চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৯১॥ সুশীল সাহা


স্নিগ্ধা ও সমরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়


আজ এমন দু’জনার কথা লিখছি যাঁদের সঙ্গে আমার সখ্য তো দূরের কথা, কোনওরকম আলাপ পরিচয় ছিল না। তবে তাঁদের আমি চিনতাম। তাঁদের কাজকর্মের সঙ্গে আমার নিবিড় পরিচয় ছিল। এককথায় আমি তাঁদের খুব ভক্ত ছিলাম। কীভাবে যেন তাঁদের একটা পাকাপোক্ত জায়গা দিয়েছিলাম আমার মনের মণিকোঠায়।

আশির দশকের গোড়ার দিকে আমি বেশ মেতে উঠেছিলাম গণসংগীত আর তার নৃত্যদৃশ্যায়ন নির্মাণে। তখন এই ধরনের অনুষ্ঠান এখানে ওখানে খুব হত। আমি নিজে দেখতামও সুযোগ পেলে। তখন বাজার মাত করছে ক্যালকাটা ইউথ ক্যয়ার। পাশাপাশি আরও দুটি সংস্থা সেই সময়ে নিজের যোগ্যতায় জায়গা করে নিয়েছে। ক্যালকাটা পিপলস ক্যয়ার ও ক্যালকাটা ক্যয়ার। পিপলস ক্যয়ারটা ছিল স্নিগ্ধা ও সমরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়দের। সেই সময়ে ওঁদের অনেকগুলো অনুষ্ঠান দেখে খুব ভাল লাগে। খোলা গলায় গাইতেন সমরেশবাবু। স্নিগ্ধা মূলত ছিল নৃত্যশিল্পী, গানও গাইত। ছিমছাম স্মার্ট চেহারা, সেই তুলনায় সমরেশবাবু ছিলেন একটু খর্বাকায়, তবে তাঁর সংগীতজ্ঞান ছিল অসামান্য। শুধু ভাল গাইতেন তা নয়, বহু বিখ্যাত গান বাংলায় রূপান্তরিত করে খুব ভাল সুরারোপ করেছেন তিনি। তাঁর দলের গান- জীবনের জন্যে ভালবাসার জন্যে, চারটি নদীর গল্প, শতফুল বিকশিত হোক তখন অনেকের মুখে ফিরত। জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে’ গানটিতে তিনি এক অসামান্য সুরারোপ করেছিলেন। পরে সেই গানটিকেই নিজের মতো করে গেয়েছিলেন একালের এক শিল্পী। তবু সমরেশবাবুর সেই গান এখনও আমার কানে লেগে আছে। ওদের পরিবেশনায় অনেক বিখ্যাত গানের নৃত্য দৃশ্যায়ন দেখেছি। তারমধ্যে একটি হল ‘জন হেনরি’। অসাধারণ সেই অভিজ্ঞতা। এগুলো ঠিক লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। তখন আমার ওইসব অভিজ্ঞতা গোগ্রাসে গেলার সময়। নিজে বহু নৃত্যনির্মিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম বলে সুযোগ পেলেই দেখতাম। দেখতে দেখতে শিখেছি আর শিখতে শিখতে শিখিয়েছি আমার ছাত্রদের। মধ্য তিরিশের সেই দুরন্ত সময়ের ঠিক দশ বারোটা বছর আমি এইভাবেই কাটিয়েছি।

আগেই লিখেছি যে কোনও কারণেই হোক পিপলস ক্যয়ারের অনুষ্ঠান আমার খুব ভাল লাগত। একবার সুযোগ হয়েছিল ওদেরকে আমাদের অফিসে নিয়ে আসার। খুব অল্প টাকায় ওঁরা অনুষ্ঠান করেছিলেন। একেবারে সামনের সারিতে বসে মুগ্ধ বিস্ময়ে সেই অনুষ্ঠান দেখেছি। অথচ একেবারেই ইচ্ছে জাগেনি ওঁদের সঙ্গে আলাপ করার। ওঁরা একটা এল পি রেকর্ডও ওই সময়ে বের করেছিল। গানগুলো শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।

একবার পশ্চিমবঙ্গ নাট্য একাডেমির উদ্যোগে বিভিন্ন দলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে শেক্সপিয়রের ‘মিড সামার্স নাইটস ড্রিম’ অবলম্বনে ‘চৈতালি রাতের স্বপ্ন’ মঞ্চায়িত হল কলকাতার বিভিন্ন মঞ্চে। নাট্যরূপান্তর ও পরিচালনা উৎপল দত্ত। সে এক অসামান্য প্রযোজনা। সেই নাটকে স্নিগ্ধা ও সমরেশবাবুকে দেখলাম। সমরেশবাবু গানে আর স্নিগ্ধা অভিনয়ে। সেই নাটকে আরো অনেকের সঙ্গে বিপ্লবকেতন চক্রবর্তীর অভিনয় কোনওদিনও ভোলা যাবে না। আর সমরেশবাবুর গান! খোলা গলার সেই দৃপ্ত উচ্চারণ চিরদিন মনে রয়ে যাবে।
অশেষ গুণবতী মানুষ ছিলেন স্নিগ্ধা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। নাচ ও গান তো ছিলই, আর গোটা দলটা পরিচালনা করার দায়িত্ব ছিল তাঁর। এতসব কাজের ফাঁকে তাঁকে দেখা গেল চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘দূরত্ব’ ছবিতে তিনি একটি বড় ভূমিকায় অভিনয় করেন। এছাড়া সরোজ দে’র বিখ্যাত ছবি ‘কোনি’তেও তাঁকে দেখা গিয়েছিল একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকায়। তবে তাঁর প্রাণমন জুড়ে ছিল তাঁর দল। এক সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিও ছেড়ে দেন।

আশির দশকের শেষদিক থেকে হঠাৎ করেই পিপলস ক্যয়ারের নাম আর সেইভাবে শুনতে পাইনি। কারণ একান্তই অজানা। একবার একাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ কী একটা নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। সম্ভবত সেটা এই শতাব্দীর গোড়ার দিক। সেখানে হঠাৎ দর্শকাসনে সমরেশবাবুকে দেখতে পাই। একবার ইচ্ছে হল, তাঁর সঙ্গে কথা বলি। পিপলস ক্যয়ারের অনুষ্ঠান কেন দেখতে পাচ্ছি না, জিজ্ঞেস করি। কিন্তু ভাবতে ভাবতেই সময় কেটে গেল। ইন্টারভ্যালের পরে নাটক শুরু হল এবং একসময় শেষও হল। ভিড়ের মধ্যেও ছোটখাট চেহারার মানুষটা দেখলাম বেরিয়ে যাচ্ছেন। কথা হল না। ওই ওঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা।

তারপর কতদিন চলে গিয়েছে! কলকাতার সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় কীভাবে যেন গণ সংগীত ব্যাপারটাই আস্তে আস্তে মুছে গেছে। আমারও জীবন বয়ে চলেছে অন্য খাতে। আশির দশকের ওই দিনগুলো এখন কেবল স্মৃতি।

বছর কয়েক আগে সেটা সম্ভবত ২০১৪ সাল হবে, হঠাৎ করেই কার মাধ্যমে যেন সমরেশবাবুর মৃত্যুসংবাদ পেলাম। মনটা খুবই বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিল সেদিন। জিজ্ঞেস করা হল না, কেন পিপলস ক্যয়ারের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেল, কেন অমন জনপ্রিয়তার শিখরে উঠেও তাঁরা হঠাৎ করেই থেমে গেলেন! জিজ্ঞেস করা হল না অনেক কিছু। মনের কথা মনেই থেকে গেল। এমন তো কতজনকে কতকথা বলা হয়নি, হবেও না।
অতি সম্প্রতি অর্থাৎ এই ২০২১ সালের মে মাসে ফেসবুক মারফতই পেলাম স্নিগ্ধা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুসংবাদ।
আমার মনের গহনে বাস করতেন যে দু’জন পরম আদরনীয় মানুষ, যাঁরা ইহজীবনে কোনওদিনও আমাকে চিনতেন না, তাঁদের এই শোকতাপ আমি ভুলি কী করে!