চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৯ ॥ সুশীল সাহা




নাটক ‘শের আফগান’ : পঞ্চাশ বছর আগে ও পরে

পুরনো নাটকের নতুন করে মঞ্চায়নের নানান ভালো দিক আছে। নাটক তো একেবারেই তাৎক্ষণিক ব্যাপার। এই আছে এই নেই। পরের প্রজন্মের কাছে আগের দিনের নাটক নতুন করে নিয়ে আসার মধ্যে এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতাও আছে। ইতিহাস বিমুখতা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তা থেকে কিছুটা ফিরিয়ে আনতে পারেন যাঁরা সেইসব নাট্যকর্মীদের কুর্নিশ জানাতেই চাই আমরা। অতি সাম্প্রতিককালে বাংলা নাটকের স্বর্ণযুগের অনেক প্রযোজনাকে নতুন আঙ্গিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এই তালিকায় ‘রক্তকরবী’ থেকে ‘রাজা অয়দিপাউস’, ‘রাজরক্ত’ থেকে ‘বলিদান’ – সবই আছে। নতুন প্রজন্মের কাছে আগের দিনের নাটকগুলোকে এইভাবে উপস্থাপন করার জন্যে সংশ্লিষ্ট নাট্যকর্মীরা অবশ্যই ধন্যবাদ পাবেন। এই তালিকায় নতুনতম সংযোজন সংসৃতি নাট্যদলের ‘শের আফগান’। কমবেশি পঞ্চাশ বছর আগে নান্দীকারের এই নাটকটা দেখেছিলাম। একবার নয়, তিনবার। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনা আর অভিনয়দীপ্ত সেই নাটকের স্মৃতি কোনদিনও ভুলব না। সেই নাটকটাই নতুন করে নির্মাণ করেছেন এই সময়ের খ্যাতিমান নির্দেশক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। উইঙ্কল টুইঙ্কল, ফ্যাতাড়ু, দেবী সর্পমস্তা ইত্যাদি নাটক নির্মাণ করে ইতোমধ্যেই তিনি বাংলা নাটকের অঙ্গনে একটা সর্বমান্য জায়গা করে নিয়েছেন। তাই তাঁর এই নতুন নির্মাণ দেখার এক অদম্য ইপ্সা মনের মধ্যে এমনিতেই বাসা বুনেছিল। তাছাড়া নামভূমিকায় এই সময়ের বিখ্যাত অভিনেতা রজতাভ দত্ত অভিনয় করছেন, এটাও ছিল একটা বড় আকর্ষণ।

লুইজি পিরানদেল্লোর এই নাটকটির (Hanry IV / The Plessure Of Honesty) প্রথম বঙ্গানুবাদ করেন জ্যোতির্ময় রায়চৌধুরী। সেই নাটকটিকে একেবারে এ দেশের পটভূমিতে রূপান্তরিত করেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। নামকরণ করেন ‘শের আফগান’। নান্দীকার নাট্যগোষ্ঠীর প্রযোজনায় সেই নাটকের প্রথম মঞ্চায়ন হয় মুক্ত অঙ্গন রঙ্গালয়ে ১৯৬৬ সালের ১২ জুলাই। দীর্ঘকাল ধরে সেই নাটকের মঞ্চায়ন হয়। মোট অভিনীত শো-এর সংখ্যা ২৯১। বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে সংখ্যাটি নেহাৎ কম নয়। সেই নাটকটিই যখন একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে পুনর্নিমিত হয় তখন তার জনপ্রিয়তা সম্পর্কে আর কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

নান্দীকারের প্রযোজনায় অবশ্যই একটি চমক ছিল। বিভ্রম আর বাস্তবের (Illusion and reality) এক অভূতপূর্ব সমন্বয় দেখে আমরা একটু চমকেই গিয়েছিলাম। বাস্তব থেকে দূরে এক কল্পনার জগতে বিচরণের সেই দৃষ্টিবিভ্রম আমাদের বেশ কিছুটা ধন্দে ফেলে দেয়। আবার সেই বিভ্রমের পর্দা সরিয়ে কঠোর কঠিন বাস্তব যখন উঁকি দেয় তখন আমরা সত্যি সত্যি সংশয় ও অস্বস্তির দোলাচলে দুলতে থাকি। কোনটা যে প্রকৃত সত্যি তার খোঁজ করতে করতেই দিশেহারা হয়ে যাই আমরা।

নান্দীকারের নাটকটি আমি প্রথম দেখি গত শতাব্দীর সত্তর সালের শেষদিকে। বলাবাহুল্য প্রথম দেখার ঘোর কাটাতে অচিরেই আরেক বার দেখি। বস্তুত খুব দ্বিধাদ্বন্দের আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকি। বিশ্বাস অবিশ্বাসের সেই ঘুর্ণন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে তৃতীয়বার ওই নাটকটি দেখি। অবাক লাগে নাট্যকারের মেধা আর মননের প্রয়োগ কুশলতায়। সবচেয়ে বেশি আলোড়িত হই পরিচালক/অভিনেতা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় ও তাঁর দক্ষ নির্মাণে। নান্দীকারের টিম ওয়ার্ক ছিল অপূর্ব। অজিতেশবাবুর অভিনয় ক্ষমতা যতই উচ্চমানের হোক না কেন, অন্য কুশীলবেরা নিতান্ত পিছিয়ে ছিলেন না। সবটা মিলিয়ে ছিল এক দুদার্ন্ত টিম ওয়ার্ক। কাহিনির চুম্বকে ছিল এক অসাধারণ ঘটনা বিন্যাস। জাহাঙ্গীর-নূর জাহান-শের আফগানের গল্পটি সুবিদিত। কিন্তু সেই গল্পটি এখানে প্রধান উপজীব্য নয়। তবে সেই গল্পের আধারে নির্মিত নাটক চলাকালীন দোলনা ছিঁড়ে একটি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত এই নাটকের ঘটনা পরম্পরা। সেই দুর্ঘটনায় নায়কের মাথায় আঘাত এবং স্মৃতিভ্রম শুরু হয়। ওই নাটকের প্রধান চরিত্র শের আফগানের খোলসে নায়ক তাঁর দিনযাপন করতে থাকেন। দেখতে দেখতে পঁচিশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়। শের আফগান তাঁর সভাসদ সাজিয়ে এইভাবে এতগুলো বছর অতিক্রম করে যান। এইসময় তাঁকে দেখতে আসেন এক ডাক্তার, সঙ্গে নায়কের পুরনো প্রেমিকা ও তার স্বামী বলরাম, একদা যার চক্রান্তে ঘটেছিল ওই দোলনা ছেঁড়ার দুর্ঘটনা। এতদিন পরে শের আফগান চিনতে পারেন সবাইকে। শনাক্ত করতে পারেন প্রকৃত চক্রান্তকারীকে। হঠাৎ তার প্রতিহিংসা জেগে ওঠে। তরোয়াল দিয়ে হত্যা করেন বলরামকে। ডাক্তারের পরীক্ষা ও ঘটনা বিন্যাসে আমরা বুঝতে পারি নায়ক সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু ততক্ষণে খুনের অপরাধ থেকে পরিত্রাণ পাবার আশায় বাকি জীবন তিনি ওই শের আফগান সেজেই মিছিমিছি তাঁর রাজত্ব চালাতে থাকেন। দর্শক মজে যান নাটকে, পাশাপাশি চমক আর দ্বিধাদ্বন্দ্বের দোলাচলে, বিভ্রম আর বাস্তবের ভুল ভুলাইয়াতে ঘুরপাক খেতে থাকেন সবাই। কঠিন সত্যের মুখোমুখি হবার জন্যে সবার মন প্রাণ আকুল হয়ে ওঠে, কিন্তু কিছুতেই তারা একটি সরল সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন না কেউই। শের আফগান নাটকের এটাই অন্যতম বৈশিষ্ট। বিভ্রম থেকে বাস্তব আবার বাস্তব থেকে বিভ্রমের চরকিবাজিতে আমরা কেবল ঘুরপাক খেতেই থাকি।

স্বভাবতই মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। দুই সময়ে নির্মিত দুটো নাটকের তুলনা এসেই যায়। আমরা যারা দুটো নাটকই প্রত্যক্ষ করেছি, তারা নানা সময়ে নানাজনের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে থাকি। কোনটা বেশি ভাল ! কোনটা সেই অর্থে বেশি পিরানদেল্লোর কাছাকাছি। ইত্যাদি। স্মৃতি হাতড়ে খুঁজে ফিরি সেই সময়কার অভিজ্ঞতাকে। আর এখন এই সময়ে যখন প্রকৃতপক্ষে আমরা যারা বয়সের প্রান্তসীমায় এসে পৌঁছেছি তারাও বর্তমান প্রযোজনার ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারি না সহজে।
ইতালিয় নাট্যকার লুইজি পিরানদেল্লো (১৮৬৭-১৯৩৬) আন্তর্জাতিক নাট্য ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য নাম। তবে ৪৪ টি নাটক লিখলেও সারা জীবনে ২৩২টি গল্প এবং ৭টি উপন্যাস ছাড়া কিছু প্রবন্ধও লিখেছেন। তবে তিনি বেশি পরিচিতি লাভ করেছেন তাঁর নাট্যরচনাতেই। তাঁর নাটক সম্পর্কে নাট্যতত্ত্ববিদরা বলেছেন, এইসব বুদ্ধিদীপ্ত নাটক সবার জন্যে নয়। ‘তিনি নাট্যরচনায় বাস্তব ও মায়া, বিবর্তিত ও বহুস্তরীয় মানবিক সম্পর্ক, শিল্প ও জীবনের বাস্তবতার এমন মিশেল ঘটিয়েছিলেন যে তাঁর লেখা মর্ডানিজম থেকে পোস্ট মডার্নিজমের দিকে এগিয়েছিল। তাঁর ব্যক্তিজীবনের আর্থিক সঙ্কট, স্ত্রীর মানসিক অসুস্থতা– তাঁর রচনাকে প্রভাবিত করেছে বারেবারেই। তাঁর জীবনকে বাদ দিয়ে শিল্পকে বিচার করা অসম্ভব’। (পিরানদেল্লোর মিথ – দেবেশ চট্টোপাধ্যায়)।

তাঁর লেখা ‘হেনরি ফোর’ নাট্য যাকে অবলম্বন করে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রূপান্তর করে নির্মাণ করেছিলেন ‘শের আফগান’, এতে এক দল চরিত্র নির্দিষ্ট একটি ঘটনায় আস্থা রেখে অভিনয় শুরু করে, আরেক দল যারা ওই অভিনয়ের মধ্যে নেই তারা ওই কাহিনি বিন্যাস থেকে বেরিয়ে প্রকৃত সত্য খোঁজার চেষ্টা করে এবং শেষ পর্যন্ত মিথকে মুছে দিয়ে বাস্তবের মুখোমুখি এনে দাঁড় করায় সবাইকে। সেই সবার মধ্যে দর্শকেরাও যুক্ত হয়ে যায় অতি অনায়াসেই। মুখ ও মুখোশের দ্বন্দ্বে বিচলিত হতে থাকে সবাই।
পিরানদেল্লো ইবসেনের গল্প বলার রীতিকে বর্জন না করে বরং তাঁর রীতিতে আস্থা রেখে এক্সপ্রেসনিজম ও সুর রিয়ালিজমের রাস্তা পেরিয়ে আবসার্ডিজমের দিকে হাত বাড়ান। নাটকের মধ্যে নাটকের উপস্থাপনা করে তিনি চরিত্রের বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতা আর আত্মগত কল্পনার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করেন। নাট্যকারের বড় সাফল্য হল একই সঙ্গে দর্শকের দুঃখের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একটু হাল্কা হাসির স্রোতে হারিয়ে যেতে দেওয়া এবং সেই সত্যের মুখোমুখি সবাইকে দাঁড় করিয়ে নতুন এক সত্যের অনুভবকে যেন প্রতিষ্ঠিত করতে চান তিনি। চরিত্ররা প্রথাগত সংলাপ আওড়াতে আওড়াতে মঞ্চে উপস্থিত হয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠেন। শের আফগান নাটকের মূল চরিত্রের মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে সকলের সঙ্গে দর্শকের মনেও সন্দেহ উঁকি দিতে থাকে। তারা বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব ও দোলাচলে সবাই দুলতে থাকে নাটকের দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরের মধ্যে।

দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের এই নাটকের এক পর্বে শের আফগান যখন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা ‘হৃদয়পুর’ আউড়ে যায়, তার সঙ্গে আমরা দর্শকেরাও একাত্ম হয়ে যাই। বুঝতে পারি এই নাটকের মুখ ও মুখোশের দ্বন্দ্ব কতখানি। সেই দ্বন্দ্বের কোনও অবসান হয়না বরং একটু একটু করে সত্যানুসন্ধানের এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নাটকটা এগোতে থাকে। দর্শকও যেন মনে মনে উচ্চারণ করে,
‘তখনো ছিল অন্ধকার তখনো ছিলো বেলা
হৃদয়পুরে জটিলতার চলিতেছিলো খেলা
ডুবিয়াছিল নদীর ধার আকাশে অধোলীন
সুষমাময়ী চন্দ্রমার নয়ান ক্ষমাহীন
কি কাজ তারে করিয়া পার যাহার ভ্রূকুটিতে
সতর্কিত বন্ধদ্বার প্রহরা চারিভিতে
কি কাজ তারে ডাকিয়া আর এখনো, এই বেলা
হৃদয়পুরে জটিলতার ফুরালে ছেলেখেলা’?
এই জটিলতার উন্মোচনেই পিরানদেল্লো থেকে অজিতেশ হয়ে আমরা দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের নাট্যনির্মাণে মজে থাকি। বুঝতে চাই ‘সত্য সে কঠিন’ এবং সেই কঠিনকেই ভালবাসার মন্ত্র।