চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৮৯॥ সুশীল সাহা


সন্দীপনদার সাক্ষাৎকার

বছর পঞ্চাশেক আগে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার এক অসম ‘দোস্তি’ হয়। তখন তিনি নিজেকে লিটল ম্যাগাজিনের ‘প্রিন্স’ মনে করতেন, নিয়মিত মিনিবুক বার করে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছেন। আমি তখন স্বভাবদোষে বেছে বেছে নানা মানুষকে চিঠি লিখতাম জোড়া পোস্টকার্ডে। কেউ কেউ উত্তর দিতেন। উত্তরের সূত্র ধরে অনেকের সঙ্গে দেখা করতাম। এই বাংলায় নতুন করে সম্পর্কের সূত্রপাত এইভাবেই, যা অনেকদিন পর্যন্ত থেকেছে। এমনকি কারো কারো সঙ্গে আজও সেটা রয়ে গেছে। এইভাবেই সন্দীপনদার সঙ্গে যোগাযোগ। তাঁর বরানগরের কাশীনাথ দত্ত রোডের বাড়িতে যাতায়াত শুরু এভাবেই।

আমি তখন উল্টোডাঙ্গার ‘নবাহ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। পত্রিকার জন্যে নানারকম কাজ করি। লেখকদের কাছে যাওয়া, প্রেসে যাওয়া, পত্রিকা নানা জায়গায় পৌঁছে দেওয়া ছাড়া মাঝে মাঝে সাহিত্য সভার আয়োজন করতে হত। পত্রিকার সাতজন সম্পাদকমন্ডলীর কনিষ্ঠতম আমি। তখন নিয়মিত কফি হাউসে যেতাম। কত মানুষের সঙ্গে আলাপ তখন ওখানেই। আলাপ থেকে বন্ধুত্ব এবং সুযোগ পেলেই তাঁদের বাড়িতে যেতাম। তখন সন্দীপনদার কাছে মাঝে মাঝেই ছুটে যেতাম। বেশিরভাগ দিন যেতাম দিনে দুপুরে। খবর না দিয়েও যখনই যেতাম, তাঁকে বাড়িতে পেতাম। কী যে গল্প হত আমাদের তা মনে নেই, তবে একটা শ্রদ্ধামিশ্রিত দূরত্ব আমাদের অবশ্যই ছিল। সন্দীপনদা আমার আর্থিক অবস্থাটা জানতেন। তাঁর শিল্পীবন্ধু অমরেন্দ্রলাল চৌধুরীর পুত্রের গৃহ শিক্ষকের কাজের জন্যে ওঁর বাড়িতে আমাকে পাঠান একটা সুন্দর চিঠি দিয়ে। যদিও ইংরেজি মাধ্যমে পড়াবার অভিজ্ঞতা নেই বলে কাজটা আমার হয়নি। আরেকবার তিনি আমাকে পাঠান গৌরকিশোর ঘোষের কাছে তাঁর পাইকপাড়ার বাড়িতে। তখন আমি একজনের কাছ থেকে ক্লিক ত্রি ক্যামেরা ধার করে কলকাতার এদিক ওদিক ঘুরে নানারকম ছবি তুলেছিলাম। ছবিগুলো সন্দীপনদা পছন্দ করেছিলেন। আমাকে বলেন ছবিগুলোর সঙ্গে যুৎসই লেখা জুড়ে দিয়ে গৌরবাবুর হাতে দিয়ে আসতে। তখন কানাঘুষোয় জানা গিয়েছিল তিনি অন্য কী একটা দৈনিকের কথা ভাবছিলেন। গৌরবাবু লেখাসহ ছবিগুলো রেখে দিয়েছিলেন। অবশ্য প্রত্যাশিত কোনও সাড়া পাইনি। নিশ্চয়ই লেখা পছন্দ হয়নি, ছবির মানও তো এমন কিছু ছিল না।

এ হেন সন্দীপনদাকে নবাহর জন্যে সাহস করে একটা লিখিত সাক্ষাৎকারের জন্যে রাজি করাই। সেটাই ছিল আমার প্রথম কারো সাক্ষাৎকার নেওয়া। কয়েকদিন ধরে প্রচুর পরিশ্রম করে কয়েকটি প্রশ্ন পাঠাই ওঁকে। তিনি বেশ বড় করে লিখিত উত্তরই দিয়েছিলেন। আশ্চর্যের কথা, প্রশ্নগুলোর ধারকাছ দিয়েও যায়নি তাঁর উত্তর। যদিও গোটা লেখাটাই নবাহতে ছাপা হয়েছিল। মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। অনেকদিন ধরে ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে একরকমের বিষণ্ণতা অনুভব করেছি। সেই ঘটনার পর থেকে সন্দীপনদার সঙ্গে একটু একটু করে দূরত্ব বাড়তে থাকে। পত্রিকার কপি পৌঁছে দিয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু ওঁর কাছে যাওয়াটা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। তাছাড়া ’৭৩ সালে একটা চাকরি পাবার পরে জীবনের ছকটাই বদলে যায়।

কী ছিল সেই সাক্ষাৎকারে? নবাহ’র সেই সংখ্যাটা আমার কাছে নেই। কথাকার অমর মিত্রের কাছে খবর পেলাম ওটা নাকি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের এক সাক্ষাৎকার সংকলনে আছে। বন্ধু গৌতম মিত্রের সৌজন্যে সেটা আমার হাতে এল একদিন। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর আগের একটা কাজ। স্বভাবতই আমার কাছে এর একটা ঐতিহাসিক মূল্য আছে। গোটা লেখাটাই এখানে উল্লেখ করা যেত। কিন্তু স্থানাভাবে সেটা করা যাচ্ছে না। কৌতূহলী পাঠকের জন্যে সেই সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত কিছু অংশ নীচে দিলাম।

প্রশ্ন ১ – গল্প হল ‘কথা, কাহিনি, বিবরণ, প্রস্তাব’ এই আভিধানিক শব্দগুলোকে আপনি কতখানি মানতে চান?
উত্তর – ৭টা চিঠি আপনি আমাকে দিয়েছেন, আমি শুধু প্রথমটার জবাবে চিঠি আপনাকে দিই, তারপর আপনার প্রশ্নমালা এসে পড়ল। চিঠির উত্তর নয়, চিঠির উত্তরে চিঠি আমি দিতেই পারতুম, অনেককেই দিই, অনেককে আবার দেওয়া হয় না। হাতের কাছে অনায়াসে পোস্টকার্ড এসে গেলে তবেই চিঠি দেওয়া যায়, নইলে পারি না দিতে। আসলে উত্তরে-চিঠি দিলে যা হত, না-দিলেও তা-ই হয় ও হবে। এ-জন্যে এফর্ট করবার প্রয়োজন নেই। আবার যদি ‘উত্তর’ চান, তবে বলব উত্তর নেই, কারণ উত্তর হয় না। প্রশ্ন হতে পারে দেখছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার এখন-আর একটিও প্রশ্ন নেই। একদিন ছিল। আজ মাত্র ৪০ হবার আগেই একটাও প্রশ্ন নেই। …
এইভাবে শুরু হয়েছিল সেই সাক্ষাৎকার। শুরু থেকেই প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে চলে যাচ্ছিলেন তিনি। যেহেতু মুখোমুখি বসে নেওয়া হয়নি, তাই তাঁকে প্রশ্নের অভিমুখে নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না।

প্রশ্ন ২ – দেখা যাচ্ছে গল্প জিনিসটা নেহাৎ পুরনো নয়। ইতালীয় সাহিত্যে Gesta Romanoram (1330), Boccacio-র Decameron (1348-53), ইংরেজি সাহিত্যে বাইবেল, Chaucer-গল্প, Aesop’s Fable, সংস্কৃতে বিষ্ণুশর্মার ‘হিতোপদেশ’ ও ‘পঞ্চরত্ন, সোমদেবের ‘কথাসরিৎসাগর’,বৌদ্ধ সাহিত্যের ‘জাতকের গল্প’, ‘দিব্যাবদান’ থেকে হাজার হাজার গল্প লেখা হয়েছে আজ পর্যন্ত। তবু সত্যিকারের গল্প নাকি লেখা হয়েছে খুব কম। কথঞ্চিৎ যা হয়েছে তার অধিকাংশই নাকি ব্যাপকার্থে অসার্থক। আপনি কি এই মন্তব্য সমর্থন করেন?
উত্তর– মনে হয় আপনি মনে করে নিয়েছেন আমি একজন লেখক। এটা ভুল। আমি তিনটি বই লিখেছি সত্য, এবং আরও কিছু লিখেছি যা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। বহু পোস্টকার্ড আমার হাতে বিনা আয়াসে এসে গেছে, আমি কমটম করেও হাজার দুই চিঠি লিখেছি এবং বাহ্যপেচ্ছাপ করে গেছি, ক্যারম আমি, হ্যাঁ খেলেছি এবং বায়োস্কোপও দেখেছি, তা বেশ কয়েকবার। …আমি মানি না যে আমি একজন লেখক ; যদিও আমি লিখেছিলুম। আমি একজন নন-ক্রিয়েটিভ মানুষ- এখন, যখন ওই তিনটি বইও অন্যান্য অতীতের ব্যাপার। আবার আর-একটা লিখব এ আমি বিশ্বাস করি না। এখন মনে করি আমার শেষ লেখা হয়ে গেছে ও আর কখনও লিখব না। বাকি পথে আর কোনও গহবর নেই এরকম ধারণা থাকে বলে চলি। নইলে কার সাধ্য এক পা নাড়ায়।

প্রশ্ন ৩– যা কিছু লেখা হবে জীবনকে বাদ দিয়ে নয়। অর্থাৎ, সাহিত্যের চিরায়ত প্রসঙ্গ হল জীবন। অভিজ্ঞতায় পোড় খাওয়া ও ব্যাপক মানুষের জীবন থেকে নেওয়া একটা প্রবল Conception-ই হবে লেখার Content. একজন লেখক হিসেবে (শুনেছি আপনাকে লিটল ম্যাগাজিনের প্রিন্স বলা হয়) আপনার বক্তব্য কি ভিন্নতর?
উত্তর– আমি কিছুই লিখতে পারিনি, যেমন রবীন্দ্রনাথ কিছুই লিখতে পারেননি। আমাদের অক্ষর পরিচয় পর্যন্ত ছিল না। আমাদের বাংলাদেশে বঙ্কিম, মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্কর প্রমুখ লিখেছেন, জীবনানন্দ লিখেছেন, এখন কমলকুমার মজুমদার লিখছেন। আমরা, আমি ও রবীন্দ্রনাথ, এঁদের নখরাঘাতের যোগ্যও নই। আমাদের দু-জনের তাই কোনো দাবি নেই, আগেই বলেছি। আমাদের কোনো ঋণ নেই, কেউ আমাদের কাছে ঋণী নয়। আমাদের পাঠক নেই। বঙ্কিম থেকে কমলকুমার পর্যন্ত লেখকের কাছে দাবি করুন। তাঁরা দাবি রেখেছেন। আমার সমস্ত লেখা আমি Disown করি।

প্রশ্ন ৪– পাঠক তৈরি হয়নি এমন অসূয়াপর মন্তব্য করে যাঁরা খুব কম লেখেন বা মোটেও লিখতে চান না অথবা অধিকাংশ পাঠক কীভাবে নেবে তা বড়ো কথা নয়, কত নতুনভাবে লেখা যায়, লেখা কত শৈল্পিক করা যায় এমন বোধবুদ্ধি দ্বারা চালিত হয়ে যাঁরা লেখেন তাঁদের সম্পর্কে আপনি কি বক্তব্য রাখতে চান? আপনি নিজে কীভাবে লিখতে চান?
উত্তর– হ্যাঁ নিশ্চয়ই। আমার অস্তিত্ব, মেটাফিজিক্যাল বলতে পারেন। কেননা, ফিজিক্যাল কথাটি সেখানেও রয়েছে। যা কিছু রিয়ালিস্টিক, তাই তো আর রিয়ালিজম না। আমার প্রথম বই বেরোয় ১৯৬১ সালে। গল্পগুলো পত্রিকায় বেরোয় ১৯৬০ সালে। তার বেশ কয়েক বছর আগে, ১৯৫৫ থেকে, হাত মকশো করি। তারপর ৫-বছর একদম চুপ করে যাই। কিছু ছাপা হয়নি। ১৯৬০ সাল থেকে ধরলে আমার লেখাটেখার বয়স ১২ বছর হল। টেখাই হয়েছে, লেখা হয়নি কিছুই, আমি জানি। নিঃসন্দেহে, আমি এখনও কিছুই লিখতে পারিন। …

প্রশ্ন ৫– আমরা অনেক কিছুই করে যাচ্ছি অভ্যাসবশত। আমাদের এই জন্ম, এই এত বড়ো হওয়া এর অনেকখানিই আমাদের ইচ্ছে অনিচ্ছের বাইরে। আমরা অভ্যাসবশত খাচ্ছি-দাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি, দর করে বই কিনছি, জামাকাপড়ে ন্যাংটো শরীর ঢাকছি, এই ঘাড় ঢাকা চুল বা বেলবটম জুলফি রাখছি এবং স্তূপাকার লিখছি। যাঁরা প্রথাসিদ্ধ পথে চলতে চান না তারাই হন আন্দোলনকারী। কিন্তু আজকের আন্দোলনকারী আগামী- কাল স্তব্ধবাক। তবে কি চিরকালই কিছু রাগী তরুণ বয়সকালে কুকুরের মতো চেঁচায় আবার ওই বয়সকালেই প্রতিষ্ঠা পেয়েই চুপ মেরে যায়। তাহলে ‘আধুনিক’ এই শব্দটিই কি ব্যাপকার্থে আপেক্ষিক?
উত্তর- মার্কসবাদ শ্রেষ্ঠ জিনিস। অর্থনৈতিক বা সামাজিক ক্ষেত্রে মার্কসবাদ স্বয়ং একটি বিপ্লব। মার্কসবাদ চেতনাচৈতন্যের ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে শ্রেণিভেদ স্বীকার করে। মার্কসবাদে আমার জায়গা আছে জানি। চীনদেশ স্বয়ং অপর এক বিপ্লব। এরও মৃত্যু নেই ( দ্র. চায়না টু-ডে : এডগার স্নো ) আদর্শই অমর, যা যুদ্ধের আগেই বিজয়ী। দক্ষিণপন্থায় আর কোনো রহস্য নেই। বাকি আছে বামপন্থীদের ডি-মিস্টিফিকেশানের। এটা সত্য কথা যে, গত দুই আড়াই দশক ধরে চিনে যা-কিছু ঘটেছে ইতা মানবেতিহাসে একটি প্রোগ্রেস। একবার প্রগতি হলে তা আর কখনও পেছোয় না। রেনেসাঁসের পর অন্ধকার যুগ। কিন্তু তাতে কি রেনেসাঁর সুফল মানুষ পায়নি ?..

প্রশ্ন ৬– কেন লেখেন, এমন একটা প্রশ্নের জবাবে দুজন অতি সাম্প্রতিককালের লেখক যা বলেছেন তা এখানে উল্লেখ করছি। একজন (কল্যাণ সেন) বলেন, ‘যে অভ্যাসে শীত করলে আমি চাদর খুঁজি বা বাথরুমে ঢুকে গলা ছেড়ে গান গাই, সাহিত্য বা লেখা ব্যাপারটা আমার কাছে অনেকটা সেইরকম।’ অন্যজন (সুবিমল মিশ্র) বলেন, ‘আমরা যা কিছু লিখছি সব ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। আমরা যাদের কথা লিখছি তাদেরকে আমরা জানি না, তাই ‘লেখক ও ইঁদুরটি একই আকাশের নীচে একই আলোর তলায় অতিদ্রুত পচে যাচ্ছে।’ তবু লিখছি কেন, না-লিখে পারি না।’ এর মধ্যে কোন উক্তিটি আপনার কাছে বেশী আকর্ষণীয়, অথবা বলুন আপনি কেন লেখেন?
উত্তর– হ্যাঁ, সে তো বটেই। আমার আবার অন্যান্য নামের অসুখ হতে পারে। কিংবা আমার আর একবার মাত্র, শেষবার মাত্র অসুখ করবে হয়তো। আমার সুবিমল মিশ্রের কথাই ঠিক মনে হয় যে, ‘লেখক ও ইঁদুর…দ্রুত পচে যাচ্ছে।’

প্রশ্ন ৭– যেহেতু লেখক সমাজবিচ্ছিন্ন কেউ নন– সেহেতু তার কিছু সামাজিক দায়িত্ব থেকেই যায়। সেই দায়িত্বও পালন তিনি কতটুকু করতে পারেন? একজন দায়িত্বশীল লেখক হিসেবে আপনি অন্তত কতটুকু এবং কীভাবে তা করবার সমর্থক?
উত্তর– অতিতরুণদের গদ্য রচনার মধ্যে আউটস্ট্যান্ডিং কাজ হল অমল চন্দের উপন্যাস ‘অভিযোগ’। এখানে পুরোপুরি কাফকার জগতের পুনরাবিস্কার। একটি বাঘ এখানে আহার শেষ করে চলে গেছে। সে যতক্ষণ আহারে বসেছিল, একমাইল দূর থেকে, অন্ধকার থেকে, তাকে লক্ষ্য করছিল একপাল হায়না, এখন তার কাজ শেষ করে সে চলে যাবার পর একপাল হায়না ধারেকাছে এসে গেছে, একটা উচ্ছিষ্ট হাড় তুলে নিয়ে তারা বলছে প্ল্যাজিয়ারিজম, বলছে কাফকা।’ জীবনানন্দের ‘হায় চিল’ ও ইয়েটসের ‘Cry no more in the air, curlew’ একই, কিন্তু ‘হায় চিল’ কবিতাটি বাংলা অক্ষরে। তেমনি ‘Professor’ ও ‘সমারূঢ়’। এখানে ‘অভিযোগ’-এ বিশাল সিম্বলের জগৎ। অতিকায় দুঃস্বপ্ন। অমূল্য রচনাশৈলী।

প্রশ্ন ৮– শিল্পের সঙ্গে জীবনের সমন্বয় সে বড়ো কঠিন সমস্যা। কী লেখা হবে বা কেমন করে লেখা হবে, এই দুই দ্রুতবৃদ্ধিশীল সমস্যার একটি সুনিশ্চিত সমাধান দিন, নিদেনপক্ষে একটা মধ্যপন্থা।
উত্তর– সেলফ থেকে স্বামী বিবেকানন্দর ‘বর্তমান ভারত’ সহসা খুলে উন্মুক্ত পৃষ্ঠা থেকে পাঠ করলাম ‘সমষ্টির জীবনে ব্যষ্টির জীবন, সমষ্টির সুখে ব্যষ্টির সুখ, সমষ্টি ছেড়ে ব্যষ্টির অস্তিত্বই অসম্ভব, এ অনন্ত সত্য– জগতের মূল ভিত্তি। অনন্ত সমষ্টির দিকে দিব্যানুভূতিযোগে তার সুখে সুখ ও দুঃখে দুঃখ ভোগ করে করে অগ্রসর হওয়াই ব্যষ্টির একমাত্র কর্তব্য। শুধু কর্তব্য ন্যায়ের ব্যতিক্রমে ব্যষ্টির মৃত্যু– পালনে অমরত্ব।’

এখানে আমাকে থামতেই হচ্ছে। কেন যে সন্দীপনদা এমনটা করেছিলেন জানিনা। সাক্ষাৎকারের পুরোটাই আমাদের ‘নবাহ’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল (১৯৭২)। এটা পড়ে অনেকে হেসেছিলেন। অনেকের চোখ হয়েছিল বিস্ফারিত। অনেকে আমার দিকে বিদ্রুপ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। কফি হাউসে এ টেবিলে ও টেবিলে এটা একটা আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল একসময়। অনেকের উপহাসের লক্ষ ছিলাম আমি। ভাবটা এমন, ঢাল নেই তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার! বড় গাছে নাও বাঁধতে গেলে এমনটাই হয়! কেউ কেউ একগাল হেসে আমার পিঠ চাপড়েও দিয়েছিল। সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করেছি।

কেন যে সন্দীপনদা আমার প্রশ্নগুলোর ধারকাছ দিয়েও গেলেন না, কে জানে! মনোযোগী পাঠক লক্ষ্য করবেন একমাত্র পাঁচ নম্বর প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছেন অতি সংক্ষেপে। তাঁর উত্তরগুলোর অনেকটাই বড় ছিল। আমি ইচ্ছে করেই এখানে সেগুলো ‘এডিট’ করেছি। কিছু অশালীন কথাও যে ছিল!
জীবনের প্রথম সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল যে প্রায় তিরিশ বছর ওই পথে আর হাঁটিনি আমি। কিছুদিন আগে জানলাম ‘প্রতিভাস’ থেকে সন্দীপনদার একটি সাক্ষাৎকার সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। সম্পাদক অদ্রীশ বিশ্বাস এটিকে স্থান দিয়েছেন বলে খুব কৌতূহলী হয়ে সংগ্রহ করলাম ‘কথাবার্তা’ শীর্ষক ওই সংকলন। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের স্মৃতি জেগে উঠল এক লহমায়।

বলাবাহুল্য ওটা পড়ে একইরকম বিরক্ত হলাম আজও। তবু ব্যাপারটাকে অন্য সবার গোচরে আনার জন্যে ‘চেনাশোনার কোন বাইরে’র একটু কলেবর বৃদ্ধি করলাম এই যা।