চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৮৭॥ সুশীল সাহা



আমার ভাষাজ্ঞানের বহর

জন্মেছিলাম খুলনা শহরে। ফলে খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় আমি বেশ সরগর। তবে আমাদের দেশের বাড়ি ছিল যশোরের কালিয়ায় এবং সেখানে প্রতি বছরের একটা বড়ো সময় কেটেছে আমার। বিশেষ করে পুজোর সময় দেশের বাড়িতে যাওয়াটা ছিল রীতিমতো রোমাঞ্চকর। ওখানে একটানা অনেকবার অনেকদিন থেকেছি। তাই যশোরের আঞ্চলিক ভাষাটাও আমি বেশ ভালই জানি। মুগির ডাল আর কুলির আচার ছাড়া আরো অনেক অনেক কথা আমি জানি যা সচরাচর ওই জেলার লোকেরা ছাড়া অন্যেরা বুঝবে না। সত্তরে যখন দেশান্তরী হয়ে কলকাতায় এলাম তখন সাময়িকভাবে আমি একটু ভাষা সংকটে পড়েছিলাম। অবশ্য তা অচিরেই কাটিয়ে উঠেছিলাম। সেটা মনে হয় খুলনা যশোরের মানুষ ছিলাম বলেই দ্রুত সম্ভব হল। তবে দেখলাম কলকাতার লোকেরাও বেশ অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলে। তাই ঠিক করলাম মুখের ভাষা যখন পাল্টাবই তখন প্রাণপণে প্রমিত বাংলা ভাষাতেই কথা বলবার চেষ্টা করব। তখন কিছুদিন মন দিয়ে কাজি সব্যসাচী আর শম্ভু মিত্রের আবৃত্তি শুনেছিলাম। শুনতাম রেডিওর খবর আর নানারকম আলোচনা। শুনতাম দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংবাদ ভাষ্য। তখন সেই একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধের প্রাক্কালে রেডিও ছিল আমাদের অন্যতম নিত্যসঙ্গী। নিয়মিত কফি হাউসে যেতাম তখন। অচিরেই টের পেলাম আমার মুখের ভাষা পালটে গেছে। বাহাত্তরের এপ্রিলে যখন খুলনায় যাই তখন ওখানকার বন্ধুরা আমার কথার পরিবর্তনে বিস্ময় প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সেটা ছিল প্রথম কয়েকটা দিন। খুব তাড়াতাড়ি আমি আবার খুলনার ভাষা ব্যবহার করে ওদের অবাক করে দিই। বলতে দ্বিধা নেই খুলনার ভাষা আমি আজও ভুলিনি। এখনও দেশের কাউকে পেলে অনর্গল ওই ভাষায় কথা বলি। ব্যাপারটা মনে হয় ভুলতে না চাইলে ভোলা সম্ভব নয়। আমি তো সেইভাবে ভুলতে চাইওনি। শুধু চেয়েছিলাম কলকাতার তথাকথিত উন্নাসিক ভাষাতাত্বিকদের একটা দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে। বলাবাহুল্য সেটা পেরেওছিলাম।

বাংলা ভাষার পাশাপাশি আমি আরেকটা ভাষাকে রপ্ত করেছিলাম। বলা যায় আমার পরিবেশ সেই ব্যাপারে বেশ সাহায্য করেছিল। যে স্কুলে আমার প্রাথমিক পাঠ সেটি সত্যনারায়ণ বিদ্যালয়। খুলনায় তখন হিন্দুদের খুব দাপট। একটা বড়ো সংখ্যার অবাঙ্গালি মাড়োয়াড়ি ওখানে তখন বাস করত। তাঁরা মূলত ব্যবসায়ী। ঘটনাক্রমে আমাদের বাড়িতে বেশ কয়েক পরিবার মাড়োয়াড়ি থাকত। ওঁরা ঠিক হিন্দি ভাষাতে কথা বলত না। ওঁদের মুখের ভাষাটা হিন্দিভাঙ্গা এবং বিচিত্র। যা হোক আমাদের স্কুলটা চালাত মাড়োয়াড়ি সম্প্রদায়ের লোকেরা। তাই অন্য অনেক বিষয়ের সঙ্গে হিন্দিটা অবশ্যপাঠ্য ছিল। বলে রাখা ভাল, আমাদের স্কুলে অহিন্দুদের প্রবেশাধিকার ছিল না। যা হোক ওই স্কুলে ক্লাশ সেভেন অব্দি হিন্দি পড়ে এবং জীবনের তেইশটা বছর মাড়োয়াড়ি বন্ধুদের সঙ্গে থেকে হিন্দিটা আমি বেশ ভালই রপ্ত করেছিলাম। হিন্দি বলতে লিখতে এবং পড়তে পারতাম। কতটা ভাল সেটা রপ্ত করেছিলাম তার পরীক্ষা দিলাম কলকাতায় এসে। এখানে এসে অক্লেশে হিন্দিভাষীদের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম। প্রসঙ্গত একটা কথা না বললেই নয়। তা হল সেই বাহাত্তর তিয়াত্তর সালে বছরখানেক ক্লাশ এইটে পড়া একটি ছেলেকে মাসিক পঁচিশ টাকায় প্রাথমিক হিন্দি পড়াতাম। গ্রে স্ট্রিটের সেই বাড়িতে সপ্তাহে তিন দিন যেতাম নিয়মিত। পড়ানোর চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ছিল খাওয়া। ছেলেটির মা প্রতিদিন নিজের হাতের তৈরি খাবার খাওয়াতেন। তিয়াত্তরের নভেম্বরে যখন চাকরি পাই তখন ওই কাজটা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতে আমি দ্বিধান্বিত ছিলাম। তবু ভদ্রতার খাতিরে বলতে গিয়ে ভদ্রমহিলার অসামান্য সৌজন্যবোধে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। তিনি আমার চাকরি পাবার খবরে খুব খুশি হয়েছিলেন। বলেছিলেন মাঝে মাঝে যেতে। তা অবশ্য আর হয়নি। জীবনের ছকটা তখন একটু একটু করে বদলাতে শুরু করেছে।

চাকরি পাবার পরে একটু দেশভ্রমণের স্পৃহা বেড়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে পা দিয়ে দেখেছি হিন্দিটা খুব কাজে লাগে। আমি তো যেমন তেমন হিন্দি বলি না। অনর্গল বেশ কয়েকটি হিন্দি গানও গাইতে পারি। তাই দেশভ্রমণে হিন্দি ভাষাটা আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছে। তবে দক্ষিণ ভারতে অবশ্য হিন্দির বদলে ইংরেজিটা চলে। তাই যস্মিন দেশে যদাচারের মতো ওখানে প্রয়োগ করেছি আমার অপটু ইংরেজি। কাজ চালিয়ে নিয়েছি কোনক্রমে। হিন্দির মতো স্বচ্ছন্দে কিছুতেই নয়। সে অবশ্য একেবারেই ভিন্ন প্রসঙ্গ।
হিন্দি নিয়ে বিদ্যের বহর আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল অনুবাদকর্মে। ছোটখাট সেইরকম কাজ কিছু করেছিলাম একসময়। তারপর কী করে জানি না বাংলায় কিছু গানের অনুবাদ কর্মে মেতে উঠেছিলাম। শুরু করেছিলাম রবীন্দ্রগান দিয়ে। একটু আধটু গাইতে পারি বলে নিজের অনুবাদ কর্মের কিছু অনুবাদ গেয়ে শোনাতে গিয়েছিলাম শ্রদ্ধেয় অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কাছে। এক্ষণে বলে রাখি, ততদিনে আমি রবীন্দ্রসংগীতের আঙ্গিনা ছেড়ে আরেকটু বড়ো পরিসরে পা ফেলেছি। বন্ধু সুরঞ্জন রায় একটি ছবি করেছিলেন অলোকদাকে নিয়ে। ছবিতে একটি গান ছিল প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। অলোকদার ‘যৌবন বাউল’ বইয়ের শেষ কবিতাটিতে তিনি সুরারোপ করে গেয়েছিলেন। ‘গেল আমার ছবি আঁকার সাজ সরঞ্জাম’। অসাধারণ সেই গান। সেই গানও আমি হিন্দিতে অনুবাদ করলাম। একদিন অলোকদাকে আমার অনুদিত কয়েকটি গান শোনাতে গেলাম। মনে আছে প্রথম গানটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’। সেই গানের কথা, আমার অনুবাদ কর্মের কথা অলোকদা তাঁর একটি কবিতায় (গুরুদক্ষিণা) এইভাবে এনেছিলেন,
“…সুশীল যখন ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ
গানটাকে হিন্দি ভাষায় তর্জমা করে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে
রাষ্ট্রভাষার জঞ্জাল থেকে এক একটি বৈদুর্যমণি চয়ন
করে আনে, গুনগুনিয়ে গাইতে থাকে নির্মীয়মান ভাষ্য
আমিও সেই খেলায় যোগ দিই। সুশীলের সঙ্গে
পথ চলায় শামিল হতে না পারলেও পথ চাওয়ার
ব্রতে সতীর্থ হতে পেরেছি, এটা তার মাস্টারমশাইয়ের
দান।”…

অলোকদার কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে কিছুদিন ওই অনুবাদ কর্মেই মগ্ন হয়ে ছিলাম। তখনকার এক বড়ো সাফল্য জুটল আমার। অফিসের হিন্দি দিবসে গানের প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে প্রথম হলাম সেবার। গানটা ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা’। অনুবাদ করতে গিয়ে টের পেয়েছিলাম জাতীয় সংগীতের মতো ওই গানটাতেও অনেক তৎসম শব্দের সমাহার। বস্তুত গায়নভঙ্গিটা একটু পালটে নিলেই কাজ হয়ে যায়। তাতেই আমার সাফল্য এলো। পরমোৎসাহে ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে’ গানটারও অনুবাদ করে ফেললাম। তারপর একদিন অলোকদার বাড়িতে গেলাম আমার নতুন গানের ডালি নিয়ে। সেদিন ওখানে আরো কয়েকজনের সঙ্গে একজন বিদগ্ধ অধ্যাপিকাও ছিলেন। অলোকদা তাঁর কবিতার অনুবাদ শুনে মুগ্ধতা প্রকাশ করলেন। ‘বহে নিরন্তর’ গানটাও তাঁর ভাল লেগেছিল। কিন্তু সেদিন সেই অধ্যাপিকা আমার গানের উচ্চারণ নিয়ে অনেক প্রশ্ন তুলেছিলেন। অনুবাদের অনেক ত্রুটিও ধরেছিলেন। অলোকদার উৎসাহদান সত্ত্বেও সেদিন থেকে অনুবাদের ব্যাপারে কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়লাম আমি। মনে হল, অনেক হয়েছে আর নয়।

সত্যি সত্যি সেদিনের পর থেকে আর আমি ওই গান নিয়ে বসিনি। আমার যা স্বভাব, পল্লবগ্রাহীতা, তাইই নতুন করে প্রকাশিত হল যেন। অচিরেই ওই অনুবাদের ভূত আমার ঘাড় থেকে নামল।
আমার ভাষাজ্ঞানের বহর যে খুব খাটো, তা আর বলতে!!