চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৯০॥ সুশীল সাহা


সেলেব-সংযোগ


সত্যজিৎ রায়কে দিয়েই শুরু করি। ১৯৭৫ সালের গোড়ার দিককার কথা। অফিসের রিক্রিয়েশন ক্লাবের নির্বাচনে জিতেছি। আমার ভাগে পড়েছে সাহিত্য বিভাগ। একটা লাইব্রেরী করতে হবে, সারা বছরের সাহিত্য সম্পর্কিত নানা অনুষ্ঠান ইত্যাদি করব, একটা পত্রিকা প্রকাশ। ইত্যকার নানান পরিকল্পনা যখন মনে উঁকি মারছে, সেই সময় ঠিক করলাম সত্যজিৎ রায়কে ফোন করব। আমাদের অফিসে নিয়ে আসব। তিনি একসময় বিদেশি ধ্রুপদি সংগীতের রেকর্ড বাজিয়ে আনুষঙ্গিক কিছু কথা বলতেন নানা জায়গায়। নিজে বিদেশি সংগীতের অনুরাগী শ্রোতা ছিলেন বলে তা নিয়ে অনর্গল বলে যেতে পারতেন। এটা আমার জানা ছিল। ঠিক করলাম আমাদের অফিসে ওইরকম একটা আয়োজন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেব। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। ফোন নম্বর আগেই সংগ্রহ করে রেখেছিলাম। একদিন সাহস করে অফিসের আনালগ টেলিফোনের ডায়াল ঘোরালাম। দু’তিন বারের চেষ্টায় সংযোগ হল। ওপারের ভারি কণ্ঠস্বর ভেসে এল। আমি আমার পরিচয় দিয়ে মনের কথা ব্যক্ত করলাম। সবটা শুনে তিনি আমাকে তাঁর ব্যস্ততার কথা জানিয়ে নিজের অক্ষমতার কথা জানালেন। একসময় তিনি ওটা করতেন ঠিকই কিন্তু সেটা অনেকদিন আগের ব্যাপার। এখন তাঁর বড়ো সময়াভাব। কী আর করব! ফোন ছেড়ে দিলাম।

অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই তিনি এসেছিলেন আমাদের অফিসে তাঁর তখনকার ছবি ‘জন অরণ্য’ ছবির শ্যুটিং করতে। দু’তিন ধরে চলেছিল সেই মহাযজ্ঞ। অফিসের কাজ মাথায় উঠেছিল। আমরা পালাক্রমে সেই শ্যুটিং দেখতে যেতাম। তাঁকে দূর থেকেই দেখা হল। কথা বলার দুঃসাহস হয়নি সেদিন।
আমি কিন্তু সহজে দমে যাবার পাত্র নই তখন। এবার আমার লক্ষ্য মৃণাল সেন। একদিন তাঁর ফোন নম্বর সংগ্রহ করে ডায়াল ঘোরালাম। কী আশ্চর্য! একবারেই পেয়ে গেলাম। তাঁর তৈরি করা বিখ্যাত ছবি বিশেষ করে ‘ভুবন সোম’ নিয়ে কিছু কথা বলার জন্যে অনুরোধ করলাম। তিনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেলেন। বললাম পরে তাঁকে দিনক্ষণ জানিয়ে ফোন করব। সেই ফোনটা আর করা হয়নি। তার কারণ একটাই, তা হল আমার এই উদ্যোগকে কেউই স্বাগত জানাল না। ওদের একটাই কথা, এসব অফিস টফিসে চলে না। আমি সত্যি সত্যি দমে গেলাম। বলাবাহুল্য তার পর থেকে অফিসের অমন সব কাণ্ডকারখানা করার কথা আর ভাবিনি।

পরিচালক হিসেবে তরুণ মজুমদার আমার অতি প্রিয়। একবার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম একটা সাক্ষাৎকার নেব বলে। তিনিও এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। এটা অবশ্য পাঁচ/ছ বছর আগের কথা। তাঁর দেওয়া সময় অনু্যায়ী একদিন গেলাম গণশক্তি পত্রিকার লাইব্রেরীতে। সঙ্গে ছিল তরুণ বন্ধু শৌভিক। ঘন্টাদুয়েক ধরে তাঁর সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা হল। তিনি কিন্তু একটুও বিরক্তি প্রকাশ করেননি। ওই সাউন্ড ফাইল থেকে লিখিত ভাষ্য তৈরি করেছিল শৌভিক। সেটাকে যথাসাধ্য এডিট করে ওঁকে দেখিয়েছিলাম। তারপর পাঠিয়েছিলাম বাংলাদেশের কালি ও কলম পত্রিকা দপ্তরে। কয়েক মাস পরে ওটা প্রকাশিত হয়েছিল। তরুণবাবুকে পত্রিকার কপিও পাঠিয়েছিলাম।
সত্তর দশকের শেষদিকে উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর আবির্ভাব। বন্দিমুক্তি নিয়ে তাঁর প্রথম ছবি ‘মুক্তি চাই’ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘ময়না তদন্ত’ সাধারণ দর্শক পছন্দ করল। তিনি সর্বভারতীয় স্বীকৃতি পেলেন ‘চোখ’ ছবিটি করে। তখন তাঁর উত্থানপর্ব। নব্বইয়ের গোড়ার দিকে তাঁকে আবিষ্কার করলাম অধ্যাপক তরুণ সান্যালের স্কটিশ চার্চ কলেজের কোয়ার্টারে। তিনি তখন আগের সংসার ত্যাগ করে নতুন করে ঘর বেঁধেছেন তরুণদার মেয়ে শতরূপার সঙ্গে। তখন মাঝে মাঝে যেতাম তরুণদার কাছে, আর গেলেই দেখা হয়ে যেত শ্রী চক্রবর্তীর সঙ্গে। তিনি শোনাতেন তাঁর আগামী ছবির পরিকল্পনার কথা। অবশ্য সেইসব পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি। অচিরেই ওদের সংসার ভেঙ্গে যায় এবং উৎপলেন্দু চলে যান পাদপ্রদীপের আড়ালে। তাঁকে নিয়ে অবশ্য লিখেছি আলাদাভাবে। একটা অমিত সম্ভাবনা কীভাবে নষ্ট হয়ে যায় তার উজ্বল উদাহরণ ওই মানুষটি। শতরূপার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটার পরেও তাঁর সঙ্গে কয়েকবার দেখা হয়েছে। ছেঁড়া পাল ভাঙ্গা হালের এক নাবিকের মতো চেহারা তখন তাঁর। যতবার দেখা হয়েছে, বলেছেন অচিরেই তিনি স্বমহিমায় ফিরে আসবেন। তাঁর আগামী ছবির গল্পও শুনিয়েছেন সবিস্তারে। অবশ্য তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। আরো দশজনের মতো তিনিও কথা রাখেননি। পারিবারিক জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলে মানুষের যে কী দশা হয় তার উজ্জ্বল উদাহরণ ইনি।
শতরূপার সূত্রে পরিচিত হয়েছিলাম পৃথা সর্বাধিকারী নামের এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে। তিনি আমাকে এক বিশেষ কারণে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন অভিনেত্রী মাধবী চক্রবর্তীর সঙ্গে। ঠিক করেছিলাম তাঁকে অতিথি হিসেবে আনব কলকাতার জ্ঞান মঞ্চে। সেটা বিরানব্বই সালের গোড়ার দিক। ওখানে আয়োজন করেছিলাম বন্ধু গৌতমবরণ অধিকারীর একটি গানের অনুষ্ঠানের। অনুষ্ঠানে তিনি আসবেন অতিথি হিসেবে। দু’একটি কথা বলবেন। শুধুমাত্র ট্যাক্সিভাড়া দিলেই হবে। একদিন কথা বলতে গেলাম তাঁর টালিগঞ্জের বাড়িতে। ওখানে সেদিন ছিলেন নাট্যকার চিত্তরঞ্জন ঘোষ। ভদ্রমহিলা সেদিন আমার সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করেছিলেন। যথাসময়ে তিনি জ্ঞান মঞ্চে এসেছিলেন। সারাক্ষণ ছিলেন। সবশেষে কিছু কথা বলেছিলেন, একটা কবিতাও পাঠ করেছিলেন। কথামতো অগ্রিম টাকা দিয়ে তাঁকে শ্যামবাজারগামী একটি ট্যাক্সিও ঠিক করে দিয়েছিলাম। না, আর দেখা হয়নি তাঁর সঙ্গে। রুপোলি পর্দার মানুষদের সঙ্গে যত কম দেখা হয় ততই ভাল।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে প্রথম দেখি কফিহাউসে, সত্তর দশকের গোড়ায়। তিনি তখন রীতিমতো স্টার। কিন্তু তাঁকে কখনও গ্লামারের ঘেরাটোপে বন্দি হতে দেখিনি। ফিল্ম ক্লাবের অনেক আয়োজনে তাঁকে আসতে দেখেছি মাঝে মাঝেই। সাধারণ দর্শকের আসনে বসে ছবি দেখেছেন। আলাপ হয়নি সেইভাবে। একবার তপন থিয়েটারে তাঁকে ধরেছিলাম একটা সাক্ষাৎকার দেবার জন্যে। তখন ওখানে তাঁর অভিনয় ও পরিচালনায় মনোজ মিত্রের ‘দর্পণে শরৎশশী’ নাটকটা হচ্ছিল। সেই অর্থে সময় দিতে পারেননি বলে ‘সমন্বয়’ পত্রিকার জন্যে সাক্ষাৎকারটা নেওয়া হয়নি। তবে তাঁর খুব কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়েছিল একবার। একেবারে সেইভাবে সারাদিনের জন্যে। বন্ধু পল্লব মিত্রের সৌজন্যে এটা সম্ভব হয়েছিল ওদেরই ‘নাভানা’ প্রকাশনা দপ্তরে। তখন সবে তিনি সত্যজিৎ রায়ের শাখা প্রশাখা ছবির শুটিং শেষ করেছেন। ’৮৯ সালের এক শনিবার তিনি আসবেন নাভানা দপ্তরে। সারাদিন থাকবেন। পল্লব কথাটা জানাতেই আমি খুব উৎসাহিত হয়ে পড়লাম যাবার জন্যে এবং যথারীতি ফিল্মভর্তি ক্যামেরা নিয়ে হাজির হলাম গনেশ এভিনিউয়ের অফিসে যথাসময়ের অনেক আগেই। সৌমিত্রবাবু এলেন বেলা বারোটা নাগাদ। একেবারে সাধারণ পোশাকে। তবে চেহারায় এক অনিন্দ্য দীপ্তি ছিল নিঃসন্দেহে। সেদিন অনেক কথাই হয়েছিল তাঁর সঙ্গে, বিশেষ করে সাহিত্য নিয়ে। তাঁর কবিতা এবং এক্ষণ পত্রিকার প্রসঙ্গও বাদ গেল না। ঘুরেফিরে এলো সত্যজিৎ রায়ের প্রসঙ্গ। তাঁর খেরো খাতার কথা বললেন। তিনি নিজেও ওইরকম একটা খাতা ব্যবহার করেন। তা থেকে নিজের লেখা কবিতাও পড়ে শোনালেন। ছবি তোলা হল। নানারকম খাবার খাওয়াও হল। তারপর থেকে এক এক করে তাঁর নাটক দেখেছি। হোমাপাখি, প্রাণতপস্যা, আত্মকথা আরো কত! মুখোমুখি আর হইনি কখনও। তবে তাঁর শেষ দিককার ছবিগুলো দেখে খুব মন খারাপ করেছে আমার। হায়, কী করুণ সেই অসামান্য অনিন্দ্যকান্তির তখনকার দীপ্তি!

মনোজ মিত্রকে চিনতাম জানতাম সুন্দরম নাট্যদলের কর্ণধার হিসেবে। তপন সিংহের ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ সিনেমায় অভিনয় করার পর তিনি রীতিমতো স্টার হয়ে যান। ‘আদালত ও একটি মেয়ে’, ‘শত্রু’, ‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে তাঁর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি নাটকেই নিবেদিত প্রাণ। একটার পর একটা নাটক লিখে পরিচালনা করেছেন। নিজে অভিনয়ও করেছেন। এই মানুষটার সঙ্গে আমার খুলনাতুত সম্পর্ক। আমরা যে এক জেলারই মানুষ! কতবার যে তাঁর বাড়িতে গেছি! কতদিন কাটিয়েছি মুখোমুখি গল্প করে। একবার অনুষ্টুপ পত্রিকার একটি নাট্য সংখ্যার জন্যে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম এক বছর ধরে। এখনও মাঝে মাঝে হঠাৎ হঠাৎ ফোন করেন। একেবারেই অকারণে, অদরকারে।
একবার অভিনেতা শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল শিশির মঞ্চের গ্রিন রুমে। সেদিন হাসান আজিজুল হক সাহেবকে নিয়ে ঊষা গাঙ্গুলির নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। সম্ভবত কোর্ট মার্শাল। নাটকশেষে হাসানভাইকে গ্রিন রুমে নিয়ে গিয়ে দেখি সেখানে শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় নাটকটি সম্পর্কে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন ঊষাদিকে। মুগ্ধ বিস্ময়ে তাঁর কথা শুনছিলাম। নাটক সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা আমাকে অবাক করে দিয়েছিল। হঠাৎ ঊষাদি আমাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসেন। হাসানভাইয়ের সঙ্গে দু’জনেরই পরিচয় করিয়ে দিই। হাসানভাই শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ের ভক্ত। সে কথা তাঁকে বলতেই তিনি এক গাল হেসে ওঁকে স্বাগত জানালেন। আমি আলাদাভাবে শুভেন্দুবাবাবুকে ঊষাদির নাটক সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানগর্ভ প্রতিক্রিয়ার জন্যে ধন্যবাদ জানালাম। বললাম বহুদিন আগে তাঁর অভিনীত ‘বিবর’ নাটকটি দেখে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। কেন যে তিনি আর নাটক করলেন না, এই আক্ষেপটাও তাঁকে জানিয়েছিলাম সেদিন। তিনি একগাল হেসে বলেছিলেন, ভাগ্য আমাকে সিনেমার হিরো বানিয়েছে। আমিতো ডাক্তারি করতে পারতাম, গানও গাইতে পারতাম। আমাদের কিছু একটা হওয়া না হওয়া আমাদের ওপরেই সম্পূর্ণত নির্ভর করে না। কথাটা বলেই তিনি হাসানভাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সাহিত্য আলোচনায় মগ্ন হলেন। মন দিয়ে শুনলাম তাঁর কথা। তাঁর পড়াশুনোর পরিধি ভেবে একটু বিস্মিতই হয়েছিলাম। সেদিন তাঁর চলনে বলনে স্টারসুলভ কোনও লক্ষণ দেখিনি।

অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায়কে দেখেছিলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে ‘প্রমা’ পত্রিকার এক আয়োজনে। একেবারে পিছনের সারিতে বসেছিলেন। অভিনেতাসুলভ কোনো গ্লামার তাঁর ছিল না। তার কিছুদিন আগেই তাঁর এলাকার বিধায়ক হয়েছেন। অভিনয় জগৎ থেকে প্রায় বিদায়ই নিয়েছেন। প্রায় যেচে গিয়ে আলাপ করেছিলাম। তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয় এক অভিনেতা। কাছে গিয়ে প্রণাম করে জানালাম আমার একটা প্রশ্ন করার ছিল। অনুমতি নিয়ে সেটা করেই ফেললাম, আপনি এত ভাল অভিনয় করেন, কতদিন ধরে এই ইন্ডাস্ট্রিতে আছেন। আপনার প্রখর বুদ্ধি ও বিবেচনার কথা নানাজনের মুখে শুনেছি। আপনি কেন ছবি পরিচালনার কাজ করলেন না? একটু হেসে তিনি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় একজন এসে ডেকে নিয়ে গেলেন তাঁকে কী এক বিশেষ প্রয়োজনে। তিনি যেতে যেতে পিছন ফিরে কেবল বলেছিলেন, পরে একদিন যোগাযোগ করবেন, আপনার সমস্ত জিজ্ঞাসার উত্তর দেব। জানতাম তিনি গলফ ক্লাব এলাকায় থাকেন। ঠিকানাপত্র সংগ্রহ করেছিলাম, এমনকী টেলিফোন নম্বরও। মনে মনে ওঁর কাছে যাবার সাহস সঞ্চয় করতে করতে একদিন শুনলাম তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ সংবাদ।

তপেন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার একাধিকবার দেখা হয়েছে বন্ধু সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়ের কর্মক্ষেত্র ‘সিস্টাস’-এ। তপেনবাবু তখন আজকাল পত্রিকার কর্মী। সুমন্ত্রের কাছে বিজ্ঞাপন সংগ্রহের জন্যে আসতেন। এসেই গল্পে মেতে উঠতেন। সুমন্ত্রই ওঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। খুব রসিক মানুষ ছিলেন তিনি। সারাক্ষণ কেবল মজার মজার গল্প করতেন। আমি তাঁর কাছে গুগাবাবা ছবিতে কাজ করা নিয়ে নানা প্রশ্ন করতাম। তিনি বেশ গুছিয়ে সবটা বলতেন। বলতেন এইসব গপ্পো আমি কিন্তু অনেক জায়গায় করেছি। কিন্তু আমি নিজেকে কখনও রিপিট করি না। সব সময়েই নতুনভাবে বলার চেষ্টা করি। ভাববেন বাঁধা বুলি আওড়াচ্ছি। কথাটা সর্বৈব সত্যি। কী করে তিনি গুপীর চরিত্রটা করার বরাত পেয়েছিলেন। এই একই প্রশ্ন তাঁকে দু’দিন করি কিছুটা সময়ের ব্যবধানে। কী আশ্চর্য! একই ঘটনা যে কতভাবে বলা যায়, সেটা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। তাঁর আকর্ষণেই সুমন্ত্রের অফিসে যেতাম। ও নিজেও আমাকে খবর দিত। একদিন সুমন্ত্রই খুবই কাঁপা কাঁপা বিষণ্ণ সুরে বলেছিল, তপেনদা আর আসবেন না। তিনি আর নেই। বলাবাহুল্য তাঁর মৃত্যুসংবাদে খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম।
এতখানি পড়ে পাঠক নিশ্চয়ই ধরে নিয়েছেন, আমি সেলেব বলতে এই কিস্তিতে ছায়াছবির জগতের মানুষদের কথাই লিখছি। ঠিক তাই। সিনেমা নিয়ে আমার প্রভূত আগ্রহ থাকলেও তথাকথিত স্টারদের নিয়ে আমার তেমন মাথাব্যথা কোনকালেও ছিল না। তবে পথচলতি যাঁদের পেয়েছি, তাঁদের কথাই কেবল লিখলাম। বহু স্টারকে দূর থেকে দেখেছি। দেখেছি উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, তরুণকুমার, মালা সিনহা, শর্মিলা ঠাকুর, অপর্ণা সেন, বিশ্বজিৎ, রঞ্জিত মল্লিক, মহুয়া রায়চৌধুরী। আর বম্বের অমিতাভ বচ্চন, জয়া বচ্চন, অমোল পালেকর, রাজেশ খান্না, কিশোরকুমার, প্রদীপকুমার ইত্যাদির সঙ্গে আরো অনেকে আছেন। এঁদের দেখার জন্যে খুব একটা পরিশ্রম করতে হয়নি। তবে তেমন কিছু কথা হয়নি বলে শুধু নামগুলোই উল্লেখ করলাম। তবে একবার এয়ারপোর্টে দেখা হয়েছিল পরিচালক গুলজারের সঙ্গে। একই লিফটে আমরা ছিলাম। তখন সবে তাঁর লেখা ‘পান্তাভাতে’ বইটা পড়েছি। দু’একটি কথা বলেছিলাম বইটা প্রসঙ্গে। মূলত আমার ভাল লাগার কথাই ছিল। তিনি মৃদু হেসে বলেছিলেন ‘শুকরিয়া’। খুবই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার। তবে মনে রয়ে গেছে এবং থাকবে।

বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে একমাত্র শবনমের সঙ্গেই আমার একবার দেখা হয়েছে। সে এক মধুর অভিজ্ঞতা। তার কথা অন্যত্র লিখেওছি। তবে দূর থেকে দেখেছি সুমিতা দেবী ও শওকত আকবরকে। কথা হয়নি। কলকাতায় একবার দেখা হয়েছিল হাসান ইমামের সঙ্গে। দেখা মানে দেখাই, কথা হয়নি তেমন কিছু। তিনি কিন্তু আমার প্রিয় মানুষদের একজন। শিল্পী হিসেবেই কেবল নয়, মানুষ হিসেবেও।

ভেবেছিলাম এই পর্ব শেষ করব সতীনাথ মুখোপাধ্যায় আর উৎপলা সেনের সঙ্গে তাঁদের কড়েয়া রোডের ফ্ল্যাটে এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারের বিবরণ দিয়ে। কিন্তু না, সেসব এখানে নয়। কেবল ওঁরা নয় অনেক সংগীত শিল্পীদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে নানাসময়ে। শান্তিদেব ঘোষ, সুবিনয় রায়, মায়া সেন, সুচিত্রা মিত্র, নীলিমা সেন, সাগর সেন, অর্ঘ্য সেন, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়া আছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বপন গুপ্ত, সুশীল মল্লিক, হৈমন্তী শুক্লা, বনশ্রী সেনগুপ্তরা। এঁদের কথা নাহয় আলাদা করে অন্যত্র লিখব।