেব ঘোষের লেখা দুটি মূল্যবান বই ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’ ও ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত বিচিত্রা’। গানের মানুষের ঝুলি থেকে ‘গীতবিতান’ বেরোবে না, তা কি হয়? পেলাম সেই বই, অখণ্ড। কিন্তু অতি ব্যবহারে জরাজীর্ণ, তার উপর এতদিনের ঝোলাবন্দি হয়ে ধূলি ধুসর! ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর বিখ্যাত বই ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের ত্রিবেণীসঙ্গম’ পেলাম। পেলাম আরেক খানা দারুণ বই– প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তীর ‘রাগরাগিনীর এলাকায় রবীন্দ্রংগীত’। সুচিত্রা মিত্রের লেখা একখানা দুর্লভ বই পেলাম, রবীন্দ্রনাথের সংগীতজীবন পূর্বভাগ। রবিতীর্থ থেকে প্রকাশিত (১৯৮৮) এই বইয়ের নামই শুনিনি কোনওদিন। পেলাম রবীন্দ্রনাথের ‘সংগীতচিন্তা’, শৈলজারঞ্জন মজুমদারের ‘রবীন্দ্রসংগীত চিন্তা’, সুবোধ নন্দীর লেখা অসাধারণ একটি বই ‘ভারতীয় সঙ্গীতে তাল ও ছন্দ’।

সঞ্জয়দা কবিতা লিখতেন একসময়। তাঁর একমাত্র কবিতার বই ‘আহ্নিকের ধুলো’ আমাকে তিনি একসময় দেন। যুধাজিৎ সেনগুপ্তর আঁকা প্রচ্ছদে সেই বইয়ের প্রকাশকাল ১৯৮৭ সালে। আড়াই ফর্মার সেই বইতে বেশ কিছু ভাল কবিতা সংকলিত হয়ে আছে। অথচ কবি হিসেবে সঞ্জয়দার কোনও পরিচিতি নেই। কী করেই বা হবে? ওই বই বস্তাবন্দি হয়ে এসেছে আমার কাছে। গুণে দেখিনি। দু’বস্তায় শ’দেড়েক বই তো হবেই। বইটা হাতে তুলে নিতে খুব কষ্ট হল। কী এক অভিমানে তিনি বইগুলো বাড়িতেই ফেলে রেখেছিলেন। অথচ কী ভাল লিখতেন তিনি। বইটা নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎ একটি কবিতায় আমার চোখ আটকে গেল। বড়ই অভিমানক্ষুব্ধ সেই লেখা। অতীব কষ্টের অনুভবে জারিত হয়ে তিনি লিখেছেন–
“…খুবই হল স্বেচ্ছাচার–কপট, নিষ্ঠুর
সংগোপনে পড়ে আছে কোনখানে মুখের আড়ালে
দুপুর রাত্রি যায়, রাত্রি দুপুর
অত্যন্ত মুর্খের মত, আমি শূন্যে কতক্ষণ আছি,
রুদ্ধতায় ছিঁড়ে গেছে চক্ষুশিরা সব কণ্ঠনালী,
আমার নিকটতম মুকুর হারালো;
না-কি সে ঘাটের জল,গেল তাই আর ফিরবে না! (একটি কবিতার খোঁজে)
কবিতার বই ছাড়া তাঁর লেখা আরো চারখানা বই পেলাম। সবগুলোই গদ্যের। এর তিনখানা আমাকে তিনি আগেই দিয়েছিলেন। সেগুলো হল– ‘রবীন্দ্র সংগীতের ভিতরমহল’, ‘কবিপুরুষ মোহিতলাল’ ও ‘নির্বিশেষে নিছক কথা’। শেষোক্ত বইটি তাঁর লেখা সাহিত্য ও সংগীতভাবনা সম্বলিত কয়েকটি প্রবন্ধের সংকলন। তিনি মোহিতলাল ও রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাবনা নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থানুকূল্যে সেই সন্দর্ভ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছিল পত্রলেখা থেকে ১৩৯৮ বঙ্গাব্দে। সেই বইয়ের একটি কপি পেলাম এর মধ্যেই। এমনকি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া সেই সন্দর্ভপত্রটিও পেলাম ওই ঝোলাগুলোর মধ্যেই।
অনেকগুলো কবিতার বই পেলাম একসঙ্গে। তার মধ্যে আছে সুধীন দত্তের ‘দশমী’, জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’, শঙ্খ ঘোষের ‘ধুম লেগেছে হৃৎকমলে’, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘কিছু মায়া রয়ে গেল’, ‘মানুষ বড়ো কাঁদছে’, ‘পদ্যসমগ্র’, ‘লোরকার কবিতা’ (অমিতাভ দাশগুপ্তর সঙ্গে), দিনেশ দাসের ‘কাস্তে’, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ‘যৌবনবাউল’, ‘ধুনুরি দিয়েছে টংকার’ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কাল মধুমাস’, ‘পাবলো নেরুদার আরো কবিতা’, বিষ্ণু দের ‘কবিতাসমগ্র’, কৃত্তিবাস প্রকাশিত শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘আহত ভ্রূবিলাস’ (১৩৭২ বঙ্গাব্দ), দিব্যেন্দু পালিতের শ্রেষ্ঠ কবিতা, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বুকের দুয়ার খুলে’, ‘প্রেমের কবিতা’, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, রত্নেশ্বর হাজরার ‘আছি নির্বাসিত’, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘হায় চিরজল’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘পুবের হাওয়া’, বিতোষ আচার্যের ‘জন্ম জন্ম সেই পুণ্য’, জয় গোস্বামীর ‘ঘুমিয়েছ ঝাউপাতা’, ‘সন্তানসন্ততি’, ‘বিষাদ’, এছাড়া ছোটদের জন্যে লেখা ‘ভুতুম ভগবান’ বইয়ের দু’কপি। নরেশ গুহ সম্পাদিত বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা সংগ্রহ’ (১৯৮০), বুদ্ধদেব বসু অনুদিত ‘বোদলেয়ার তাঁর কবিতা’, দেশ পত্রিকার সুবর্ণ জয়ন্তী সংকলন শিরোনামে একশোজন নির্বাচিত কবির প্রতিনিধিমূলক কবিতা সংকলনটি পেলাম অক্ষত অবস্থায়। ‘তিনজন কবি’ শিরোনামে একটি দুর্লভ বইও এরমধ্যে ছিল। পরমা থেকে এটি প্রকাশিত হয়েছি ১৯৭৪ সালে। এতে সংকলিত হয়েছে রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী, মণীন্দ্র গুপ্ত এবং বীতশোক ভট্টাচার্যের বেশ কয়েকটি কবিতা। পেলাম এক অমূল্য রতন– আবু সয়ীদ আইয়ুব সম্পাদিত সিগনেটের বই ‘পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা’ (১৩৬৩ বঙ্গাব্দ)। শিশিরকুমার দাশের প্রথম কবিতার বই ‘জন্মলগ্ন’ (১৩৬৩ বঙ্গাব্দ) পেলাম। আর কী আশ্চর্য! আমার দুটো কবিতার বইও (অনাথাশ্রমে কবিপ্রণাম, চলে যেতে যেতে) আছে দেখলাম। যদিও এই বইয়ের পিতৃত্ব আমি অস্বীকার করতে চাই। কিন্তু জানি জ্যা মুক্ত তীর ফিরিয়ে আনা যায় না কখনও।

দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন যে মানুষটা তাঁর সংগ্রহে প্রবন্ধের বই তো থাকতেই হবে। এবার তার তালিকা। আবু সয়ীদ আইয়ুবের ‘পথের শেষ কোথায়’, শোভন সোমের ‘দিনেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কের খতিয়ান, কেতকী কুশারী ডাইসনের ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’, দেবব্রত বিশ্বাসের ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ‘সুন্দরের অভ্যর্থনা’, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাহিত্যে ছোটগল্প’, সুকুমার সেনের ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’, বীরেন্দ্র দত্তের ‘বাংলা ছন্দের সেকাল একাল’, তপনকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও সাহিত্যটীকা’, অশোককুমার মিত্রের ‘গণনাট্য আন্দোলন ও নবান্ন’। অভিধান পেলাম বেশ কয়েকটি। তার মধ্যে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দু’খণ্ডের শব্দকোষ তো ছিলই। তাছাড়া ইংরেজি-ইংরেজি-বাংলা ছাড়াও সুধীরচন্দ্র সরকারের বিখ্যাত পৌরাণিক অভিধানও পেলাম। হ্যাঁ, চলন্তিকা অবশ্যই আছে।
বেশ কটি গল্প সংকলন পেলাম। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ পত্রিকার সুবর্ণজয়ন্তী গল্প সংকলন। ওই পত্রিকায় প্রকাশিত পঞ্চাশটি গল্পের এক সুচয়িত গ্রন্থ এটি। এছাড়া আছে রমাপদ চৌধুরীর গল্প-সমগ্র, নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘গল্পমালা’। একটি চমৎকার গল্প সংকলন (লিটল ম্যাগাজিনের শ্রেষ্ঠ গল্প ১৯৪৭-৯৭) পেলাম। পঞ্চাশ বছরের এই সালতামামি খুবই আগ্রহসঞ্চারী আমার কাছে। গল্পের বই আছে কয়েকটি। এগুলো সবই নানাসময়ে উপহার পাওয়া। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য – বিমল করের ‘ভুবনেশ্বরী’। পেলাম বাণী বসুর বিখ্যাত বই ‘মৈত্রেয় জাতক’।

বেশ কিছু পত্রিকা পেলাম। উত্তরসূরী, ধ্রুপদী, পূর্বাশা, উত্তরঙ্গ, কবিপত্র, অধুনা ইত্যাদি পত্রিকার নানান পুরনো সংখ্যা। একটু উল্টেপাল্টে বুঝলাম প্রায় সবগুলোতেই সঞ্জয়বাবুর লেখা আছে। উত্তরের হাওয়া নামে একটি একেবারে কৃশকায় একটি পত্রিকা পেলাম। এতে ‘নীলামে’ শিরোনামে আনন্দ বাগচির একটি চমৎকার কবিতা পেলাম। ‘ক্ষপণক’ নামের একটি পত্রিকার বিশেষ কবিতা সংখ্যা পেলাম। এতে কবিতা লিখেছেন বিষ্ণু দে, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, হরপ্রসাদ মিত্র, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত প্রমুখ। সুভাষ মুখোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা কবিতা প্রসঙ্গে একটি সুন্দর গদ্য লিখেছেন। ভাস্কর মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘রেখা ও লেখা’র বেশ কয়েকটি সংখ্যা পেলাম। অধুনালুপ্ত বামঘেঁষা ‘নিশান’ পত্রিকার ১৯৭০ ও ’৭১ সালের দুটি শারদ সংখ্যা পেলাম। ‘মনন’ নামের একটি ছোট পত্রিকায় পেলাম অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর কবিতা ‘সৌজন্য আমার’। এই একটিমাত্র কবিতার জন্যে এই পত্রিকাটি আমার কাছে বহুমূল্য হয়ে উঠল। শিশির ভট্টাচার্য সম্পাদিত কবিতা ত্রৈমাসিক ‘অন্যদিন’ পত্রিকার দুটি সংখ্যা পেলাম। আলাদাভাবে তিনি খুব বেশি পত্রিকা সংগ্রহ করেননি।
ধুলো ঝেড়ে বইগুলোকে একটু ভদ্রস্থ করা গেল। এখন এগুলোকে রাখব কোথায়! নতুন একটা চিন্তা ঢুকল মাথায়। আপাতত আমাদের একটা ডিভানে ওগুলো স্তূপ করে রাখা হল। এবার একটা লোহার বুক শেলফ বানাতেই হবে। যে কটা দিন বেঁচে থাকব, এইসব বইয়ের মধ্যেই নিজেকে ডুবিয়ে রাখব দিন ও রাতের একটা বড়ো সময়। একদিন আমার এই সমস্ত ফেলে রেখে জানি আমাকেও চলে যেতে হবে এই পৃথিবী ছেড়ে। তবু যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ থাকিনা এই বইয়ের জগতে। এর থেকে পরম শান্তি আর কী আছে এখন!