চেনাশোনার কোন্ বাইরে-১৭ ॥ সুশীল সাহা



‘…পারি নাইবা পারি, নাহয় জিতি কিংবা হারি’



আমার বন্ধু সত্যেনের কথা খুব মনে পড়ে। তাঁকে চিনতাম সত্তরের সেই আগুনঝরানো দিনগুলোতেই। ওঁদের পরিবারের সকলেই যে যার নিজের ক্ষেত্রে সফল, কৃতবিদ্য। সত্যেন নিজেও কৃতি ছাত্র। তবু তাঁর চোখে ছিল সমাজ বদলের স্বপ্ন। তাই তরুণ বয়সেই জীবনের প্রতিষ্ঠাকে উপেক্ষা করে ও উগ্র রাজনীতির অঙ্গনে নেমে পড়েছিল। ষাট দশকের শেষদিকের সেই উত্তাল দিনগুলোয় কত না যুবক দিনবদলের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পথে নেমেছিল। অনেকের সঙ্গে সত্যেনও সেইসময়ে পথে নেমেছিল। ফলে অচিরেই তাঁকে কারাগারের অভ্যন্তরে নিভৃতবাসে যেতে হয়। সে এক অস্থির সময় পশ্চিমবঙ্গ তথা সমগ্র ভারতের। স্কুল কলেজের অসংখ্য মেধাবী ছাত্ররা আত্মত্যাগের এক মহানব্রতে নিজেদেরকে উৎসর্গ করেছে। সত্যেনও সেই কাতারে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। তারপর আরো অনেকের সঙ্গে তাঁকেও জেলে যেতে হয়। আপন সংকল্পে অনড় হয়ে সেই দুর্বহ জীবনকেও মেনে নিয়েছিল সে। জেল থেকে বেরিয়ে সে বিয়ে করে অপর এক সংগ্রামী নেত্রী মীনাক্ষীকে। তারপর কর্মব্যপদেশে চলে যায় সুদূর ত্রিপুরায়। দূরে চলে গেলেও ওঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল আমার। তখন দু’জনেই শিক্ষক হয়েছে। জন্ম হয়েছে ওঁদের একমাত্র সন্তান সম্ভবের। দু’জনেই তখন লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। পত্রিকা আর গ্রন্থপ্রকাশের মধ্যেই ওঁরা দু’জনে নিমগ্ন। প্রথম জীবনে অর্জিত বিশ্বাস থেকে সরে আসেনি বরং সেই বিশ্বাসকে শিরোধার্য করে এক নতুন জীবনের স্বপ্নে বিভোর ছিল ওঁরা। কিন্তু জীবন তো সবার সমান গতিতে এগোয় না। মাঝে মাঝেই এর তালভঙ্গ হয়। যেমনটা ঘটেছিল ওঁদের জীবনে। একদিন হঠাৎ ধরা পড়ল সত্যেনের ফুসফুসে ক্যান্সার। সেখান থেকেই এই ইতিবৃত্তের শুরু।

আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রথমেই বলে রাখা ভাল, এই লেখাটা খানিকটা আত্মপ্রচারের ঢংয়ে আমাকে লিখতে হবে। এতে যে ঘুরেফিরে আসবে আমারই এক উদ্যোগের কথা। সেই উদ্যোগের স্মৃতি আজও আমাকে তাড়া করে ফেরে। তবে উদ্যোগটা নিয়েছিলাম কোনও মহান ব্রতের লক্ষে নয়, বরং তাকে নিঃস্বার্থ এক বন্ধুকৃত্য বলাই শ্রেয় হবে। এইটুকু এই ছোট্ট জীবনে নানারকম উদ্যোগের মধ্যে যে সেটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ফলাফল যাই হোক না কেন, ইতিহাসের পাতায় এর নাইবা মিলুক ঠাঁই। তবু আমার মনের মণিকোঠায় এর জায়গা যে এক উচ্চাসনে। বন্ধু সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাঁচানোর জন্যে একুশ বছর আগে এক মহতী প্রচেষ্টায় মেতে উঠেছিলাম। তাঁর ফুসফুসের ক্যান্সার তখন এক আগ্রাসী রূপ নিয়েছে। তখন তাঁর জীবন মৃত্যুর এক সন্ধিক্ষণ। ওঁর জীবনসঙ্গী মীনাক্ষী দিশেহারা হয়ে আগরতলা-কলকাতা-মুম্বাই ছুটোছুটি করছে। ওঁদের একমাত্র সন্তান সম্ভব একেবারে ছোট। অসুস্থ শরীরে মীনাক্ষী প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে সত্যেনের পুনরুজ্জীবনে। তখন তাঁর চাই অর্থ, যা না হলে এখনকার এই আধুনিক জীবনে এক পাও এগোনো যায় না। সর্বস্ব দিয়ে মীনাক্ষী তখন সত্যেনকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।

বন্ধু হিসেবে আমারও যে কিছু করণীয় ছিল আমার। কিন্তু কী করব, কী করব। ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে সেই সময় মাথায় একটা পরিকল্পনা এসেছিল এবং সেটা আসামাত্র তাকে বাস্তবায়িত করতে উঠেপড়ে লেগেছিলাম। সত্যেনের চিকিৎসাকল্পে সাহায্যের আবেদনের একটা খসড়া তৈরি করলাম। ছোট্ট একটা বয়ান আর তার নীচে স্বাক্ষর করবেন কয়েকজন বড়মাপের মানুষ। এ ব্যাপারে আমার পাশে এসে দাঁড়াল ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকার সম্পাদক অনিল আচার্য। তিনি আমার পরিকল্পনাকে সর্বতোভাবে সমর্থন করেছিলেন। প্রথমেই গেলাম বালিগঞ্জ স্টেশন রোডে মহাশ্বেতা দেবীর বাড়িতে। তিনি সানন্দে তাঁর স্বাক্ষর দিলেন। আর দিলেন একটা পাঁচ হাজার টাকার চেক। বলাবাহুল্য যাঁরা চেক দিতে চান, তাঁরা সত্যেনের নামেই দেবেন এমন আবেদন করা হয়েছিল। এরপর গেলাম শঙ্খ ঘোষের কাছে। তিনিও একটা পাঁচ হাজার টাকার চেক দিলেন সই করার আগেই। তারপর দেবেশ রায় দিলেন দু’হাজার টাকার চেক। এরপর একে একে সই করলেন বাদল সরকার, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এবং তরুণ সান্যাল। বাংলা সাহিত্য অঙ্গনের বরেণ্য এই সাতজনের আশীর্বাদ মাথায় করে পূর্ণোদ্যমে কাজে নেমে পড়লাম। দুঃখের কথা এঁদের মধ্যে আজ আর কেউ জীবিত নেই।

সাতজন বিশিষ্ট মানুষের স্বাক্ষর সম্বলিত ওই আবেদন ছাপা হল কলকাতার তিনটে দৈনিক কাগজে। অনুষ্টুপের ঠিকানায় সত্যেনের নামে চেক ও নগদ টাকা আসা শুরু হল। যেমন যেমন পাচ্ছিলাম, তেমন তেমনই মীনাক্ষীকে পাঠিয়ে দিতে থাকলাম। প্রখ্যাত গণশিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায় বরানগর আর বসিরহাটে দুটো অনুষ্ঠান করে আমার হাতে এগারো হাজার টাকা তুলে দিলেন। সেই টাকাও যথাসময়ে পাঠিয়ে দিলাম মীনাক্ষীকে। অল্প ভাড়ায় শিশির মঞ্চ পেলাম একটা অনুষ্ঠান করার জন্যে। অনুষ্ঠানে বিনা পয়সায় গান গাইবেন অর্ঘ্য সেন এবং প্রতুল মুখোপাধ্যায়। আবৃত্তি করবেন প্রদীপ ঘোষ। শেষ মুহুর্তে বাংলাদেশের এক শিল্পী এসে যুক্ত হলেন ওই অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানের শুরুতে আমাদের সংগঠন ‘আনন্দধারা’র শিশুশিল্পীরা গান গাইল। সবই হল সুষ্ঠুভাবে কিন্তু খুব বেশি টাকা উঠল না ওই অনুষ্ঠান থেকে। তবু যা পেলাম, তাইই যথাস্থানে পাঠিয়ে দিলাম। অনুষ্ঠান করে যে বেশি টাকা অর্জন করা যায় না, সেই শিক্ষা হল আমার। আসলে সুভেনির করতে পারলে টাকা আসত, কিন্তু ততদিনে আমার প্রায় দম ফুরিয়ে এসেছে। তবু তখন তো আর
পিছিয়ে আসার উপায় নেই। একার চেষ্টায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা তুলতে পেরেছিলাম তখন। সেটাই বা কম কি।

প্রবল অসুখ আর মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে সত্যেন তখন নিত্যদিন কবিতা লিখে যাচ্ছে। সাক্ষাৎ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষার সেইসব দিনগুলোর কথাই উঠে এসেছিল কবিতায়, যা পরে অনুষ্টুপের একটা সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। কবিতাগুলো পড়লে বোঝা যাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও একজন জীবনবাদী কবি কেমন করে আসন্ন মৃত্যুকে বরণ করে নেবার শক্তি অর্জন করতে পারেন। কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে সেই শঙ্কা আর নির্ভয়া মৃত্যুকে স্বাগত জানাবার আনন্দ উদ্ভাস। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমি তখন ওই পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক। সত্যেনের ওই কবিতাগুলো আমিই একদিন সম্পাদক অনিল আচার্যর হাতে পৌঁছে দিয়েছিলাম।
কয়েক মাস ঘোরের মধ্যে কেটেছিল আমার। প্রিয় বন্ধুকে বাঁচানোর সে এক অসম প্রচেষ্টা ছিল আমাদের। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কর্তব্যভ্রষ্ট হতে পারিনি। সমবেত ভালবাসার যে অনেক জোর। তবে অনেক চেষ্টা করেও সত্যেনকে আমরা বাঁচাতে পারিনি। অল্প দিনের মধ্যেই তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে যায়। আমাদের সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে একদিন সে চলে যায় একেবারে না ফেরার দেশে। প্রবল একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে মেনে নিয়েছিলাম বন্ধুবিয়োগের সেই কষ্ট।
বাঁচাতে পারিনি, তবু তাঁকে বাঁচানোর জন্যে সামান্য কিছু করার চেষ্টা করেছিলাম, এই সান্ত্বনা আমার সারা জীবনের।