চেনাশোনার কোন বাইরে-২১॥ সুশীল সাহা



বৃত্তাবদ্ধ জীবন ও বৃত্তের বাইয়ের কিছু ছকভাঙ্গা প্রাপ্তি-৩


এরমধ্যে হাসান আজিজুল হকের ছোট উপন্যাস ‘বিধবাদের কথা’ একটু অন্যরকম আঙ্গিকে প্রকাশ করি। প্রকাশন সংন্থার নাম ‘ডানা’। প্রকাশকের নাম সোমনাথ। শারীরিকভাবে খুবই বিধ্বস্ত সোমনাথের চোখে ছিল অনেক স্বপ্ন। বেনিয়াটোলা লেনে ছোট্ট একটা অফিসও করেছিল। ‘সময় তোমাকে’ নামে একটি খুব উচ্চমানের পত্রিকা প্রকাশ করত। পত্রিকাটির মিথ সংখ্যাটি সত্যিই সংগ্রহে রাখার মতো। ‘ডানা’ প্রকাশনা থেকে সোমনাথ বেশ কয়েকটা বই প্রকাশ করে। সেই তালিকায় যুক্ত হল হাসানভাইয়ের এই বইটা। সেটা ২০১০ সাল। বইটির নাম ‘পাঠে আন্তর্পাঠে বিধবাদের কথা’। পাঠ অংশে মূল উপন্যাস আর অন্তর্পাঠ অংশে ওই উপন্যাস সম্পর্কে চারজনের চারটি প্রবন্ধ। তাঁরা হলেন অশ্রুকুমার সিকদার, পৃথ্বীশ সাহা, ইমতিয়ার শামীম ও মধুবন্তী সোম। মধুবন্তীকে যুগ্ম সম্পাদক করতে বাধ্য হয়েছিলাম। চলার পথে কত না আপোষ আমাদের করতে হয়। অবশ্য কয়েক বছর বাদে ওই বই নতুন কলেরবে দে’জ থেকে বেরোয় আমার একার সম্পাদনায়। মধুবন্তীর লেখাটা বাদ দিয়ে এই বইয়ে আলাদাভাবে প্রবন্ধ লেখক হিসেবে পাই দেবেশ রায় ও সাধন চট্টোপাধ্যায়কে। অনেক অপেক্ষার পরে এই বই বেরোয় ২০১৯-এর সেপ্টেম্বরে।

২০০৭ সালে আমি আমার কর্মজীবন থেকে অবসর নিই। ২০০৯ সাল থেকে একটু অন্যরকমের ব্যস্ত কর্মজীবন শুরু হয় আমার। আগের বছর থেকে মারুফের সঙ্গে কাজ করছি। নয় সালেই যোগ দিই ঢাকার কালি ও কলম পত্রিকায়। প্রায় একসঙ্গেই যোগ দিই শিয়ালদহের আদর্শ বিদ্যামন্দির স্কুলের খণ্ডকালীন গ্রন্থাগারিকের কাজে। এরমধ্যে মারুফ রিভিউ প্রিভিউ পত্রিকা অন্তত দু’বছর নিয়মিত বার করবে বলে ঘোষণা করে এবং আমাকে নতুন করে দায়িত্বভার নিতে বলে। নব পর্যায়ের ওই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা বেরোয় ২০১১’র গোড়ার দিকে। ছোট্ট পকেট বইয়ের আকার, অথচ ভিতরে ঠাসা নানারকম লেখা। খুব তাড়াতাড়িই পত্রিকাটি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পত্রিকার কাজ করতে করতে অভিযানের দু’তিনটে বইয়ের কাজ করে দিয়েছিলাম। ওখান থেকে পরপর বেরোয় ‘আমার মা’, ‘আমার বাবা’ ও ‘আমার শিক্ষক’ – এই শিরোনামে তিনটে বই, যাতে আমার প্রত্যক্ষ যোগ ছিল। বইগুলো কিন্তু ভাল বিক্রি হয়েছিল।

ইতঃমধ্যে বাংলাদেশের সিনেমার কাজটা নিয়ে অনেকদূর এগিয়েছি। বলতে দ্বিধা নেই, এই কাজে মারুফ আমাকে খুবই স্বাধীনতা দিয়েছিল। বাংলাদেশে গিয়ে প্রচুর সিনেমা সংক্রান্ত বইপত্র সংগ্রহ করি। ঠিক করলাম বইটা করব বাংলাদেশের মূলধারার সিনেমার বাইরের কাজকর্ম নিয়ে। কেননা ওখানকার মূলধারার সিনেমা নিয়ে জোরগলায় কিছু বলা যায় না। ওইসব ছবি একেবারে বাণিজ্যিক ধারায় নির্মিত। ও নিয়ে বেশি কিছু বলার নেই। বরং মূলধারার বাইরের ছবি নিয়েই কাজটা করব ঠিক করলাম। শুরু করলাম ১৯৫৫ সালে বাংলাদেশের প্রথম ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে। অনুসন্ধান করতে করতে একেবারে সাম্প্রতিককালে নির্মিত অন্যধারার ছবির প্রসঙ্গে চলে এলাম। ১৯৭০ সালের মার্চ মাস অব্দি বাংলাদেশে ছিলাম। অল্প বয়সে যা হয়, একেবারে সিনেমার পোকা ছিলাম। লুকিয়ে চুরিয়ে সিনেমা দেখা ছাড়া বাজারচালু পত্র পত্রিকা পড়তাম খুব। সিনেমার পাতাগুলো প্রায় মুখস্ত ছিল তখন। ফলে বাংলাদেশের সিনেমার হয়ে ওঠার অনেককিছুরই প্রায় প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম। তাই গোটা কাজটার মুখবন্ধ অংশটুকু আমার কাছে ছিল জলের মতো সোজা ও সরল। সত্তর পরবর্তী সময়টুকু নিয়ে প্রচুর পড়াশুনো করতে হয়েছে। ক্রমশ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা তৈরি হয়ে যায় মনে। এ নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা করতে হয়েছিল তখন। নানা সূত্র থেকে অনেক লেখা সংগ্রহ করেছিলাম। অনেকেই নতুন লেখা দিয়েছিলেন। ইতঃমধ্যে টের পেলাম কাজটা সুসম্পূর্ণ করতে হলে বেশ কয়েকটা খণ্ড করতে হবে। অনেক ঝাড়াই বাছাই করে শেষ পর্যন্ত ছ’টি খণ্ডে একত্রে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হল। প্রথম খণ্ডটি উৎসর্গ করলাম বাংলাদেশের নবীন প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের। বাকি পাঁচটি বই ওই দেশের পাঁচজন বরেণ্য চলচ্চিত্রকারকে উৎসর্গ করে ধন্য হলাম।। এঁরা হলেন জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, বেবি ইসলাম, আলমগীর কবির ও তারেক মাসুদ। এঁরা সকলেই প্রয়াত। এইভাবে আমি আমার স্বদেশভূমির কয়েকজন গুণী মানুষের পরোক্ষ ঋণ শোধ করার চেষ্টা করলাম। যথাসময়ে বই বেরোলো। বেশ ঢাউস আকার। একটা সুন্দর ‘গিফট প্যাক’ করা হয়েছিল যাঁরা সব খণ্ডগুলো একসঙ্গে কিনবেন, তাঁদের জন্যে। বেশ জাঁকজমক করে গোর্কি সদনে বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানও হল। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে এসেছিলেন দেবেশ রায়, বাংলদেশের তানভীর মোকাম্মেল ও মোরশেদুল ইসলাম। বই বেশ ভাল বিক্রি হল।

এই ধরনের কাজের ব্যাপারে খুব উৎসাহ বোধ করতে করতে আরেকটি বিষয়ে মনোনিবেশ করি তখন। আসলে দেশভাগের যন্ত্রণা আমাকে সবসময় বিদ্ধ করত। ওই বিষয় নিয়ে যখন ভাবছি তখন আমার হাতে আসে একটি সংকলন গ্রন্থ ‘ছেড়ে আসা গ্রাম’। দেশভাগের অব্যবহিত পরে ‘অমৃত’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে স্মৃতিকাতর কিছু মানুষের এইসব লেখা। সেই সময়ের প্রেক্ষিতে লেখাগুলো সত্যি সত্যি মর্মস্পর্শী, কিন্তু পঞ্চাশ বছর পরে দেখা যাচ্ছে ওইসব লেখার প্রাসঙ্গিকতা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তাই ঠিক করলাম ওই বইয়ের আদলে আরেকটি বই করব। মারুফের সমর্থন পেতেই কাজটা শুরু করে দিই। বইয়ের নাম ‘ছেড়ে আসা মাটি’। অনেকেই লেখা দিলেন। কিছু লেখা পুনর্মুদ্রণ করলাম। বইটা উৎসর্গ করলাম আমার শিক্ষাগুরু মুহম্মদ কায়কোবাদ ও গুরুপত্নী মুক্তি মজুমদারকে। উৎসর্গ পত্রে লিখেছিলাম রবীন্দ্রগানের একটি লাইন, ‘তোমারি ইচ্ছা করো হে পূর্ণ আমার জীবনমাঝে’। বইটা ওঁদের হাতে যথাসময়ে পৌঁছে দিলাম। এই বই প্রকাশের কিছুদিন পরে আমি অভিযান–এর কাজকর্ম থেকে সরে আসি। এই ছেড়ে আসা বা নতুন কাজে যোগ দেবার ব্যাপারে কিছু বাধ্যবাধকতা কাজ করে সবসময়। তাই তিক্ততা না বাড়িয়ে যাকে বলে ‘সুইট সেপারেশন’ তাতে আমি সব সময় বিশ্বাস করি। তবে আমি চাইলেই তো আর সব সম্পর্ক মধুর থাকে না সব সময়।

এরমধ্যে একদিন আমার পরম শুভানুধ্যায়ী সাধন চট্টোপাধ্যায় জানান গাঙচিল প্রকাশনার অধীর বিশ্বাস দেখা করতে চান। অধীরবাবু তখন ‘বর্ডার’ নিয়ে কাজ করছেন। আমার কথা ওঁকে সাধনদাই বলেন। যা হোক, একদিন ঠিকই ওঁর সঙ্গে দেখা করি। ওঁকে আমি অনেক আগে থেকেই চিনতাম। কাজটা তিনি ভাল করেন ঠিকই। কিন্তু মানুষটা সম্পর্কে তেমন কোনও আকর্ষণ বোধ করি নি। দেখা হবার পরেও আমার ধারণা খুব একটা বদলালো না। তবু ভাবলাম কাজটাই তো আসল, মানুষ নিয়ে ভেবে কী কাজ। অন্য সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে কাজটা নিয়ে ভাবতে থাকলাম। বলা যায় বইয়ের সিংহভাগ কাজই আমি করলাম, অথচ সম্পাদক হিসেবে অধীরবাবুর নাম ছাপা হল, আমি সহকারী। মন কিছুটা দমে গেলেও ততদিনে আমি ওই প্রতিষ্ঠানের জন্যে আরেকটি কাজের ভার নিয়ে ফেলেছি। ‘দেশভাগের গল্প– বাংলাদেশ’। এই ধরনের কাজ এই বাংলায় আগে কখনও হয় নি। কাজটায় কিছুটা চ্যালেঞ্জও ছিল। তবে এটা যে আমার সম্পাদনায় হবে সে কথা আগেভাগেই অধীরবাবুকে বলে নিলাম। জানি কোনও সম্মান দক্ষিণা পাব না, তবু জন্মভূমির প্রতি প্রবল কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই কাজটা করতে আত্মপ্রণোদনা জাগে ভিতর থেকে। প্রচুর বইপত্র ঘেঁটে একটা পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করি অতি অল্প সময়ের মধ্যেই। সহকারী হিসেবে পাই ভ্রাতৃপ্রতিম শৌভিক মুখোপাধায়কে। ও খুব ভাল সহায়তা দেয় আমাকে। বেশ কিছু নতুন গল্প পাই। নির্বাচিত গল্পের সংখ্যা অনেক বেশি হবার জন্যে কিছু গল্প বাদ দিতেই হয়। যা হোক শেষ পর্যন্ত বইটা বেরোয় বেশ শোভনসুন্দর রূপ নিয়ে। এই বইটা উৎসর্গ করি দেশভাগের শিকার ভাঙ্গাচোরা মানুষদের। অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি থাকা সত্বেও বইটা কিন্তু যথেষ্ট সমাদর পায়। সম্পাদক হিসেবে আমার তখন আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে।

রিভিউ প্রিভিউ পত্রিকার সুবাদে অনেক মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে হয়েছিল একসময়। ওগুলো থেকে বাছাই করে একটা সংকলন করার কথা বাংলাদেশের নিশাত জাহান রানাকে বলি। ও রাজি হতেই সেগুলো সাজিয়ে দিই এবং বইটা ২০১৭ সালের বইমেলায় বেরোয়। এই বইয়ে দুই বাংলার কয়েকজন বরেণ্য মানুষ ছাড়া তিনজন বিদেশি, যাঁরা প্রাচ্যবিদ্যায় যথেষ্ট আগ্রহী, তাঁরা ছিলেন। বইটি পাঠক সমাদৃত হয়। এই বই উৎসর্গ করি মারুফকে। রবীন্দ্রগানেরই একটি লাইন লিখেছিলাম, ‘মনে রবে কিনা রবে আমারে’। বইটা ওর হাতে যথাসময়ে দিলেও কোনও চিত্তবিকার চোখে পড়ে নি আমার।

বই সম্পাদনার পাশাপাশি পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা সম্পাদনার কাজ করেছি অনেক। মনে আছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের চল্লিশ (২০১১) বর্ষপূর্তিতে ‘নীললোহিত” পত্রিকার একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র তৈরি করার দায়িত্ব পাই এবং মনপ্রাণ ঢেলে কাজটা করি। বাংলাদেশের অনেকের লেখা দিয়ে ওটা সাজাই, এখনকার অনেকে অবশ্য লিখেছিলেন। ২০১২’র বইমেলায় ওটা বেরিয়েছিল। কাজটা করে খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম লেখাগুলো নিয়ে একটা বই করার প্রস্তাব হয়ত দেবেন কোনও প্রকাশক। না, সেই আশা আমার পূরণ হয় নি। এই কাজে বাংলাদেশের অনেক মানুষের সাহায্য পেয়েছিলাম। এটা আমার পরম সৌভাগ্য। ইহজীবনে মানুষের ভালবাসা পাওয়াও এক দুর্লভ ব্যাপার।

বছর কয়েক আগে জয়ন্ত মালাকার নাকে একজন উঠতি প্রকাশকের পাল্লায় পড়ে একটি পত্রিকার দায়িত্ব নিতে প্রায় বাধ্য হয়েছিলাম। ও তখন ‘চারুপাঠ’ নামে একটি প্রকাশন সংস্থা খুলেছে। কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে অফিস নিয়েছে। কয়েকটা বইও প্রকাশ করে ফেলেছে ইতমধ্যে। ও আমাকে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদনা করার অনুরোধ জানায়। বইপত্রর কাজ করা তো আমার এক দুর্বলতম জায়গা। তাই অগ্রপশ্চাৎ কিছু না ভেবেই কাজটা গ্রহণ করি। তাছাড়া কাউকে কখনও অবিশ্বাস করতে শিখি নি। তাই হয়ত জীবনে অনেক ঠকেওছি। যথাসময়ে পত্রিকার প্রথম সংখ্যা বেরোলো। সেটা ছিল পয়লা বৈশাখ ১৪২২ বঙ্গাব্দ। ‘ধারাভাষ্য’ পত্রিকার নাম। জয়ন্তর ইচ্ছে ছিল পঞ্চাশ দশকের ‘টুকরো কথা’র আদলে পত্রিকাটি নির্মাণ করা। তাঁর কথা কিছুটা রাখলাম। চমৎকার একটি প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন শিল্পীবন্ধু শ্যামলবরণ সাহা। ধারাভাষ্য শিরোনামে একটি কবিতা লিখে দিয়েছিলেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত । পত্রিকা বেশ ভাল হয়েছিল। কিন্তু ওই সোৎসাহে দ্বিতীয় সংখ্যার প্রস্তুতি নেয়াই সার হল। কলেজ স্ট্রিটের পাট চুকিয়ে জয়ন্ত একদিন কোথায় হাওয়া হয়ে মিলিয়ে গেল। অজ্ঞাতবাসে চলে যাবার আগে আমার পরিচিত অনেকের বেশ কিছু টাকা পয়সাও আত্মসাৎ করার অভিযোগ ওর বিরুদ্ধে রয়েছে। অনেকের বই করে দেবে বলে এই চাতুরী কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় নতুন কিছু নয়। কষ্ট পেলেও মেনে নিয়েছি, নিতে হয়েছে।

ইতমধ্যে দুটি সম্মাননীয় প্রস্তাব আসে। একটি হল, ‘বাঘের বাচ্চা’ পত্রিকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা এবং অন্যটি ‘এবং অন্যকথা’ পত্রিকার দেশভাগ সংখ্যা সম্পাদনা করা। দুটি কাজই করেছিলাম যথাসাধ্য সামর্থ্য দিয়ে। অবশ্য এজন্যে প্রচুর সহযোগিতা পেয়েছিলাম দুটি পত্রিকার সম্পাদকদের কাছ থেকে। ‘বাঘের বাচ্চা’র সম্পাদক স্বপনরঞ্জন হালদার একজন সত্যিকারের বহুমাত্রিক মানুষ। স্কুলের কাজ থেকে অবসর নিয়ে ঠিক করেন বছরে একটা করে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করবেন। কলকাতা থেকে অনেকদূরে গাঁড়াপোতা নামের একটি জায়গায় ওঁর বাড়ি। সেলিব্রিটি আলোকবৃত্ত থেকে অনেক দূরে ও থাকে। একটা নাটকের দল চালায়। একমাত্র পুত্র সুপ্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে ‘এবং অন্যকথা’র সম্পাদকদ্বয় বিশ্বজিৎ ঘোষ ও জলধি হালদার আমার অনেকদিনের বন্ধু। দুজনেই থাকে বনগাঁতে। কলকাতার সাহিত্যমহল থেকে অনেক দূরে ওঁদের অবস্থান। মহানগরের ঝাঁ চকচকে বৃত্তের বাইরে থেকেও যে অনেক ভাল কাজ করা যায়, তার প্রমাণ ওঁদের কাজ। ইতমধ্যেই ওঁরা অনেকগুলো সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এই ঢাউস সংখাটি নির্মাণ করে আমি খুবই আনন্দ পাই এবং নিজের কাজ সম্পর্কেও যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস জন্মায় মনে।

ইতঃমধ্যে আনন্দ পাবলিশার্সের একট বড় কাজের বরাত পাই। ‘হাসান আজিজুল হকের ৫০টি গল্প’ বইয়ের সম্পাদনার কাজ। মনপ্রাণ ঢেলে কাজটা সম্পূর্ণ করি। বইটা বেরোয় ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে। এই বইটিও যথেষ্ট সমাদর পায়। আনন্দ থেকে আমার সম্পাদনায় আরেকটি বই বেরোয়। সেটি হল ‘সেলিনা হোসেনের প্রবন্ধ সংগ্রহ’। এই বইটার জন্যে আমাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। সেলিনাদি গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতিমান। তিনি প্রচুর প্রবন্ধও লিখেছেন। সেগুলো থেকে বাছাই করে একটি পাণ্ডুলিপি নির্মাণ করি। লিখি একটা বড় ভূমিকাও। এ ছাড়া অনেক খেটে এই বইয়ের একটা ইনডেক্স তৈরি করি। বইটা প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে।

২০১৯ সালে আমার সম্পাদনায় বেশ কয়েকটি বই বেরোয়। খড়ি প্রকাশনী থেকে ‘দেশের বাড়ি’। এই বইটা অনেকটা আমার অন্য একটা বই ‘ছেড়ে আসা মাটি’র আদলে তৈরি। অনেক মিল যেমন আছে তেমনি অমিলও কম নয়। এই বই উৎসর্গ করি ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধু অংকুরকে। ধানসিড়ি থেকে বেরোয় ‘রক্তে রেখে গেছে ভাষা’ প্রথম খণ্ড। এই বই মূলত ভাষা আন্দোলনের গল্প সংকলন। প্রথম খণ্ডে ছিল অসম ও বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ভিত্তিক কিছু নির্বাচিত গল্প। পরের খণ্ডে থাকবে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের লেখকদের নির্বাচিত গল্প । এরপর বেরোয় বাংলাদেশের ‘যুক্ত’ প্রকাশনা থেকে ‘আমার বাংলাদেশ’। এই বই নির্মাণের একটি নেপথ্য কাহিনি আছে। বন্ধু লেখক প্রয়াত রবিশঙ্কর বলের অনুরোধে ‘সুখবর’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লিখতে শুরু করি বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার কিছু অনুভূতির কথা। বেশ কয়েকটা অংশ বেরোবার পরে অজানিত এক কারণে ওটার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। তখন ওই বিষয়ে লেখার জন্যে ভিতর থেকে প্রভূত তাড়ণা বোধ করি। লিখেও ফেলি অনেকটা। এরপর ওই বই প্রকাশের ব্যাপারে যুক্তর কর্ণধার নিশাত জাহান রানার শরণাপন্ন হই। ও সানন্দে ছাপতে রাজি হয়। অবশেষে বইটা বেরোয় ওই ২০১৯ সালের বইমেলায়। এই বই উৎসর্গ করি প্রিয় বন্ধু আমেরিকার হিউস্টন প্রবাসী বাসুদেব মল্লিককে।

একই বছরে ‘সোপান থেকে বেরোয় আমার সম্পাদিত ‘দুই বাংলার দেশভাগের আখ্যান’। এই বইয়ের অন্যতম সেরা আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায় দেবেশ রায়ের দাদা দীনেশচন্দ্র রায়ের একটি গল্প এবং বাংলাদেশের কয়েকটি গল্প। এই বই উৎসর্গ করি আমার বাল্যবন্ধু আনোয়ার ও স্বপন নামের এক ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধুকে। এই বই পাঠকেরা সানন্দে গ্রহণ করেছেন। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ‘দিয়া’ প্রকাশনা থেকে আমার সম্পাদনায় বেরোয় ‘আখ্যানের চলচ্চিত্রায়ন’। মূলত সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের নির্বাচিত এক খতিয়ান। এতে মূলত লেখে অল্পবয়েসী আমার কয়েকজন পছন্দের লেখক। এই বইটা নির্মাণ করেও আমি বেশ তৃপ্তি অনুভব করি। এই বই উৎসর্গ করি অতি কাছের দু’জন মানুষ, নিশাত জাহান রানা ও নীহারুল ইসলামকে।

দেশভাগ নিয়ে কাজ করতে করতে ওই বিষয় সম্পর্কে এক ধরনের কৌতুহল ও আগ্রহ মনের মধ্যে কাজ করতে থাকে অবিরত। এমন সময় ‘সোপান’-এর প্রকাশক জয়জিৎ মুখোপাধায় অনুরোধ করেন দেশভাগের সিনেমা নিয়ে একটা বই করার জন্যে। বিষয়টা আমার মনে ধরে। কিছুদিন ধরে কেবল ভাবতে থাকি, ভাবতেই থাকি। অবশেষে অন্তর্জালে নির্ভর করে বেশ কিছু দেশভাগের সিনেমা ডাউনলোড করে একটা একটা করে দেখতে থাকি। ক্রমে বিষয়টার গভীরে পৌঁছাবার একটা প্রয়াস পাই। ঠিক করি ভারত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে নির্মিত দেশভাগের সিনেমা নিয়েই এই বইটা করব। কেননা সারা পৃথিবীর ছবি নিয়ে কাজ করতে গেলে হিমসিম খাব। বই প্রকাশ করতে হবে কয়েক খণ্ডে। তার চেয়ে আপাতত বইটা করি এই উপমহাদেশে নির্মিত ছবিগুলো নিয়ে। তারপর সুযোগ পেলে অন্য দেশের ছবি নিয়ে কাজ করব। বলাবাহুল্য এবারেও লেখকদের সানন্দ সাড়া পেলাম। অনেকেই লেখা দিলেন। অনেক নতুনদের লিখবার জন্যে সুযোগ দিলাম।

কাজ অনেকটাই করে রেখেছিলাম। অতিদ্রুত পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করে প্রকাশককে দিয়ে রাখলাম। কিন্তু ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার কারণে বইপ্রকাশে অনেকটাই বিলম্ব হল। অবশেষে ২০২০’র বইমেলায় প্রকাশিত হল বইটা। গোর্কি সদনে বেশ ঘটা করে এর মোড়ক উন্মোচন হল। বিপুল সাড়াও পেলাম। বইটা উৎসর্গ করেছিলাম বন্ধু তানভীর মোকাম্মেলকে।

২০২০ সালের গোড়ার দিকে করোনা পর্ব শুরু হলে একটা নতুন ধরনের কাজে হাত দিয়েছিলাম। এই প্রথম রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে কিছু একটা করার প্রবল ইচ্ছে জাগল মনে। যেমন ভাবা, লিখতে শুরু করলাম। দু’একটি আগের লেখা নতুন করে লিখলাম। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে আমার কৌতুহলের শেষ নেই। কারণে অকারণে ‘গীতবিতানে’ চোখ বোলানো আমার দীর্ঘকালের অভ্যাস। সেই চোখ বোলাতে বোলাতে নানা প্রশ্ন জেগেছে মনে। সেগুলোকেই নিয়েই নতুন করে ভাবতে ভাবতে কয়েকটা ছোট ছোট নিবন্ধ লিখে ফেললাম। দেখতে দেখতে তা যখন আট/ন’টা হয়ে গেল, তখন ভাবলাম এগুলো আদৌ কিছু হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে শ্রদ্ধেয় সুধীর চক্রবর্তীর পরামর্শ নিই। তখন পূর্ণ লক-ডাউন চলছে। অগত্যা শরণ নিলাম আরেক কৃষ্ণনগরবাসী ডাক্তারবন্ধু অনির্বাণ জানার। তাঁকে সব লেখাগুলো মেলে পাঠালাম, সঙ্গে সুধীরদাকে লেখা একটি চিঠি। সবকিছুর প্রিন্ট-আউট করিয়ে অতিদ্রুত সে সুধীরদার কাছে পৌঁছে দিল। বলাবাহুল্য ওঁর মতামত জানা আমার পক্ষে খুব জরুরি ছিল। সুখের কথা, অতি শীঘ্রই তাঁর সদর্থক মতামত পেলাম। এবার তাঁকে ভয়ে ভয়ে বইটার একটা ভূমিকা লিখে দেবার অনুরোধ করলাম। পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার যে, সেটাও একসময় এসে গেল। এবার গ্রন্থ প্রকাশের জন্যে আমার অনেক কাজের কাজি ঢাকার নিশাত জাহান রানাকে অনুরোধ করলাম। তাঁরও হ্যাঁ সূচক অভিমত এসে গেল। অতঃপর এই বছরের (২০২১) বইমেলায় সেই বই (গানের সুরের আসনখানি) প্রকাশিত হয়ে গেল। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার যে সেই বই সুধীরদার হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ পেলাম না। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন চিরতরে।

বছর চারেক আগে ‘দিয়া’ প্রকাশনীর কর্ণধার অধ্যাপক দীপঙ্কর মল্লিক আমাদের বাড়িতে আসে। হৃদয়পুরেই থাকে। ওঁর প্রকাশনা থেকে আমার প্রথম কাজ এর একটি সংখ্যার সম্পাদনা। মহাশ্বেতা দেবীর মৃত্যুর পরে দিয়া প্রকাশনা থেকে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। সংখ্যাটি আমিই সম্পাদনা করি, যা অনতিকালের মধ্যেই পুনর্মুদ্রণ করতে হয়। সংখ্যাটি অবশ্য পরিবর্ধিত আকারে প্রকাশিত হয়। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর মৃত্যুর পরে ওঁকে নিয়েও ‘দিয়া’র একটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেটিও আমি সম্পাদনা করি। এছাড়া ওদেরই ‘তবু একলব্য’ নামের একটি সংখ্যা যা বাংলাদেশের কথা সাহিত্য নিয়ে বিশেষ আলোকপাত করে, সেটিও আমি সম্পাদনা করে দি। ‘দিয়া’ প্রকাশনী থেকে এখন পর্যন্ত আমার সম্পাদনায় তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমটির নাম ‘আখ্যানের চলচ্চিত্রায়ণ’। সাহিত্য থেকে নির্মিত চলচ্চিত্রের এক নিবিড় সালাতামামি। এমন বই সম্ভবত বাংলা ভাষায় এই প্রথম। এর পরে ওই প্রকাশনী থেকে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘ধুলোয় মলিন এক বিবর্ণ ক্যানভাস’ নামে নির্বাচিত দেশভাগের সাহিত্য নিয়ে আলোচনার বই। অনেকের মূল্যবান লেখা নিয়ে বইটি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই বই উৎসর্গ করি দুই বন্ধু কাবেরী বসু ও কৌশিক জোয়ারদারকে। এই প্রকাশনা থেকে আমার আপাতত সর্বশেষ বইয়ের নাম ‘পুব আকাশের রঙধনু’– এই মূলত বাংলাদেশের সাহিত্যের এক নিবিড় অবলোকন। উৎসর্গ করি বন্ধু ওয়াসি আহমেদকে। ‘দিয়া’ থেকে অচিরেই আরো কয়েকটি বই বেরোবে। বেশ কয়েকটি সংখ্যাও সম্পাদনা করতে হবে। তবে যা এখনও পৃথিবীর আলো দেখে নি, তা নিয়ে আলোচনা বাতুলতা। তাই ওই প্রসঙ্গে আর না গিয়ে এই সাতকাহনের ইতি টানি।

সেই কবে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সাহিত্যের অনুরাগী হয়ে নানারকম কাজের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত দেখতে ভালবেসেছিলাম, তারপর এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমার অনেকটা সময় ব্যয় করেছি নেপথ্য কর্মী হিসেবে। কাজ করতে করতে কাজ শিখেছি। পথ চলতে চলতে পথ চিনেছে। এই পথেরই বাঁকে বাঁকে কত না মানুষের সঙ্গে দেখা হল, সখ্য হল আবার কেমন অবলীলায় বিচ্ছেদও ঘটে গেল। কত মানুষকে হারালাম অকালে। কত মানুষকে আপন করতে পারলাম। কত মানুষ ভুল বুঝে দূরে চলে গেল। এই পথের শেষ কোথায় জানি না।

জানি একদিন আমাকেও থামতে হবে। একদিন সব কাজ সাঙ্গ করে চলে যেতে হবে। তবু কিছু কাজের স্বাক্ষর থেকে যাবে, এই ভরসায় এখনও কাজ করেই যাচ্ছি। পুরস্কারের আশায় নয়, নিজের আত্মতৃপ্তির একান্ত অভিলাষে।