চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৯৬॥ সুশীল সাহা


শ্রীলেখার ঘরগেরস্থি

তনিমার বাঁ হাঁটুর প্রতিস্থাপনের পরে বাড়িতে নানারকম খণ্ডকালীন পেশাদার বহিরাগতর আবির্ভাব হতে শুরু করল। প্রথমত একজন আসতে শুরু করলেন একদিন অন্তর ব্যান্ডেজ খুলে ‘ড্রেস’ করতে। আরেকজন আসলেন এক নাগাড়ে প্রায় প্রতিদিন মাসখানেক। তিনি একজন ‘প্রফেশনাল ফিজিওফেরাপিস্ট’। এবং অবশেষে একজন আয়া। চতুর্দিকে আয়া সেন্টারের রমরমা এখন। ফোন করলেই পরিসেবা দিতে হাজির। প্রথমে একজন এলেন এবং দিন দশেক পরে আরেকজন। শেষোক্ত মহিলা আমাদের খুব কাছের রেলবস্তিতে থাকেন, এলেন আমাদের গৃহপরিচারিকার হাত ধরে। শ্রীলেখা নামের সেই মধ্যবয়স্কা মহিলাকে কাজে বহাল করার দুটি কারণ। প্রথমত তিনি খুব কাছাকাছি থাকেন, দ্বিতীয়ত তাঁর মজুরী আয়া সেন্টার যে কমিশন কেটে নেয়, সেটা বাদে অপেক্ষাকৃত কম। নামেই আয়া, আসলে এগারো ঘন্টার কাজের লোক। প্রথাগত কোনও ট্রেনিং নেওয়া নেই, তবে রোগীর সেবাযত্নের ব্যাপারটা ভালই জানেন। বাকি সময়টা বাসন মাজা, কাপড় কাচা, ঘর ঝাঁট দেওয়া সব করেন। খুবই চটপটে। খলবলিয়ে কথা বলেন। তিনি নাকি কাজ ছাড়া থাকতে পারেন না। অচিরেই তনিমার প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন শ্রীলেখা। তারপর যা হয় অবসর সময়ে নিজের জীবনের সুখ-দুঃখের গল্প ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে শুরু করলেন তনিমার কাছে। পাশের ঘর থেকে আমি কিছু কিছু শুনতে পাই। আজকের এই কিস্তি শ্রীলেখার ঘরগেরস্থি নিয়ে, যা অবশ্য কয়েকদিন ধরে শুনে এসেছি তনিমার কাছ থেকে।

কৃষ্ণনগরের মোটামুটি এক সম্পন্ন ঘরেই জন্মেছিলেন শ্রীলেখা। স্কুলে যাতায়াতের পথে আলাপ হয়েছিল কাঠের মিস্ত্রি স্বপনের সঙ্গে। আলাপ থেকেই প্রেম এবং একদিন পালিয়ে চলে আসা এই হৃদয়পুরে। ঠাঁই হল রেলবস্তিতে। পরপর দুটো মেয়েও হল তাঁর। মোটামুটি সুখেই ঘর-সংসার করছিলেন। কিন্তু এরমধ্যে আরেকজনকে বিয়ে করে নিয়ে এলেন স্বপন। পুত্রসন্তান দিতে না পারার খেসারত নাকি এটা। শ্রীলেখা তাঁকে মেনে নিল। বস্তির ওই একঘরে পাঁচজন বাস করতে থাকলেন। সতীনের নাম মীরা। সতীন হলেও তাঁর সঙ্গে এক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলল বুদ্ধিমতী শ্রীলেখা। বছর না ঘুরতেই মীরার এক কন্যাসন্তান হল, তারপর আরেকটি এবং শ্রীলেখাও আরেকটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিল।। পাঁচটি কন্যাসন্তান নিয়ে ওই একটি ঘরেই বাস করতে থাকল ওঁরা তিনজন। এরমধ্যে এক কঠিন অসুখে পড়ল মীরা এবং ওঁদের সংসারে অচিরেই নেমে এলো দারিদ্রের চরম কষাঘাত। বাধ্য হয়ে কাজের সন্ধানে নামতে হল শ্রীলেখাকে। বলাবাহুল্য গৃহপরিচারিকা থেকে অচিরেই আয়ার কাজকে বেছে নিলেন তিনি। এতে আয় বেশি, সম্মানও। সময় অনেকটা দিতে হলেও সংসারের আর্থিক হাল ফেরাতে আর কোনও বিকল্প যে তাঁর জানা নেই।

কোনওরকমে দিন কাটছিল ওঁদের। কিন্তু গোল বাঁধল দ্রুত বেড়ে ওঠা পঞ্চকন্যাদের নিয়ে। বড়োটা কলেজে পা দিতে না দিতেই প্রেমে পড়েছিল, অবশেষে একদিন গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা। সেই যাত্রায় বেঁচে গেলেও শরীরের তিরিশ শতাংশ দগদগে ঘায়ের পোড়া দাগ শুকোতে মাস চারেক লাগল। যথারীতি সংসারের আর্থিক টানাটানিও বেড়ে গেল। মেজো মেয়েটি খারাপ পথে পা বাড়িয়েছিল। পাচার হতে হতে বেঁচে গেলেও পুরনো পেশাটা ছাড়তে পারল না। সব জেনেও ওঁরা সবটা মেনে নিয়েছে। সংসারের খানিকটা হলেও হাল ধরেছে যে মেয়েটি। তৃতীয়টি পড়াশুনোয় খুব ভাল। মেয়েটি মীরার হলেও শ্রীলেখাই তাঁকে মানুষ করেছে। রাত জেগে তাঁকে পড়িয়েছে। শুরু থেকেই রেজাল্ট ভাল করতে থাকল মেয়েটি। পঞ্চম শ্রেনিতে বৃত্তিও পেয়েছিল। তারপর কীভাবে কীভাবে যেন বাগবাজারের সারদা মিশনের স্কুলে বিনা পয়সায় পড়ার সু্যোগ পেয়ে গেল মেয়েটি। হোস্টেলে থাকে। ওঁকে ঘিরে নানা স্বপ্ন দেখে শ্রীলেখা। পরের দুটো খুব ছোট। ওদের কী হবে কে জানে!

এইভাবেই দিন কাটছে শ্রীলেখার। আমাদের বাড়ির কাজ শেষ হলেই আরেক জায়গা ধরবে। এছাড়া দু’তিনটে আয়া সেন্টারে নাম লেখানো আছে। সেই অর্থে মাসে কুড়ি দিন কাজ থাকেই ওঁর। এই বাজারে এও বা কম কি! এইভাবেই দিন কাটছে শ্রীলেখার। চোখে মুখে তাঁর একটিই স্বপ্ন। মীরার প্রথম সন্তান জয়া একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং সংসারের সব দুঃখ-কষ্ট ঘুচিয়ে সুদিন আনবে। সেজন্যে অনেক কষ্ট করে দিন গুজরান করছে ওঁরা। শ্রীলেখা বলেই চলে নির্বাক শ্রোতা পেয়ে, অনর্গল। তার প্রথম কাজ হবে ওই রেলবস্তি থেকে বেরোনো। একটা ভদ্র গোছের জায়গায় বাসা ভাড়া করবে। বিপথগামী মেয়েটা এতদিনে পুরনো পেশা ছেড়ে এখন পোষাক সেলাইয়ের কাজ করে। জয়ার পথ ধরে অন্যেরাও মানুষ হবে। একে একে সব কটা মেয়ের বিয়ে দেবে। তারপর একদিন সংসারের সব দায় মিটিয়ে ভারতের নানা তীর্থক্ষেত্রে বেড়াতে যাবে। না, কাশীবাসি হবার সাধ তার নেই। এই সংসারের নরকের পাঁকে সেই নিত্যদিন লড়াই করেছে। বাকি জীবনটা লড়াই করেই সে বাঁচতে চায়।

শ্রীলেখার স্বপ্ন আদৌ সফল কিনা কে জানে। তবু স্বপ্ন নিয়েই তো মানুষ বেঁচে থাকে। শ্রীলেখাই বা তার ব্যতিক্রম হবে কেন?