চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৯৩॥ সুশীল সাহা




সত্যেন মিত্র

সত্যেন মিত্রকে মনে আছে? এই প্রশ্নটা শুনতে না শুনতেই নিশ্চয়ই আপনি এরমধ্যে মোবাইল টিপে গুগল সার্চ করে পেয়ে গেছেন তাঁকে। না, যাঁকে পেয়েছেন তিনি ইনি নন। যাঁকে পেয়েছেন সেই সত্যেন্দ্রনাথ মিত্র জন্মেছিলেন ১৯১৫ সালে আর প্রয়াত হয়েছেন ১৯৯৬-এ। ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী- সারা ভারতে আধুনিক রীতিতে সাক্ষরতা আন্দোলনের পথিকৃৎ। আমি যাঁর কথা লিখছি তিনি অন্য আরেকজন। তিনি ছিলেন আদ্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ এক নাট্যকর্মী, জন্মেছিলেন ১৯৩৪ সালে। নান্দীকারের জন্মলগ্ন (১৯৬০) থেকে ছিলেন দলের একজন উৎসাহী সংগঠক। ১৯৭১ সালের উত্তাল ঝড়ো দিনগুলোর এক উচ্চণ্ড সময়ে (৬ মে) তিনি নিহত হন।

১৯৮৫ সাল থেকে প্রতি বছর থিয়েটার ওয়ার্কশপ নাট্যদল বর্ষসেরা বাংলার একজন নাট্যকারকে সত্যেন মিত্র পুরস্কার দিয়ে আসছে। মৃত্যুর ১৪ বছর পরে বৎসরান্তিক এই স্মৃতিচারণে জানি না কতখানি তাঁকে স্মরণ করা যায়। তবু বিস্মৃত জাতি হিসেবে আমাদের যে কুখ্যাতি তার কিছুটা অপনোদন হয়তো হয়।

অতি সম্প্রতি পুরনো পত্রিকার জঙ্গল থেকে ‘নিশান’ নামাঙ্কিত একটি পত্রিকার শারদ সংখ্যা হাতে এল আমার। পত্রিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ এক জায়গায় চোখ আটকে গেল। ‘একটি মৃত্যু : আমাদের শোক ও ঘৃণা’ এই শিরোনামে দুই পাতা জুড়ে প্রকাশকের তরফে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। লেখার শুরুটা হয়েছে এইভাবে– আমাদের গতবারের শারদ সংকলনে ‘সাপ ব্যাঙ মানুষ’ নামে একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। সেই গল্পের লেখক ছিলেন সত্যেন মিত্র। এর আগে সত্যেনবাবু একাধিক নাটক/নাটিকা রচনা করেছেন– সেগুলো প্রকাশিত ও প্রযোজিত হয়েছে। কিন্তু সাপ ব্যাঙ মানুষ ছিল তাঁর প্রথম গল্প। নিশান-এর পাঠকরা সত্যেনবাবুর প্রথম গল্প পড়েই চমকিত হয়েছিলেন। মনে মনে হিসেব করেছিলেন, নীচের তলার মানুষকে নিয়ে সার্থক সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারে এরকম একটি লোক বুঝি এলো। প্রত্যাশা জাগলো– আরো লিখবেন সত্যেনবাবু। কিন্তু প্রথম গল্পই যে তাঁর শেষ গল্প হয়ে থাকবে পাঠকরা কল্পনাও করতে পারেননি।

সত্যেন মিত্রের নাটকের হাতে খড়ি বহুরূপী নাট্যদলে পঞ্চাশের দশকে। পরে তিনি অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নান্দীকার নাট্যদলের প্রতিষ্ঠালগ্নে (১৯৬০) ওই দলে যোগ দেন। নান্দীকার প্রযোজিত নাটকগুলোর মধ্যে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে অভিনয় করেন ‘সেতুবন্ধন’, ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র’ ও ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’ প্রভৃতি নাটকে। ১৯৬৬ সালে তিনি নান্দীকার থেকে বেরিয়ে এসে অন্যান্য সহকর্মীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’ নাট্যদল। আমৃত্যু ইনি ছিলেন ওই দলের অন্যতম প্রাণপুরুষ। জঁ পল সাত্রের একটি নাটকের সত্যেন মিত্র কৃত অনুবাদ ‘ললিতা’ ছিল থিয়েটার ওয়ার্কশপের প্রথম প্রযোজনা। এর পরে তাঁর দুটি একাঙ্ক ‘জংলী’ ও ‘চাই হৃদয় চাই’ থিয়েটার ওয়ার্কশপের প্রযোজনায় অভিনীত হয়। শেষোক্ত নাটকটির নির্দেশনা তিনিই দেন। ওই দলের সাড়া জাগানো নাটক ‘রাজরক্ত’, এতে অন্যতম প্রধান চরিত্রে তিনি অভিনয়ও করেন। এছাড়া ‘ললিতা’, ‘ছায়ার আলোয়’ এবং ‘ভিয়েতনাম’ নাটকেও তিনি সুনামের সঙ্গে অভিনয় করেন। থিয়েটার ওয়ার্কশপ দলের সম্পাদক হিসেবে তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু দলের জন্যে বয়ে আনে এক অপরিমেয় শোক। একই সঙ্গে সেই সময়ে এই ঘটনা সবাইকে হতবাক করে দেয়।

সময়ের ঘড়ি তো আর থেমে থাকে না। একটি অধুনালুপ্ত পত্রিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ চোখে পড়ে যাওয়া একটি প্রতিবেদনে চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি ভয়ঙ্কর দুঃসময়কালের ছবি। কত মানুষকে যে এইভাবে অন্যায়ভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে! মানুষ খুন করা যাদের নেশা ছিল সেইসব অমানুষদের বংশধরেরা এখনও রয়ে গেছে। আর রয়ে গেছে বলে আজও বহু সত্যেনকে অন্যায়ভাবে খুন হতে হয়। আর সেই খুনের কোনও বিচার হয় না। অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতেই কাঁদে সারাক্ষণ। বগটুই থেকে আমতা, কামদুনি থেকে রামপুরহাট, সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

পঞ্চাশ বছর আগের একটি বিস্মৃতপ্রায় ঘটনার সূত্র ধরে পিছন ফিরে একটু দেখতে চাইলাম। এখনও লক আপে বিচারাধীন বন্দির মৃত্যু হয়। অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের জন্যে এখনও হাহাকার শোনা যায়। একজন নাট্যকর্মীর এইরকম মৃত্যু ঘিরে এদেশে রচিত হয় না তেমন কোনও কাব্যগাথা। শাশ্বত শিল্পে নিবেদিতপ্রাণ আমাদের সত্যসন্ধ সাহিত্যসেবীরা অনেক বড় বড় কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তবু তো কিছু মানুষের এখনও হৃদয় দ্রব হয় এমন উপেক্ষিত মানুষদের জন্যে। অন্তর থেকে উৎসারিত হয় শ্রদ্ধা আর ভালবাসার অর্ঘ্য! সত্যেন মিত্রের মতো একজন মানুষের জন্যে তাই তো নিবেদিত হয় আমার মতো এক অখ্যাত মানুষের শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং তা এইভাবে।