চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৮ ॥ সুশীল সাহা



আদায়-উসুলের চক্করে

সরকারি চাকরির বন্ধনে বাঁধা পড়লে আয়কর বাঁচানোর ফাঁদে আমাদের পা দিতেই হয় । নানারকম ‘সেভিংস’-এর সে এক নিদারুণ জাঁতাকল। সরকার বেতন দেয়, আবার তার অনেকটাই নানা কৌশলে আদায় করে নেয়। এক অজানা ভবিষ্যতের হাতছানিতে সারাবছর ধরে সঞ্চয়ের নানা কূট কৌশলের জালে আমাদের যে স্বেচ্ছায় ধরা দিতেই হয়। সেই সঞ্চয় আমাদের একসময় হয়ত অনেক কাজে লাগে। তবে তা যে কেমন মাথাব্যথার জন্ম দেয়, তা কেবল জানে ভুক্তভোগিরাই। এবার তারই এক ঝলক।
এনএসসি, এলআইসি, মিউচুয়াল ফান্ড, ইত্যাদির ঘেরাটোপে যখন ঢুকে গেছি অবলীলায় তখনই এলো আর এক প্রস্তাব- ‘মেডিক্লেম’। বেশ বড় রকমের আয়কর ছাড় পাবার লোভের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে চিকিৎসা নামক দুর্ভাবনা থেকে রেহাই পাবার এ এক বিরাট প্রলোভন। অতএব ‘অগ্নিমুখী পতঙ্গে’র মতো একদিন আমিও করে ফেললাম মেডিক্লেমের এক বীমা। বছরে একবার মাত্র প্রিমিয়াম। বেশি টাকা নয়, উপরন্তু আয়কর ছাড়। প্রতি বছর বোনাসের টাকাটা পুজোর জামাকাপড় বেড়ানো ইত্যাদিতেই খরচ হত। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হল এই বীমার টাকা। কয়েক বছর অতিক্রম করার পর হঠাৎ একদিন মনে হল, বছর দশেক তো হয়ে গেল। ইতোমধ্যে লাখখানেক টাকা দেওয়া হয়ে গেছে। আয়কর ছাড় পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু একটাও তো মেডিক্লেম করিনি! ততদিনে আমি অবসর নিয়েছি। ওষুধপত্র কিনেই খেতে হয়। শরীর যখন, তার তো অসুখ-বিসুখ থাকবেই। কিন্তু মেডিক্লেমের সহায়তা পেতে গেলে তো নার্সিং হোমে ভর্তি হতে হয়। অনেক ফন্দিফিকির করে একজন শুভার্থীর পরামর্শে একটা উপায় বার করলাম। সেই শুভার্থী আবার এইসব স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানারকম সহায়তা দিয়ে থাকে। নিজে একটা সরকারি হাসপাতালে কাজ করে। তার সুবাদে অনেক ডাক্তারের সঙ্গে তার আলাপ পরিচয়। মানুষকে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সহায়তা দেওয়া তার একটা পেশাই বটে। সেই ছেলেটাই আমাকে একটা পরামর্শ দিলো। একটা রুটিন চেক-আপ করাতে হবে। সেজন্যে একজন ভাল ডাক্তার দেখিয়ে তাঁর পরামর্শমতো কয়েকটা পরীক্ষা করানো হবে। এজন্যে প্রয়োজনে একটা নার্সিং হোমে ভর্তি হতে হবে হয়ত। বলে রাখা ভাল, ছেলেটি কিন্তু আমার কাছে আসেনি, আমিই তার কাছে গিয়েছিলাম। তার বিশ্বস্ততা নিয়ে আমার অভিযোগ কিন্তু নেই। বলা যায়, এই ফাঁদ আমার নিজেরই তৈরি।

একদিন যাওয়া হল একজন নামি ডাক্তারের চেম্বারে। সেই ছেলেটি সঙ্গে ছিল। সবকিছু শুনে তিনি পরামর্শ দিলেন বাগুইয়াটির এক নার্সিং হোমে ভর্তি হবার জন্যে। ওখানেই সবরকম পরীক্ষা করিয়ে তিনি একটা ব্যবস্থাপত্র দেবেন। মনে মনে ভাবলাম, একটা স্বাদবদল নেওয়াই যাক না। আমি যেন কোনও স্যানিটরিয়ামে যাচ্ছি, এমন এক অনুভূতিমাখা চিন্তা মাথার মধ্যে তখন ঘুরপাক খাচ্ছিল তখন। দিনক্ষণ ঠিক করে একদিন রওনা হলাম সেই অভিমুখে। সঙ্গে নিয়েছি কয়েকটা বইপত্র। সেইসময়ে আমি অতীত দিনের এক বিখ্যাত গায়ক কে মল্লিককে নিয়ে একটা লেখা তৈরি করার জন্যে মনে মনে তৈরি হচ্ছিলাম।
নার্সিং হোমে গিয়ে রিসেপশনে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখাতেই আমাকে সটান চালান করে দেওয়া হল সোজা ওখানকার আইসিইউতে। ওখানে গিয়ে জানলাম, এমনিতে আমি যতই সুস্থ থাকি না ‘তখন আমার কন্ডিশন নাকি ‘ক্রিটিক্যাল’। তাই এই ব্যবস্থা। গরমের দিন। এসি ঘরে তখন বেশ ফুরফুরে ঠাণ্ডা হাওয়া। তবে অন্য বেডের মুমূর্ষু রোগীদের দেখে একটু ঘাবড়েই গুটি গুটি পায়ে নিজের জন্যে বরাদ্দ বেডে চলে গেলাম। মোবাইলে বাড়িতে কথা বলছি, এমন সময় বাজখাই গলায় কে একজন প্রায় হুমকির মতো আমার ফোন সেটটা নিয়ে নেবার জন্যে বললেন। শুনলাম সেই মহিলা নাকি ওখানকার আডমিনিস্ট্রেশন অফিসার। এবার সত্যি সত্যি নিজেকে কেমন বন্দিশিবিরের লোক মনে হচ্ছিল। কী আর করা। সবকিছু মেনে নিয়ে কে মল্লিকে মনোনিবেশ করলাম। লেখা কিছুটা এগিয়েছে, এমন সময় খুব হট্টগোল। খুব চিৎকার চেঁচামেচি কানে এল। পর্দা সরিয়ে দেখলাম একজন রোগী রাগে গজগজ করতে করতে ওখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। অনেক তার অভিযোগ। সবাই মিলে তাকে আটকাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। কিছু সময় ধরে নানারকম ফোনের আদান প্রদান হল। হঠাৎ সেই মানুষটা ফিরে এল ওই আইসিইউতেই। দেখলাম, তখন সে বেশ কাহিল। সবাই মিলে তাকে তার বেডে শুইয়ে দিল। তারপর ঘটল সেই অঘটন। সেই প্রথম একটা মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করলাম। ডাক্তার নার্স আর আয়াদের হঠাৎ তৎপরতা দেখে কৌতূহলী হয়ে মুখ বাড়াতেই দেখলাম সেই বীভৎস দৃশ্য। কোনওরকমে নিজেকে গুটিয়ে এনে আবার কে মল্লিকে মন দিতে গেলাম। মন কি আর বসে। চোখের সামনে তখন একজন অসহায় মানুষের মৃত্যুদৃশ্য ভাসছে। আমার ভেতরটা তখন কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। কয়েকঘন্টা যে কীভাবে কাটিয়েছিলাম মনে নেই। সন্ধ্যায় আমার ডাক্তার এলেন রুটিন ভিজিটে। তাঁকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করলাম আমাকে ওখান থেকে সরিয়ে জেনারেল বেডে দেবার জন্যে। তিনি ওদের কী বলে গেলেন জানি না, রাতের খাবার আসলে জিজ্ঞেস করতেই জানলাম, রাতটুকু ওখানেই আজ আমাকে থাকতেই হবে। জেনারেল বেড নাকি খালি নেই। কী আর করা। অগত্যা মুখ বুজে মেনে নিলাম ওদের কথা। সেই রাতটা যে কীভাবে কাটিয়েছিলাম ওখানে, তা আমিই জানি।

পরদিন আমাকে জেনারেল বেডে দিতে দিতে বেশ দেরিই করে ফেলল ওরা। পরে একজন নার্স বলল, দুদিনের বিল করার জন্যেই নাকি এই বিলম্ব। বুঝলাম, স্বেচ্ছায় যে খুড়োর কলে আটকা পড়েছি তা থেকে আমার সহজে নিস্তার নেই। মুখ বুজে জেনারেল বেডের এককোণে নিজের ঠাঁই খুঁজে নিলাম। আট জনের একটা ঘর। সারাক্ষণ টিভি চলছে। নার্স আর আয়াদের শাসন চলছে তো চলেছেই। তারই মধ্যে একটু একটু করে কে মল্লিককে নিয়ে আমার লেখা এগোতে থাকল। আমার পাশের বেডের মানুষটি খুব কথা বলেন। কী একটা অপারেশনের জন্যে এসেছেন। কয়েকটি পরীক্ষার পরে সেটা হবে। আমার ব্যাপারে তার অনেক কৌতূহল। কী লিখছি, কেন লিখছি ইত্যাদি। তাকে কোনওরকমে ঠাণ্ডা করলাম এটা ওটা বলে। এমন সময় একজন নার্স এসে বলে গেল পরদিন আমাকে তৈরি থাকতে। আমার বেশ কয়েকটা পরীক্ষা হবে। আমি তো গামছা লুঙ্গি ইত্যাদি কিছুই সঙ্গে নিয়ে যাইনি। ওখান থেকে নাকি এসব কিছুই দেওয়া হয় না। কী আর করা, অনেক অনুনয় বিনয় করে মোবাইলটা চেয়ে নিয়ে এক বন্ধুকে ফোন করলাম। ওদের বাড়ি কাছেই। বললাম দুটো লুঙ্গি আর গামছা দিয়ে যেতে। বন্ধু শুভেন্দু রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। ওকে আশ্বস্ত করে ব্যাপারটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে বললাম। স্বেচ্ছায় আমার এই প্যাঁচে পড়ার ঘটনাতে শুভেন্দুর মুচকি হাসিতে আমার শরীরটা যেন জ্বলে গেল। ইতোমধ্যে জেনে গেলাম আমার মেডিক্লেমের ক্লিয়ারেন্স নাকি এসে গেছে। তাই এই তৎপরতা। আমার ভেতরে ভেতরে তখন একটু একটু করে বিরক্তি জমতেও শুরু করেছে। তবু দাঁতে দাঁত চেপে সবকিছু মেনে নেওয়া ছাড়া আমার আর যে কোনও গত্যন্তর ছিল না যে।

একদিন সকালে রক্তের নমুনা নিয়ে গেল। নির্দেশমতো না খেয়ে আছি। এবার আল্ট্রা সোনোগ্রাফি হবে। জল খাচ্ছি একটু একটু করে। খালি পেটে জল খাওয়া কী যন্ত্রণাদায়ক, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানে। প্রস্রাবের বেগ এলে নীচে নিয়ে যাওয়া হবে। তারপর হবে পরীক্ষা। যা হোক যথাসময়ে লিফটে নেমে আমাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে ওখানে নিয়ে যাওয়া হল। আমার কোনও ওজর আপত্তি শুনলেন না ওরা। সুস্থ মানুষ হয়েও হুইল চেয়ারে বসলাম। ওখানে গিয়ে দেখি বেশ কয়েকজনের পেছনে আমি। এদিকে প্রস্রাবের বেগ বাড়ছে, ক্রমশ তা অসহ্য হয়ে উঠছে। ওদের ব্যাপারটা বললাম। আমার কোনও কথাই ওরা শুনতে নারাজ। ক্রমশ আমার অবস্থা কাহিল হয়ে উঠছে। এবার সত্যি সত্যি আমার ধৈর্যের বাঁধ আর থাকতে চাইল না। এমন সময় জানলাম, আজ নাকি ওটা হবে না। আমার আগের আরো দু’জনের তখনও বাকি। তারা তো রেগে ফেটে পড়লেন। আমি গুটি গুটি পায়ে বাথরুম সেরে এসে দেখি ওখানে তখন এক তুলকালাম কাণ্ড। একজন রোগীর বাড়ির লোকের সঙ্গে ঝগড়া করছেন ওখানকার এক কর্মী। মেশিন নাকি কাজ করছে না। অথচ সেই রোগীর নাকি আজই কোথায় যাবার কথা। আমি আর কথা না বাড়িয়ে আমার নিজের বেডে রওনা হলাম। এবার আর হুইল চেয়ারে বসলাম না। বুঝলাম দ্বিতীয় দিনের শুরুটা মোটেই ভাল হল না। বেডে ফিরে কে মল্লিকে মন দিলাম। সেদিন বেশ খানিকটা লিখেও ফেললাম। দুপুরের খাওয়া সেরে বেশ খানিকটা লম্বা ঘুম দিলাম। সন্ধ্যায় আবার লেখাতেই মন দিলাম। একসময় আমার ডাক্তার এলেন। তাঁকে বিনীত অনুরোধ করলাম, দ্রুত আমাকে ছেড়ে দেবার জন্যে। তিনি আমার কথায় মোটেই কর্ণপাত করলেন না। কী আর করব। দ্বিতীয় দিনটা এইভাবে কাটিয়ে পরের দিনের অপেক্ষা করলাম। পরদিন আল্ট্রাসোনগ্রাফিসহ আরো কয়েকটা পরীক্ষা হল। বিকেলে ডাক্তার ওগুলো দেখে তাঁর নিদান দেবেন। অতএব অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নাই বুঝে লেখাটায় মন দিলাম। একটানা লিখে প্রায় শেষ করে ফেললাম ওটা। যথাসময়ে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল। আমার সমস্ত রিপোর্ট নাকি এসে গেছে। কিন্তু ডাক্তার না এলে তো কোনও কাজ হবে না । ডাক্তার এলেন একটু রাত করেই। তাঁকে অনেক অনুনয় করে ওগুলো দেখতে বললাম। তিনি বেশ গম্ভীর হয়ে ওসব দেখে বললেন, সব তো ঠিকই আছে। তবে গল ব্লাডারে পাথর জমেছে। চাইলে তিনি ওখানেই ওটার অপারেশন করে দিতে পারেন । ধৈর্যের বাঁধ আর মানছিল না। কোনওরকমে নিজেকে সামলে বললাম বাড়িতে কথা বলে পরে আসার কথা। আমি চাইলাম, ছুটি। তিনি বললেন রাতে নাকি কোনও রোগীকে ছুটি দেওয়া হয় না। আমি যে রোগী নই, সে কথা বোঝাতে চাইলাম। তিনি আমার কথায় কর্ণপাত না করে সোজা লিফটের দিকে পা বাড়ালেন। ওই লিফটেই এলো সেই ছেলেটা, যার ব্যবস্থাপনায় আমি এখানে এসেছি। তাকে বেশ রাগত স্বরে এই ব্যাপারটার একটা ইতি চাইলাম। ছেলেটা অবশ্য খুবই নম্র ও ভদ্রভাষায় আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। আমি তার কথায় কান না দিয়ে একটা কথাই জোর দিয়ে বোঝালাম, কাল সকালেই আমি এখান থেকে মুক্তি চাই। আমার ভেতরের অস্থিরতা তখন ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে আমাকে আশ্বস্ত করে কোনরকমে প্রস্থান করল।

পরদিন সকালেই ওখান থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম। তবে ওরা বারবার করে গল ব্লাডার অপারেশনের জন্যে খুব তাড়াতাড়ি আসার কথা বলছিল। একটা লম্বা বিলের একপাশে আমাকে সই করতে হল। একটু চোখ বোলাতেই সব জলের মতো পরিস্কার হয়ে গেল। সব মিলিয়ে প্রায় পনেরো হাজার টাকার বিল। ডাক্তার তিনটে ভিজিটে নিয়েছেন দেড় হাজার টাকা, আয়া এবং নার্সরাও ভাগ পেয়েছেন। সবচেয়ে বড় খরচ আসিইউয়ের দু”দিনের ভাড়া চার হাজার টাকা। পরীক্ষাগুলোর মূল্য বাইরের থেকে অনেক বেশি। মোদ্দা কথা যে পরীক্ষাগুলো করাতে আমার খরচ হত কমবেশি আড়াই হাজার টাকার মতো, তারই জায়গায় এত টাকা। আমার পকেট থেকে না গেলেও খুব খারাপ লাগছিল। কাগজপত্র সব বুঝে নিয়ে যখন বাইরেই দিকে পা বাড়াচ্ছি, তখন ওখানকার বেশ কয়েকজন আমাকে ঘিরে ধরল বখশিস পাবার আশায়। এবার আমি সত্যি সত্যি রাগে গরগর করতে থাকলাম। তাদের তখন অশ্লীল ভাষায় কী কী বলেছিলাম এখানে তা অনুল্লেখ্যই থাক। কোনওরকমে ওদের জটাজাল থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম।
শুভেন্দুদের বাড়িতে লুঙ্গি গামছা পৌঁছে দিয়ে বাসে উঠে যখন এই তিন দিনের মৎপ্রণীত স্বেচ্ছা আত্মপীড়ণের কথা ভাবছি এমন সময় মনে পড়ল কে মল্লিকের কথা। এত কিছুর মধ্যেও লেখাটা তো শেষ করেছি। এও বা কম কী।
আমার বাস তখন এয়ারপোর্ট ছাড়িয়ে হৃদয়পুরের দিকে অনেকটাই এগিয়ে গেছে।