চেনাশোনার কোন বাইরে-১৯ ॥ সুশীল সাহা




বৃত্তাবদ্ধ জীবন ও বৃত্তের বাইরের কিছু ছকভাঙ্গা প্রাপ্তি


লেখালিখির প্রতি বরাবর আগ্রহ থাকলেও কোনওদিন লেখক হবার স্বপ্ন দেখি নি, বরং নিজেকে সাহিত্যের নেপথ্য কর্মী হিসেবে ভাবতে ভাল লাগত। খুলনায় অনীক সাহিত্য সংসদে হাতেখড়ি হলেও ওখানে নিয়মিত সাহিত্য বাসরের অধিক কিছু করা যায় নি। কেবল একবার ছাপার অক্ষরে ‘সূর্য সংক্রান্তি’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করতে পেরেছিলাম আমরা। কাজের সিংহভাগ বহন করলেও সম্পাদক হিসেবে নিজের নাম রাখি নি। মঞ্চের আলোকবৃত্তের বাইরে থাকারও একটা আলাদা মজা আছে। সেটা কিন্তু ওই বয়সেই কেমন করে যেন বুঝে গিয়েছিলাম। তবে আমার লেখলিখির চেষ্টা তারও আগে থেকে। যতদূর মনে পড়ে স্কুলের দেয়াল পত্রিকায় আমার প্রথম লেখা বেরিয়েছিল। ওই সেন্ট যোসেফস স্কুলেরই বার্ষিক পত্রিকায় আমার লেখা প্রথম মুদ্রিত হয়। তারপর ব্রজলাল কলেজ বার্ষিকীতে। খুলনার কিছু ছোট পত্রিকায় আমার গল্প কবিতা ছাপা হলেও সে সবই ছিল হাত মকসো করার ব্যাপার। সেইসব লেখা এখন দেখলে আমার নিজেরই প্রভূত সংকোচ হয়। সত্তরের ঝোড়ো হাওয়ায় জীবনের ছক বদলে গেল। ওই বছরের গোড়ার দিকেই আমাকে দেশান্তরী হতে হল। ঠাঁই হল উল্টোডাঙ্গায় ছোটমামার আশ্রয়ে। ওই ছোটমামারই সৌজন্যে পরিচিত হলাম ওখানকার ‘নবাহ’ সাহিত্য সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে। অনতিবিলম্বে ওই সংস্থার পত্রিকা ‘নবাহ’র সাতজন সম্পাদকমণ্ডলীর কনিষ্ঠতম সদস্য হয়ে গেলাম। সাতজনের মধ্যে আমি ছাড়া সকলেই চাকুরে। ফলে পত্রিকার খুঁটিনাটি অনেক কাজের দায়িত্ব আমার ঘাড়ে ন্যস্ত হল, বলা যায় সেধেই আমি ওগুলো গ্রহণ করলাম। সেই সময়েই প্রথম বুঝলাম ‘জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠে’র মর্মার্থ।

‘নবাহ’ পত্রিকার সুবাদে সম্পাদকীয় অনেক দায়দায়িত্ব আমাকে পালন করতে হত। যেমন লেখকদের কাছ থেকে লেখা নিয়ে আসা, প্রুফ দেখা, ডাকে আসা চিঠিপত্রের জবাব দেয়া, বিভিন্ন জায়গায় পত্রিকা পাঠানো ইত্যাদি। মাঝে মাঝে আমাদের ছোটবড় নানা বিষয়ে সাহিত্যসভা হত। সেগুলোর আয়োজনের নেপথ্য কাজগুলো করতাম। নবাহ পত্রিকাতে আমার গল্প কবিতা ছাপা হতে থাকে। সেইসময় টের পেয়েছিলাম পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকার সূত্রে অনেকে আমাকেই সম্পাদক ভেবে অনেক দূর দূরান্ত থেকে লেখা পাঠাত, লেখা চাইত। সেই সময়ে অনেক পত্রিকাতে লেখা পাঠিয়েছি। ছাপা হয়ে যখন সেগুলো ডাকে আসত, তখন কী আনন্দই না হত। কাগজের সম্পাদক হবার একটা আলাদা প্রপ্তি ছিল এই লেখা ছাপা হওয়া। তা সে যত খারাপ লেখাই হোক। বিনিময়ে তাদের লেখা ছাপানোর আবদার শুনতে হত। ওই সময়ে কীভাবে যেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার বেশ একটা নিবিড় যোগাযোগ হয়েছিল। তাঁর বরানগরের বাড়িতে মাঝে মাঝেই যেতাম। তখন তো তেমন ফোনের ব্যবহার ছিল না। তাই আগাম খবর না দিয়ে যখন তখন তাঁর বাড়িতে যেতাম। আশ্চর্যের ব্যাপার তাঁকে সব সময়েই বাড়িতে পেতাম। শুনেছিলাম তিনি কলকাতা পুরসভায় চাকরি করেন। কখন যে অফিসে যেতেন, জানি না। ‘নবাহ’ পত্রিকার তরফ থেকে তাঁর একটি লিখিত সাক্ষাৎকার নিই। তিনি লিখিত উত্তরই দিয়েছিলেন। কিন্তু মজাটা হল, আমার কোনও প্রশ্নেরই তিনি সরাসরি জবাব দেননি। আমি যা যা জিজ্ঞেস করেছি, তিনি তার উত্তরে তাঁর নিজস্ব কিছু কথা লিখে দিয়েছেন, যা আদৌ ওই প্রশ্নগুলোর ধারকাছ দিয়েও যায় নি। পুরো লেখাটাই ‘নবাহ’তে ছাপা হয়েছিল। শুনেছি পরে কোনও সংকলনে সেটা জায়গাও পেয়েছে। আজও ভেবে কুলকিনারা পাই না, সন্দীপনদা কেন অমনটা করেছিলেন। ওটা কি এক ধরনের উপেক্ষা? না, অতি আধুনিকতার একটা রীতি ছিল, জানি না।

‘নবাহ’ পত্রিকার জন্যে কবিতা আনতে সত্তরেই আমি শঙ্খ ঘোষের শ্যামবাজারের বাড়িতে প্রথম যাই। কবিতা আনতে ঢাকুরিয়ায় বীরেন চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম একদিন। ওঁর খুব কাছাকাছি থাকতেন ফণিভূষণ আচার্য। তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম। ওঁর সম্পাদিত ‘মহারাজ’ পত্রিকায় আমার একটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। বেলেঘাটায় অনিল আচার্যর বাড়িতেও মাঝে মাঝে যেতাম। ওই সময় অনুষ্টুপে আমার কবিতাও ছাপা হয়। নিয়মিতই যেতাম হিন্দুস্থান রোডের মণীন্দ্র গুপ্তর বাড়িতে। তাঁকে নিত্যনতুন কবিতা শোনাতাম। অসীম আগ্রহে সেগুলো তিনি শুনতেন এবং মতামত দিতেন। ওই বাড়িতেই দেবারতি মিত্রের সঙ্গে আলাপ হয়। তিনিও আমার ওইসব কবিতা শুনতেন। ওঁদের উৎসাহে আমার মনে একটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশের বাসনা জাগে। তখন কোনও একটা কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে কলেজ স্ট্রিটে অসীম বর্ধনের সঙ্গে দেখা করি। কথায় কথায় জানতে পারি তিনি খ্যাতনামা সাহিত্যিক অদ্রীশ বর্ধনের ভাই। বইয়ের নামও ঠিক করেছিলাম সেই সময়, ‘অন্তরীপে একক সংগীত’। শ’খানেক বিশ্রী কুশ্রী কিছু কবিতার সংকলন। অসীমবাবু আমার সঙ্গে যথেষ্ট ভদ্র ব্যবহার করেন। কিছুক্ষণ আলাপের পর বুঝতে পারি বই প্রকাশের সমস্ত ব্যয়ভার আমাকেই বহন করতে হবে। সেই সময়ে একেবারে নির্ভেজাল বেকার জীবন আমার। বলাবাহুল্য ভগ্ন ক্লান্ত হতোদ্যম হয়ে বাড়ি ফিরে আসি এবং বই প্রকাশের সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষা জলাঞ্জলি দিই। ’৭৩-এর শেষদিকে চাকরি পাই এবং কীভাবে যেন লেখালিখির জগৎ থেকে অনেকটাই সরে আসি। ইতঃমধ্যে নবাহ’র প্রকাশও বন্ধ হয়ে যায়।

চাকরি জীবনে ঢুকে লেখালিখির জগৎ থেকে সামিয়িকভাবে কিছুটা সরে এসেছিলাম ঠিকই। দশটা পাঁচটার শৃঙ্খল ছাড়াও সারা সপ্তাহ জুড়ে ট্রেনে যাতায়াতের ধকল ছিল। আর ছিল নাটক/সিনেমা দেখা, সঙ্গে নৃত্যনাট্য ও গানের অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করা। তবে লেখা কিন্তু একেবারে ছাড়ি নি। মনে আছে, ইতিহাস সংসদের এক অধিবেশনের জন্যে লিখেছিলাম ‘ঢাকার চিত্রময় রিক্সা’ নিয়ে একটি গবেষণা পত্র। লেখাটা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও লেখালিখির জগতে সেইভাবে ঢুকি নি তখনও। একবার সাহস করে ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেসের এক অধিবেশনে একটি পেপার পড়েছিলাম, তাও আবার ইংরেজিতে। এমন সাহস অবশ্য আর কখনও দেখাই নি। এরমধ্যে (সালটা ১৯৮০/৮১ হবে) কীভাবে যেন যোগাযোগ হয়ে গিয়েছিল ‘বিজ্ঞাপন পর্ব’ পত্রিকার রবিন ঘোষ এবং ওঁরই সূত্রে সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সত্তরের শেষদিকে নতুন করে শুরু হল পত্র পত্রিকার সঙ্গে সংযোগ। তখন বিজ্ঞাপন পর্ব পত্রিকার তিনজনের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন হলাম আমি। অন্য দু’জন রবিন ও সুমন্ত্র।

সম্পাদক রবিন নিজে। কাগজটা ওরই। আমার উপর ন্যস্ত হল ওই পত্রিকার হাসান আজিজুল হক সংখ্যা নির্মাণের কাজ। কাজটা তেমন সহজসাধ্য ছিল। একবার রাজশাহী গিয়ে এ ব্যাপারে হাসানভাইয়ের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি রাজি হলেন। একটি চিঠিতেও তাঁর সম্মতির কথা জানালেন আমাকে। লেখার জন্যে অনেকের সঙ্গে কথা বললাম। ওঁর বই দেয়া হল সবাইকে। লেখা দিলেন শিবনারায়ণ রায়, সব্যসাচী দেব, নিত্যপ্রিয় ঘোষ এবং বাসুদেব দাশগুপ্ত। হাসানভাইয়ের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিল রবিন ও সুমন্ত্র। ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় একটি লেখা দিয়েছিল। রবিন সেটা বাতিল করেছিল। সামান্য ছলছুঁতোয় আরো কয়েকটি লেখা বাতিল করেছিল ও। বিভিন্ন সময়ে আমাকে লেখা হাসানভাইয়ের ১৯টি চিঠি নিয়ে আমি একটা বড়ো লেখা তৈরি করলাম। শিরোনাম দিলাম ‘সেই সুরে বাজে মনে অকারণে’। হাসানভাইয়ের সংক্ষিপ্ত জীবনভাষ্য ও রচনাবলীর একটা রূপরেখা লিখে দিলেন কবি মোহাম্মদ কামাল। হাসানভাইয়ের কয়েকটি লেখার পুনর্মুদ্রণ হল। এবং ছাপা হল ওঁর একেবারে আনকোরা নতুন গল্প ‘পাব্লিক সার্ভেন্ট’। এই লেখার জন্যে অবশ্য আমাদের অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেটা আমাদের বেশ ভুগিয়েছিল।

সম্ভবত ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ ‘এক্ষণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পরে পশ্চিমবঙ্গে হাসান আজিজুল হকের ব্যাপক পরিচিতি ঘটে। ওই গল্প এখানকার বহু পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হয়। এরপর ওই ‘এক্ষণ’ পত্রিকাতেই ওঁর ‘জীবন ঘষে আগুন’ গল্পটা প্রকাশিত হয়। ’৭৫ সালে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের উদ্যোগে হাসানভাইয়ের একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় কলকাতায়। ওই বইতে শ্যামলদা একটি চমৎকার ভূমিকা লিখেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে তখন হাসানভাই রীতিমতো পরিচিত। ইতঃমধ্যে এখানে তাঁর অনেক গল্পই পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। আমরা চেয়েছিলাম ওঁর একটি নতুন গল্প থাকুক ওঁকে নিয়ে এই বিশেষ সংখ্যায়। তিনি নতুন গল্প দেবেন বলে কথাও দিয়েছিলেন। কিন্তু দিন, মাস যায়, নতুন গল্প আর আসে না। এদিকে আমাদের পত্রিকার কাজ প্রায় শেষ। পত্রিকাটা বের করার উদ্যোগ নেবার সময় থেকে অনেকগুলো দিন আমরা পেরিয়ে এসেছি। ওঁর গল্প আর আসে না। তাগিদের পর তাগিদ দিয়ে যাচ্ছি আমরা। অবশেষে সেটা এল একসময় এবং পত্রিকাও বেরিয়ে গেল। তারপরের সবটাই ইতিহাস। ওঁকে নিয়ে দুই বাংলাতে ওটাই ছিল প্রথম কাজ। পরম দুঃখের কথা, পত্রিকাও বেরোলো আর ‘বিজ্ঞাপন পর্ব’ পত্রিকার সঙ্গে আমার যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে গেল। সেটা ১৯৮৮ সাল। কোনও কিছুই তো আর এমনি এমনি ঘটে না, এই বিচ্ছেদেরও অনেক কারণ ছিল। এতদিন পরে ওইসব কারণের যাথার্থ্যতা নিয়ে ময়নাতদন্ত করে কোনও লাভ নেই।

আমি এবারে যোগ দিলাম ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকায়। এজন্যে অবশ্য আমার নিজের কোনও উদ্যোগ ছিল না। স্বয়ং সম্পাদক আমাকে প্রায় বাধ্য করেছিলেন। আমাদের অনেক কাজে যে সবসময় তেমন করে নিয়ন্ত্রণ থাকে না। শুরু হল ১৮ বছরের এক দীর্ঘ পরিক্রমা। এই পত্রিকার আমার একটি গালভরা পদমর্যাদা ছিল, ‘সম্পাদকীয় সহযোগী’। অবশ্য আমি একা নই, আমার সঙ্গে আরেকজন ছিলেন, অরুণ কর্মকার। অবশ্য আমি তাঁকে আঠারো বছর ধরেই পাই নি। আমাকে নানারকম কাজই করতে হত। অফিস পর্ব সেরে ওখানে যেতাম। অতীশ ও আশিস নামে দুই ভাই ছিল। আশিস অফিসে বসত আর অতীশের কাজ বাইরে, মূলত বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করত ও। কথাবার্তায় বড্ড চৌকস ছেলেটি। ওর দক্ষতার তারিফ করতে হয়। অবশ্য মাসমাইনে ছাড়া বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে একটা কমিশন পেত ও। আশিস সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছে। আমি ছিলাম নির্ভেজাল অনাহারী কর্মী। আমি বাংলাদেশের লেখাপত্রের ব্যাপারটা দেখতাম। বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশের অনেক লেখকের প্রথম লেখা আমার হাত দিয়েই অনুষ্টুপে ছাপা হয়েছে। এটা কোনও আত্মশ্লাঘার ব্যাপার নয়। পিতৃ-মাতৃভূমিকে প্রচণ্ড ভালবাসতাম, আজও বাসি। তাই এই কাজটার মধ্যে ছিল এক ধরনের আনন্দ ও তৃপ্তি। ‘অনুষ্টুপে’র খ্যাতি তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ঢাউস ঢাউস সংখ্যা বেরোত। বিজ্ঞাপনে ঠাসা। অথচ কোনও লেখককে সম্মান দক্ষিণা দেওয়া হত না। অনেকদিন পরে যখন আমি ওই পত্রিকার সঙ্গে আর যুক্ত নই, তখন সম্পাদক অনিল আচার্যকে প্রশ্ন করেছিলাম এ নিয়ে। তিনি বেশ জোর গলায় বলেছিলেন, ওই পত্রিকা তাঁর নাকি একার নয়, লেখক সম্পাদক সবার। তাই সবাই পরমানন্দে স্বতপ্রণোদিত হয়ে লেখা দেন। লেখকদের এই স্বেচ্ছাশ্রমই নাকি ওই পত্রিকার সম্পদ। তবে তাঁর এই আপ্তবাক্যে আমি সন্তুষ্ট না হয়ে আরো কতগুলো প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন ঠিকই, তবে সেদিন তাঁকে খুব কোণঠাসা মনে হয়েছিল। তাতে ওঁর অবশ্য কিছু এসে যায় নি।

ওদের প্রকাশনা থেকে অনেক বই বেরিয়েছিল তখন, এখনও নিশ্চয়ই বেরোয়। কিন্তু বেশিরভাগ লেখককেই রয়ালটি দেওয়া হত না। কতজন কতদিন কতভাবে যে আমাকে তাঁদের এই অভিযোগ জানিয়েছেন। কথাগুলো স্বত্বাধিকারী শ্রী আচার্যকে একাধিকবার বলেও কোনও কাজ হয় নি। নব্বইয়ের দশকে বুক সেলার্স গিল্ডের সঙ্গে শ্রী আচার্যর যোগসূত্র প্রবলভাবে ঘটে। তিন বছর তিনি গিল্ডের পাবলিক রিলেশন অফিসার আর তিন বছর সম্পাদক ছিলেন। সেই সময় তাঁর জীবন যাপনের চেহারা আমূল বদলে গিয়েছিল। ‘অনুষ্টুপে’র তখন রমরমা অবস্থা। ওই পত্রিকার বিশেষ দুটি নাট্য সংখ্যার দায়িত্বভার পেয়েছিলাম নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে। অনেক ভেবে নকশাল আন্দোলন ও ওই পত্রিকার তিরিশ বছরকে (১৯৯৬) মাথায় রেখে দুই বাংলার নাট্যচর্চার একটা সালতামামি করার পরিকল্পনা করলাম। সহযোগী হিসেবে নিলাম বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব কুন্তল মুখোপাধায়কে। না নিলেও কোনও ক্ষতি হত না। কেউ তো এইসব ঔদার্যের কথা মনে রাখে না। কি আর করা যাবে। কাজ করতে গেলে এমনতর কত না অভিজ্ঞতা হয়। সব মনে না রাখলেও চলে। যা হোক সংখ্যাটার জন্যে দুই বাংলার বহু মানুষের সহযোগিতা পেয়েছিলাম। লেখার সংখ্যা এত হয়ে গেল যে অনেক লেখাই রেখে দিতে হল। সেই লেখাগুলো নিয়ে পরের বছর বইমেলায় আরেকটি নাট্যসংখ্যা বেরিয়েছিল। যা হোক ’৯৬-এর বইমেলায় প্রথম সংখ্যা বেরোয়। খুব দ্রুত সেগুলো বিক্রিও হয়ে যায়। পরের সংখ্যাটি অবশ্য তেমন বিক্রি হয় নি। এই কাজটা করে আমার মনে প্রচুর আত্মবিশ্বাস জন্মে। এটা আমার জন্যে ছিল এক দারুণ অভিজ্ঞতা। ওই সূত্রে বহু গুণী মানুষের সঙ্গে ওই সময়ে যোগাযোগ হয়েছিল। সেই যোগাযোগ আজও আছে।

ততদিনে প্রেস লেখক ইত্যাদি ব্যাপারে অনেক কিছু অবহিত হয়ে গেছি। স্বাধীনভাবে কিছু একটা করতে মন চায়, কিন্তু কী করব ভেবে পাই না। তখন দেখেছি, এখনও দেখছি নিজের পয়সায় কবিতার বই বের করে কত মানুষ। কিন্তু আমি ওই যে একাত্তর সালে একটা ঠোক্কর খেয়েছিলাম তার পরে আর ওই পথে হাঁটি নি, কিন্তু মনে মনে পোষণ করতাম ছাপার অক্ষরে গোটা একটা বইয়ের। স্বপ্নটা অবশ্য সফল হয়েছিল গত শতাব্দীর একেবারে শেষদিকে। সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে স্বাধীনভাবে একটা পুস্তিকা নির্মাণের কথা বলতে হবে। বন্ধু দীপক ভট্টাচার্য তখন ‘থিয়েটার কনভয়’ নামে একটা ছোট্ট নাট্যদল চালাতেন। ওঁর সঙ্গে আমার সখ্য বহুদিনের। খোলামনের মানুষ দীপক, কির্লোস্কর কোম্পানিতে কাজ করতেন। ক্যামাক স্ট্রিটে অফিস, আমার অফিস খুব কাছের শেক্সপিয়র সরনিতে। তাই ওর সঙ্গে দেখা হত প্রায়ই। কখনও আমি যেতাম ওর অফিসে, আবার কখনও ও চলে আসত। নানা বিষয়ে আমাদের কথা হত। দীপকের নাটক তখন কলকাতার মঞ্চে হচ্ছে। খুব বেশি নয়, মাঝে মাঝে। ওর এক ভাই কাজল ওর দলেই অভিনয় করত। ছেলেটি আসলে ছিল একজন বাচিকশিল্পী। দাদাভাইয়ের সম্পর্ক ছিল খুবই গভীর। এই দীপকের দল একবার অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একাডেমি মঞ্চে অভিনয় করার সুযোগ পেল। সেটা ১৯৯৭ সাল। ওই দিনটাকে একটু বর্ণময় করে তোলার জন্যে ও চাইল বাংলাদেশের একটি দলকে এনে একটা বড় রকমের নাট্যোৎসব করবে। যথারীতি ও আমার শরণাপন্ন হল। আমি নানারকম যোগাযোগ করে যশোরের ‘বিবর্তন’ নামাঙ্কিত দলটিকে আনার ব্যবস্থা করলাম। যথসময়ে যশোর থেকে এক ঝাঁক তরুণ চলে এল। ওদের থাকার ব্যবস্থা করা হল দমদমের এক বিয়ে বাড়িতে। কলকাতায় প্রথম অভিনয় তাও আবার একাডেমি মঞ্চে। ভীষণ রকমের আবেগ আর উত্তেজনা তখন ওদের মধ্যে। দুপুর বেলার শো। ওদের নাটকের নাম ‘যুদ্ধ’ – একটি চমৎকার যুদ্ধবিরোধী নাটক। নাটকটি ওরা নির্মাণ করেছিল কিছুটা পথনাটকের আদলে। তবু মঞ্চে ওদের উপস্থাপনা খুবই উপভোগ্য হয়েছিল।

ওই নাটকের পরেই ছিল ‘থিয়েটার কনভয়ে’র নতুন নাটক ‘বাইরের দরজা’। এই নাটকটাও বেশ ভাল হয়েছিল। সন্ধ্যায় ওই একাডেমি মঞ্চেই ছিল বহুরূপীর নাটক ‘মিস্টার কাকাতুয়া’। বিবর্তন যশোরের ছেলেরা আর আমাদের কয়েকজন নাটকটা দেখল প্রাণভরে। বহুরূপী আমাদের বেশ কয়েকটা ফ্রি পাস দিয়েছিল। পরদিন রবিবার সকালে ছিল বাংলা একাডেমির সভাঘরে ‘এই সময়ের নাটক’ শীর্ষক সেমিনার। অংশ নিয়েছিলেন বিষ্ণু বসু, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, অশোক মুখোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র, মান্নান হীরা, প্রবীর গুহ, বিজয় ভট্টাচার্য ও লুৎফর রহমান। সঞ্চালক ছিলেন কুন্তল মুখোপাধ্যায়। এক টেবিলে এত গুণীজন, যা অনুষ্ঠানের সৌকর্য বাড়ানোর বদলে হয়ে গেল ‘অতি সন্নাসীতে গাজন নষ্ট’ গোছের কিছু একটা। কেউই তেমনভাবে বলার সুযোগ পেলেন না। এটা একটা অভিজ্ঞতাই বটে।

তবে যে স্মারকপত্রটি করেছিলাম সেটা ছিল বেশ অভিনব। সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ওটা করার একটা আনন্দও পেয়েছিলাম। একটা বিষয় মাথায় এসেছিল। ছোট দলের বড় নাটক, ছোট দলের ছোট নাটক, বড় দলের বড় নাটক, বড় দলের ছোট নাটক – এই চারটি শিরোনামে লিখলেন বেশ কয়েকজন। বিষ্ণুদার সস্নেহ প্রশ্রয় পেয়েছিলাম তখন। আজ ওঁর কথা খুব মনে পড়ে। এমন জ্ঞানী গুণী প্রাণখোলা সজ্জন মানুষের তো এখন খুবই অভাব। যেদিন সেমিনার হল, সেদিনই বিকেলে নন্দন চত্বরে বিবর্তন একটি সুন্দর নাটক (পাইচো চোরের কেচ্ছা) অভিনয় করেছিল, আর ছিল এ এল টি’র নাটক ‘যৈবতি কন্যা’। বেশ জমেছিল সেদিন। রাতের ডিনারে সবার জন্যে ব্যবস্থা ছিল প্যাকেট চিকেন বিরিয়ানী, যদিও ওই দিন মাইগ্রেনের কষ্ট আমাকে একেবারে বিকল করে দিয়েছিল। তবে সবার মিলনোৎসবে কোনও ঘাটতি পড়ে নি। যথাসময়ে বিবর্তনের ছেলেমেয়েরা ফিরে গেল দেশে আমাদের একরাশ আনন্দ উপহার দিয়ে।