চেনাশোনার কোন্ বাইরে-২৩ ॥ সুশীল সাহা


জ্ঞানমঞ্চের সেই অনুষ্ঠান


১৯৯২ সালের ২৬ জানুয়ারি সকালে কলকাতার জ্ঞানমঞ্চে আমার অনুজপ্রতিম বন্ধু গৌতমের একক রবীন্দ্রগানের এক আয়োজন করেছিলাম। ঊনত্রিশ বছর আগের ঘটনা। তবু মনে রয়ে গেছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে।
গৌতম অর্থাৎ গৌতমবরণ অধিকারীর সঙ্গে আমার সখ্য বহুদিনের। সেই কবে ১৯৭৪ সালে ওর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল হংকং ব্যাংকের এক অনুষ্ঠানে। গৌতম তখন শিবপুরের বি ই কলেজের ছাত্র। পড়াশুনোর পাশাপাশি গান শেখে জয়দেব বেজের কাছে। খুব খোলা গলায় গান করে। আর্কিটেক্ট হিসেবে অনেকদিন চাকরি করেও গান ছাড়েনি ও। পেশা হিসেবে গানকে বেছে নেওয়া যে মুশকিল এ দেশে। তাই পেশায় আর্কিটেক্ট গৌতম অদ্ভুত এক কৌশলে গানের চর্চাও চালিয়ে গেছে ।

ওই দিনটাতে আসলে অন্য এক প্রিয়জন অমিতাভ ঘোষের আয়োজনে শান্তিদেব ঘোষ ও তাঁর এক জাপানি ছাত্রী তোমোকো কাম্বের গানের অনুষ্ঠান হবার কথা ছিল। কিন্তু এক অনিবার্য কারণে ওই দিন তোমোকো কলকাতায় আসতে পারবেন না বলে জানালেন। তিনি এমন সময় ব্যাপারটা জানালেন যে, তখন ওই তারিখটা বাতিল করলে হল কর্তৃপক্ষ টাকা ফেরৎ দেবেন না। ওই দিন ওই অনুষ্ঠানের জায়গায় অন্য কোনও কিছু করা যেতে পারে। অমিতাভদা আমাকে কথাটা জানাতেই গৌতমের একক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা মাথায় এল। জীবনের প্রথম একক, তাই স্বভাবতই গৌতম প্রথমটায় একটু কুণ্ঠিত ছিল। পরে আমাদের সবার কথায় সে রাজি হয়ে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিল। বলাবাহুল্য অনুষ্ঠানের নানান কাজের দায়িত্ব অবলীলায় আমার ঘাড়ে এসে পড়ল।

জানুয়ারির ১০/১২ তারিখে আমরা প্রস্তুতি শুরু করলাম। এদিকে ডাক্তার জানিয়েছেন আমার প্রথম সন্তান জন্মাবার সম্ভাব্য তারিখ ওই মাসেরই তৃতীয় সপ্তাহে। একটু বেশি রকমের ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছিলাম সম্ভবত। তবু জীবনের নানা পর্বে এমন ঝুঁকি তো কতবার নিয়ে সাফল্য পেয়েছি। তাই এবারেও এই ঝুঁকি নিতে দ্বিধাবোধ করলাম না। ব্যাপারটা গৌতম জানত না। পরে যখন জানল, তখন স্বভাবতই খুব বিস্মিত হয়েছিল। যা হোক, অনুষ্ঠানের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই আমার ব্যস্ততা বাড়ছে। প্রায় একক প্রচেষ্টা, তাই মাথাব্যথা একটু বেশিই ছিল যেন। ছুটির দিনের সকাল, শ্রোতা দর্শক আসবে তো। এই সংশয়টা প্রথম থেকেই উঁকি মারছিল মনে। অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ পত্র তৈরি করেই সেটা বিলি করতে থাকলাম। ব্যাপক জন-সংযোগ করে বুঝলাম অনেকেই আসবেন ওইদিন। গৌতমের বেশ কিছু শুভানুধ্যায়ী অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। ওই সময় অধ্যাপক তরুণ সান্যালের কন্যা শতরূপা এবং তাঁর স্বামী চলচ্চিত্রকার উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল তরুণদারই বাসায়। সদ্য বিয়ে করে ওঁরা তখন ওখানেই থাকেন। অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ওঁরা সেই সময়ে আমাকে অনেক পরামর্শ দিয়েছিলেন। নানারকম সাহায্য সহযোগিতাও করেছিলেন। ওঁদের এক ঘনিষ্ঠজন পৃথা সর্বাধিকারীর সৌজন্যে অনুষ্ঠানের শেষে কয়েকটি কথা বলার জন্যে অভিনেত্রী মাধবী চক্রবর্তীকে পাওয়া গেল। কথা বলতে একদিন গেলাম তাঁর টালিগঞ্জের বাসায়। ঠিক হল, সকালে তাঁকে ওখান থেকে নিয়ে আসতে হবে এবং অনুষ্ঠান শেষে পৌঁছে দিতে হবে বিজন থিয়েটারে। তখন তিনি ওখানকার এক নাটকের নিয়মিত শিল্পী। ভাবতেই পারিনি, এমন সহজ শর্তে যে তাঁকে পাওয়া যাবে।

এদিকে ক্রমে ক্রমে অনুষ্ঠানের দিন এগিয়ে আসতে থাকল। পাশাপাশি এগিয়ে আসছে আমার প্রথম সন্তানের জন্মাবার তারিখ। বিশে জানুয়ারি অরুণিমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। একুশ তারিখ গভীর রাতে আমাদের একমাত্র সন্তান রাকার জন্ম হল। সিজারিয়ান বেবি, তাই অপারেশন হয়ে যাবার পরে বেশ কয়েকটা দিন অরুণিমাকে ওই হাসপাতালেই থাকতে হল। আমার তখন এক ত্রিশঙ্কু অবস্থা। অফিস, হাসপাতাল আর অনুষ্ঠানের আয়োজনে দৌড়ঝাঁপ চলছে আমার। আমরা তখন হাবরায় থাকি।
যথাসময়ে ২৬ জানুয়ারি সকালে প্রায় পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে গৌতমের প্রথম একক গানের অনুষ্ঠান শুরু হল। সুচয়িত কয়েকটি গান দিয়ে সাজানো সেই অনুষ্ঠানে গৌতম নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল। শ্রোতা-দর্শকের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পেয়ে খুব ভাল লাগল। শেষে আমি কয়েকটি কথা বলেছিলাম। আমার পরেই মাধবী চক্রবর্তী একটি কবিতা পাঠ করেন। অনুষ্ঠান শেষ হয় বিপুল করতালির মধ্যে।
ঊনত্রিশ বছর পেরিয়ে গেছে। ইতঃমধ্যে গৌতম শিল্পী হিসেবে অনেক প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তবু আজও সে ভোলেনি তার সেদিনের সেই প্রথম একক অনুষ্ঠানের কথা। আমার কন্যাও এখন সুখে শান্তিতে ঘর সংসার করছে। কলেজে পড়াচ্ছে। সময় কী দ্রুত ধাবমান।

এইটুকু এই ছোট্ট জীবনে নানাসময়ে কত না উদ্যোগ নিয়েছি। সাফল্য অসাফল্যের কথা না ভেবেই এক অজানা অভিযানে নামার মধ্যে রোমাঞ্চ আছে, তা আমি অনুভব করেছি, কতদিন কতভাবে। এত বছর পেরিয়েও ওই অনুষ্ঠানের কথা আমি আজও ভুলিনি।
জীবনের ধন, তা যতই অকিঞ্চিৎকর হোক না কেন, কিছু কিছু বর্ণময় অভিজ্ঞতার কথা ইহজীবনে ভোলা সম্ভব নয়।