চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৯৪॥ সুশীল সাহা


টিনা পুঁচকির জন্যে, একদা গহীন অরণ্যে

আমাদের হৃদয়পুর থেকে সুন্দরবনের দূরত্ব খুব বেশি নয়, তবু ওখানে যাওয়া হয়ে ওঠে না নানা কারণে। প্রথমত ভিতরের ইচ্ছেটা সেইভাবে জাগে না, কেননা বাংলাদেশের সুন্দরবনটা সেইভাবে দেখেছি যে! তাছাড়া এখান থেকে যাবার ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে। নদীবহুল এলাকাগুলোতে যাবার জন্যে বহু সময় ব্যয় করতে হয়। মূলত যানবাহনের ঝামেলা। মনে আছে একবার সাগরদ্বীপে যাবার অভিজ্ঞতা। ট্রেন থেকে নেমে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সেই যে ভেসেলের জন্যে অপেক্ষা করা, হুড়মুড় করে ওতে ওঠা এবং তারপর সেই শঙ্খচিলের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে নদী পার হয়ে দ্বীপের মাটিতে পা রাখা। সময় যে কোথা থেকে পেরিয়ে যায় বুঝতে পারি না। শুধু বুঝি এই যে শ্লথগতি, এটাই এখানে বিধি। সবাই মেনে নিয়েছে। আর মেনে নিয়েছে বলে কারো কোনও তাড়াহুড়ো নেই।

যাই হোক, আমাদের সংক্ষিপ্ত সুন্দরবন ভ্রমণ হয়েছিল টিনার কারণে। টিনা হল আমাদের দীর্ঘ দিনের গৃহকর্মে সহায়ক বিন্দু মন্ডলের নাতনি। প্রায় সারাক্ষণ আমাদের বাড়িতেই থাকে। আপন মনে ফুল তোলে, পুজো করে। টুকটাক কাজ করে। খেয়েদেয়ে এখান থেকেই স্কুলে যায়। কত আর বয়েস! নয়/দশ হবে বড় জোর। কিন্তু দেখায় আরো ছোট। তাই ওর আর এক নাম পুঁচকি। অরুণিমা ওকে আদর করে নাম দিয়েছে ‘টেপি’, আমি বলি ‘পেটি’। যে নামেই ডাকি না কেন, ও ঠিকই সাড়া দেয়। সেই টিনাই একদিন তার বই পড়া বিদ্যে নিয়ে সুন্দরবনে যাবার আবদার করে বসল। ছোট্ট ওই মেয়েটির কথাটা আমাদের মনেও ধরল। ঠিক করলাম দু’দিনের জন্যে নাহয় আমরা তিনজন ঘুরেই আসি ওখান থেকে। যেই না ভাবা ওমনি সেইভাবেই ঠিক করতে করতে বন্ধু অধ্যাপক সুরঞ্জনের শরণাপন্ন হলাম। কেননা ও যে ওখানকারই ভূমিপুত্র! শহুরে টুরিষ্টের মতো আমরা ওপর ওপর কিছু যে দেখতে চাই না! জায়গাটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে ওখানকার মানুষের সান্নিধ্যও যে বড় দরকার! সুরঞ্জন এই ব্যাপারটাকে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করল এবং একটা ছোট্ট ভ্রমণ পরিকল্পনা করে আমাকে জানাল। ঠিক হল, এক সকালে শিয়ালদহ থেকে ক্যানিং-এর ট্রেন ধরে ওখানে নেমে প্রথমে ঝড়খালি তারপর বাসন্তীতে সুরঞ্জনের এক কাকার বাড়িতে রাত্রিবাস।পরদিন সকালে প্রথমে গোসাবা তারপর পাখিরালয় হয়ে ফের গোসাবায় এসে মধ্যাহ্নভোজন সেরে ক্যানিং হয়ে ঘরে ফেরা। ভ্রমণসূচিটা যত সংক্ষেপে জানালাম, আসল ভ্রমণটা কিন্তু বেশ সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য ছিল। তার বিবরণই দেব এবার।

যথাসময়ে সুরঞ্জন তাঁর দুই ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে গড়িয়া থেকে আমাদের ট্রেনে উঠল। বাকি পথটা কাটল গল্পগুজব করে ক্যানিং-এ নেমে লোকজনের ভিড় ঠেলে প্লাটফরমের বাইরে এলাম। সেখানে আমাদের অবাক করে দিয়ে আগে থেকে ঠিক করে রাখা একটি টাটা সুমো গাড়িতে আমাদের ওঠাল সুরঞ্জন। গরমে তখন গলদ্ঘর্ম হয়ে গেছি। গাড়িতে উঠেই এসির ঠাণ্ডা হাওয়ায় আমাদের মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল। এবার আরেক দফা বিস্ময়ের পালা। সুরঞ্জনের ওখানকার এক ছাত্র দু’বোতল বাড়িতে তৈরি করা লস্যি দিয়ে গেছে। এবার তার সদব্যবহার করতে হল। চলন্ত গাড়িতে এপ্রিল মাসের ওই ভ্যাপসা গরমে কী যে ভাল লাগছিল ওই লস্যি, তা কী করে বোঝাই! এইভাবে ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে আমরা এসে পৌঁছে গেলাম ঝড়খালি। দুপুর হয়ে গেছে। ওখানেই এক সস্তা হোটেলে মধ্যাহ্ন ভোজন সারা হল, খাওয়া হল কচি ডাব। এবার ওখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশে বন্দি বন্যজন্তু দেখার পালা। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে প্রথমেই ব্যাঘ্রদর্শন সম্ভব হল। ওখানে সাধারণত আহত বাঘদের এনে শুশ্রুষা করে বনে ছেড়ে দিয়ে আসা হয়। আমাদের দেখা দুটি বাঘ বেশ বড়। ওদের শরীরে অসুস্থতার কোনও লক্ষণ দেখলাম না। চোখে পড়ল বানর। খাবার দিতেই কাছে এল। দেখলাম এক ঝাঁক হরিণ এবং তারপর কুমির। এক লপ্তে এতগুলো জন্তু দেখতে পারাকে আমরা আমাদের সৌভাগ্য হিসেবেই গণ্য করলাম। টিনার তখন পরমানন্দ। এইভাবে তার স্বপ্ন সফল হবে ভাবতেই পারেনি। ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে। আমরা গিয়ে বসলাম জেটিতে। সামনে চওড়া নদী। অদূরে সুন্দরবনের বনবীথি। ঝিরি ঝিরি ঠাণ্ডা হাওয়ায় মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল। ওখান থেকে উঠতে একেবারেই ইচ্ছে করছিল না। কান না পাতলেও শোনা যাচ্ছিল নানারকম পাখির ডাক। বিকেলের নরম আলোয় ধীর মৃদুমন্দ সমীরণে আমাদের চোখ বুজে আসছিল। মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে আমরা কোলাহলময় শহর থেকে একেবারে অন্য এক শান্ত নিভৃত আনন্দময় এক জায়গায় এসে পড়েছি। শহরের ইট কাঠ আর পিচ ঢালা পথ ছাড়িয়ে একেবারে প্রকৃতির কোলে তখন আমরা।

সুরঞ্জনের ডাকে আমাদের আচ্ছন্নতা কাটল। গাড়িতে উঠে পড়লাম। এবার আমাদের গন্তব্য ওর কাকার বাড়ি বাসন্তী। ঘন্টাখানেকের মধ্যে আমরা এসে পৌঁছে গেলাম সেখানে। অনেকদিন বাদে ভাইপো এবং তার সঙ্গীসাথীদের পেয়ে কাকা কাকিমার আনন্দ ধরে না। বৈকালিক চা-পর্ব সেরে আমরা আমাদের থাকার জায়গায় গেলাম। সেখানেও এক অপার বিস্ময়। সুন্দর একটা ছোট্ট দোতলা বাড়ির চারটে ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। নতুন সেই বাড়িটির মালিক কাকার এক বন্ধু। বাড়ির সামনে পেছনে এবং পাশে দিগন্ত বিস্তৃত খোলা মাঠ। ওই মাঠের অনেকটাই নাকি ওই ভদ্রলোকের। এই বাড়িটা বানিয়েছেন অতিথিদের থাকবার জন্যে। অদূর ভবিষ্যতে ওই বাড়িসহ জমি তিনি নাকি দান করে দেবেন রামকৃষ্ণ মিশনে। সন্ধ্যার ঠান্ডা হাওয়ায় আমরা যে যার মতো করে একটু গড়িয়ে নিলাম। রাত একটু বাড়লে আমরা গেলাম কাকার বাড়িতে রাতের আহার সারতে। রাতের খাওয়ার নামে হল রীতিমতো ভুরিভোজ। সুরঞ্জনের দুই ছাত্র খুব কম কথা বলে। কিন্তু সারাক্ষণ আমাদের দেখভাল করে যাচ্ছিল নীরবে। বাড়ি ফিরে আমরা যে যার শয্যায় শুয়ে পড়লাম। সকালে উঠে যেতে হবে প্রথমে গোসাবা তারপর পাখিরালয়। দু’জায়গায় দুটো নদী পার হতে হবে।

খুব ভোরে ঘুম ভাঙল পাখির কলকাকলিতে। সকালের সোনারোদ বেশ লাগছিল। কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার সময় তখন নয়। অতি দ্রুত আমরা তৈরি হয়ে নিলাম। রওনা হলাম গোসাবার দিকে। গাড়ি আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। বিশাল চওড়া মাতলা নদী পার হয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম গোসাবায়। সেখানেও এক চমক অপেক্ষা করছিল। প্রথমেই গেলাম এক চার্চে। ওখানকার এক ফাদার আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। এই সবই সুরঞ্জনের আগে থেকে ঠিক করা। সকালের খাওয়া ওখানেই সারতে হল। ওঁর আন্তরিক আমন্ত্রণে পাখিরালয় দেখে ওখানেই আবার ফিরে আসতে হবে মধ্যাহ্নভোজনের জন্যে। চলার পথে এমন সব অভিজ্ঞতা সত্যিই বিস্ময়কর। অবশ্য সব কৃতিত্বের দাবিদার সুরঞ্জন। আমরা আর দেরি না করে গেলাম নদীতীরে। আরেকটা বিশাল চওড়া নদী। সেটি পার হয়ে ওপারে গেলেই পাখিরালয়। ওখানকার ওয়াচ টাওয়ার থেকে ঘন সুন্দরবনের দৃশ্য দেখা এক পরম আকর্ষণীয় ব্যাপার। আমরা আর দেরি না করে নৌকাতে উঠলাম। ইঞ্জিনচালিত নৌকা ঢেউ ভেঙ্গে ভেঙ্গে আমাদের নিয়ে চলল ওপারে। পার হতে বেশ খানিকটা সময় লাগল। ওপারে পৌঁছে প্রথমেই জেনে নিলাম আমাদের অবস্থানের মেয়াদ। কেননা ওই নৌকাতেই আমাদের ফিরতে হবে যে! বলাবাহুল্য বেশ খানিকটা সময়ের ব্যবধানে নৌকা আসে।

আমরা ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। চারপাশটা বেশ সুন্দর করে সাজানো। মূলত নানারকম বাহারি ফুলের গাছ। তার মধ্যেই বানর লাফালাফি করছে। একটা তো টিনার হাত থেকে কলা নিয়ে গেল। তাদের ওটা খাওয়ার দৃশ্যটাও বেশ দেখবার মতো। এইবার আমাদের ওয়াচ টাওয়ারে ওঠার পালা। ঘুর্ণায়মান সিঁড়ি বেয়ে আমরা একটু একটু করে ওপরের দিকে এগিয়ে গেলাম। ওপরে পৌঁছে পেলাম এক পরম স্বস্তি। হাল্কা এক ঠাণ্ডা বাতাস আমাদের প্রাণমন ভরিয়ে দিল। সামনে তাকিয়ে দেখি দিগন্ত বিস্তৃত বনাঞ্চল। অপূর্ব সেই দৃশ্য। মানুষের হাত পড়েনি এমন সেই বন যার নাম সুন্দরবন। বন কেটে কেটে তো মানুষের বসত বেড়েই চলেছে। তবু এখনও যেটুকু আছে, তার সৌন্দর্যেই আমরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম। মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম টিনাকে। আশীর্বাদও করলাম। ওর দু’চোখ ভরা বিস্ময় কেবল। বইতে যা পড়েছে তা থেকে কতই না বড় এইসব জায়গা! সামনে পিছনে দুই পাশে কেবল জঙ্গল আর জঙ্গল। অবাক চোখে আমরা কেবল দেখতেই থাকলাম। কখন যে সময় ফুরিয়ে গেছে টের পাইনি। সুরঞ্জনের খবরদারিতে দ্রুত ঘাটের দিকে এগিয়ে গেলাম। এবার ফেরার পালা। প্রথমে গোসাবা, তারপর ক্যানিং।
নদী পেরিয়ে গোসাবা। আবার সেই চার্চ। হাত মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে আসা এবং ফাদারের উপস্থিতিতে নানারকম খাবারের স্বাদ নেওয়া। অবশ্য আয়োজনের বৈভবে নয়, ফাদারের আন্তরিকতায় আমরা বিস্ময়াভিভূত হয়ে গেলাম। অবশ্য মনে মনে সুরঞ্জনের প্রতিও কৃতজ্ঞতায় মাথা নুয়ে এল। এবার খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে ফেরার পালা। ফিরে যাবার পথও যে দীর্ঘ। ফেরার পথে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য সমবায় আন্দোলনের পথিকৃৎ হ্যামিলটন সাহেবের বাংলো দেখা হল। দু’জনার দুটি সুন্দর মূর্তি ওখানে রয়েছে। দর্শনার্থীদের কথা ভেবে ওই জায়গাটা যেভাবে রাখা হয়েছে তাতে খুব ভাল লাগল। সময় বেশি হাতে নেই। ইচ্ছে করলেও বেশি সময় থাকা হল না। পটাপট কয়েকটা ছবি তোলা হল কেবল।

আবার নদী পার হওয়া, গাড়িতে ক্যানিং স্টেশন। তারপর ধীরগতির ট্রেন ধরে বাড়ি ফেরা। সেই যাত্রাপথের বিবরণ দেওয়া নিরর্থক। ক্লান্তিতে আমাদেরও তখন চোখ বুজে আসছে। যাত্রী আর হকারের ভিড়ে ঘুমোনো সম্ভব নয়। কেমন যে এক ঘোরের মধ্যে কেটে গেল দুটো দিন আর এক রাত্রি। বারে বারে মনে পড়ছিল টিনার কথা।
কেননা ওর জন্যেই তো সম্ভব হল এই ভ্রমণ। আর সুরঞ্জন ও তাঁর দুই ছাত্র! কী অসামান্য তাদের নীরব উপস্থিতি! তাঁদের কথা নাহয় অন্যত্রই বলা যাবে!