চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৯৫॥ সুশীল সাহা


অবশেষে সিনেমায়

অভিনয়ের দিকে এক আধটু ঝোঁক থাকলেও সিনেমায় অভিনয়ের কথা কোনওদিন সেইভাবে ভাবিনি। আমার স্কুলে ভর্তি হবার আগে আমার ছোটবেলাটা শুরু হয়েছিল নাচ-গানের মধ্য দিয়ে। নাচাটাও যে এক ধরনের অভিনয় সেটা বুঝেছি অনেক পরে। যা হোক ছেলেবেলায় স্কুলের অনুষ্ঠানে নাটকে দু’একবার অংশগ্রহণ করার সু্যোগ পেয়েছি। অভিনয় ব্যাপারটা আমার বরাবরই ভাল লাগত। কিন্তু যাকে বলে সেইভাবে লেগে থাকা, সেটা কিন্তু আমার হয়ে ওঠেনি। আমার এই শিল্প-সাহিত্যের জগতটা খানিকটা খেয়াল-খুশির জগত। যখন যা ভাল লেগেছে, করেছি। এক একটা ব্যাপার ধরেছি আবার কিছু দিন পরে ছেড়েও দিয়েছি। যাকে বলে সাত ঘাটের জল খাওয়া, আমি হলাম সেই ধাতের মানুষ। আর ঠিক এই কারণেই কখনও গান, কখনও ছবি আঁকা, কখনও নাচ তো কখনও অভিনয়, আবার কখনও বা লেখালিখি কিংবা অনুষ্ঠান আয়োজনে সহায়তা। এই আমার জগত, এই আমার ভাল লাগা খেয়াল খুশির দিনযাপন। কিন্তু এরমধ্যে সিনেমায় অভিনয় করার বিন্দুমাত্র উদ্যোগ বা আকাঙ্ক্ষা আমার কোনওদিন ছিল না। সিনেমা দেখা, চিত্রতারকাদের নিয়ে মুখরোচক লেখাপত্র পড়া, ছবি দেখা এসবই ছিল। তাই বলে পর্দায় নিজেকে দেখাব, এমন আকাশকুসুম কল্পনা আমি স্বপ্নেও কোনওদিন ভাবিনি। কিন্তু মেঘ না চাইতে জলের মতো আমার এই ছোট্ট বিবর্ণ জীবনে সিনেমায় অভিনয় করার ব্যাপারটা ঘটেছিল। এবার সেই বৃত্তান্ত।

আমার বন্ধু চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল বছর চারেক আগে হঠাৎ করেই একদিন আমাকে তাঁর সেই সময়ের (২০১৭) নির্মীয়মাণ কাহিনিচিত্র ‘রূপসা নদীর বাঁকে’-তে একটা ছোট্ট ভূমিকায় অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। একজন শিক্ষকের ভূমিকা। মাত্র একদিনের কাজ। ওই চরিত্রে মানানসই অভিনেতা তিনি নাকি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সেই সময় তাঁর ইউনিটের শিল্প নির্দেশক উত্তম গুহ নাকি আমার নাম প্রস্তাব করেছিলেন। যা হোক, প্রস্তাব যখন এল তা সাদরে গ্রহণ করলাম অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে। হাজার হোক বন্ধুকৃত্য বলে একটা ব্যাপার তো আছে! তাছাড়া সিনেমা নিয়ে অনেক লেখালিখি করলেও অভিনয়ের ব্যাপার, যা কোনওদিন ভাবিনি, সেই সুযোগ এমন অযাচিতভাবে আসায় একটু পুলকিতবোধই করেছিলাম।

যথা নির্দিষ্ট দিনে বাড়ি থেকে বেরোলাম বাংলাদেশের খুলনার উদ্দেশে। শুটিং হবে খুলনার অদূরে বটিয়াঘাটায়। আপাতত আমার গন্তব্য তানভীরের বন্ধু মনোরঞ্জন মন্ডলের বাড়ি। ওখানেই পুরো টিম আগের দিনই এসে যাবে বলে জানা গেল। দিনটা ছিল ৮ মার্চ, তানভীরের জন্মদিন। ভর সন্ধ্যায় যখন অকুস্থলে পৌঁছালাম, দেখলাম চারদিকে বেশ উৎসবের মেজাজ। কেক কাটা হচ্ছে। ইউনিটের সবাই মিলে ওঁর জন্মদিন পালন করছে। ভাল সময়ে আমি পৌঁছালাম বলে নিজেকে পরম সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। একটু রাতের দিকে সবাই চলে গেল খুলনার অদূরে ফুলতলায় এক অতিথিশালায়। আমি ওখানেই থেকে গেলাম। জানা গেল পরদিনই আমার কাজ।

সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাতকৃত্য সারতে না সারতেই ইউনিটের সবাই এসে গেল। আলাপ হল মূল চরিত্রের দুই অভিনেতা শোভন ও সবুজের সঙ্গে। অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত ব্যবহার দু’জনেরই। এছাড়া মৃণাল দত্ত নামের এক চরিতাভিনেতার সঙ্গেও আলাপ হয়ে ভাল লাগল। এবার আমাকে ইউনিটের ড্রেসার চিত্রলেখা গুহ আমার জন্যে প্রয়োজনীয় পোশাক এগিয়ে দিলেন। সাদা ধুতি ও পাঞ্জাবি সঙ্গে কালো চশমা এবং পুরনো দিনের চটি। কোনও মেকাপ নেই। আমার চেহারাই আমার মেকাপ। কাজটা ভালভাবে বুঝে নিলাম প্রথমেই। আমি আমার স্কুলের এক শিক্ষককে সাইকেলের পিছনে বসিয়ে গ্রামের রাস্তা ধরে এগিয়ে আসব। রাস্তায় কতগুলো বাচ্চা লাট্টু খেলবে। ওদেরকে কোনওরকমে থামিয়ে ওখান থেকে আসতে আসতে ছেলেদের স্কুলের পড়া জিজ্ঞেস করব। কেউই তেমন উত্তর দিতে পারবে না। কিন্তু একজন পারবে। সেইই হল এই ছবির নায়ক। এটা ছিল তাঁর ছোটবেলার এক দৃশ্য। ছেলেটির সঙ্গে কথা বলে আমি খুশিমনে আস্তে আস্তে ওখান থেকে চলে আসব।

দৃশ্যগ্রহণের আগে মহড়াতেই বিপত্তি ঘটল। এবড়ো থেবড়ো রাস্তায় সাইকেল চালানো মুশকিল। কাউকে পিছনে বসিয়ে চালানো তো প্রায় অসম্ভব। হা হোক, ঠিক হল সাইকেল পাশে নিয়ে হেঁটে হেঁটেই আসব আমরা দু’জন। গোটা দৃশ্যটা তুলতে প্রায় ঘন্টাদুয়েক সময় ব্যয় হয়ে গেল। একই দৃশ্য একাধিকবার ক্যামেরাবন্দি করা হল। সে এক বিরক্তিকর ব্যাপার। ততক্ষণে দুপুর হয়ে গেছে। ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। অথচ কারো সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। পরের দৃশ্যগ্রহণের আয়োজন চলছে। সেখানেও আমার কাজ আছে। একটা স্টেজ তৈরি করা হয়েছে। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান। আমি অনুষ্ঠান ঘোষক। একই সঙ্গে একজনের গানের সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজাতে হবে। যখন আয়োজন চলছে– তার এক ফাঁকে দই চিড়ে খেয়ে এলাম। ওটা ছিল সকালেও খাওয়া। দেখলাম অনেকেই খাচ্ছে। আমিও সুযোগ বুঝে এক ফাঁকে খেয়ে এলাম। অবাক হয়ে দেখছিলাম ক্যামেরাম্যান তথা পরিচালকের ধৈর্য ও নিষ্ঠার ব্যাপারটা। কোনও বিরক্তি নেই। কাজ করে যাচ্ছেন মুখ বুজে। অত বড় একটা ইউনিট সামলানো বেশ ঝক্কির ব্যাপার। এখানে না আসলে সেটা বুঝতেই পারতাম না।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে শুটিং শুরু হল। আমি স্টেজে উঠে একটি মেয়ের নাম ঘোষণা করলাম। সে এসে অবলীলায় গাইল ‘মায়াবন বিহারিনী’। গাইল বলতে ঠোঁট মেলাল। গান হল যন্ত্রে। আমরা স্টেজে কয়েকজন। আমি ওর গানের সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজালাম। একজন বাজালেন বাঁশি। নানাভাবে বেশ কিছুক্ষণ ধরে সেই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা হল। এরপর আরেকবার আমার ঘোষকের কাজ। সকালের সেই ছেলেটি গান গাইবে খালি গলায় ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’। গানের সঙ্গে বাজনা নেই। আমরা দর্শক। সেই দৃশ্যও অনেকক্ষণ ধরে ক্যামেরাবন্দি করা হল। ততক্ষণে সন্ধ্যা সমাগত। ওই দিনের মতো কাজ শেষ হল। এবার সবাইকে প্যাকেটবন্দি বিরিয়ানি দেওয়া হল। সবাই কেমন অবলীলায় খেতে থাকলেন। আমি আর ওই পথ না মাড়িয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। রাতের দিকে শুটিং ছিল অন্য দৃশ্যের খুব কাছেই। সেটা একটু দেখলাম বটে। তবে ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছিল। আমার কাজ শেষ হয়েছে জেনে ঠিক করলাম পরদিনই ওই জায়গা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাব। বলে রাখা ভাল, শুটিং-এ অংশ নেওয়া প্রধান উদ্দেশ্য হলেও সেবারে বাংলাদেশে আমার অন্য কাজও ছিল।

যথাসময়ে তানভীরের ছবির কাজ শেষ হল। ভয়েস রেকর্ডিং-এর সময় আমি ঢাকায় যেতে পারিনি। আমার হয়ে অন্য একজন গলা দিয়েছিলেন। কলকাতায় ছবির সম্পাদনার কাজ হল। নিজেই নিজের অভিনয় দেখলাম। ওই ব্যাপারটায় যে আমি ‘ফুল মার্কস’ পেয়েছি সেটা পরিচালক নিজেই আমাকে বললেন। জীবনে নানারকম অযাচিত প্রাপ্তি ঘটেছে আমার। এসব ব্যাপারে তেমন উত্তেজনা কাজ করে না আমার ভিতরে। দেশ হারাবার পরে এমন এক নিস্পৃহ এক ব্যাপার আমার মধ্যে যে কাজ করে সেটা আমি টের পেয়েছি।

ছবি রিলিজ হল। অভিনেতা অভিনেত্রীর বিশাল তালিকার এক কোণে আমার নামও দেখা গেল। পত্র পত্রিকায় আলোচনা বেরোল। কলকাতার গোর্কি সদনে একটা ‘শো’ হল। যত ছোট ভূমিকায় অভিনয় করি না কেন অভিনেতা হিসেবে মঞ্চে ডাক পড়ল যথাসময়ে। পরিচালকের পাশে দাঁড়িয়ে আলোকিত মঞ্চে গেলাম। আমার সামনে কয়েক শো দর্শক। কী বলব ভেবে পাইনি। তেমন কিছুই বলিনি। এ তো পড়ে পাওয়া পাঁচ শিকে।
দেশ হারিয়ে যা কিছু পেয়েছি তার পরিমাপ করি না কখনও। কেননা দেশ হারানো মানুষকে পার্থিব আর কোনও কিছুই যে ভরিয়ে দিতে পারে না।