চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৯৭॥ সুশীল সাহা


থামতে চাওয়া, থামতে পারা

অমন করে ছুটবে যদি থামবে কেমন করে?
পথ সে তো নয় কুসুমে কুসুমে লীন
অনেক দূরের দিগন্ত যতই হাতছানি দিক
থামতে তোমার হবেই গরবিনী।
দৌড় থামাবার পরেও কিছুটা পথ দৌড়াতে হয় সবাইকে। নইলে হোঁচট খেতে হয়। তবে অনেকে খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে থেমে যেতে পারেন, অনেকে থামতেই জানেন না। দম ফুরোতে না ফুরোতে আরো কয়েক পাক ঘুরে আসতে চান। সেই চাওয়াটাতে লাগাম দিরে পারা না পারার মধ্যেই রয়েছে জীবনের অনেক সাফল্যের চাবিকাঠি। ঠিকমতো যতিচিহ্ন ব্যবহার করতে পারার মতো এও এক ধরনের পরীক্ষা।
মনে পড়ছে মূকাভিনেতা যোগেশ দত্তের কথা। তিনি তখন খ্যাতির তুঙ্গে। দেশে বিদেশে বহু ছাত্র ছাত্রী। হঠাৎ করেই একদিন নিজের কাজ থেকে অবসর নেবার কথা ঘোষণা করলেন। তখন তাঁর বয়েস আশিও হয়নি, সেটা ২০১০ সাল। রবীন্দ্র সদনে যোগেশ মাইম একাডেমীর অনুষ্ঠান। যোগেশ দত্ত শেষবারের মতো মঞ্চে নামবেন। শহরময় এই কথাটা চাউর হয়ে গেল। অনেকের সঙ্গে আমিও দেখতে গেলাম সেই অনুষ্ঠান। দেখলাম দু’চোখ ভরে ওই বিশ্ববরেণ্য মানুষটার কাজ। পরম আনন্দের সঙ্গে একটু কষ্টও হচ্ছিল। কী আর করা! সবকিছু তো মেনে নিতে হয়। শচীন তেণ্ডুলকারের মতো ক্রিকেটারকেও একদিন মাঠ ছাড়তে হয়!

কথাগুলো বিশেষভাবে মনে এলো অতি সম্প্রতি রবীন্দ্র সদনে অনুষ্ঠিত বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী পলি গুহর নৃত্যাভিনয়– সমৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত নৃত্যনাট্য ‘শ্যামা’র অভিনয় দেখতে গিয়ে। কিছুদিন আগে থেকেই বিশেষভাবে বিজ্ঞাপিত হয়ে আসছিল রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যের কিংবদন্তী পলি গুহ শ্যামার ভূমিকায় মঞ্চে অবতীর্ণ হবেন। ৭৫ বছর বয়সের একজন শিল্পী শ্যামার চরিত্র রূপায়িত করবেন– এই খবরে অনেকের মতো আমিও খুব পুলকিত বোধ করলাম। মনে মনে ঠিক করলাম যত বড় কাজই থাকুক ওই দিন অন্তত রবীন্দ্র সদনে যাবই। দেখে আসব পঞ্চাশ বছরে আগের সেই মানুষটাকে, যাঁর নাচের ছন্দে প্রাণ পেত রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যগুলো। তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মঞ্চ কাঁপাতেন তাঁর জীবনসঙ্গী সাধন গুহ। অসাধারণ সেই জুটির নাচ দেখার জন্যে হল উপচে পড়ত দর্শকের ভীড়ে। এই অভাজনের স্মৃতিতে সেদিনের সেই অভিজ্ঞতাগুলো জমে আছে। তাতে বিস্মৃতির প্রলেপ পড়েনি একটুও। তাইতো অনেক কাজ ফেলে রেখে এই সেদিন গেলাম ভিড় উপচে পড়া রবীন্দ্র সদনে পলি গুহর ‘শ্যামা’ দেখতে।

যথাসময়ে পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে শুরু হল নৃত্যনাট্য। মঞ্চে এলেন বহুকাঙ্খিত পলি গুহ। কিন্তু এ কোন মানুষ! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষটা একসময় প্রবল করতালির মধ্যে নাচ শুরু করলেন। ‘জীবনে পরম লগন কোরো না হেলা’। কোথায় সেই অপরূপা স্বর্গের অপ্সরী! বয়সের ভারে নুব্জ এক পৃথুলা রমণী এগিয়ে চলেছেন সখী পরিবৃত হয়ে। ‘ফাগুন যখন যাবে গো নিয়ে ফুলের ডালা, কী দিয়ে তখন গাঁথিবে তোমার বরণমালা, হে বিরহিনী।’– এই নির্মম সত্যিটা যেন মূর্ত হয়ে উঠল তাঁর নাচে।
বলাবাহুল্য আমার স্বপ্নভঙ্গ হল।

এ কী দেখছি আমি! কোথায় সেই স্বর্গীয় মধুরিমা! কোথায় সেই প্রেম আর কর্তব্যের দ্বন্দ্বে ঘেরা বৌদ্ধ জাতকের অমর কথাকাব্য! এ তো উৎকট রঙ–এর প্রলেপে ঢাকা বয়সের বলিরেখা! ভাঙ্গা আয়নায় দেখা মুখচ্ছবি।

তবু শেষ পর্যন্ত দেখলাম নৃত্যনাট্যটি। কেন জানি না আমার চোখ ফেটে জল আসছিল। এ কী দেখতে এলাম! বিখ্যাত গায়িকা শ্যালিয়াপিনের মতো ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল আমার। সেই শ্যালিয়াপিন যিনি তাঁর বৃদ্ধা বয়সে যৌবনকালের রেকর্ডধৃত বর্ণিল গান শুনে সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলেছিলেন।
আমার জন্যে আরো অনেক দুঃখের অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছিল। অনুষ্ঠান শেষে মঞ্চে অভিনেত্রী এলেন। ফুলের বন্যায় ভেসে গেল তাঁর দেহ। অভিনন্দন জানাতে এসেছে তাঁর অজস্র গুণগ্রাহী, ছাত্র-ছাত্রী। তাঁর চোখেও জল। তবে সে জল দুঃখের নয়, যাকে বলে আনন্দাশ্রু। মাইকে দুটো কথা বলতে চাইলেন। কণ্ঠস্বর বেরোচ্ছে না। বহু কষ্টে অনেকগুলো কথা বলে গেলেন। কিন্তু কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আহা, তাঁর যে গলা চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে! ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় নিজের কৃতজ্ঞচিত্তের অভিব্যক্তি কোনওরকমে ব্যক্ত করলেন। চারদিকে কেবল করতালি আর করতালি। কিছুটা আবেগ আর কিছুটা তৃপ্তির বন্যায় ভেসে গেলেন অতীত দিনের সেই নামি অভিনেত্রী। কিছুতেই টের পেলেন না একজন, অন্তত আমার মতো একজনের মোহভঙ্গের বেদনামথিত জ্বালা। দেখতে পেলেন না ফোটায় ফোটায় ঝরে পড়া আমার অভিমানহত অশ্রুবিন্দু। জানলেন না তাঁর একজন অজানা অনুরাগীর দুঃখশোকের অজানা কষ্টের সেই উপল ব্যথিত যন্ত্রণা।
দূর থেকে প্রণাম জানাতে জানাতে আমারও মনে এল তারাশঙ্করের কবি উপন্যাসের সেই বিখ্যাত সংলাপটা-
‘জীবন এত ছোট কেনে’?