চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৯২॥ সুশীল সাহা


একটি গানের পুনর্জন্ম

বছর চল্লিশেক আগের কথা। আমাদের অফিসে তখন বেশ ঘটা করে রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করা হত। মূলত একজন গানের শিল্পীই আসতেন, কখনও কখনও কোনও আবৃত্তিকার। সাধারণত সেদিন এক বেলা অফিস হত। আমদের কাজের জায়গাতেই মঞ্চ তৈরি হত। শ্রোতা দর্শক আমরাই। মাঝে মাঝে অন্য অফিসের কেউ কেউ আসত। তখনকার অনেক বড় বড় শিল্পীদের আমরা আমাদের ওই সব অনুষ্ঠানে আনতে পেরেছি। জানি না এখনকার অফিসগুলোতে অমন অনুষ্ঠান আদৌ আর হয় কিনা!

একবার এমনই একটা অনুষ্ঠানে গান গাইতে এলেন শ্রীমতী সুচিত্রা মিত্র। চলাফেরা আর কথাবার্তায় অমন সপ্রভিত শিল্পী আমি খুব কম দেখেছি। অমন সৌম্য শুভ্র বসনাবৃত মানুষটির দিকে তাকালে সম্ভ্রমবোধে মাথা এমনিতেই নুয়ে আসে। সেই মানুষটি লিফট থেকে নেমে গটগট করে আমাদের বোর্ডরুমে গিয়ে বসলেন। অনুষ্ঠানের বেশ কিছুক্ষণ আগেই তিনি এসে গেছেন। তাঁর ওই ব্যক্তিত্বপূর্ণ চাহনি আর বসার ভঙ্গিমা দেখে কেউই সাহস করে তাঁর সামনে যাবার সাহস দেখায়নি। একা একা অনেকক্ষণ বসে আছেন দেখে আমি নিজেই তাঁর কাছে গেলাম। অবশ্য একটি অনুরোধ জানাবার দুর্মর বাসনা ছিল মনে। অনেক কষ্টে সাহস সঞ্চয় করে তাঁর কাছে গিয়ে প্রণাম করে একটি গানের অনুরোধ জানালাম– ‘মধ্যদিনের বিজন বাতায়নে’। এই গানটা কিছুদিন আগেই তাঁর একটি রেকর্ডে শুনেছি। বলাবাহুল্য কয়েকবার শুনেও তৃপ্তি হয়নি। তিনি আমার কথাটা শুনলেন এবং আশ্বাস দিলেন চেষ্টা করবেন।
মে মাসের প্রবল এক গরমের দিন ছিল সেটা। যদিও আমাদের অফিসের পুরোটাই এ সি, তবুও বাইরের দাবদাহ আমরা বেশ আন্দাজ করতে পারছিলাম। সুচিত্রা মিত্রকে ওই অনুরোধ জানাবার কিছু সময় পরে তাঁকে চা দেয়ার ছলে আবার ওই বোর্ডরুমে গেলাম। দূর থেকে দেখলাম তিনি তাঁর ডায়রিতে কি যেন লিখছেন আর গুনগুন করছেন। কাছে গিয়ে টের পেলাম তিনি আমার সেই অনুরোধ করা গানটাই একটু একটু করে মহড়া দিচ্ছেন। আমার নিজের তখন আনন্দে আত্মহারা হবার যোগার।

যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হল। প্রথম গান ‘নাই রস নাই’। প্রবল গ্রীষ্মের আবহ যেন মূর্ত হয়ে উঠল তাঁর কণ্ঠস্বরে। চারপাশের প্রকৃতির বিশুষ্ক বাতাবরণ ছিঁড়ে বেরিয়ে এল কবির অমোঘ বাণী। যোগ্য শিল্পীর যথার্থ গায়নে গানটি যেন আমাদের সামনে হাজির করল রবীন্দ্রনাথের ‘না বলা বাণীর ঘন যামিনী’র অনেক অব্যক্ত কথা। সেদিন তিনি বেশ কয়েকটি গান গেয়েছিলেন। মূলত গ্রীষ্মের গান। তবে মধ্যাহ্নের নিদাঘকে উপেক্ষা করে তাঁর কণ্ঠে বেজে উঠল এক অনন্য সুর। যোগ্য শিল্পী যিনি, তিনিই পারেন এমন নিরস আবহাওয়ার মধ্যেও প্রাণের পরশের ছোঁয়া দিতে। আমার অনুরোধ করা গানটা কখন গাইবেন, সেই আশায় ছিলাম। সময় শেষ আসছে দেখে একটু হতাশবোধ করছিলাম। এমন সময় আমাকে অবাক করে ধরলেন সেই গান। সেদিনের সেই শেষ গান ছিল, ‘মধ্যদিনের বিজন বাতায়নে’। এইভাবে তিনি যে আমার অনুরোধ রাখবেন, ভাবিনি। গান শুনতে শুনতে আমার চোখে জল এসে গেল। এ তো কেবল গান নয়, এ যেন কবির অন্তরের বাণীকে পৌঁছে দেওয়া সকলের মধ্যে।

সেদিনের সেই গান, আমাদের শেক্সপিয়র সরনির অফিসের গণ্ডী পেরিয়ে যেন মহানগরের পিচঢালা পথে ছড়িয়ে দিল এক অদৃশ্য মায়া। সুচিত্রা মিত্র তখন তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের জাদু দিয়ে আমাদের মুহ্যমান করে দিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত এই কথাগুলো কানের ভিতর দিয়ে যেন হৃদয়ে সাড়া জাগাল। চোখের সামনে ভেসে উঠল ছায়াঢাকা এক মরমী দুপুরের ছবি, যার অঙ্গে অঙ্গে বনযূথীর সুবাস। চাঁপাফুলের অনন্য গন্ধে মাতাল ছায়াঘেরা এক বিজন দিনের ছবি যেন দেখতে পেলাম আমার তৃতীয় নয়ন দিয়ে।

“…যে নৈরাশা গভীর অশ্রুজলে ডুবেছিল বিস্মরণের তলে ডুবেছিল
আজ কেন সেই বনযূথীর বাসে উচ্ছ্বসিল মধুর নিশ্বাসে
সারাবেলা চাঁপার ছায়ায় ছায়ায় গুঞ্জরিয়া ওঠে ক্ষণে ক্ষণে।’
পরবর্তীকালে সুচিত্রা মিত্রের খুব কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়েছে আমার। তাঁর পায়ের কাছে বসে মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনেছি অনেক গান। শুনেছি তাঁর অনেক মেধাদীপ্ত কথা, তবে সেদিনের সেই অভিজ্ঞতা আর কোনওভাবেই ফিরে আসেনি। বিরস দিনের মধ্যেও যে কতভাবে লুকিয়ে থাকে প্রাণের উচ্ছ্বাস, সমস্ত কঠিন কঠোর বাস্তবকে ভুলিয়ে দিয়ে গান যে কোন সুদূরের পারে নিয়ে যেতে পারে সেদিন সেই গান শোনার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সেটা বুঝেছিলাম। সেই স্মৃতির সুরভি এখনও অম্লান।

সেদিন তাঁর কণ্ঠধৃত গান আমার প্রাণে মনে এনে দিয়েছিল যে সরস প্রণোদনা তার রেশ হয়তো কোনওদিনও শেষ হবে না। এখানেই শিল্পের জয়। আর যে শিল্পী তাকে পৌঁছে দেন শ্রোতার অন্তরে তিনি বিরাজ করেন আমাদের মনোগহনে, আত্মার পরমাত্মীয় হয়ে।